আরএসএসের বাংলায় আগ্রাসন প্রসঙ্গে কিছু কথা

আজকের খবর বিশেষ খবর মতামত

Last Updated on 5 months by admin

আরএসএস তার রাজনৈতিক মুখ বিজেপি-কে সামনে রেখে যে কোনো মূল্যে বাংলা দখল করতে চায়। তারা ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে নষ্ট করতে চায়। আরএসএস এওকটি ফ্যাসিস্ট শক্তি। এই ফ্যাসিস্ট শক্তি যাদের উত্থানের পিছনে প্রধান অবদান রয়েছে বৃহৎ পুঁজির। ফ্যাসিস্টরা আজ ভারতবর্ষের বহুত্বকে, ভারতের বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য’ কে ধ্বংস করতে উদ্যোগী। আরএসএস-এর এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে এখনই জোট বেঁধে লড়াইতে নামতে হবে। নাহলে বিপদ।  –   লিখছেন পঞ্চক …..

আরএসএসের বাংলায় আগ্রাসন প্রসঙ্গে কিছু কথা

পঞ্চক

আরএসএসের পাখির চোখ এখন বাংলা। যে কোনো মূল্যে তারা বাংলা দখল করতে চায়। এই দখল করা বলতে কেবলমাত্র আরএসএসের রাজনৈতিক মুখ বিজেপির ভোটে জিতে নিরামিষ ক্ষমতা দখল নয়। বরং এটি  হল বাংলার বুকে তাদের ভাবাদর্শকে সুদৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠা করা, তাদের সর্বগ্রাসী হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আখড়া হিসাবে স্থাপন করা বাংলাকে। তারা ঘোষিতভাবেই যুক্তরাষ্ট্রীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, ব্যাক্তিস্বাধীনতা, নারী অধিকারের বিরোধী একটি ফ্যাসিস্ট শক্তি যাদের উত্থানের পিছনে প্রধান অবদান রয়েছে বৃহৎ পুঁজির। তারা চায় ভারতবর্ষের বহুত্বকে, ভারতের diversity কে (যা ভারতের অন্তরাত্মা) ধ্বংস করতে। আর যে উদারপন্থী চর্চার তারা সবচেয়ে বিরোধী বাংলায় বহুকাল ধরেই তা জেঁকে বসেছিল। যদিও আরএসএসের প্রধান পুঁজি মুসলিম বিদ্বেষ, দলিত বিদ্বেষ- বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ  হিন্দু জনগণের মধ্যেই আছে। কিন্তু তারপরও নানা কারণে সেগুলি এতদিন ছিল অবদমিত। একরৈখিক, রিগ্রেসিভ, নগ্ন মৌলবাদ বাংলায় ছিল না। পরিবেশ ছিল আপাতভাবে বিভেদের পরিপন্থী। ফলে সরাসরি সেই সুপ্ত বিদ্বেষকে খোঁচা দিয়ে মানুষকে স্পষ্ট তার বিভেদের ভাষায় কথা বলানো সহজ কাজ নয়। তাই ওদের দরকার পড়েছে নানা কৌশলের। যা দিয়ে তারা মানুষের ভেতরে সুপ্ত ভাবে বিদ্যমান বিদ্বেষকে জাগিয়ে তুলবে।

