Last Updated on 9 months by admin

প্রায় তিন সপ্তাহ অতিক্রম করতে চলল দিল্লির সীমানায় সংগঠিত কৃষক অবস্থান। কৃষি সংক্রান্ত তিনটি

বিল ও বিদ্যুৎ বিল ২০২০ প্রত্যাহার সহ বেশ কয়েকটি দাবিতে শুরু হয়েছে এই আন্দোলন। পাঞ্জাব, হরিয়ানা,

রাজস্থান সহ উত্তর ও পশ্চিম ভারতের বেশ কয়েকটী রাজ্য থেকে কয়েক লক্ষ কৃষক জমায়েত হয়েছেন

রাজধানী দিল্লির সীমানার আশেপাশে। আন্দোলন শুরুর প্রথম দিন থেকেই সরকার প্রবল বলপ্রয়োগ করে এই

আন্দোলনকে দমন করার জন্য অতিসক্রিয় হয়ে উঠেছিল। জাতীয় সড়ক গুলোতে বড় বড় কংক্রীটের চাঙড়ের

ব্যারিকেড করে, জল কামান চালিয়ে দিল্লিগামী কৃষকদের গতিরোধ করার সব ধরণের চেষ্টা চালিয়েছে

কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লি পুলিশ। সরকারের এই দমননীতির সামনেও অটুট মনোবল নিয়ে প্রত্যেকদিন

আরোও বেশি সংঘবদ্ধ হচ্ছে কৃষক আন্দোলন। এই আন্দোলন ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিশেষত

পাঞ্জাবের গনতান্ত্রিক নাগরিক সমাজ, গায়ক- শিল্পীদের সক্রিয় সমর্থন আদায় করে নিতে পেরেছে। উত্তর

ভারত ছাড়াও অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, তামিলনাডু এইসমস্ত রাজ্যেও

আপামর কৃষকদের মধ্যে এই আন্দোলন-এর প্রতি সমর্থন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত ৮ই ডিসেম্বর কৃষকরা যে

সর্বভারতীয় ধর্মঘট এবং ১৪ ই ডিসেম্বরের যে প্রতিবাদ কর্মসুচীর ডাক দিয়েছিলেন তাতে দেশের বিভিন্ন

প্রান্তের মানুষেরা সামিল হয়েছেন।

আন্দোলনের শুরু থেকেই কেন্দ্রীয় সরকার এই আন্দোলন-এর গতি আটকানোর জন্য চেনা ছকে বেধে দিতে

চেয়েছিল। আন্দোলনরত কৃষকরা সরকারের সাথে আলোচনা চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ তাদের জাতীয়

সড়ক থেকে সরে এসে বুরারি ময়দানে জমায়েত হওয়ার শর্ত দেন। কিন্তু আন্দোলনকারীরা সেই শর্ত

প্রত্যাখ্যান করে সমাবেশের চাপ বাড়ালে সরকার পক্ষ কথা শুরু করতে বাধ্য হন। ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয়

সরকার আন্দোলন দুর্বল করার জন্য নানা অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করেছে। কখনো আন্দোলনকে খালিস্থানী

তথা বিভেদকামী দেশদ্রোহীদের আন্দোলন বলে দাগিয়ে দিয়েছেন। কখনো আন্দোলনের নেতৃত্ব-এর একাংশকে

আলাদা করে ডেকে নিয়ে গিয়ে আন্দোলনকারীদের ঐক্যকে ভাঙার চেষ্টা করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। একই

সাথে প্রধানমন্ত্রী সহ সরকারএর বিভিন্ন মন্ত্রীরা বারংবার তিনটি আইনের ‘উপযোগিতা’ জনসমক্ষে তুলে

ধরারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আর-এস-এস ও সংঘ পরিবারের ঘনিষ্ট বিভিন্ন কৃষক সংগঠনের সাহায্যে

তারা চাষিদের মধ্যে এই আইনের ‘উপকারিতা’ নিয়ে প্রচারে নেমেছেন।

অথচ এই তিনটি কৃষি আইনের যে সমস্যার দিকগুলো রয়েছে তা কিন্তু আন্দোলনরত কৃষকরা বেশ জোরালো

ভাবেই সমাজে রাখছেন। আন্দোলনরত কৃষকদের অভিযোগ ফসল বিক্রি সংক্রান্ত যে নতুন আইন-টি করা

হয়েছে তাতে উৎপাদিত ফসল বিক্রির ক্ষেত্রে নূন্যতম সহায়ক মূল্যর প্রসংগ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

