“হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তান” স্লোগান দেওয়া বিজেপি – বাঙালিদের নাগরিকত্ব দেবে না

আজকের খবর পর্যালোচনা বিশেষ খবর মতামত

Last Updated on 6 months by admin

“ হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তান” স্লোগান দেওয়া বিজেপি বাঙালিদের নাগরিকত্ব দেবে না

কমল চক্রবর্তী (শিলচর, আসাম)

(কমল চক্রবর্তী আসামের জাতীয় নাগরিক পঞ্জীকরণ তথা এন আর সি, ডি-ভোটার, ডিটেনশন ক্যাম্প ইত্যাদির উৎপীড়নের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে নানা কাজকর্মে যুক্ত থেকেছেন। নাগরিকত্ব প্রমাণের জটিল কর্মকাণ্ডে ভুক্তভোগী সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষের পাশে লাগাতার থেকেছেন বরাক উপত্যকার যে কয়েকজন মানুষ, কমল তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম। আসামের বাইরেও তাঁর পরিচিতি এই কাজের সূত্রে। তাঁর লেখা “আসামের নাগরিকত্ব হরনের দহনলিপি” বইটি নাগরিকত্ব প্রমাণের চক্রব্যূহে পড়ে মানুষের দুরবস্থার জ্বলন্ত আখ্যান। এন পি আর, এন আর সি, সি এ এ-র বিষয়ে ‘এদেশ আমার’ এর পক্ষ থেকে তার সাথে একটি কথোপকথন প্রশ্নোত্তর আকারে প্রকাশ করা হল।)

 

১) আসামের “চূড়ান্ত” নাগরিকপঞ্জি তো বেরোচ্ছে ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে। তার আগে বন্দী শিবিরে যে মানুষগুলোকে পাঠানো হল তাদের কী পদ্ধতি মেনে পাঠানো হল?

আসামে ‘চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জী’  বের হয়েছিল  ৩১ আগষ্ট, ২০১৯ সালে। এন‌আরসির  সঙ্গে বন্দি শিবির বা ডিটেনশন  ক্যাম্পে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। বন্দি শিবিরে যারা থাকে, তাদের ‘সন্দেহ ভাজন’ নাগরিক চিহ্নিত করা হয়েছে আসামে ১৯৯৭ সাল থেকে। কোনো সময় ১৯৭৭ সালের পরও চিহ্নিত করে।  প্রথমে সেই ব্যক্তির নামে “বিদেশি নোটিশ” পাঠানো হয়। সেটা হয়ে থাকে Foreigners (Tribunal ) order rule under 2. আমার  ব‌ইয়ে  দুলুবি বিবিকে নিয়ে লেখা আছ। এই মহিলা একজন ‘সন্দেহ ভাজন নাগরিক’, তার কারণ,  ভোটার লিস্টে ওর নাম একবার ‘দুলুবি বিবি’, আরেকবার ‘দুলাবজান’ ও পরে ‘দোলাবজান’ লেখা ছিল। এই Foreigners Tribunal rule সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এন‌আরসির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এন‌আরসি এক বিষয়, ডি- ভোটার এবং পরবর্তীতে ডিটেনশন ক্যাম্প, পুরো বিষয়টি আলাদা। দুলুবি বিবি,দুলাবজান এক‌ই ব্যক্তি হ‌ওয়া সত্ত্বেও ডিটেনশন ক্যাম্পে আশ্রয় হলো। সেইজন্যই আমার ব‌ইয়ে (“আসামে নাগরিকত্ব হরণের দহনলিপি”) – ‘কী হতে পারে পশ্চিমবঙ্গে’ তা নিয়ে কিছু মতামত রেখেছি। পশ্চিমবঙ্গ কে সাবধান করেছিলাম ফেসবুক সহ নানা সামাজিক মাধ্যমে।

 

২) নিঃশর্ত নাগরিকত্বর যে দাবী আপনারা করেছেন সেটা ঠিক কীরকম?

দেশভাগের  ফলে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শিকার হয়ে ভারতে এসেছিলেন , তাদের এবং জন্মসূত্রে যারা ভারতীয় ( কোনো শর্ত বিহীন), তাদের নিঃশর্ত নাগরিকত্ব দিতে হবে। সেটাই আমরা চেয়েছিলাম।


৩) বিজেপি আসামে ভোটের আগে প্রচার করছে নতুন করে এন আর সি করার কথা। অথচ, সিএএ ২০১৯ এর বিষয়ে তারা নিশ্চুপ সেখানে। পশ্চিমবঙ্গে আবার এই বিষয়ে হিন্দুদের মধ্যে একটা প্রচার চালানো হচ্ছে ওদের তরফ থেকে। এই দ্বিচারিতা কেন?