ধর্মান্ধতা, ধর্মীয় মৌলবাদ এগুলি কমবেশি ভারতের সর্বত্রই রয়েছে। তবে অঞ্চলভেদে নানা কারণে তার কিছু রূপভেদ আছে। যেমন বাংলা অঞ্চলে ধর্মীয় গোঁড়ামি (হিন্দু, ইসলাম উভয় ধর্মেই) থাকলেও তা গোবলয়ের মত নগ্ন, রিগ্রেসিভ নয়। আসলে বাংলায় বহুকাল ধরে সংস্কৃতির একটা উদারপন্থী, সহিষ্ণু লোকায়ত ধারা তিরতির করে বয়েছে। চৈতন্য, লালন, বাউল, মুর্শিদির সেই ঐতিহ্য বাংলাকে cultural rigidity এর হাত থেকে বাঁচিয়েছে। বাঙালি যে ঈশ্বরকে পুজো করে তাকে নিয়েই রসিকতা করতে পারে বা গোঁড়ামি মুক্ত হয়ে কাব্য লিখতে পারে। অবশ্য তার মানে এমনটা নয় যে এখানে ধর্মীয় গোঁড়ামি একদমই ছিল না বা কুসংস্কার ছিল না। বেশ ভালোভাবেই তা ছিল এবং এখনও আছে। কিন্তু একরৈখিক নগ্ন ধর্মান্ধতা কোনো কালেই ছিল না। বরং বিভিন্ন সামাজিক কুপ্রথা, জঘন্য রীতিনীতির ওপর কুঠারাঘাত এখানেই শুরু হয়েছিল একসময়। যদিও উনিশ শতকের তথাকথিত নবজাগরণ কতদূর অচলায়তন ভাঙার উদ্দেশ্যে ছিল বা কতদূর শ্রেণীস্বার্থহীন ছিল তা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। মুসলিম সমাজকে দূরে সরিয়ে রাখা, এলিট কেন্দ্রিকতা ইত্যাদি নানা দোষে তা দুষ্ট ছিল। কিন্তু তার সুফলও অনস্বীকার্য। এত সমস্যার পরেও যদি এই তথাকথিত নবজাগরণ না থাকতো তাহলে হয়তো পরের শতকে বীণা দাস, কল্পনা দত্তদের স্কুলে যাওয়া হতো না বা নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের ( এম.এন রায়) কালাপানি পেরিয়ে তৃতীয় আন্তর্জাতিকে যোগ দেওয়া হতো না। কারণ সবকিছুরই একটা এন্ট্রি পয়েন্ট  লাগে, যেখান থেকে প্রাথমিক শুরুটা হয়। তারপর উনিশ শতকের শেষের দিকে আসে হিন্দু পুনরুত্থানবাদ। এ বস্তুটি মোটের ওপর সাংঘাতিক প্রগতিশীল কিছু না হলেও এরও খানিকটা ইতিবাচক প্রভাব ছিল। বিশেষত পরবর্তী শতকের সশস্ত্র বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ওপর এর প্রভাব ছিল। তবে বাংলায় সেকুলারিজমকে সেই অর্থে  নাগরিক সমাজে প্রতিষ্ঠিত করবার মূল কৃতিত্ব বাংলার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী বাম আন্দোলনের। মূলত কমিউনিস্ট আন্দোলনের হাত ধরেই বাংলার মাটিতে আপাত উদারপন্থী হাওয়া জোরদার হয়, ধর্ম বিমুখতা বাড়ে। দীর্ঘদিনের বাম আন্দোলনের প্রভাবে মৌলবাদী নখ দাঁত অনেকটাই ভোঁতা হয়ে যায়। কিন্তু তা একেবারে বিলুপ্ত হয়নি। বরং তা ভেতরে ভেতরে ঠিকই থেকে যায়। মূলধারার বাম রাজনীতিতে সংশোধনবাদ ঢুকে যাওয়া, সুবিধাবাদী ভোটের রাজনীতি, সঠিকভাবে শ্রেণী সচেতনতা গড়ে না ওঠা, বিপ্লবী পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে না পারা ইত্যাদি নানা কারণে শেষ পর্যন্ত এই ধর্মনিরপেক্ষ উদারতার হাওয়া ওপরের একটা চাদর হয়েই থেকে যায়, বিদ্বেষ গোঁড়ামির প্র্যাকটিস ভেতরে ভেতরে ঠিকই রয়ে যায়। উপরন্তু মূলধারার বাম রাজনীতির ক্রম অধঃপতনের ফলে তা বাংলায় ক্রমশ জমি হারাতে থাকে।

