“আমরা কী করে বিদেশি হয়ে গেলাম?” দেড় বছর ডিটেনশন ক্যাম্পে থাকার পর ‘ভারতীয়’ হল পরিবার

বিশেষ খবর

Last Updated on 9 months by admin

বিশেষ সংবাদ: দেড়বছর আগে যখন আসামের গোয়ালপাড়া জেলার এই পরিবারকে ‘বিদেশি’ তকমা দিয়ে গ্রেপ্তার করে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছিল, তখন তাদের চারপাশের পৃথিবীটা ভেঙেচুরে গিয়েছিল।

দেড় বছর ডিটেনশন ক্যাম্পে থাকার পর অবশেষে নতুন বছরে মুক্তি ও নাগরিকত্বের স্বাদ পেলেন মোহম্মদ নূর হোসেন, তাঁর স্ত্রী সাহেরা বেগম ও তাঁদের দুই শিশু। গতবছর ‘বেআইনি অনুপ্রবেশকারী’ ঘোষিত হবার পর ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় দফার শুনানিতে ”ভারতীয়” বলে ঘোষিত হন ওই পরিবার।

বুধবার ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে মোহাম্মদ নূর হোসেন বলেন, “আমরা গর্বিত ভারতীয়। আসাম আমাদের বাসস্থান। ওরা ভুলবশত আমাদের বাংলাদেশি তকমা দিয়েছিল, আর বলেছিল আমরা নাকি বেআইনি উপায়ে বর্ডার পেরিয়ে এখানে এসেছি। কী করে সেটা সম্ভব? আমার তো জন্ম এখানেই।” হোসেন পেশায় একজন রিক্সাচালক। তাঁর বাড়ি আসামের উদলগুড়ি জেলার লডং গ্রামে।

মোহাম্মদ নূর হোসেনের ঠাকুরদা ও ঠাকুমার নাম ১৯৫১ সালের NRC তে ছিল; তাঁদের সাথেই তাঁর বাবার নাম ১৯৬৫ সালের নির্বাচনী তালিকায় ছিল। সাহেরা বেগমের বাবার নামও ১৯৫১ সালের NRC তালিকা ও ১৯৬৬ সালের নির্বাচনী তালিকায় ছিল। পরিবারের কাছে ১৯৫৮-৫৯ সালের জমির কাগজপত্রও আছে। প্রসঙ্গত, আসামের ক্ষেত্রে একজন ভারতীয় নাগরিক হবার শর্তপূরণের শেষ তারিখটি হল ২৪/০৩/১৯৭১।

কিন্তু ২০১৭ সালে যখন গুয়াহাটি পুলিশ এই পরিবারের নাগরিকত্ব  নিয়ে তদন্ত শুরু করে, তখন এইসব কাগজপত্র ও প্রমানে তারা সন্তুষ্ট হয়নি। ওই বছর আগস্ট মাসে সাহেরা বেগমের মামলা পাঠানো হয় কামরূপের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে, আর পরের বছর জানুয়ারি মাসে মোহাম্মদ নূর হোসেনের মামলা যায় একই জায়গায়।

হোসেন এর কথায়, “এই বিষয়ে আমাদের কিছুই জানানো হয়নি, এবং কাগজপত্রের বিষয় কী করব কিছুই বুঝতে পারিনি”। তিনি নিজের জন্য ৪০০০ টাকা খরচ করে একজন উকিলের বন্দোবস্ত করতে পারলেও ট্রাইব্যুনালের শুনানিতে তাঁর স্ত্রীর জন্য কোনো ব্যবস্থা করতে পারেননি। যদিও ২০১৮ র ২৮ শে আগস্ট হোসেনের উকিল মামলা থেকে অব্যাহতি নেন, আর তাই তিনি ট্রাইব্যুনালের শুনানিতে পর পর অনুপস্থিত হতে থাকেন। হোসেন বলেন, “আমার উকিল আমাকে বলেন যে আমিই তাঁর ফী ও অন্যান্য খরচ বহন করতে পারব না, আর তাই আমি যেন গুয়াহাটিতে পালিয়ে যাই, নয়ত পুলিশ আমায় গ্রেপ্তার করবে। আমি তাঁকে বলি, আমি পালাব কেন? কী অপরাধ করেছি আমি ?”

২০১৮ সালের ২৯শে মে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল সাহেরা বেগমকে বিদেশি ঘোষণা করে, আর পরের বছর ৩০শে মার্চ হোসেন বিদেশি  ঘোষিত হন। ফরেনার্স অ্যাক্ট এর ৯ ধারা অনুযায়ী, কেউ বিদেশি ঘোষিত হলে তাঁকেই প্রমাণ করতে হবে যে তিনি বিদেশি নন। আর তাই ট্রাইব্যুনালের শুনানিতে পর পর অনুপস্থিত থাকলে তার অনুপস্থিতিতেই মামলার রায় ঘোষিত হবে। শেষে গতবছর জুন মাসে এই পরিবারকে গ্রেপ্তার করে গোয়ালপাড়া ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

সাহেনারা হোসেন জানান, “আমাদের বাচ্চাগুলোকে (বয়েস ৭ ও ৫ বছর) দেখার মতো কেউ ছিল না। আমাদের সব আত্মীয় গ্রামে থাকেন, তাই আমরা ওদের আমাদের সাথে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। বড় ছেলে শাহজাহানকে স্কুল ছাড়িয়ে দিতে হয়। জেলে থাকার সময়ে ওরা বারবার বাড়ি ফিরতে চাইত।” 

তাঁরা জেলে থাকার সময় তাঁদের কিছু আত্মীয় গুয়াহাটির এক মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী আমান ওয়াদুদ এর সাথে যোগাযোগ করেন। ওয়াদুদ আরো দুই উকিল সঈদ বুরহানুর রাহমান ও যাকির হোসেনকে সাথে নিয়ে গুয়াহাটি হাইকোর্ট ও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে তাঁদের মামলা লড়েন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে ওয়াদুদ বলেন, “যাঁরা বিদেশি তকমা পাচ্ছেন ,তাঁদের সকলেরই উকিল ধরার ক্ষমতা থাকে না। অনেক ভারতীয় নাগরিক বিদেশি ঘোষিত হয়ে যাচ্ছেন শুধুমাত্র উকিল না পাওয়ার কারণে”

২০২০ সালের ৯ই অক্টোবর হাইকোর্ট ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের রায়কে খারিজ করে নতুন করে তাকে শুনানি করতে বলে। শেষে ডিসেম্বর মাসের শুরুর দিকে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল তাঁদের জামিনে মুক্তি দেয়, আর ১৬ই ডিসেম্বর হোসেনকেভারতীয় নাগরিক বলে ঘোষণা করে। গত বুধবার সাহেনারা বেগমও বিদেশি তকমা থেকে মুক্ত হন।

 

[ছবিসহ সংবাদটি প্রথম প্রকাশিত হয় ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এ]

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
No Thoughts on “আমরা কী করে বিদেশি হয়ে গেলাম?” দেড় বছর ডিটেনশন ক্যাম্পে থাকার পর ‘ভারতীয়’ হল পরিবার

Leave A Comment