হাইকোর্টে আবারও ধাক্কা খেলো রাজ্য সরকার : চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকদের বদলিতে আপাতত স্থগিতাদেশ – স্থায়ীকরনের দাবিতে পার্শ্ব শিক্ষকরা জোরদার আন্দোলনের পথে

আজকের খবর বিশেষ খবর রাজ্য

Last Updated on 1 month by admin

ইন্দ্রানী পাল, ১৬ সেপ্টেম্বর,২০২১ :

প্রায় ২০১৮ সাল থেকে প্রাইমারি ও আপার প্রাইমারি স্তরের পার্শ্ব শিক্ষক, শিক্ষাবন্ধু সহ শিশু শিক্ষা কেন্দ্র (এসএসকে) ও মাধ্যমিক শিক্ষা কেন্দ্র (এমএসকে)-এর শিক্ষক-শিক্ষিকারা স্থায়ীকরণ ও বেতন বৃদ্ধির দাবিতে দীর্ঘ  আন্দোলন করে আসছেন । পার্শ্ব শিক্ষকদের দাবি তারা স্থায়ী শিক্ষকদের মত সম-দায়িত্ব পালন করেন, বাদ যায়না ২৬শে জানুয়ারি থেকে ১৫ই আগস্ট এর মত দিন গুলিও এবং পার্শ্ব শিক্ষকদের যোগ্যতা ও কাজ বাড়লেও  সমকাজে সমবেতন তাঁরা পাননা ।

বর্তমানে প্রাইমারি স্তরের শিক্ষকদের মাইনে আট হাজার টাকা ও উচ্চ প্রাথমিক স্তরে  মাইনে প্রায় এগারো হাজার টাকা । শিশু শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষিকাদের মাইনে অক্টোবর থেকে ৫৪০০ টাকা থেকে ১০১৯০ টাকা করা হলেও তা তাদের দাবীর তুলনায় অনেকটাই কম ।

বর্তমানে রাজ্যে এসএসকে শিক্ষক শিক্ষিকা বা সরকারি ভাষায় সম্প্রসারক সম্প্রসারিকার (প্রথম শ্রেণী থেকে চতুর্থ শ্রেণী পর্যন্ত) সংখ্যা প্রায় ষোলো হাজার এবং  এমএসকে শিক্ষক শিক্ষিকার (পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি ) সংখ্যা রয়েছে প্রায় দু হাজার। এই শিক্ষক – শিক্ষিকাদের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের অধীন থেকে শিক্ষা দপ্তরের অধীনে আনা হলেও তাদের দাবি মেনে এখনো তাদেরকে প্রাথমিক বা মধ্যশিক্ষা পর্ষদের আওতায় আনা হচ্ছে না। এছাড়াও এস এস কে শিক্ষকদের অনিয়মিত বেতন কাঠামোর বিরুদ্ধে অভিযোগও কম নয়।

১৯৯৭ সালে রাজ্যে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের অধীনে প্রায় ১০০০ টি শিশু শিক্ষা কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। উদ্দেশ্য ছিল লিঙ্গগত ও সামাজিক বৈষম্যকে অতিক্রম করে, গ্রামে যেখানে উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই সেখানেও শিক্ষাকে পৌঁছে দেওয়া।  মূলত ওই কেন্দ্রগুলিতে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা হতো প্রয়জনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন স্থানীয় মানুষদের ।

বিভিন্ন সময়ে এই সকল শিক্ষক শিক্ষিকারা শিক্ষাদপ্তর থেকে শুরু করে শিক্ষামন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ডেপুটেশন জমা ও আবেদন করার পরও সরকারের তরফ থেকে কোনো সাড়া না মিললে, সম্মিলিতভাবে কখনো বিকাশ ভবন – কখনো নবান্ন অভিযান করেছেন। সাক্ষী থেকেছেন পুলিশি বর্বরতার এবং জেলেও যেতে হয়েছে আন্দোলনকারীদের। এতকিছুর পরেও নির্বিকার রাজ্য সরকার আন্দোলনকারী শিক্ষক শিক্ষিকাদের সাথে কোনপ্রকার আলোচনায় বসতে নারাজ থেকেছে; উপরন্তু প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে শিশু শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষকদের বদলির কোনো নিয়মনীতি না থাকা সত্ত্বেও বেশকিছু শিক্ষক-শিক্ষিকাকে নিজের জেলা থেকে অন্য জেলায় ৩০০ থেকে ৯০০ কিলোমিটার দূরে ‘শাস্তি’  স্বরূপ  বদলির নির্দেশ আসে । অথচ এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায়  আসার আগে  পার্শ্বশিক্ষকদের আশ্বাস দিয়েছিলেন যে,  তিন বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে তাদের স্থায়ীকরণের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে ।

তৃতীয়বারের জন্য তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পরও শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু প্রত্যেকবারই  শিক্ষক – শিক্ষিকাদের সাথে কোনো আলোচনায় বসতে চান নি। তাদের আলোচনায় বসার দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন বারবার। যদিও সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া বিভিন্ন বিবৃতিতে তিনি দাবি করেছেন – তিনি নাকি যে কোন মুহূর্তে আলোচনায় বসতে রাজি ।

এরপরেও ১৭ টি শিক্ষক সংগঠন নিয়ে তৈরি হওয়া ‘শিক্ষক ঐক্য মুক্ত মঞ্চের’ সঙ্গে যুক্ত শিক্ষক-শিক্ষিকারা

