লাঞ্ছিত ক্যাপিটল আর আমাদের শিক্ষা

মতামত

Last Updated on 8 months by admin

“বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর, সবার আমি ছাত্র
নানান ভাবের নতুন জিনিস শিখছি দিবারাত্র”

শুধু কবি নয়, যুগে যুগে যুগাবতার থেকে শুরু করে মা-বাপ হয়ে শিব খেরা, মায় সাধগুরু পর্যন্ত সক্কলেই বলিয়াছেন, যাবৎ বাঁচিবি তাবৎ শিখিবি বাপ। বিজয় মাল্য- নীরব মোদি- মেহুল চোকসি সম্পাদিত টেক্সটবই থেকে “চুরি করা মহাপাপ” শিখবি, বিবেক ওবেরয়ের কাছ থেকে ব্যর্থ প্রেম এবং “মেরা গুজরাত জ্বল রহা হ্যায়” শিখবি, ভারতীয় মিডিয়ার কাছ থেকে শিখবি ‘নির্ভীক সাংবাদিকতা’ ফ্রেজের মানে। আর হ্যাঁ, অতি অবশ্যই আমেরিকার কাছ থেকে শিখবি গণতন্ত্র কাহাকে বলে…

কবিগুরু থেকে শুরু করে সাধগুরু পর্যন্ত সকলেই জানেন,এ ধরার প্রাচীনতম এবং ‘সবচেয়ে পরিণত’ গণতন্ত্রের পীঠস্থান হ’ল আম্রিগা। সারাবচ্ছর নিজে খেয়ে- ছড়িয়েও তার ‘গণতন্ত্র’ এতটাই উদ্বৃত্ত থাকে যে সে রাষ্ট্রিয় সীমানার ধার-টার না ধেরে সারা পৃথিবীর কোণায় কোণায় একেবারে নিজ উদ্যোগে, বিনে পয়সায় গণতন্ত্রের গঙ্গাজল ছিটিয়ে বেড়ায়। ইরাক থেকে আফগানিস্তান, সিরিয়া থেকে ভিয়েতনাম, কিউবা থেকে সাউথ চায়না সী পর্যন্ত বিস্তৃত ম্যাপে মিলিটারি বেস গড়ে তুলে, যুগে যুগে নাপাম থেকে শুরু করে এফ সিক্সটিন বর্ষিয়ে, দেশে দেশে সেমি অটোমেটিক রাইফেল আর স্নাইপার ওয়ালা জলপাই-রঙা সেনা পাঠিয়ে এবং, লেডিজ অ্যান্ড জেন্টেলমেন, শেষে সমস্তকিছুর ধারাবিবরণী সহ অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড জয়ী সিনেমা বানিয়ে এ ধরণীর গণতন্ত্র রক্ষার বিশুদ্ধ দায়িত্বটি কার ওপরে ন্যস্ত? আজ্ঞে হ্যাঁ, তার নাম, আমাদের সব্বার ‘বিগ ব্রো’, আমেরিকা!

________________________________________

তা সেই বড় ভাইয়ের গুড বুকে থাকার জন্য চিরদিনই সবাই কমবেশি চেষ্টা করে এসেছেন। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে নরেন্দ্রভাই এবং আঙ্কল ডোনাল্ডের সখ্য ছাপিয়ে গিয়েছিল সমস্ত পুরোনো কোলাকুলিকেই। এ তার দেশে গিয়ে ‘হাউডি মোদি’র স্টেডিয়াম থেকে এন আর আইদের ভোট কুড়িয়ে দিয়ে আসে তো সে এদেশে এসে ‘কেম ছো ট্রাম্প’ এর মঞ্চ থেকে ভারতকে করে তোলে তার ‘গ্লোবাল পার্টনার’। কারণ? কারণ হ’ল রাজনৈতিক আদর্শ থেকে শুরু করে সামাজিক গঠন হয়ে বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি পর্যন্ত সমস্ত বিষয়েই তাদের উভয়ের আশ্চর্য মিল!

আঙ্কল ট্রাম্প সাম্প্রতিক এলজিবিটিকিউ আন্দোলন বোঝেন না, মিলিটারি থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যব্যবস্থা হয়ে স্কুল পর্যায় পর্যন্ত তার প্রশাসনের বিভেদকারী নীতির মূল্য দিতে হয় তাঁদের। তিনি অবলীলায় প্রত্যাখ্যান করেন বিশ্ব উষ্ণায়নকে, চূড়ান্ত দায়িত্ববোধহীন হয়ে প্যারিস চুক্তি থেকে সরিয়ে আনেন নিজেকে। তার আমলে ফুলে ফেঁপে ওঠে সেদেশের ০.১% অতিধনীরা, এদিকে দেশের সিংহভাগ মানুষের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবীমা করা বা অবসর পরবর্তী জীবনে বেঁচেবর্তে থাকা চলে যায় হাতের বাইরে। তার কাছে ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ এর আন্দোলনকারীরা হয়ে যায় ‘দুর্বৃত্ত’ আর তাদের আন্দোলন হয়ে যায় ‘বিদ্বেষের প্রতীক’ (ক্যাপিটল হামলার পরে সেসব মনে পড়লে আপন মনেই বলে উঠতে ইচ্ছে করে, হায় আয়রনি)। দেশ নিয়েও তার বক্তব্য কী হুবহু মিলে যায় আমাদের সাথেঃ আমেরিকার পতনের জন্য দায়ী কখনও মেক্সিকান, কখনও দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীরা; তাই মেক্সিকো বর্ডারে দেওয়াল তুলে দাও, আমূল বদলাও ভিসা পলিসি; এবং এভাবেই নাকি সম্পন্ন হবে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’!