বিজেপি আসামে ভোট প্রচারে এন্আরসি এবং সিএএ নিয়ে নিশ্চূপ। তার কারণ, এন‌আরসি করে উগ্র অসমিয়া জাতীয়তাবাদী দল ও তাদের দোসররা ( বিজেপি কংগ্রেস) দেখলো যে মাত্র ১৯ লক্ষ বাদ পড়েছে। অথচ তারা বারবার সারা ভারতবর্ষে প্রচার করেছিল যে আসামে এক কোটি বাংলাদেশী অবৈধভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটা যে মিথ্যে,সেটা প্রমাণ হয়ে গেছে। তাই বিজেপি ভোটের আগে বলেছিল যে আসামে আবার এন‌আরসি হবে এবং তাদের মতো করে এন‌আরসি করবে। এখন এই ভোটের সময় কিন্তু বলছে না।

সিএএ আসামে চালু করা সম্ভব না। তার মূল কারণ হচ্ছে যে আসামে অসমিয়াদের আধিপত্য বজায় রাখতেই হবে। সিএএ তে যদি হিন্দু বাঙালিরা নাগরিকত্ব পেয়ে থাকে, তাহলে আসমিয়াদের আধিপত্য কমে যাবে। কাজেই বিজেপি সরকার যদি সিএএ আসামে চালু করে, তাহলে এই ভোটের পর আবার যদি বিজেপি বা কংগ্রেস সরকার আসে, তাহলে দশদিনের মধ্যেই সরকার ফেলে দেবে অসমিয়ারা।

পশ্চিমবঙ্গে সিএএ নিয়ে প্রচার করাটা বিজেপির পক্ষে সুবিধা। সেখানে ওদের হারানোর কিছু নেই, বরং পাওয়ার আছে। রাজ্য দখল করার লিপ্সা। তাছাড়া, সাধারণ মানুষ নাগরিকত্ব আইন নিয়ে বোঝে না। মতুয়া সহ অন্যান্য হিন্দু সম্প্রদায়ের বাঙালিদের বোঝাবে এই সিএএ দিয়ে তাদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। সেটা কি কখনো হয়, আসামে সিএএ চালু করার কথা বলছে না, অথচ পশ্চিমবঙ্গে হবে?

 

৪) এন আর সি, সি এ এ নিয়ে চর্চা হলেও এন পি আর নিয়ে অনেকেই অবগত নন। এন আর সি করার ক্ষেত্রে এন পি আর এর ভূমিকা কী?

এনপিআর হচ্ছে এন‌আরসির প্রথম ধাপ। কীভাবে? এনপিআরের মাধ্যমে একটি পরিবারের অর্থাৎ “সাধারন বাসিন্দাদের”,, যারা ছয়মাস ধরে একটা অঞ্চলে বসবাস করছেন এবং পরবর্তীতে সেই অঞ্চলে আরো ছয় মাস থাকতে চান, সেই নাগরিকদের সমস্ত “ তথ্য ভান্ডার’ সংগ্রহ করবে। নাম, ঠিকানা,বয়স বর্তমান ও আগের ঠিকানা সহ পরিবারের সদস্যদের সব তথ্য নেওয়া হবে। এই তথ্য সংগ্রহ করে ডেটা বেস তৈরি করা হবে। এনপিআরের ফর্ম পূরণ করার সময়, সেই পরিবার যা বলবে, সেটাই সত্যি ধরে নেওয়া হবে। এবং সেই তথ্য সংগ্রহ করে পরবর্তীতে এন‌আরসি করার সময় সেই তথ্যগুলোর কাগজপত্র জমা দিতে বলবে। কাজেই কেউ যদি লিখেও থাকে, তার বাবা বাংলাদেশ থেকে ভয়ে পালিয়ে পশ্চিমবঙ্গে এসেছিল বা অন্য কোনো কারণে, তখন তার কাছ থেকে পাসপোর্টের কাগজ চাইবে।

এনপিআর শেষ হ‌ওয়ার সাথে সাথেই শুরু হবে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল গঠন করা পশ্চিমবঙ্গে। এনপিআরের সময় যে তথ্য দেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকেই বেরিয়ে আসবে, কারা বাংলাদেশ থেকে  অবৈধভাবে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছে। পশ্চিমবঙ্গেও আসামের মতো ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল তৈরি করা হবে – একথাও আমার  ব‌ইয়ে উল্লেখ করেছি।

 

 

৫) এন পি আর কি কোনও একটি রাজ্যে আলাদা করে আটকানো সম্ভব? না হলে উপায়?

