কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের অঙ্গ নতুন ‘শ্রম কোড’ শ্রমিকদের অর্জিত অধিকার কেড়ে নেবে

আজকের খবর পর্যালোচনা বিশেষ খবর মতামত

Last Updated on 3 months by admin

নতুন চারটি শ্রমকোড আইন হওয়ার পর এখন বিধি তৈরীর প্রক্রিয়া চলছে। এই শ্রমকোড একবার লাগু করাতে পারলে ভবিষ্যতে ধর্মঘট, কাজ বন্ধ, ট্রেড ইউনিয়ন এগুলো সব অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে। এই চারটি শ্রমকোড এর কোনও সংশোধনী নয় – একে বাতিল করতে হবে। এই আইনে যে আক্রমণগুলো  নামানো হয়েছে তার কিছু দিক নিয়ে আলোচনা করলেন – শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠক কুশল দেবনাথ।  

কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের অঙ্গ নতুন ‘শ্রম কোড’ শ্রমিকদের অর্জিত অধিকার কেড়ে নেবে

কুশল দেবনাথ

চারটি শ্রমকোড আইন হওয়ার পর এখন বিধি তৈরীর প্রক্রিয়া চলছে। যেহেতু সংবিধানে শ্রম যৌথ তালিকা ভুক্ত, তাই কেন্দ্র ও রাজ্য  উভয় সরকারই বিধি তৈরী করে। শ্রমকোডের উপর বিধি কেন্দ্রীয় সরকার তৈরী করছে। ৯ টি রাজ্য সরকার ইতিমধ্যে বিধি তৈরী করে ফেলেছে। পশ্চিমবঙ্গ সহ বাকি অন্য রাজ্যগুলোও বিধি তৈরীর প্রক্রিয়া  চালাচ্ছে। প্রসঙ্গত বলা যায়, ২০১৯ সালে ক্ষমতায় দ্বিতীয় বার আসার পর গোটা দেশে ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন  তীব্র করে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আইন তৈরি করে। তিনটি গুরুত্বপূর্ণ আইন হলো – নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯, তিনটি কৃষি আইন ও ৪৪ টি শ্রমআইন কে ৪ টি শ্রমকোডে পরিবর্তন করা। আমরা জানি, আইন হবার পর তাকে কার্যকরী করার জন্য রুলস বা বিধি তৈরী করতে হয়। দেশজোড়া বিক্ষোভের মুখে পড়ার পর তিনটি কৃষি আইন ও নাগরিকেত্বর সংশোধনী আইনের বিধি তৈরী করতে সরকার পারছে না। অপরদিকে দুটি আন্দোলন এর সাথে যুক্ত আন্দোলনকারীরা দাবী তুলেছে  এই আইনগুলিকে বাতিল করতে হবে। ফলে, এই মুহূর্তে বেশ বেকায়দাতে পড়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।

কিন্তু ৪ টি শ্রমকোডের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে শ্রমিক আন্দোলন গড়ে না ওঠার জন্য এই আইনগুলির বিধি তৈরী চলছে।এই আইনগুলি শ্রমিকদের যে ভয়ংকর ক্ষতি করবে এই বক্তব্য শ্রমিকদের মধ্যে ভালোভাবে নিয়ে যেতে ট্রেডইউনিয়নগুলি ব্যর্থ হয়েছে। ফলে সাড়া জাগানো শ্রমিক আন্দোলন গড়ে  উঠলো না। আর এর সাথে কর্পোরেট পুঁজিপতি সহ বিভিন্ন শিল্পের মালিকরা চারটি শ্রমকোড-এর বিধি দ্রুত তৈরীর জন্য চাপ সৃষ্টিও করছে। আর সেইজন্য কেন্দ্রীয় সরকার দ্রুত বিধি তৈরীর প্রক্রিয়া চালাচ্ছে।

চারটি শ্রমকোড হলো : এক – বেতন সংক্রান্ত, দুই – শিল্প সম্পর্কে,  তিন – সামাজিক সুরক্ষা  ও চার – কাজের পরিবেশ সংক্রান্ত। আমরা প্রথমে এই আইনে যে গুরুত্বপূর্ণ আক্রমণ নামানো হয়েছে তার কিছু দিক নিয়ে আলোচনা করবো।পরে এই চারটি শ্রমকোড এর কোনও সংশোধনী নয় – একে বাতিল করতে হবে। কেন? সেই প্রসঙ্গে আমাদের বক্তব্য রাখবো।