সরকারের যুক্তি, এই আইনের ফলে মধ্যসত্ত্বভগীদের বদলে এবার থেকে চাষীরা সরাসরি কর্পোরেটদের ফসল

বেচতে পারবেন। কিন্তু উচ্চ ক্ষমতাশালী কর্পোরেটদের সাথে বানিজ্য করলে একজন সাধারণ কৃষক আদৌ

কিভাবে ফসলের ন্যায্য দাম পাবেন সেই সুরক্ষাকবচটি কিন্তু এই আইনে দিতে পারছে না। কৃষকদের আরো

দাবি ক্ষেত থেকে ফসল বাজারজাত হওয়ার মাঝে বর্তমানে যে বিপুল সংখ্যক ছোট ব্যবসায়ীদের স্বার্থ জড়িয়ে

রয়েছে তাদের ভবিষ্যৎও এই আইনের ফলে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে। চাষীর কাছ থেকে ফসল কেনা থেকে

শুরু করে বাজারে বিক্রি করা, সবটাই বড় বড় কর্পোরেট সংস্থার অধীনস্ত হয়ে পড়বে। কৃষকদের অভিযোগ,

একই সাথে অত্যাবশ্যকয়ীয় পণ্য আইনের বদল ঘটিয়ে কৃষিজাত খাদ্য দ্রব্য মজুদ করা সংক্রান্ত আইনি

বিধিরও বদল করেছে সরকার। চাল, গম সমেত বিবিধ খাদ্য-দ্রব্য আইনি ভাবেই বহুল পরিমাণে মজুদ

করার ছাড়পত্র দিয়েছে নতুন আইন। এর ফলে বড় বড় কর্পোরেট সংস্থার নির্দেশে বাজারজাত কৃষিপন্যের দাম

বাড়বে অনেকাংশেই। কৃষকদের আরো অভিযোগ ফার্মার্স এগ্রিমেন্ট অন প্রাইস আস্যুরেন্স এন্ড ফার্মার্স

সার্ভিসেস এক্ট এনে কর্পোরেটদের নিয়ন্ত্রণে চুক্তিচাষ করার রাস্তা খুলে দিচ্ছে সরকার। কর্পোরেটদের

নিয়ন্ত্রণে এধরণের চুক্তিচাষে স্বাধীন কৃষকের অস্তিস্ত্ব একপ্রকার বিলুপ্ত হবে বলে কৃষক সংগঠনগুলির

আশংকা।

 

কৃষক সংগঠগনগুলি সরাসরি আম্বানি আদানিদের মতন বড়ো কর্পোরেটদের অনৈতিক সুযোগসুবিধা

প্রাপ্তিকে নিজেদের আন্দোলনের লক্ষ্যবস্তু করে তুলেছে। কেন্দ্রের মোদী সরকার এই প্রশ্নে বড় বড়

কর্পোরেটদের কথাতেই এগোচ্ছে বলে আন্দোলনকারিদের অভিমত। সরাসরি আম্বানিদের সংস্থা রিলায়েন্স

এর পণ্য যেমন জিও বয়কটের ডাক দিয়েছে কৃষক আন্দোলন। সিংঘু, টিকরি সহ দিল্লির সীমানায় প্রত্যেকেদিন

লোকবল বাড়ছে আন্দোলনের সমর্থনে। ঊত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, মধ্যপ্রদেশ থেকে রোজ নতুন করে

চাষিরা আন্দোলনে যোগদান করছেন। আন্দোলনের নেতৃত্ব জানিয়েছেন শীতকালের প্রবল ঠান্ডাকে উপেক্ষা

করেও আগামী তিন চার মাস আন্দোলন চালানোর রসদ নিয়ে হাজির হয়েছেন কৃষকেরা। দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায়

আসার পর থেকে মোদী শাহ জুটিকে এত বড় গণ আন্দোলনের মুখোমুখি হতে হয়নি বলেই রাজনৈতিক মহলের

অভিমত। পাঞ্জাব হরিয়ানা সহ উত্তর ভারতের এই কৃষক আন্দোলন কতটা ঐক্যবদ্ধ থেকে আগামী দিনে

কর্মসূচী নিতে পারে তার উপরই নির্ভর করবে এই আন্দোলনের সাফল্য বা ব্যর্থতা।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Social Media Auto Publish Powered By : XYZScripts.com
error

Enjoy this website? Please spread the word :)