________________________________________

এভাবেই ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে একদিকে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ আর অতি জাতীয়তাবাদের আগুনে ঘি ঢেলে গিয়েছেন, একদিকে প্রচার করেছেন দিগন্তবিস্তৃত ‘জিব্বেরিশ’ আর অবৈজ্ঞানিকতার, আর অন্যদিকে দিনেরাতে পুজো দিয়ে গেছেন ওয়াল স্ট্রিটের লক্ষ্মীদেবীকে। অর্থাৎ, সমস্ত চিহ্ন সহ আধুনিক পৃথিবীর দক্ষিণপন্থীয় উত্থানে নরেন্দ্র মোদী- জাইর বলসোনারো- বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুদের পাশাপাশিই ‘বড়দা’ হিসেবে নিজের গুরুদায়িত্বটি শুরু থেকে খুব মন দিয়ে পালন করে গেছেন ডোনাল্ড জে ট্রাম্প।

তবু সময় সাধারণত একজন নির্মম শিক্ষক এবং ট্রাম্পদের জন্য একটি কুক্কুরী বিশেষ। ‘I won, by a lot’ এর শূন্য দম্ভে তার কিচ্ছুটি যায় আসে না। তবু ট্রাম্প সেই বিশেষ প্রজাতির ‘প্রেসিডেন্ট’ যে তার নিজের দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস, তার অন্তর্গত অসংখ্য জাতি-ধর্ম-বর্ণের সহাবস্থানের সংস্কৃতি অথবা গণতন্ত্রের মানে কিছুই জানেন না। তাই নির্বাচনে হেরে গিয়েও নাগরিকের রায় মানেন না, অনবরত প্ররোচনা দিয়ে যান হিংসায়। যার সর্বশেষ প্রতিফলন ঘটে ক্যাপিটলে তার সমর্থকদের দাঙ্গায়; হাতে দেশের জাতীয় পতাকা আর গলায় ‘ইউ এস এ’ স্লোগান নিয়ে তারা ঢুকে আসে গণতন্ত্রের পীঠস্থানে, ভাঙচুর চালায়। তাদের মস্তিষ্ক জুড়ে বসে থাকে অভাবনীয় সব চক্রান্ত তত্ত্ব আর মিথ্যে যারা বহু ব্যবহারে আপাতত সত্যে পরিণত হয়েছে; তারা জানে, তাদের নেতা যে শুধু নির্বাচন জিতেছেন তাই নয়, তাদের স্বার্থরক্ষা থেকে শুরু করে এদেশের উন্নয়নের জন্য তাঁর বিকল্প আর হতেই পারে না। সারা পৃথিবী হাঁ করে দেখে দেশ আর রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে অযোগ্য এক রাষ্ট্রনায়কের প্রতি অন্ধ প্রেমের সেই নগ্ন উন্মাদনা, গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী আমেরিকার নিজের মাটিতেই গণতন্ত্রের লজ্জাজনক ভূলুণ্ঠন, তারা হেসে ওঠে সময়ের সেই নির্মম পরিহাসে।
________________________________________

অবশ্য সেই হাসিতে অথবা ট্যুইটার- ফেসবুক- ইন্সটা জুড়ে তার ব্যানে ট্রাম্পের কিছু যায় আসে বলে বোধ হয় না। ট্রাম্পদের কিছু যায় আসে বলে বোধ হয় না। কারণ ট্রাম্পরা শুধু ক্ষমতার নির্লজ্জ সমীকরণ বোঝেন, হিংসার নির্বোধ ভাষা চেনেন।

এবং আমাদের প্রত্যেকের মনে রাখা উচিত, যেদিন এদেশে সময়ের সেই নির্মম অঙ্গুলিহেলনের মুহূর্ত উপস্থিত হবে সেদিন এদেশ জুড়েও নরেন্দ্রভাই এবং তার সমর্থকদের হাতে এভাবেই চূড়ান্ত ভূলুণ্ঠিত হবে মানুষের রায়, গনতন্ত্রের নিয়ম। আপাতত এদেশের উর্বর মাটি জুড়ে সেই বিভেদের, হিংসার, অসহ্য দম্ভের বীজ বোনার কাজ চলছে সুনিপুণ হাতে; চলবে আগত সময় জুড়েও। আইনের শাসনকে নিজের পকেটস্থ করে, গোটা দেশজোড়া মিডিয়াকে সার্কাসে পরিণত করে, আইটি সেল আর ধর্মের আফিমে বুঁদ লক্ষ লক্ষ ‘ভক্ত’ তৈরি করে এদেশের বুকে চিরতরে নিজের মনোপলি কায়েমের কাজে জীবন সঁপেছেন তার নেতৃত্ব, বিষ্ণুর একাদশ অবতার!

আকাশের কাছ থেকে যে উদারতা, বাতাসের কাছ থেকে যে কর্মযোগের সংজ্ঞা এবং পাহাড়ের কাছ থেকে যে মহত্ত্বের আদর্শ শেখার কথা ছিল আমাদের, আপাতত আঁকড়ে ধরতে হবে তাকেই। আর শিখতে হবে এদেশের সুদীর্ঘ সহিষ্ণুতার পাঠ, সমন্বয়ের ইতিহাস, বদ্ধ জলাশয় নয়, বহমান স্রোতের রাজনীতি। সে সংকল্প ছাড়া আগত দেশজোড়া হিংসা আর পৃথিবীজোড়া লজ্জার হাত থেকে বাঁচার অন্য কোনও উপায় আপাতত আমাদের কারও কাছেই নেই…

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
No Thoughts on লাঞ্ছিত ক্যাপিটল আর আমাদের শিক্ষা

Leave A Comment