চারটি শ্রমকোড নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করবো না। শুধু মূল মূল কতগুলো বিষয় তুলে ধরার চেষ্টা করবো। শিল্প সম্পর্ক বিলে ধর্মঘট প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করতে হলে বলতে হয় এই আইনে বলা আছে ধর্মঘট করতে হলে প্রতিটি শিল্প বা কারখানায় নোটিশ দিতে হবে। নোটিশ  দেবার পর আলোচনা শুরু হবে। আলোচনা চলাকালীন ধর্মঘট করা যাবে না এবং এই পর্যায়ে ধর্মঘট করলে ফৌজদারী মামলা দায়ের হবে। তাতে কড়া শাস্তির নিদান দেওয়া আছে। অনেকেই বলতে পারেন ধর্মঘট  করলে তো নোটিশ আগেও দেওয়া হতো।

১৯৪৭ সালে গৃহীত শিল্প সম্পর্ক আইনে বলা ছিল কেবল পাবলিক ইউটিলিটি ক্ষেত্রে নোটিশ দিতে হবে। যেমন জল,বিদুৎ,সূতাকল ইত্যাদি। এখন সমস্ত শিল্পকে পাবলিক ইউটিলিটি সার্ভিস হিসেবে ঘোষণা করা হলো। যেমন জুট মিল। এখানে মালিকদের দুঃসহ অত্যাচার চলে। কোনো শ্রমিক কে ছাঁটাই করলে সঙ্গে সঙ্গেই শ্রমিকরা কর্মবিরতি করতে পারে। এটা বেআইনি নয়। কিন্তু, এই কোডের মাধ্যমে বলা হয়েছে এটা বেআইনি কাজ। নোটিশ না দিয়ে কোনো ধর্মঘট করলে সেটা বেআইনি হবে এবং তারজন্য সরকার ব্যবস্থা নেবে। অর্থাৎ, এইভাবে আইনি জটিলতায় ধর্মঘটের অধিকারকে কার্যত কেড়ে নেওয়া হলো।

এবার আসা যাক অন্য একটা বিষয়ে। ফিক্সড টার্ম এমপ্লয়মেন্ট নামে একটি বিষয় আইনে লিপিবদ্ধ করা হলো। মানেটা কি? কোনো শ্রমিক যদি কারখানাতে কাজ করতে আসে সে মালিকের সাথে চুক্তিবদ্ধ হবে। একবছরের। এই সময় যদি শ্রমিকটি আশানুরূপ কাজ করতে না পারে তাকে কর্তৃপক্ষ একতরফা ভাবে ছাঁটাই করতে পারবে। আবার চুক্তি শেষ হবার পর মালিক তার সাথে পুনরায় চুক্তি করতে নাও পারেন।এর উদ্দেশ্য কি? প্রথমত-স্থায়ী চাকরি শব্দটি আর থাকবে না।

দ্বিতীয়ত, ইউনিয়ন করা অপ্রাসঙ্গিক হবে। কারণ সে চুক্তি করে ঢুকছে। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তার কাজ চলবে। তাহলে ইউনিয়ন করবে কীভাবে?

তৃতীয়ত, কোন লড়াই আন্দোলন সে আর করতে পারবেনা।

অনেকেই বলতে পারেন এরকম অবস্থা তো বহু কারখানায় আছে। হ্যাঁ, আছে। এতদিন সেটা বেআইনি ভাবে করা হতো। এখন এই অন্যায় কাজকে আইনি রূপ দেওয়া হলো।

আরো দুটি প্রসঙ্গে আলোচনা করা যাক। ৩০০ পর্যন্ত শ্রমিক যে কারখানায় আছে সেখানে ছাঁটাই করতে মালিককে আর সরকারের অনুমতি নিতে হবেনা। চলতি আইনে সংখ্যা ছিল ১০০। এর মানে হলো, আমাদের দেশে ৭০ শতাংশ কারখানা তে ছাঁটাই করতে অনুমতি লাগবে না।

