স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণের পথে স্কুল সার্ভিস কমিশনের ‘মেধা তালিকায় উত্তীর্ণ’ রাজ্যের হবু শিক্ষকেরা

আজকের খবর বিশেষ খবর রাজ্য

Last Updated on 3 months by admin

নিজস্ব সংবাদদাতা, ৭ জুলাই, ২০২১ :

স্কুল সার্ভিস কমিশনের মেধা তালিকায় উত্তীর্ণ হবু শিক্ষক শিক্ষিকারা আজ প্রায় ১৬০ দিন ধরে রাস্তায় অবস্থান করছেন তাদের ন্যায্য ও আইনসঙ্গত নিয়োগের দাবিতে। ২০১৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ সেন্ট্রাল স্কুল সার্ভিস কমিশন কর্তৃক আয়োজিত প্রথম SLST পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মেধাতালিকায় থেকে বঞ্চিত হবু শিক্ষক পদপ্রার্থীরা বিধাননগরের সেন্ট্রাল পার্কের ৫ নং গেটের সামনে ২০২১-এর ৩০ জানুয়ারি থেকে আজ অবধি লাগাতারভাবে শান্তিপূর্ণ ধর্না কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের নিয়োগ নিয়ে রাজ্য সরকারের অনিচ্ছা ও উদাসীনতার জবাবে, তাঁরা গত কয়েকদিন আগে থেকে স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণের সিদ্ধান্ত নিয়ে আন্দোলন শুরু করেছেন বিধাননগরের ঐ স্থানে।

গত ২০১৬-র এস এস সি পরীক্ষার মেধা তালিকা, মোট শূন্যপদ ও শিক্ষক নিয়োগে রাজ্যের চরম দূর্নীতি ও স্বজনপোষণ নিয়ে কমবেশি আমরা সকলেই জানি। সাধারণত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ করে স্কুল সার্ভিস কমিশন।

প্রসঙ্গত গত ২০১৬ সালে শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা হয়। তারপর দীর্ঘ একটি বছর টালবাহানার পর আপডেট ভ্যাকেন্সি ছাড়াই মেরিট লিস্ট প্রকাশিত হয় – যা স্কুল সার্ভিস কমিশনের গেজেট বর্হিভূত। সেই তালিকা বা লিস্টে পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর কত? ইন্টারভিউয়ে কত পেয়েছে? মোট প্রাপ্ত নম্বর কত? আজও তারা জানে না। এসএসসি-র অফিসিয়াল নোটিশে পরীক্ষার সময় যে শূন্যপদ দেখানো হয়েছিল, মেধা তালিকা বা মেরিট লিস্ট প্রকাশিত হওয়ার পর কোনো এক অজ্ঞাত কারণে  সেই শূন্যপদ কমে গেল। কিন্তু কেন? কীভাবে? এগুলো সব “লজিক নয় ম্যাজিকে ভরা”। কমিশনের গেজেটে উল্লেখ করা হয়েছিল প্যানেল তৈরী হবে মোট শূন্যপদের ১ : ১.৪ অনুপাতে। অর্থাৎ ১০০টি  শূন্যপদ থাকলে ১৪০ জনকে তালিকাভুক্ত করানো হবে। পরবর্তীকালে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে মেধাতালিকা প্রকাশিত হলে উক্ত অনুপাতের অসঙ্গতি দিনের আলোর মতো উদ্ভাসিত হয়। কোনো  কোনো বিষয়ে দুইগুন, চারগুন বা বহুগুন প্রার্থীকে ওয়েটিং লিস্টে রাখা হয়, যা নোটিফিকেশনের সম্পূর্ণ বিপরীত।

এরপর মেরিট লিস্ট প্রকাশিত হয়।গেজেট ভহির্ভুতভাবেই এস এম এস-এর মাধ্যমে একাধিক কাউন্সেলিং হয় নিয়োগের জন্য। সেখানে দেখা যায় পরের দিকে র‍্যাঙ্ক করা প্রার্থীরা শিক্ষকতা করছে। এটা কি কমিশনের নিরপেক্ষতা ? কমিশন পরীক্ষার পর ইন্টারভিউয়ের জন্য প্রথম ফেজ, দ্বিতীয় ফেজ ও তৃতীয় ফেজে প্রার্থীদের ডাকে।  একাধিক কাউন্সেলিংয়ের পর দেখা যায় ফার্স্ট ফেজের ক্যান্ডিডেটদের ওয়েটিংয়ে রেখে দেয়।আর দ্বিতীয় ও তৃতীয় ফেজের প্রায় ক্যান্ডিডেটরা নিয়োগপত্র পায়।

