বিজেপির ইস্তাহারে সিএএ ধাপ্পা

আজকের খবর বিশেষ খবর মতামত

Last Updated on 6 months by admin

(বিজেপির নির্বাচনী ইস্তেহারের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার কোন দায় নেই। প্রতি বছর ২ কোটি করে চাকরি, নোটবন্দিতে ১০০ দিনের মধ্যে সমস্ত কালো টাকা ফেরৎ, কত কিই তো বলেছিল। এ রাজ্যে না হয় আর এক ঝুড়ি মিথ্যা উপহার দিল। তার মধ্যে অন্যতম সিএএ-এর মাধ্যমে নাগরিক পঞ্জি থেকে বাদ পড়া হিন্দুদের নাগরিক পঞ্জিতে ঠাঁই দেওয়ার প্রতিশ্রুতি – ….. লিখছেন প্রণব কান্তি বসু।)

 

বিজেপির ইস্তাহারে সিএএ ধাপ্পা

প্রণব কান্তি বসু

 

বিজেপি পশ্চিম বাংলায় নির্বাচনী ইস্তেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে ক্ষমতায় এলে মন্ত্রীসভার প্রথম বৈঠকেই সিএএ লাগু করে এ রাজ্যে ওপার বাংলা থেকে যে সব হিন্দুরা উদ্বাস্তু হয়ে এসেছেন তাদের সবাইকে নাগরিকত্ব প্রদান করবে।

প্রশ্ন যাগে আমরা, যাদের পূর্বপুরুষ উদ্বাস্তু হয়ে এসেছিল এবং উদ্বাস্তু কলোনিতে ঠাই পেয়েছিল, তারা তো ভোট দিচ্ছি, আমাদের রেশন কার্ড আছে, কলোনি জমি প্রয়োজনে বিক্রি করছি, আইন ব্যবস্থার সুযোগ পাচ্ছি, পুলিসের সাহায্য নি, অর্থাৎ নাগরিকের সমস্ত অধিকার আছে। আবার নতুন নাগরিকত্ব প্রদান করার মানে কি? তাহলে কি আমাদের প্রথমে বে-নাগরিক ঘোষণা করা হবে? মতুয়া সম্প্রদায়ের বড় অংশের মত, যারা ১৯৭১ সালের পর এসেছেন, তাদের কোন কোন ক্ষেত্রে, যেমন পাসপোর্ট করার ক্ষেত্রে, সমস্যা হয়। তার প্রতিকারের জন্য রাষ্ট্রকেই উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে। বিজেপি কি উদ্বাস্তুদের এমন বোকা ভাবছে যে তারা সিএএ-এর মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার লোভে প্রথম নাগরিকত্ব খোয়ার জন্য বিজেপিকে পশ্চিম বঙ্গে ক্ষমতায় আনবে!

কিন্তু তাও দেখা যাক তাদের এই প্রতিশ্রুতি কতটা বিশ্বাস যোগ্য।

প্রথমত, বুঝতে হবে প্রচুর উদ্বাস্তুদের সরাসরি এনআরসি-তে কেন অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। এর সহজ উত্তর – এর জন্য প্রয়োজনীয় নথি অনেক উদ্বাস্তু দাখিল করতে পারবে না। আমরা স্পষ্ট জানি না এনআরসি-র জন্য কি কি নথি লাগবে। অনুমান করতে হবে দুটি সূত্র ধরে। প্রথমত, ২০০৩ এর Citizenship rules-এ বলা আছে যে জাতীয় জন পঞ্জি (এনপিআর)-তে সংগৃহীত তথ্য যাচাই করে তবেই কাউকে নাগরিক পঞ্জি (এনারসি)-তে নথিভুক্ত করা হবে। তাই এনপিআর-এ যা যা তথ্য চাওয়া হয়েছে তা প্রমাণ করতে যে নথিগুলি প্রয়োজন সেগুলি অবশ্যই দাখিল করতে হবে। কয়েকটি মাত্র উল্লেখ করছি: আগে কোথায় থাকতেন, কত দিন থাকতেন; আপনার বাবা, মা, স্বামী বা স্ত্রী সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য, ইত্যাদির, প্রমাণ পেশ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, যেহেতু আসামেই এক মাত্র এনারসি করা হয়েছে তাই ঐ রাজ্যে যা যা নথি চাওয়া হয়েছিল তা চাওয়া হবে। আসাম এনারসি-তে কি কি চাওয়া হয়েছিল? ১৯৭১ এর আগে ভোটার তালিকায় আপনার নাম; স্থায়ী বসবাসের সরকারি প্রমাণ পত্র; শরণার্থী প্রমাণ; পাসপোর্ট; LIC শংসাপত্র; সরকার থেকে প্রাপ্ত কোন শংসাপত্র; আদালতের দলিল; জন্মের শংসাপত্র; সরকারি চাকরীর শংসাপত্র; বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শংসাপত্র; ব্যাঙ্কের পাস বই। মতুয়াদের বড় অংশের মত অনেক উদ্বাস্তু যেহেতু ১৯৭১ সালের পর এসেছেন তাই ১৯৭১ সালের আগে ভোটার তালিকায় নাম বা কোন অধিবাসী প্রমাণ দেখানো সম্ভব নয়।