এছাড়া পাল্টানো হয়েছে কারখানার সংজ্ঞা। এতদিন বিদ্যুৎ সহ ১০ ও বিদ্যুৎ বিনা ২০ জন হলেই ফ্যাক্টরি বলে গন্য হতো। এখন সেটা করা হলো বিদুৎ সহ ২০ ও বিদুৎ বিনা ৪০জন কাজ করলে ফ্যাক্টরি বলে গন্য হবে। মানে , এক বিরাট সংখ্যক শ্রমিক দের শ্রম আইনের বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো।

শ্রম সময় ১২ ঘন্টা করা হয়নি এটা যেমন সত্যি। কিন্তু এই আইনের রুলস  যে বানানো হয়েছে সেখানে সপ্তাহে  ৪ দিন কাজের প্রস্তাব করা হয়েছে। আবার লেখা আছে সপ্তাহে ৪৮ ঘন্টা কাজ করতে হবে। তার মানে দৈনিক ১২ ঘন্টা কাজ করতে হবে। এইভাবে ঘুরপথে ১২ঘন্টার কাজকে আইনি রূপ দেওয়া হচ্ছে। আর সপ্তাহে ৪ দিন কাজ করিয়ে কোন শিল্প চলতে পারেনা। ৬ দিন কাজ করাতেই হবে। তার মানে ঐ দু দিন অস্থায়ী শ্রমিক নিয়োগ হবে। কম পয়সাতে তারা কাজ করতে বাধ্য হবে।এবং ১২ ঘন্টা কাজ করতে হবে।

আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে এই শ্রমকোড শ্রমিকদের আইনি অধিকার কার্যত কেড়ে নিচ্ছে।

এই শ্রমকোড কে আমরা দেখবো কোন দৃষ্টিকোণে সেটা পরিষ্কার করা প্রয়োজন। অনেকেই এটাকে ট্রেড ইউনিয়নের কাজ বলে মনে করেন। চারটি শ্রমকোড কে শুধু ট্রেড ইউনিয়নগুলির লড়াই ভাবলে আমরা ভুল করবো। এটা  শুধু আইন সংশোধন ও নয়। গোটা দেশে কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে যে ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন চলছে – এই চারটি শ্রমকোড সেই আগ্রাসনের ই অঙ্গ। এই শ্রমকোড একবার লাগু করাতে পারলে ভবিষ্যতে ধর্মঘট, কাজ বন্ধ, ট্রেড ইউনিয়ন এগুলো সব অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে। ফ্যাসিস্ট শক্তির মূল মদতদাতা কর্পোরেট পুঁজি  শ্রমিক আন্দোলনকে ধ্বংস করতে চায়। তাই তারা শ্রমিকদের সংগঠন  ও সংগ্রাম করার আইনি অধিকার কেড়ে  নিতে চায়। সুতরাং এই চারটি শ্রমকোড বাতিলের লড়াই যেমন কর্পোরেট পুঁজির বিরুদ্ধে লড়াই তেমনি ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামের অংশ ও বটে।

বিভিন্ন রাজ্য আইন লাগু করার জন্য বিধি তৈরী করছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারও বিধি তৈরী করছে। গত বিধানসভা নির্বাচনে মানুষ ফ্যাসিস্ট শক্তিকে প্রত্যাখান করেছে। তাই এই রাজ্যে দাবী উঠুক ফ্যাসিস্ট শক্তির কোন এজেন্ডা এই রাজ্যে লাগু করা যাবে না।

আওয়াজ জোরদার হোক। চারটি শ্রমকোড বাতিল কর। ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াই এগিয়ে চলুক।

 

  • লেখক শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠক
  • এই বিভাগে মতামত লেখকের নিজস্ব 
Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
One Thought on কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের অঙ্গ নতুন ‘শ্রম কোড’ শ্রমিকদের অর্জিত অধিকার কেড়ে নেবে
    শৈলেন হালদার
    29 Jun 2021
    12:00pm

    চারটি শ্রম কোড বিলের উপর লেখাটিতে আইনটির যথার্থ মূল্যায়ন করা হয়েছে বলে মনে করি। অবিলম্বে সর্বত্র এই মূল্যায়ণ ছড়িয়ে দিয়ে ব্যাপক শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলুন।

    0
    0

Leave A Comment