ভোট দিন বিজেপির বিরুদ্ধে – আসামে এবং বাংলায়

পর্যালোচনা

Last Updated on 7 months by admin

পার্থপ্রতিম মৈত্র

বিজেপিকে ভোট নয়  (নো ভোট টু বিজেপি) কথাটির মধ্যে এক ধরণের দোদুল্যমানতা থেকে যায়। এক, নিজ নিজ পছন্দের প্রার্থী কে ভোট দিন, শুধু বিজেপিকে বাদ দিয়ে। দুই, বিজেপিকে যার পক্ষে হারানো সম্ভব এমন প্রার্থীকেই ভোট দিন। তিন, উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে না পেলে প্রয়োজনে কাউকে ভোট দেবেন না কিন্তু বিজেপিকে নয়। আসলে এটি একটি প্রতিরোধ সংগ্রাম। এবং প্রতিরোধ সংগ্রামে পক্ষ নিতে হয়। তাই শ্লোগান হওয়া উচিত বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট। এটাই প্রথম এবং শেষ বাক্য। 

কিন্তু সংসদীয় গণতন্ত্রের কতগুলি ভান আছে। যেমন কারও বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া যায় না। সব সময় কারও পক্ষে ভোট দিতে হয়। তাই কার পক্ষে ভোট, এই নির্বাচনটা জরুরি। পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামে পক্ষ নির্বাচনটা দুরূহ। এবং দুটি রাজ্যের গুণগত এবং মানগত অবস্থান আলাদা। তবু আলোচ্য যেখানে বিজেপি, সেখানে এই দুটি প্রদেশের একটি অবস্থানগত সাদৃশ্য ও রয়েছে। চরিত্র অনুযায়ী বিজেপি শুধু ধর্ম-সাম্প্রদায়িক নয়, ভাষা-সাম্প্রদায়িকও বটে। দুই রাজ্যেই বিজেপি মুসলিম এবং বাঙালি বিদ্বেষী। কারণ সাম্প্রতিকতম এনআরসি এবং সিএএ অর্থাৎ বিদেশি অনুপ্রবেশ এর সম্ভাব্য রাষ্ট্র হিসেবে ধরা হচ্ছে বাংলাদেশকে এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রাক-এনআরসি / সিএএ পর্বে সারা ভারতবর্ষের সর্বত্র এদেশি ওদেশি (প্রমাণিত হয়নি যে) সব বাঙালিকেই সন্দেহের চোখে দেখার বাতাবরণ সৃষ্টি করেছে এই দল।

পশ্চিমবঙ্গে তারা হুমকি দিয়েই চলেছে এবং প্রতিদিন হিন্দু আর হিন্দি আগ্রাসন বাড়িয়েই চলেছে। আসামে এনআরসি যতই ঘৃণ্য এবং অমানবিক পদ্ধতি হোক না কেন, সম্পন্ন হবার পরও আবার নতুন করে কেঁচে গণ্ডুষ করার ভয়, ঘাড়ের ওপর ডেমোক্লিসের খাঁড়ার মতই ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এনআরসি-র ভয় আর সিএএ-র টোপ ঝুলিয়েই রাখা হবে যতক্ষণ না বাঙালি হিন্দু এবং বাঙালি মুসলমান উভয়েই আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হয়। মনে করিয়ে দিই আসামে কিন্তু ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার এরকম বাড়বাড়ন্ত কোনও দিন ছিল না। আসুর আন্দোলনের অভিমুখ ছিল ভাষা সাম্প্রদায়িকতা।  

অসমীয়া রাজনীতিকদের তুরূপের তাস ছিল ভাষা সন্ত্রাস এবং বিদেশি বিতাড়ণ আন্দোলনও ছিল বাঙালি বিদ্বেষ আক্রান্ত। প্রথম তাতে বিষ মেশায় শায়র এবং উদার মনষ্ক, তথাকথিত নরমপন্থী বিজেপি নেতা অটলবিহারী বাজপেয়ী। ১৯৮৩-র  আসামে নেলীতে প্রায় ৩ হাজারেরও বেশি (বেসরকারি মতে ১০ হাজারেরও বেশি)  বাঙালি মুসলিম পুরুষ, মহিলা ও শিশুদের গণহত্যার আগে, এক বিশাল জনসভায় বাজপেয়ী ভাষণে বলেন, “বিদেশিরা এখানে এসেছে; এবং সরকার কিছুই করে না। এর পরিবর্তে তারা যদি পাঞ্জাবে চলে আসত, লোকেরা তাদের টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলে দিতো।” খুব নরম ভাষণ মনে হচ্ছে?  