এ সমস্ত কারণেই বাংলাদেশ থেকে আগত অনেক উদ্বাস্তু বিপন্ন হবে নাগরিকপঞ্জী চালু হলে। বিজেপি তাই ভুল বোঝাচ্ছে যে নাগরিকপঞ্জী থেকে বাদ যাওয়া হিন্দুদের সিএএ-এর মাধ্যমে নাগরিকত্ব প্রদান করা হবে। এর সত্যাসত্য যাচাই করা যাক।

বাস্তবটা হল এটা এদের স্বভাব সিদ্ধ মিথ্যাচার। CAA-এর মাধ্যমে কাউকে NRC-তে ঢোকাতে গেলে প্রথম প্রমাণ করতে হবে যে তারা বাংলাদেশ, পাকিস্তান অথবা আফগানিস্তান থেকে এসেছিল। তারা হিন্দু, শিখ, খ্রিষ্টান, পারসি, বৌদ্ধ বা জৈন সম্প্রদায়ের মানুষ। আরও প্রমাণ করতে হবে সে দেশগুলিতে তারা ধর্মীয় অত্যাচারের কারণে বা অত্যাচারের ভয় ভীত হয়ে ভারতে এসেছিল। বিজেপি মিথ্যা প্রচার করছে যে ধর্মীয় অত্যাচার বা ধর্মীয় অত্যাচারের ভয়ের কোন প্রমাণ দাখিল করতে হবে না কারণ এর কোন উল্লেখ সিএএ-তে নেই। CAA-তে বলা হয়েছে যে “যারা ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪-এর মধ্যে ঐ তিনটি দেশ থেকে এসেছেন এবং ঐ ছ’টি সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত তারা যদি Passport (Entry into India) Act, 1920-তে ছাড় পেয়ে থাকে তা হলে তারা নাগরিকত্ব পাবে”।  এই পাসপোর্ট আইন ২০১৫-তে, বিজেপি সরকারের আমলে, সংশোধন করে বলা হয় যে ঐ তিনটি দেশ থেকে ধর্মীয় অত্যাচার বা অত্যাচারের ভয়ে যারা এসেছে তারাই শুধু ছাড় পাবে। সুতরাং CAA-তে বিষয়টা আলাদা করে উল্লেখ করার দরকার হয় নি।

এই আশ্বাস যে কত বড় একটা মিথ্যা তা আরও বোঝা যায় CAA-এর পূর্ব ইতিহাস খানিক জানা থাকলে। CAB, ২০১৯, সংসদে পাস হয়ে CAA-তে পরিণত হয়। ২০১৬ সালেও প্রায় একই বিল সংসদে পেশ করা হয়, কিন্তু বিজেপি আর তার সহযোগীদের রাজ্যসভায় সংখ্যা গরিষ্ঠতা না থাকায় তা আইনে পরিণত না হয়ে Joint Parliamentary Committee- তে পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়।

এই কমিটির সভায় RAW এবং IB-এদের সঙ্গে সওয়াল জবাবের নথি দেখলে জানা আয় যে সংস্থাগুলি শঙ্কিত যে এর ফলে ঐ তিনটি দেশে ভারতের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী কোন সংস্থা তাদের লোক না ঢুকিয়ে দেয়। তাদের প্রস্তাব: যারা ইতিমধ্যেই শরণার্থি হিসাবে আবেদন করেছে এবং পরবর্তি কালে করবে তাদের সবার সম্বন্ধে নিকটবর্তী থানায় অনুসন্ধান করা হবে  তারা কোন আইন ভঙ্গ করেছে কি না। তাদের ওপর নজর রাখা হবে তারা কার সঙ্গে মেশে, তারা কোথায় যায়। যদি গোয়েন্দা সংস্থাগুলি নি:সন্দেহ হয় যে ঐ ব্যক্তি কোন ভাবেই দেশ বিরোধী কাজের সঙ্গে লিপ্ত নয়, তা হলেই তারা তাকে নাগরিকত্ব দেওয়ার অনুমতি দেবে। বর্তমান ভারতে দেশ বিরোধী কাজের যা নতুন সংজ্ঞা বিজেপি-আরএসএস চালু করেছে তাতে এই সরকারের বিরোধী কোন মত প্রকাশই দেশদ্রোহিতার সামিল। তাই বোঝা যাচ্ছে এই আইনের সুযোগ একমাত্র সঙ্ঘ পরিবারের ভক্তরাই নিতে পারবে।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on বিজেপির ইস্তাহারে সিএএ ধাপ্পা

Leave A Comment