“লাভ জিহাদ” ও উত্তরপ্রদেশের নতুন আইন

বিভাগ-বহির্ভূত

Last Updated on 9 months by admin

23 December, 2020, নিজস্ব সংবাদদাতা

ডিসেম্বর মাসের ২ তারিখে লক্ষনৌ এর একটি কলোনিতে ২৪ বছরের এক মুসলিম ছেলে ও ২২ বছর বয়সী এক হিন্দু মেয়ের বিয়ে আটকে দেয় পুলিশ। খবরে প্রকাশ দুই পরিবারের সম্মতিতেই ঐ বিয়ে হিন্দুমতে ঘটতে যাচ্ছিল। জানা যায় যে একটি হিন্দু ভিজিল্যান্টি গ্রুপের অভিযোগ পেয়ে পুলিশ ঐ বিয়েতে বাধা দেয়। তারা ওই দম্পতিকে বলে বিয়ে করার আগে জেলাশাসকের সম্মতি লাগবে। তার কারণ যোগী আদিত্যনাথের বিজেপি সরকার কর্তৃক ২৮ নভেম্বর চালু করা প্রোহিবিশন অফ আনলফুল কনভার্সন অফ রিলিজিয়ন অর্ডিন্যান্স, ২০২০ অনুসারে ভিন্নধর্মের বিয়ের ক্ষেত্রে জেলাশাসকের এই অনুমতি বাধ্যতামূলক।
উত্তরপ্রদেশের ওই দম্পতি শাস্তির হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু সে রাজ্যে সবার ক্ষেত্রে তা ঘটে না মোটেই। ওই অর্ডিন্যান্স চালু হওয়ার পর থেকে পুলিশ এখনো পর্যন্ত ভিন্ন ধর্মে বিয়ের মোট ৫ টি মামলা রুজু করেছে, এবং ৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। গত ৬ই ডিসেম্বর আরএসএস পরিচালিত বজরং দলের কয়েকজন সদস্য মোরাদাবাদের বিবাহ রেজিস্ট্রেশ্ন অফিসে পৌঁছয় এবং রেজিস্ট্রি করতে আসা এক মুসলিম পুরুষ ও এক হিন্দু নারীকে পুলিশের কাছে নিয়ে যায়। ওই দম্পতি জুলাই মাসে বিয়ে করেছিলেন। পুলিশ ঐ মুসলিম ব্যক্তি ও তাঁর ভাইকে গ্রেপ্তার করে। এই গ্রেপ্তারের ভিত্তি হল ওই মহিলার মায়ের একটি অভিযোগ, যেখানে বলা হয়েছিল যে ওই মহিলাকে জোর করে লোভ দেখিয়ে বিয়ে করা হয়েছে এবং ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। যদিও ওই মুসলিম মহিলা বার বার জোরের সাথে বলেন যে, তাঁদের সম্পর্ক এবং বিবাহ পুরোটাই পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে হয়েছে। এর দুদিন পর পুলিশ কুশীনগর থেকে ফোন পেয়ে একইভাবে একটি বিয়ে আটকায়। ফোনে বলা হয়েছিল যে ওই বিয়েতে এক মুসলিম পুরুষ এক হিন্দু নারীকে বিয়ে করছে তাকে ধর্মান্তরিত করার পর। কিন্তু পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে জানতে পারে যে দুই ব্যক্তিই মুসলিম, এবং ফোনের ওই অভিযোগ সর্বৈব মিথ্যা। ঘটনার পরদিন তাঁদের বিয়ে হয় নির্বিঘ্নেই।
