তথ্যের অধিকার আইনের ওপর আবার একপ্রস্থ কোপ

বিভাগ-বহির্ভূত বিশেষ খবর মতামত

Last Updated on 8 months by admin

এই প্রথমবার সংসদের একটি স্ট্যান্ডিং কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হল কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশন ও রাজ্যগুলোর তথ্য কমিশনগুলোর কর্মকান্ডকে দেখভাল করার জন্য। এই সিদ্ধান্তে তথ্যের অধিকার নিয়ে কাজ করেন এমন অনেকেই এতে রাজ্যের আইনসভাগুলোর ক্ষমতাকে খর্ব করা হয়েছে বলে ক্ষোভ ও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। কেন্দ্রীয় ও রাজ্যের তথ্য কমিশনগুলো তৈরি হয়েছিল তথ্যের অধিকার আইনের আওতায়। কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশন যেমন তাদের বার্ষিক রিপোর্ট জমা দেয় সংসদে, তেমনি রাজ্যের তথ্য কমিশনগুলো তাদের বাৎসরিক রিপোর্ট জমা করে রাজ্যের বিধানসভাগুলোয়। এই গোটা প্রক্রিয়াটাই সম্পন্ন হয় কমিশনগুলোর নিজস্ব আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমে। কেন্দ্রের ক্ষেত্রে এই রিপোর্ট জমা নেয় কর্মী ও প্রশিক্ষণ মন্ত্রক (মিনিস্ট্রি অফ পার্সোনেল অ্যান্ড ট্রেনিং), আর রাজ্যের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো। এই বার্ষিক রিপোর্ট নিয়ে সংসদ বা বিধানসভাগুলোতে খুব কমই বিতর্ক বা আলোচনা হয়ে থাকে। যদিও বিভিন্ন সাংসদ ও বিধায়করা নানা সময়ে কম সময়ের আলোচনার মধ্যে ও জিরো আওয়ারে তথ্যের অধিকার আইন নিয়ে নানা আলোচনা করেন ও মতের আদানপ্রদান করেন, যেখানে সদস্যরা এই আইনের কার্যকারিতা ও ফলপ্রসূতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

রাজ্যসভার সেক্রেটারি জেনারেল দেশ দীপক বর্মা সর্বমোট ১২ টি বিষয়কে তালিকাভুক্ত করেছেন, যে বিষয়গুলি নিয়ে এই স্ট্যান্ডিং কমিটি ২০২০-২০২১ সাল জুড়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশন ও রাজ্য তথ্য কমিশনগুলোর নানা কাজের পর্যালোচনার বিষয়। এই কমিটির চেয়ারপার্সন হলেন বিজেপি নেতা ভূপেন্দ্র যাদব। তথ্য কমিশন সহ যেকোনো সরকারি অফিসার বা কোনো অ-সরকারি সংগঠনকে কোনো বিষয়ে মতামত দেবার জন্য বা কোনো কাজের পর্যালচনা করার জন্য হাজিরা দিতে বাধ্য করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এই কমিটিকে।

৯ই অক্টোবর,২০২০ তারিখে তথ্যের অধিকার আইনের ১৫ বছর উপলক্ষ্যে “সতর্ক নাগরিক সংগঠন” (SNS) নামক একটি সংস্থা তাদের একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। তা থেকে দেখা যায় যে দেশের এক তৃতীয়াংশ তথ্য কমিশনের মাথায় কমিশনার নেই, এবং প্রায় এক চতুর্থাংশ তথ্য কমিশনের ক্ষেত্রে কমিশনারের পদটি খালি অবস্থায় রয়েছে। পাশাপাশি, ঝাড়খন্ড ও ত্রিপুরার তথ্য কমিশন অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এই রিপোর্ট অনুযায়ী, উত্তরপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা সহ ৯ টি রাজ্যে কোনো মুখ্য তথ্য কমিশনার নেই। প্রসঙ্গত এই মুখ্য তথ্য কমিশনারের নিয়োগ তথ্যের অধিকার আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক। আরেকটি সংগঠন “ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল” এর ৯ই অক্টোবর, ২০২০ র রিপোর্ট থেকে দেখা যাচ্ছে গত ১৫ বছরে নানা সরকারি দপ্তরে তথ্যের অধিকার আইনের আওতায় পাঠানো আবেদনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন কোটি। এর থেকেই এই আইনের গুরুত্ব বোঝা যায়। এই সংখ্যার মধ্যে মাত্র ৯% আবেদন পরবর্তী দ্বিতীয় আবেদনের স্তরে গেছে, অর্থাৎ, ৯০% এর বেশি আবেদক তাদের আবেদনে প্রাপ্ত উত্তরে সন্তুষ্ট হয়েছেন। এই বিষয়টি তথ্যের অধিকার আইনের কার্যকারিতা বা সাফল্যের একটা ভাল উদাহরণ। SNS সংগঠনের অঞ্জলি ভরদ্বাজের মতে, “সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটি দ্বারা মুখ্য তথ্য কমিশনারের কার্যকলাপের পর্যালোচনায় আমাদের কোনোরকম আপত্তি নেই, যদি না তা তথ্যের অধিকার আইনকে আরো দুর্বল করে দেবার চেষ্টা করে। কেন্দ্র সরকার কয়েকদিন আগেই এই আইনকে দুর্বল করে দেবার জন্য তথ্য কমিশনারদের জন্য নতুন সার্ভিস রুল এনেছে – এটা যেন আমরা ভুলে না যাই”। প্রসঙ্গত, কেন্দ্র সরকার ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে তথ্যের অধিকার আইনে নতুন নিয়ম আনে যেখানে তথ্য কমিশনারের পদের স্তর ও গুরুত্বকে খানিকটা কমিয়ে দেওয়া হয়। এই পরিবর্তনের পূর্বে কমিশনারের পদটি নির্বাচন কমিশনারের পদের সমতুল্য ছিল। সেখান থেকে এই পদটিকে নামিয়ে আনা হয় কেন্দ্র সরকারের সচিব পর্যায়ে। নতুন ওই সংশোধন তথ্য কমিশনারের কার্যকালকে ৫ বছর থেকে কমিয়ে ৩ বছরে নিয়ে আসে, এবং কেন্দ্রকে ক্ষমতা দেয় তথ্য কমিশনারকে কোনো কারণে সরিয়ে দেবার। এই সবকটিই কিন্তু মূল তথ্যের অধিকার আইনের স্বার্থ ও নীতির পরিপন্থী। “ন্যাশনাল ক্যাম্পেন ফর পিপলস রাইট টু ইনফর্মেশন” এর ভেঙ্কটেশ নায়কের মতে একটি সংসদীয় প্যানেল কমিটি কিভাবে কোনো রাজ্য তথ্য কমিশনের কার্যকলাপের পর্যালোচনা করতে পারে, যেখানে রাজ্য তথ্য কমিশনগুলো সেই রাজ্যের সরকার ও বিধানসভার অধীনে থাকে? তাঁর কথায়, “এটা আরো একটা পন্থা, যেখানে কেন্দ্র সরকার রাজ্যের বিধানসভার ক্ষমতাকে কেড়ে নেবার চেষ্টা করছে”।

অর্থাৎ, এই সংসদীয় প্যানেলের মাধ্যমে শুধু যে তথ্য কমিশনগুলোর কার্যকলাপের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করা হল শুধু তাই নয়, এটা দিয়ে ভারতের সার্বভৌমত্বর ওপরে আরেকবার আঘাত হানা হল।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on তথ্যের অধিকার আইনের ওপর আবার একপ্রস্থ কোপ

Leave A Comment