“আয়ুষ্মান ভারতে” কি আপনার আয়ু আদৌ বাড়বে?

মতামত

Last Updated on 8 months by admin

ডা. সিদ্ধার্থ গুপ্ত

এখানে যা নিয়ে আলোচনা করা হবে, তা আপনাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমাদের বেঁচে থাকার খাবার, পানীয় জল, মাথার উপর একটুকরো ছাদ, জামাকাপড় বা বিদ্যুতের মতই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় হল স্বাস্থ্য, এবং অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার ব্যবস্থা। এই দুটো ছাড়া আমাদের জীবনকে কখনো নিরাপদ বলা যায় না। যে কোনো মানুষ, সে তিনি যে কোন ভাষাতেই কথা বলুন, যে ধর্মেরই হন বা যে রাজনৈতিক বিশ্বাসেরই হন না কেন অসুস্থ হয়ে পড়াটা কখনো বলে কয়ে আসে না। আর মধ্যবিত্ত ও গরিব মানুষের চিকিৎসার ক্ষেত্রে ভারতবর্ষের অবস্থাটা ভয়াবহ। প্রতিবছর হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মানুষ এবং শিশু যক্ষ্মা, পেটের অসুখ, ফুসফুসের অসুখ, রক্তাল্পতা, এইসব কারণে বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। বিনাপয়সার সরকারি চিকিৎসাব্যবস্থা, চিকিৎসাকেন্দ্র, হাসপাতাল, ওষুধপত্র – এসব নেহাতই কম। প্রতিবছর শিশুমৃত্যু, বাচ্চা হতে গিয়ে মায়েদের মৃত্যু এইসব আমাদের দেশে খুবই বেশি। বাচ্চাদের মধ্যে অপুষ্টি, বাড়বৃদ্ধি কম হওয়া প্রভৃতি ভয়ানকভাবে বেশি। তাও গত পাঁচ বছরে আমাদের রাজ্যে সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনা পয়সায় সব ধরনের চিকিৎসা,নানা অপারেশন, বাচ্চা হওয়া এই সব অনেক বেড়েছে। সরকারি চিকিৎসার খরচও অনেকটা পাওয়া যাচ্ছে তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা এখনও কম। হাসপাতালে লম্বা লাইন, বেড না পাওয়া, নানাধরণের পরীক্ষা হতে দেরি হওয়া, এসব খবর প্রতিদিনই আসে। কিন্তু অন্য রাজ্যগুলোর অবস্থা আরও খারাপ। কেন্দ্রীয় সরকার কেন্দ্রীয় বাজেটের মাত্র ১ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করেন; যেখানে প্রায় ১৫% খরচ হয় বিদেশ থেকে অস্ত্রশস্ত্র কিনতে আর ২০% খরচ হয় বিদেশ থেকে নেওয়া ধার মেটাতে আর হাজার হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় সরকার আদানি, আম্বানিদের মত বড় ব্যবসায়ীদের কর ছাড় দিয়ে দেন, বা ব্যাঙ্ক থেকে চুরি করে বিদেশে পালিয়ে যেতে দেন।