ওই অর্ডিন্যান্স পাশ হবার পর থেকেই এইরকম নজরদারি ও পুলিশি অতি-সক্রিয়তার পরিমান অনেক বেড়ে গেছে উত্তরপ্রদেশে। বলাই বাহুল্য ওই অর্ডিন্যান্স তৈরি ও পাশ করা হয়েছে “লাভ জিহাদ” তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে, যার মূল উদ্দেশ্য এটা দেখানো যে মুসলিমদের এটি একটি ষড়যন্ত্রমূলক পদক্ষেপ, যেখানে হিন্দু মেয়েদের নানারকম মিথ্যা কথা বলে বা ফুঁসলিয়ে বিয়ে করা হয় এবং জোর করে তাঁদের ধর্মান্তরিত করা হয়। এই কথাই বজ্রনির্ঘোষের মত যোগী আদিত্যনাথ ৩১ শে অক্টোবর জৌনপুরের একটি র‍্যালিতে বলেছিলেন: “আমি তাদের সাবধান করছি, যারা নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে রাখবে আর আমাদের বোনেদের সম্মান নিয়ে খেলা করবে। যদি তোমরা কথা না শোনো, তাহলে তোমাদের ‘রাম নাম সত্য’ যাত্রা শুরু হবে।“
এই অর্ডিন্যান্সকে সমর্থন করে ও ব্যাখ্যা করে উত্তরপ্রদেশের ক্যাবিনেট মন্ত্রী ও মুখপাত্র সিদ্ধার্থনাথ সিং বলেন, “এরকম জোর করে ধর্মান্তরিত করার ঘটনা একশোর বেশি ঘটেছে বলে আমাদের কাছে খবর আছে। এছাড়াও এ রাজ্যে ভুলিয়ে ভালিয়ে ধর্ম পাল্টানোর খবরও আছে। কাজেই এই বিষয়টাতে একটি নতুন আইন চালু করা বর্তমানে একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।“ কানপুর পুলিশ যেদিন ১৪ টা কেসের বিষয়ে তাদের তদন্ত রিপোর্ট পেশ করল, যার মধ্যে নাকি তাদের মতে ১১ টাই হল জোর করে বা ভুল বুঝিয়ে ধর্ম পাল্টানোর ঘটনা, তার দুদিন পরেই ওই অর্ডিন্যান্স আনা হয়। এটা স্পষ্ট যে উত্তরপ্রদেশ সরকার “লাভ জিহাদ” তত্ত্বের মাধ্যমে এটাই প্রমাণ করতে চায় যে ভিন্ন ধর্মের বিয়ে মানেই তা হল হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলিম চক্রান্ত এবং হিন্দু মহিলাদের মুসলিম ধর্মে দীক্ষিত করে আমাদের দেশে ইসলামের সম্প্রসারণ ঘটানো। কিন্তু কেন্দ্রের বিজেপি সরকার এই “লাভ জিহাদ” তত্ত্বকে মান্যতা দেয়নি। ফেব্রুয়ারি মাসে কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী জি কিসেন রেড্ডি লোকসভায় দাঁড়িয়ে বলেন যে “লাভ জিহাদ” নামক কোনো শব্দবন্ধের উল্লেখ দেশের কোনো আইনেই নেই, এবং কোনো কেন্দ্রীয় সংস্থাও এই বিষয়ে কখনো কোনো রিপোর্ট দেয়নি।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে নাৎসি জার্মানিতে ঠিক এভাবেই হিটলার “ন্যুরেমবার্গ আইন” চালু করেছিলেন। ভারতের সংবিধানও এই ধরণের আইন প্রণয়নের অনুমতি দেয় না। স্পষ্টতই এই ধরণের আইন ধর্ম-নিরপেক্ষতা ও সমানতার ধারণার একেবারে পরিপন্থী। এই বিষয়ে নানা সময়ে সুপ্রীম কোর্টের বিভিন্ন রায় থাকলেও আরএসএস-বিজেপি তাদের ভারতরাষ্ট্রকে হিন্দুরাষ্ট্রে পরিনত করার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনামাফিকই এগোচ্ছে, এবং উত্তরপ্রদেশ সহ বিজেপি-শাসিত নানা রাজ্যেই এইধরণের আইন প্রণয়ন করার চেষ্টা করে চলেছে।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
No Thoughts on “লাভ জিহাদ” ও উত্তরপ্রদেশের নতুন আইন

Leave A Comment