ফের বিকাশ ভবনের সামনে অবস্থান বিক্ষোভে বসলে পুলিশ তাঁদের হটিয়ে দিতে চায়। এর মধ্যেই পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে পাঁচজন এসএসকে শিক্ষিকা সরকারের ক্রমাগত টালবাহানা ও স্বৈরাচারী মনোভাবে বীতশ্রদ্ধ হয়ে বিষ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। জানা গেছে সেটি ছিল  ইঁদুর মারার অরগ্যানো ফসফরাস জাতীয় একটি বিষ। বর্তমানে পাঁচজন শিক্ষিকার মধ্যে এখনও কিছু জন আরজি কর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন এবং অবস্থা এখনো সংকটজনক ।

এনাদের মধ্যেই নিয়ম বহির্ভূতভাবে সরকার এসএসকে শিক্ষিকা ছবি চাকিকে মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জ থেকে এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের শিক্ষিকা জোনা টুডুকে জলপাইগুড়িতে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও হুগলির এক শিক্ষিকাকেও মালদায় বদলি করা হয়েছে । তাঁরা প্রত্যেকেই জানিয়েছেন বর্তমান বেতন কাঠামোয় নিজের জেলার বাইরে গিয়ে এত দূরে শিক্ষকতা করা তাদের পক্ষে অর্থনৈতিকভাবে অসম্ভব ।

যদিও বদলির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এসএসকে শিক্ষিকাদের করা একটি মামলার শুনানিতে আজ কলকাতা হাইকোর্ট ৩০শে নভেম্বর পর্যন্ত তাদের বদলিতে স্থগিতাদেশ জারি করেছে এবং আদালত সরকারের কাছ থেকে জানতে চেয়েছে, – কিসের ভিত্তিতে তাঁদের বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল ।

বিভিন্ন সময় আর্থিক সংকটে পড়ে একাধিক পার্শ্বশিক্ষক আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হলেও সরকার তাতে বিন্দুমাত্র  বিচলিত হয়নি। কিন্তু এই পাঁচ জন শিক্ষিকা শিক্ষামন্ত্রীকে দায়ী করে আত্মহত্যার চেষ্টা করলেও, ‘শিক্ষক ঐক্য মুক্ত মঞ্চে’ র সাধারণ সম্পাদক  শিক্ষক মইদুল ইসলাম কে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে মধ্যরাতে তার বাড়িতে বিধান নগর উত্তর ও বেলেঘাটা থানার এক বিশাল  পুলিশ বাহিনী তাকে গ্রেফতার করতে যান।

মইদুল ইসলাম জানিয়েছেন – পুলিশের কাছে তাঁকে গ্রেপ্তার করার জন্য কোন এফআইআর-এর কপি বা নোটিশ ছিলনা। প্রায় ২০০ ঘন্টা অতিক্রান্ত হয়ে গেল তিনি এবং তার গোটা পরিবার গৃহবন্দী এবং তিনি সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাইলেও তাঁকে ক্রমশ পুলিশি সন্ত্রাসের সম্মুখীন হতে হচ্ছে ।

এরই মধ্যে কল্যাণীতেও পার্শ্ব শিক্ষকদের আরেকটি অবস্থানে মহিলা শিক্ষকরা চরম পুলিশি বর্বরতার শিকার হন এবং তাদের শ্লীলতাহানি ও করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে ।

তৃণমূল সরকারের আমলেও সাধারণ খেটে খাওয়া কৃষিজীবী মানুষ এবং ছাত্র-যুবকদের বিভিন্ন আন্দোলনে বারংবার পুলিশি সন্ত্রাস নামিয়ে আনা হয়েছে এবং  ফ্যাসিস্ট বিজেপি সরকারের মতোই এ রাজ্যের শাসকও ‘UAPA’ এর মত কালাকানুন ব্যবহার করে প্রতিবাদীদের বিভিন্ন সময় কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করেছে। আন্দোলনকারীরা এই রাজ্যের সরকারের ভূমিকাকে ‘স্বৈরাচারী’ আখ্যা দিচ্ছেন।

কলকাতার প্রেসক্লাবে আয়োজিত একটি প্রেস কনফারেন্সে শিক্ষাবিদ মীরাতুন নাহার ও মানবাধিকার আন্দোলনের কর্মী সুজাত ভদ্র ও বোলান  গঙ্গোপাধ্যায় শিক্ষকদের এই আন্দোলনে তাদের পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে শিক্ষক সমাজের প্রতি সরকারের এই ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ মনোভাবকে তীব্র ধিক্কার জানান।

‘শিক্ষক ঐক্য মুক্ত মঞ্চে’ র পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে সরকার যদি এখনও তাঁদের সাথে আলোচনায় বসতে রাজি না হয় এবং পার্শ্ব শিক্ষকদের স্থায়ীকরণের প্রক্রিয়া যদি শুরু না হয় তারা এই আন্দোলনকে আরো তীব্রতর করবেন।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on হাইকোর্টে আবারও ধাক্কা খেলো রাজ্য সরকার : চুক্তিভিত্তিক শিক্ষকদের বদলিতে আপাতত স্থগিতাদেশ – স্থায়ীকরনের দাবিতে পার্শ্ব শিক্ষকরা জোরদার আন্দোলনের পথে

Leave A Comment