এবার নানা কারণে বাম রাজনীতির জমি হারানো ও মানুষের মধ্যে তাদের একটি নেতিবাচক  চিত্র হওয়ায় আরএসএস খানিকটা সুবিধা পেল। তাদের দরকার মানুষকে সাম্প্রদায়িক করে তোলা। এদিকে বাংলায় বিভেদের পরিপন্থী পরিবেশ সৃষ্টির মূল কৃতিত্ব কমিউনিস্টদের। কিন্তু নানা কারণে জনমানসে তাদের নেতিবাচক প্রভাব বিস্তৃত হওয়ায় এবং সঠিক রাজনৈতিক বিকল্প না থাকায় এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে চাইল আরএসএস। অসাম্প্রদায়িকতাকে, ধর্ম বিমুখতাকে বামপন্থীদের আমদানি করা একটি বিকৃত, ক্ষতিকর, মেরুদণ্ডহীন প্র্যাকটিস বলে প্রমাণ করতে তারা সচেষ্ট হল। মেরুদণ্ডহীন প্রমাণ করতে চাওয়া কেন? এর কারণটা বুঝতে গেলে আমাদের একটু অন্যদিকে তাকাতে হবে। আগেই বলেছি সেকুলারিজমের আপাত পরতের তলায় তলায় মুসলিম বিদ্বেষ, দলিত বিদ্বেষ ঠিকই ছিল। আরএসএস সেটাকে উসকে দেবার মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করল ‘ভয়‘। হ্যাঁ ভয়। পশ্চিমবঙ্গ যে কোনোদিন মুসলিমদের দখলে চলে যাবে, তখন তাদের বাঁচার আশা আর থাকবে না, মুসলিমরা তাদের সবকিছু দখল করে নেবে, হিন্দুরা খুব বিপজ্জনক অবস্থায় আছে এই জঘন্য নোংরা বক্তব্যকে নানাভাবে কুযুক্তি এবং প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে তারা বৃহত্তর হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে খাওয়াতে থাকে। পাশাপাশি সংরক্ষণ বিরোধিতা, দলিত অধিকারের বিরোধীতাও থাকে। ফলে একদিকে হিন্দু জনগণের ভিতরের সুপ্ত মুসলিম বিদ্বেষকে কাজে লাগিয়ে ইসলামী মৌলবাদের ভয় দেখিয়ে তাদের উত্তেজিত করা অপরদিকে ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িকতাকে বামপন্থীদের আমদানি করা (এমনিতেই তারা জমি হারিয়েছে এবং জনমানসে তাদের রেপুটেশন নেতিবাচক) বিকৃত, মেরুদণ্ডহীন চর্চা বলে প্রমাণের চেষ্টা একে অপরের পরিপূরক হিসাবে উঠে আসে। মেরুদণ্ডহীন কারণ মানুষকে তারা বোঝাতে চায় দাঙ্গা, হামলার সময় এগুলো কোনো কাজে আসে না। অর্থাৎ ইসলামি মৌলবাদের ভয় দেখিয়ে তারা তার সমাধান হিসাবে উপস্থাপন করে হিন্দু মৌলবাদকে।