এই ভয়ঙ্কর অবস্থা দূর করার জন্য যেটা দরকার ছিল তা হল স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাখাতে সরকারি খরচ বাড়ানো এবং আরও বেশি বেশি করে সরকারি হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, এইসব তৈরি করা, যাতে গরিব মানুষেরা সরাসরি সেখানে বিনা পয়সায় চিকিৎসা পান, ওষুধ পান, ভর্তি হতে পারেন বা দরকারে অপারেশনের সুযোগ পান। সরকার-নিযুক্ত অনেক বিশেষজ্ঞ এই কথাই বলেছিলেন।
অথচ দিল্লীর সরকার স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর বদলে কমিয়ে দিল। নতুন সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র আর হাসপাতাল তৈরি বন্ধ করে দিল, আর বেসরকারি বড় বড় দেশি বিদেশি ব্যবসায়ীদের ঢালাও অনুমতি দিল প্রাইভেট হাসপাতাল তৈরি করে সেখানে চিকিৎসার নামে মধ্যবিত্ত ও গরিবের রক্ত চুষে খাওয়ার। এজন্য তাদের বিনা পয়সায় জমি, জল ও বিদ্যুৎ দেওয়া হল, এবং সরকারের প্রাপ্য ট্যাক্স ছেড়ে দেওয়া হল। পাশাপাশি গজিয়ে উঠল প্রচুর প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ। যেখানে একেকটা ডাক্তারি সিট ১-১.৫ কোটি টাকা দিয়ে কিনতে হয়। এর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকার “আয়ুষ্মান ভারত” বা “প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা” নামে সারা ভারতবর্ষে একটা স্বাস্থ্যবীমা প্রকল্প চালু করেছে। এই বীমা প্রকল্পে বলা হচ্ছে ভারতবর্ষের ১০ কোটি গরিব পরিবারকে প্রতি বছর ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসার সুযোগ বিনাপয়সায় দেওয়া হবে। তাদের ৫ জনের পরিবারকে একটা শর্ত দেওয়া হবে, যেটা দেখিয়ে তারা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল থেকে বিভিন্ন অসুখের চিকিৎসা করাতে পারবে। এই খরচটা কে মেটাবে? কেন্দ্রীয় সরকার এমটা বিদেশি বীমা কোম্পানিকে দায়িত্ব দিয়েছে যারা হাসাপাতালগুলোকে এই খরচের টাকাগুলো দেবে। তার বিনিময়ে কেন্দ্রীয় সরকার এই বীমার পলিসির টাকা অগ্রীম এই কোম্পানির হাতে তুলে দেবে। হয়তো ১০ কোটি মানুষের মধ্যে কোনো বছরে ১০ লক্ষ মানুষ অসুস্থ হলেন, যা ২ লক্ষ পরিবারের সমান। এই টাকাটা বীমা কোম্পানি মেটাবে। সরকারের দেওয়া বাকি টাকাটা কোম্পানির লাভ।
সাদা চোখে দেখলে এই বীমাব্যবস্থা সাধারণ মানুষের পক্ষে খুবই ভালো, কারণ তাদের কোনো টাকা খরচ করতে হচ্ছে না। কিন্তু এর মধ্যে অনেক ঘাপলা এবং অনেক জুমলা আছে। সেগুলো সংক্ষেপে বলছি —
১) এই কার্ড নিয়ে আপনি নথিভুক্ত কোন হাসপাতালে বহির্বিভাগে বা আউটডোরে দেখাতে পারবেন না। কোন ওষুধপত্র পাবেন না। রক্তপরীক্ষা, এক্স-রে, ইসিজি প্রভৃতি কোনটাই করাতে পারবেন না।
চোখ, দাঁত, চামড়ার সাধারণ অসুখ বিসুখ এইসব রোগের চিকিৎসা বহির্বিভাগেই হয়ে থাকে। এইসব চিকিৎসায় অর্থ সাহায্য পাবার সুযোগ থাকছে না।
২) অন্দরবিভাগে ভর্তি হলে মাত্র ১৫ দিনের চিকিৎসা পাবেন। ১৫ দিনের মধ্যে সুস্থ হতে না পারলে বা অস্ত্রোপচারের ১৫ দিন পরেও অসুস্থ থাকলে আপনাকেই সেই খরচ মেটাতে হবে। একটি পয়াসাও সেই বীমা কোম্পানি দেবে না।
৩) এর মাধ্যমে সামান্য স্বাস্থ্য বাজেটের একটা বিরাট অংশ আয়ুষ্মান ভারতের নামে বীমা কোম্পানিকে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ফলে সাধারণ সরকারি চিকিৎসা পরিষেবায় খরচ করার মত আর কোনও টাকাই পড়ে থাকবে না। অন্যদিকে মানুষের ট্যাক্সের এই টাকা ঘুরপথে বীমা কোম্পানির মাধ্যমে চলে যাচ্ছে প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর তহবিলে, যাদের উত্তরোত্তর ব্যবসা বাড়বে এবং সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থার সুযোগ কমবে, ফলে লোকে ঘটি বাটি বিক্রি করেও প্রাইভেট হাসাপাতালে যেতে বাধ্য হবে।
8) যে জার্মান বীমা কোম্পানিকে কোন টেন্ডার ছাড়াই এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাদের নামে দুর্নীতির প্রচুর অভিযোগ আছে। এই কোম্পানিকে বীমার প্রিমিয়াম হিসাবে যে মোটা টাকা দেওয়া হচ্ছে, সেই টাকা দিয়ে সরাসরি হাসপাতাল তৈরি করলে মানুষ অনেক বেশি উপকৃত হত।
৫) হাসপাতাল থেকে ছুটি পাওয়ার পর কেও ঐ কার্ড নিয়ে আর হাসপাতালে দেখাতে পারবেন না বা ওষুধ পাবেন না।
৬) কোন পরিবারে যদি ৫ জনের বেশি সদস্য থাকেন, তবে তাঁরা চিকিৎসা পাবেন না।
৭) দারিদ্যসীমার নিচে ১০ কোটি পরিবারের হিসাব হয়েছে ২০১১ সালের আদমশুমারি মোতাবেক। বর্তমান সময়ে ওই সংখ্যাটা অনেক বেড়েছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবার কোনো সুযোগ এই জন আরোগ্য যোজনায় নেই।
৮) এই কার্ডভিত্তিক বীমাব্যবস্থা দুর্নীতির উৎসমুখ খুলে দেবে। কার্ডের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য বেসরকারি নার্সিংহোমগুলো অপ্রয়োজনীয় অপারেশন করে কার্ডটাকে শূন্য করে দেবে, যেমন দক্ষিণভারতে অনেক জায়গায় হয়েছে। সামান্য পেটব্যথার কারণে অল্পবয়সী কুমারী মেয়েদের ভর্তি করে টাকা হাতড়ানোর জন্য গর্ভাধান বা ইউটেরাস কেটে বাদ দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
৯) বীমার প্রিমিয়ামের মোট খরচের ৮০% রাজ্য সরকারকে দিতে হবে। অথচ নাম ডাক হবে প্রধানমন্ত্রীর। এটা অসাংবিধানিক। কারণ স্বাস্থ্য পুরোপুরি রাজ্য তালিকাভুক্ত বিষয়। তাতে কেন্দ্র এভাবে হস্তক্ষেপ করতে ও চাপিয়ে দিতে পারে না।
১০) এই স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা অনান্য বহুদেশেই বিফল হয়েছে।
এর ফলে দেখা যাচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার যে প্রকল্পকে যুগান্তরী এবং আমাদের চিকিৎসা পাওয়ার পথকে সুগম করবে বলে খোল করতাল বাজিয়ে বাজারে প্রচার করছে, সেটা আসলে একটা ধোঁকার টাঁটি; বেসরকারি বীমা কোম্পানি আর বেসরকারি নার্সিংহোমকে আমাদের ট্যাক্সের টাকায় পুষ্ট করে তোলার এক ভয়ানক চক্রান্ত।

 

[লেখক পেশায় চিকিৎসক এবং গণ-আন্দোলন এবং স্বাস্থ্য-আন্দোলনের কর্মী]

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
No Thoughts on “আয়ুষ্মান ভারতে” কি আপনার আয়ু আদৌ বাড়বে?

Leave A Comment