বাংলার রায় : বিজেপি-র সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান মানুষের

আজকের খবর পর্যালোচনা বিশেষ খবর

Last Updated on 5 months by admin

বিশেষ প্রতিবেদক , ২ মে,২০২১ :

পশ্চিমবঙ্গে ২০২১ বিধানসভা ভোটে পরাজিত হল বিজেপি। তাদের প্রাপ্ত আসন সংখ্যার চূড়ান্ত ফলাফল এখনো ঘোষণা না হলেও বোঝা যাচ্ছে সংখ্যাটা কোনভাবেই  ৯০ পেরোবে না। নির্বাচনে বিশাল সংখ্যক আসনে জয়ী হয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করতে চলেছে তৃণমূল কংগ্রেস দল। নির্বাচনের ফলাফল থেকে একভাবে স্পষ্ট যে এই রাজ্যের মানুষ সরাসরি বিজেপির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। ২০১৯ সাধারণ নির্বাচনে কিন্তু চিত্রটা একরকম ছিল না। সেই বছর পশ্চিমবঙ্গে লোকসভার ৪২টা আসনের মধ্যে ১৮টা আসনেই জয়ী হয় ভারতীয় জনতা পার্টি। সেই হাওয়া এই বারের ভোটে কতটা  ছাপ ফেলবে তা যথেষ্ট আশংকার বিষয় হয়ে ছিল। একের পর এক শাসক দল তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীরা দল বদলে বিজেপিতে নাম লেখান। অমিত শাহ, কৈলাস বিজয়বর্গীয়, নরেন্দ্র মোদিরা বারবার ছুটে আসেন এই রাজ্যে, নির্বাচনী খাতে বিজেপির বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করার কথা শোনা যায় – এসবের পরেও  ৯০ টারও কম আসন পেয়ে বিজেপির পরাজয়কে রীতিমতো শোচনীয়ই বলা চলে।

যেটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে তৃণমূল, বিজেপি দুই শিবিরের কাছেই এই ফলাফল অপ্রত্যাশিত ছিল। তৃণমূল সরকারের আমলে একের পর এক দুর্নীতি, চরম অগণতান্ত্রিকতার অভিযোগে মানুষের মনে ক্ষোভ দানা বাঁধে। প্রাথমিকভাবে সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এই রাজ্যে নিজেদের জমি তৈরি করা শুরু করেছিল বিজেপি। তার সাথে সঙ্ঘ পরিবারের দীর্ঘকালীন নীরব কর্মকান্ড “হিন্দুত্বে-র যে চাষ করে রেখেছিল তার ফসল বিজেপি নিজের গোলায় ভরার চেষ্টা করে। এই বিধানসভা নির্বাচনের আগে কোনরকম রাখঢাক না রেখেই স্পষ্টভাবে তারা তাদের সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতিতে চড়েই নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চায়।  উত্তর প্রদেশ থেকে যোগী আদিত্যনাথ উড়ে এসে নির্বাচনী জনসভায় উত্তর প্রদেশের মতোই “লাভ জিহাদ- এর বিরুদ্ধে আইন করার কথা বলেন। বলেন “অ্যান্টি রোমিও স্কোয়াড, “গো-রক্ষা বাহিনী” তৈরি করার কথা। অমিত শাহ “ঘুষপেটিয়া” ইস্যুতে গলা চড়িয়ে, মতুয়াদের “নাগরিকত্ব প্রদানে-র কথা বলে ধর্মীয় বিভাজনের চেষ্টা চালিয়ে চান। শুভেন্দু অধিকারী “মোল্লা”দের শায়েস্তা করার কথা বলেন একের পর এক জায়গায়। এমনকি তাঁর প্রাক্তন নেত্রীকে তিনি বারবার “বেগম সাহেবা” বলে বিভাজনের রাজনীতি আরো স্পষ্ট করেন।  সব মিলিয়ে উগ্র ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিষ ছড়িয়ে সংখ্যাগুরু “হিন্দু ভোট”কে কব্জা করাই ছিল বিজেপির রণকৌশল। এই নির্বাচনের ফলাফল দেখাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সেই কৌশলে জল ঢেলে দিলেন। তাই এই ভোটে বিজেপির পরাজয় একভাবে উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পরাজয়ও বলা চলে।