এর পরেই ১৯৮৩ নির্বাচন বয়কটের ডাক দেয় আসু, বিজেপি সহ সমস্ত জাতীয়তাবাদী দল। ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও দাঙ্গার আবহে নির্বাচন হয়।মাত্র ৩২ শতাংশ ভোটাররা তাদের ভোট দিয়েছিলেন। অসমিয়ারা নির্বাচন বয়কট করে এবং সরকারি যন্ত্রপাতিগুলির বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে রাস্তা পরিবহন, যানবাহন এবং রেল ট্রেন চলাচল করতে দেওয়া হয়নি। হাজার হাজার লোক মিছিলের শোভাযাত্রা “ইণ্ডিয়ানস গো ব্যাক/ গো ব্যাক, গো ব্যাক” বলে শ্লোগান তোলে ।

এই নির্বাচনের প্রসঙ্গ উত্থাপনের একটাই উদ্দেশ্য। ভোট না দেওয়াটা বিজেপিকে প্রতিহত করার রাস্তা নয়। পার্সেন্টেজ অব ভোটিং সংসদীয় গণতন্ত্রে কোনও ছাপ ফেলেনা। আসামে ১৯৮৩ সালের ভোটে ৩২ শতাংশ ভোট পড়েছিল, কারণ বাঙালি, বড়ো ডিমাসা, কার্বি সহ বহু কমিউনিটি ভোট বয়কটে সার্বিকভাবে সামিল হয়নি। ১২৬টির মধ্যে চারটি বিধানসভা কেন্দ্রে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ঘোষিত হয়েছে।  ধেমাজী কেন্দ্রে বিজয়ী প্রার্থী পেয়েছে ২৩৭ আর বিজিত প্রার্থী ৭০ ভোট, ঢাকুয়াখানা কেন্দ্রে বিজয়ী প্রার্থী পেয়েছে ৫৮৭ আর বিজিত প্রার্থী ৩৫ ভোট, বিহুপুরিয়া কেন্দ্রে বিজয়ী প্রার্থী পেয়েছে ৪২৫ আর বিজিত প্রার্থী ১১ ভোট, শিবসাগর কেন্দ্রে বিজয়ী প্রার্থী পেয়েছে ৭০০ আর বিজিত প্রার্থী ২১০ ভোট, খুমটাই কেন্দ্রে বিজয়ী প্রার্থী পেয়েছে ৯৩৪ আর বিজিত প্রার্থী ৫৩ ভোট, টিটাবর কেন্দ্রে বিজয়ী প্রার্থী পেয়েছে ১৫৪০  আর বিজিত প্রার্থী ১৫১ ভোট,  গোলাঘাট কেন্দ্রে বিজয়ী প্রার্থী পেয়েছে ২২২২ আর বিজিত প্রার্থী ১৫৯ ভোট। এগুলি নমুনা মাত্র। এই কেন্দ্র গুলির সবকটাতে বিজয়ী কংগ্রেস আর বিজিত সিপিআই বা সিপিএম। এরকম বহু কেন্দ্র আছে। কতকগুলিতে বিজিত প্রার্থীরা নির্দল এবং ভোট পেয়েছে (তেজপুর) ৩৬৯, (নাওবৈছা) ২৪৭,  (টিওক) ৮৮, এমনকি (আমগুড়ি) ৭৬। পাশাপাশি বাঙালী অধ্যুষিত বরাক উপত্যকায় ভোট পড়েছে প্রচুর। শিলচর কেন্দ্রে বিজয়ী কংগ্রেস প্রার্থী পেয়েছে ২৮০৭৩ ভোট আর বিজিত নির্দল প্রার্থী  পেয়েছে ১২৯১৭ ভোট। হাইলাকান্দি কেন্দ্রে বিজয়ী কংগ্রেস প্রার্থী পেয়েছে ২১৬৬৬ ভোট আর বিজিত নির্দল প্রার্থী  পেয়েছে ১৭৩৯০  ভোট। করিমগঞ্জ উত্তর কেন্দ্রে বিজয়ী কংগ্রেস প্রার্থী পেয়েছে ২৫৭৯৫ ভোট আর বিজিত সিপিআইএম প্রার্থী পেয়েছে ১৫৭০১  ভোট। বদরপুর কেন্দ্রে বিজয়ী কংগ্রেস প্রার্থী পেয়েছে ২১২৩৬ ভোট আর বিজিত সিপিআইএম প্রার্থী  পেয়েছে ১৩৮৭৬ ভোট। ডিমাসা এলাকা হাফলং এ ভোট পড়েছে যথেষ্ট।  হাফলং কেন্দ্রে বিজয়ী  নির্দল প্রার্থী পেয়েছে ১৬৩১৩ ভোট আর বিজিত কংগ্রেস প্রার্থী  পেয়েছে ১১৮০০ ভোট। কার্বি অধ্যুষিত বাইথালাংসো কেন্দ্রে কংগ্রেস পেয়েছে ১৬৫২৩ আর বিজিত নির্দল প্রার্থী পেয়েছে ৪৫৭৫ ভোট। বোড়ো অধ্যুষিত কোকরাঝার পূর্ব কেন্দ্রে বিজয়ী কংগ্রেস প্রার্থী ভোট পেয়েছে ১৫২৯০ আর বিজিত পিটিসি প্রার্থী পেয়েছে ১৪৩৬৩। অর্থাৎ বিজেপি এবং অসমীয়া জাতীয়তাবাদী দলগুলির নির্বাচন বয়কটের ডাক অসমীয়া এলাকাগুলিতে কার্যকরী হলেও বাঙালি-ডিমাসা-কার্বি-বোড়ো এলাকায় কোনও প্রভাব ফেলেনি। ধর্মপুর কেন্দ্রে মোট ভোট পড়েছে ২৬৬। তার মধ্যে কংগ্রেস ২৬৬ আর নির্দল শূণ্য। অভিযোগ বহু কেন্দ্রে সিআরপিএফ যথেচ্ছ ভোট দিয়েছে। কিন্তু এই তীব্র বাঙালি বিরোধিতার খেসারত দিতে হয়েছিল বিজেপিকে ঠিক দু বছর পরের নির্বাচনে। সারা আসামে একটিও সিট পায়নি। ভোট পেয়েছিল ১.১ শতাংশ। 