অর্থাৎ একদিকে হিন্দুদের অস্তিত্ব সংকটে আছে এই প্রোপাগান্ডা ছড়ানো, অন্যদিকে সেই সংকটের দোহাই দিয়ে অসাম্প্রদায়িকতার পর্দাকে ছিঁড়ে ফালা ফালা করে হিন্দুদের ভেতরে বিভেদকে আরও বহুগুণ উসকে উত্তেজিত করে তোলা – এই হল তাদের প্রধান কৌশল। কারণ কোনো সম্প্রদায়কে একবার যদি বোঝানো যায় তাদের অস্তিত্ব সংকটে আছে সাথে রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে – সম্প্রীতি, সহিষ্ণুতা থেকে তাদের যদি দূরে সরিয়ে আনা যায় তাহলেই কাজ বহুদূর হয়ে যায়। তাই তারা ঠিক সেটাই করছে। কিন্তু এতকিছুও যথেষ্ট হয় না যদি না বিদ্বেষ, মৌলবাদের স্বপক্ষে কিছু বড় স্বীকৃত মনীষী, স্কলারদের সমর্থন যোগাড় করা যায়। কারণ মানুষকে যদি দেখানো যায় যে আমার মতাদর্শ অমুক অমুক বড় ব্যাক্তিত্বরাও সমর্থন করেন বা সমর্থন না করলেও তাঁর চিন্তাভাবনা আমার চিন্তাভাবনার কাছাকাছি তাহলে সেই মতের পক্ষে সমর্থন যোগাড় করা আরও খানিকটা সহজ হয়ে যায়। কারণ “এত বড় বড় লোকও ওরম ভেবেছেন, তাঁরা কি কিছুই জানেন না? কিছুই বোঝেন না? নিশ্চয়ই এতে কিছু হলেও সত্যতা রয়েছে… ”  এই ধরনের বক্তব্যই বাস্তবে বেশি চলে। তাই সমাজে কোনো নতুন ডিসকোর্সকে প্রতিষ্ঠা করবার একটা ধাপ হল “এর সঙ্গে তোমাদের মেনে চলা অমুক অমুক মতের মিল রয়েছে” এটা দেখানো। এবং যথারীতি আরএসএস সেই পথটিও ছাড়েনি। ফলে বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ,  বিবেকানন্দ, সুভাষচন্দ্র, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র ইত্যাদি যাঁরা বাঙালীর একটা বড়ো আবেগের জায়গা গেরুয়া শিবির তাদেরকে ব্যবহার করতে শুরু করল মুসলিম বিদ্বেষী, দলিত বিদ্বেষী হিসাবে। এবার সমস্যা হল রবীন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর বা সুভাষচন্দ্রকে সরাসরি হিন্দুত্ববাদী হিসাবে প্রমাণ করা খুবই কঠিন- প্রায় অসম্ভব। কারণ তা তাঁরা ছিলেনই না; বরং কেউ কেউ বাম শিবিরের দিকে ঝুঁকে ছিলেন। অপরদিকে বিবেকানন্দ ঠিক সেই অর্থে প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ না হলেও এবং অনেক স্ববিরোধীতা থাকা সত্ত্বেও ঠিক আরএসএসের অনুরূপ হিন্দুত্বের প্রবক্তা হিসাবে দেখানো যায় না; কিন্তু তাঁকে নিয়ে ধর্মের ধুয়ো তুলে জনমানসে বিভ্রান্তি ছড়ানো খুবই সোজা। তাই বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, সুভাষচন্দ্র এঁদের বক্তব্যকে বিকৃত করে টুকরো অংশ কেটে নিয়ে অথবা প্রেক্ষিতহীন ভাবে উপস্থিত করে মুসলিম বিদ্বেষের পক্ষে ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিরুদ্ধে বক্তব্য ছড়াতে শুরু করল তারা। অন্যদিকে ক্ষুদিরাম, ভগৎ সিং, সূর্য সেনেদের মত বিপ্লবীরাও একটা বিরাট সম্মানের জায়গা অধিকার করে আছেন। এঁদেরকে সরাসরি হিন্দুত্ববাদী বলে মিথ্যা প্রচার শুরু করে গেরুয়া শিবির। কারণ মানুষের সামনে যদি একবার দেখানো যায় যে এঁদের মত বড় বড় ব্যাক্তিরাও অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্র চাইতেন, তাঁরাও ওদের মত মুসলিম বিদ্বেষী, দলিত বিদ্বেষী, নারী বিদ্বেষী ছিলেন তাহলে ওদের প্রোপাগান্ডা মানুষকে খাওয়ানো আরও সোজা হয়ে যাবে। ফলে নাস্তিক, মার্কসবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত বিপ্লবী ভগৎ সিং ওদের বিকৃত উপস্থাপনায় হয়ে গেলেন অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখা একজন গর্বিত হিন্দু। ক্ষুদিরাম, সূর্য সেন দেরও নির্লজ্জভাবে হিন্দুত্ববাদী হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা করতে লাগলো এরা। এইরকম নানাভাবে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে, পুঁজির সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে জাঁকিয়ে বসতে চায় আরএসএস। এর ফল কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। তাই এখনই জোট বেঁধে লড়াইতে নামার সময়। নাহলে বিপদ।

  • এই বিভাগে মতামত লেখকের নিজস্ব

 

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on আরএসএসের বাংলায় আগ্রাসন প্রসঙ্গে কিছু কথা

Leave A Comment