এই নির্বাচনে বিজেপি-বিরোধি জনমত তৈরির ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজ ও গণতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলনের একটা বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক সংসদীয় দলগুলোর থেকে স্বাধীনভাবে থাকা আন্দোলনের এই ক্ষেত্রটি বিজেপি-আর এস এস এর হিন্দুত্ববাদী, জনবিরোধী রাজনীতিকে আলাদা গুরুত্ব সহকারে প্রচারে না আনলে ২০১৯ এর “বিজেপি হাওয়া-র কী পরিণতি এই ভোটে হতো তা বলা মুশকিল।  ২০১৯ এ শুরু হয়েছিল  এন আর সি বিরোধি আন্দোলন “নো এন আর সি মুভমেন্ট”।  সেই আন্দোলনে পশ্চিমবঙ্গের ছাত্রযুব, নারী, অধিকার আন্দোলনের কর্মী,  প্রগতিশীল চিন্তাচেতনার মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। করোনার প্রথম ঢেউ আছড়ে পড়া ও লকডাউনের মধ্য দিয়ে যা সাময়িক স্তিমিত হয়। করোনাকালীন লকডাউনে বিভিন্ন সংহতি উদ্যোগের মধ্যে দিয়ে আবার একপ্রকার যৌথ কর্মকান্ডের বিকাশ হয়। এর পরে নির্বাচনের কয়েকমাস আগে গড়ে ওঠে “ফ্যাসিস্ত আর এস এস – বিজেপির বিরুদ্ধে বাংলা” নামক মঞ্চ।  নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যার মূল স্লোগান হয় “নো ভোট টু বিজেপি” বা  “বিজেপিকে একটিও ভোট নয়”।  গ্রাম-মফস্বল-শহরে লাগাতার প্রচারের মাধ্যমে বিজেপির স্বরূপ উন্মোচন করা, তাদের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করাই ছিল এই মঞ্চের প্রধান ঘোষিত কর্মসূচী। স্লোগানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। রাস্তায় নেমে সরাসরি প্রচারের পাশাপাশি একের পর এক আকর্ষনীয় গান, ভিডিওর মাধ্যমে  আরএসএস- বিজেপির প্রভাব থেকে রাজ্যবাসীকে মুক্ত করার এই প্রচেষ্টার সফলতা আজ বোঝা যাচ্ছে বিজেপির বিরুদ্ধে মানুষের বলিষ্ঠ এই রায় দেখে। কোনও দলের হয়ে প্রচার না করে শুধুমাত্র একটি বিশেষ দল ও ভাবধারার বিরুদ্ধে এই সক্রিয় প্রচার দেশের রাজনীতিতেও অভিনব। এর পাশাপাশি কৃষক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটও বাংলার ভোটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।  বিগত ১০ই মার্চ “নো ভোট টু বিজেপি”র ডাকে মহামিছিলে পা মেলান  দিল্লিতে  অবস্থানরত পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশের কৃষক নেতৃত্বরা। এই স্লোগান সহকারেই একের পর এক “কিষাণ মহাপঞ্চায়েত”  হয়  এরাজ্যে। সব মিলিয়ে প্রকৃত অর্থেই আরএসএস- বিজেপি -র রাজনীতির বিরুদ্ধে একটা গণ-আন্দোলনের  চেহারা নেয় “নো ভোট  টু বিজেপি”।

বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথকে প্রত্যাখ্যান করে, নাগরিক সমাজের বিজেপি-বিরোধি উদ্যোগে সাড়া দিয়ে বাংলার রাজনীতি আগামী দিনে কোন পথে এগোয় সেটাই দেখার।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on বাংলার রায় : বিজেপি-র সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান মানুষের

Leave A Comment