আমি বলতে চাইছি বিজেপির ভূমিকা প্রথম থেকে শুধু মুসলিম বিদ্বেষীই নয়, বাঙালি বিদ্বেষীও। বিজেপির বাংলা দখলের স্বপ্ন আসলে বাঙালিদের উপর হিন্দি সাম্রাজ্যেবাদের আধিপত্যবিস্তার। আসাম দখল স্বপ্ন সফল হলেও আসামের বাঙালিদের চরিত্রগ্রাস করেও তার ভাষা-গ্রাস সম্পূর্ণ করতে পারেনি। এই নির্বাচন অতএব বিজেপির অশ্বমেধ ঘোড়ার গতিরোধ করার প্রতিরোধ সংগ্রাম। এখানে একটি মাত্র সরল রণনীতি। বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট। যাদের ভোট পরোক্ষে হলেও বিজেপিকে বাংলা ও বাঙালি দখলে সহায়তা করবে, তারা যে আদর্শে বিশ্বাস করেই ভোট দিন না কেন, বিজেপির সহায়ক শক্তি হিসেবেই কাজ করবে। ভোট না দিয়েও লাভ নেই কারণ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় বা মোট ২৩৭ ভোট পেলে বা বিরোধী প্রার্থী ০ ভোট পেলেও গণতন্ত্রে নির্বাচিত হতে কোনও অসুবিধে নেই। বিজেপি বিরোধী প্রার্থীরা নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি করে মরলো, আর তার ফলে  বিজেপি জিতে গেল, সেসব দলকে বাংলাভাষা ও বাঙালিজাতি কোনদিন ক্ষমা করবে না।

“বিজেপিকে ভোট নয়,” বল্লে আসলে কিছুই বলা হলো না। বলতে হবে এটা “বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট”। “ভোট এগেনস্ট বিজেপি।

[মতামত লেখকের নিজস্ব]

[আসন্ন নির্বাচন নিয়ে কী ভাবছেন? আমাদের কাছে নির্বাচন নিয়ে ৫০০ শব্দের মধ্যে লেখা পাঠান। লেখা পাঠানোর ঠিকানা: edeshaamar@gmail.com]

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on ভোট দিন বিজেপির বিরুদ্ধে – আসামে এবং বাংলায়

Leave A Comment