কমিশনের এই সব বিবিধ গাফিলতি ও অনিয়মের জন্য হবু শিক্ষক-শিক্ষিকারা কমিশনের দ্বারস্থ হন। কমিশন জাতির কান্ডারীদের শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেয়। তাদের প্রতি দীর্ঘদিনের বঞ্চনা আগুনে ঘৃতাহুতির কাজ করে। ন্যায্য  অধিকার পেতে শুরু হয় কলকাতার রাজপথে মিটিং-মিছিল-ডেপুটেশন। সবই ব্যর্থ হয় পুলিশি হস্তক্ষেপে। তারপর ২০১৯-এর মার্চ মাসে প্রার্থীরা অনশন শুরু করেন মেয়ো রোডের পাশে। দীর্ঘ ২৯ দিন  অতিবাহিত হওয়ার পর মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় অনশনরত প্রার্থীদের সামনে প্রতিশ্রুতি দেন যে সমস্ত শিক্ষক  পদপ্রার্থীদের নিয়োগের ব্যবস্থা করবেন লোকসভা ভোটের পর। কিন্তু শিক্ষক পদপ্রার্থীদের জীবন নিয়ে তৃতীয়বারের জন্য  আবার  নির্বাচিত বর্তমান রাজ্য সরকারের টালবাহানা চলছেই।

(খবরটির ভিডিও দেখার জন্য নীচের Linkটিতে Click করুন)

একজন আন্দোলনকারী জানালেন, “বর্তমানে আমরা ১৫৮ দিন ধরে এই দুর্বিষহ অবস্থায় রয়েছি তা সত্বেও  আমাদের দিকে এস এস সি অফিস ও বিকাশ ভবনের বিভিন্ন আধিকারিকরা আমাদের কাছে কোন সদুত্তর নিয়ে আসেনি বরং আমরা প্রতিনিয়ত উনাদের কাছে গিয়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি এবং ডেপুটেশন জমা দিয়েছি।তারা বিভিন্ন চিঠি রিসিভ করিয়ে দিয়েছেন ‌।এই করে করে একের পর এক রিসিভের গাদা হয়ে জমে গেছে।তা সত্বেও আমাদের বিষয়ে কোনো ভালো খবর দেননি কমিশনের আধিকারিকরা”।

আন্দোলন অবস্থানে বসে থাকা সেখ সইরুদ্দিন বললেন, “আধিকারিকরা একটাই কথা বলে যাচ্ছে – আমরা তোমাদের ফাইল এর সমস্ত কিছু নবান্নে পাঠিয়ে দিয়েছি সেখান থেকে ফিডব্যাক এলেই তোমাদের সুরাহা করা হবে। কিন্তু সেই ফিডব্যাক এখনো পর্যন্ত আসেনি এবং কেন আসেনি সেটা এক ধোঁয়াশার মধ্যে। আধিকারিকরা বলছেন – আমাদের কিছু করার নেই ,ওপর মহল থেকে বার্তা না এলে আমরা কিছু করতে পারবো না। আমাদের বঞ্চনার কথা বলার ও তাদের সঙ্গে দেখা করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি কিন্তু সরকারি আধিকারিক আমাদেরকে নিরাশ করেছে”। হতাশার সুরে তিনি আরো বললেন, “আমরা  এস এস সি কমিশনের মাধ্যমে বঞ্চিত হয়েছি। তাই এই মূহুর্তে আমরা নরকীয় যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে সরকারের কাছে স্বেচ্ছায় মৃত্যু বরণের মধ্য দিয়েই রাজ্যের স্কুল সার্ভিস কমিশনের দীর্ঘ বঞ্চনার পরিসমাপ্তি ঘটাতে চাই”।

মেধা তালিকায় থাকা প্রার্থীদের নিয়োগের দাবিতে ও বে-আইনি নিয়োগের প্রতিবাদে শিক্ষক পদপ্রার্থীরা বাধ্য হয়েই আমরণ অনশনের পথ বেছে নিয়েছেন। এবিষয়ে রাজ্য সরকার এবং তার শিক্ষা দপ্তরের দিক থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণের পথে স্কুল সার্ভিস কমিশনের ‘মেধা তালিকায় উত্তীর্ণ’ রাজ্যের হবু শিক্ষকেরা

Leave A Comment