এনপিআর কোনোরাজ্যেই আটকানো সম্ভব নয়। কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত সব রাজ্যকে মেনে নিতে হবে। না মানলে, সেই রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে এনপিআর এর কাজ হবে। কাজেই রাজ্য সরকারকে করতেই হবে। একমাত্র গণ- আন্দোলন নয়, গণ – বিষ্ফোরণ আটকাতে পারে এই এনপিআর। কৃষকদের কাছ থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে কীভাবে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হয়। এছাড়া, এর কোনো বিকল্প পথ নেই।

 

 

৬) শ্রেণীগত, লিঙ্গগত অবস্থানের দিক থেকে দেখলে এন আর সি তে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সমাজের কোন অংশের মানুষ?

এন‌আরসিতে সবচেয়ে বিপদে পড়বে গরীব অসহায় নিরক্ষর মহিলারা, যাদের খুব কম বয়সেই বিয়ে হয়ে যাওয়ায় বাবার সঙ্গে মেয়ের সম্পর্কের কোনো সরকারি নথিপত্র থাকে না। আর বিপদে পড়বে বাংলাদেশ থেকে যারা দেশান্তরীত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করছেন পাসপোর্ট বিহীন। বিপদে পড়বে মতুয়া সহ আদিবাসীরা, সাঁওতাল এবং বিভিন্ন নিপীড়িত জনগোষ্ঠিরা। তাদের পক্ষে কাগজপত্র জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব।

 

৭) এন পি আর – এন আর সি – সি এ এ-র মাধ্যমে কি সত্যিই বাংলাদেশ থেকে ধর্মীয়ভাবে অত্যাচারিত হয়ে আসা হিন্দুরা উপকৃত হবে? আসামের অভিজ্ঞতা কী বলে?

এনপিআর এন‌আরসি,  সিএএ- এসব হচ্ছে বিজেপির গেম প্ল্যান্। এবং আসাম হচ্ছে তাদের কাছে testing laboratory. শুধুমাত্র স্লোগান দিলেই চলে অমিত শাহ ও নরেন্দ্র মোদীর। দেশের নাগরিকরা যাতে অন্য কোনো বিষয় নিয়ে আন্দোলন করতে না পারে, সেইজন্যই এই ধরনের স্লোগান ব্যবহার করে। আসামে এন‌আরসি চলাকালীন সেই ২০১৫ সাল থেকে ২০১৯ পর্যন্ত আসাম বাসী বিশেষভাবে বাঙালিরা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে আন্দোলন করেননি।  এই চার বছর বাঙালিরা মানসিকভাবে” এন‌আরসি সিনড্রোম”- এ আক্রান্ত হয়ে অনেকেই আত্মহত্যা করেছিল। ব্যক্তিগতভাবে ১২০ জনের হিসেব রেখে পরে ছেড়ে দিয়েছিলাম। পশ্চিমবঙ্গে সেটাই করাতে চাইছে বিজেপি সরকার।

আসামে বা ভারতবর্ষে সিএএ হ‌ওয়ার আগে কেন্দ্রীয় সরকার গ্যাজেট নোটিফিকেশন দিয়েছিল। যেখানে লেখা ছিল, ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে যারা এসেছিল বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে, তাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য। এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্য শিলচরের আইনজীবী অনিল দে একটি মামলার প্রেক্ষিতে আসাম সরকারের হলফনামা দিয়েছিল। সিএএ কোনোভাবেই হিন্দু বাঙালিদের নাগরিকত্ব দিতে পারবে না। কারণ, তাদের পক্ষে, পূর্ব পুরুষদের বাংলাদেশের ঠিকানা দেওয়া সম্ভব না। যদি বাঙালি হিন্দুদের নাগরিকত্ব দিতেই হয়, তাহলে নিঃশর্ত নাগরিকত্ব দিলে ওরা সিএএ- এর সুযোগ পাবে। আরএসএস -বিজেপির এজেন্ডাই হচ্ছে “ হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তান”! সেক্ষেত্রে কীভাবে বাঙালিদের নাগরিকত্ব দেবে?

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
3 Thoughts on “হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তান” স্লোগান দেওয়া বিজেপি – বাঙালিদের নাগরিকত্ব দেবে না
    amal
    23 Mar 2021
    10:47am

    পশ্চিমবঙ্গে এন আর সি বিরোধি আন্দোলনকে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়?

    0
    0
    অমল
    23 Mar 2021
    10:57am

    পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এন আর সি বিরোধি আন্দোলনের রণনীতি কী হওয়া উচিৎ?

    0
    0
    অসীম দাস
    23 Mar 2021
    1:20pm

    NRC, CAA নিয়ে আরো লেখা দরকার।

    0
    0

Leave A Comment