“পরিবেশ বিপর্যয় সভ্যতার বিলুপ্তি” স্লোগানে জলবায়ু ধর্মঘট পালিত হলো নৈহাটিতে

আজকের খবর গণ-আন্দোলন বিশেষ খবর রাজ্য

Last Updated on 4 weeks by admin

সন্তোষ সেন, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ :

পরিবেশ বিপর্যয়  সভ্যতার বিলুপ্তি  বিষয়টি সামনে রেখে ২৬ শে সেপ্টেম্বর, রবিবার  বিকেল চারটে থেকে রাত প্রায় নটা পর্যন্ত নৈহাটি জর্জ রোডে স্টেট ব্যাঙ্কের সামনে অবস্থান বিক্ষোভ  কর্মসূচি পালিত হয়। আয়োজনে “পরিবেশ বিষয়ক নাগরিক উদ্যোগ”। পরিবেশ রক্ষার দাবিতে আয়োজিত এই বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে ছিল প্রকৃতি পরিবেশ বিষয়ক লিফলেট, পোস্টার, ব্যানার, গান, কবিতা, আলেখ্য, নাটক। অনুষ্ঠান চলতে চলতে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা হলো বিপর্যস্ত পরিবেশের ওপর দুটি অসাধারণ অঙ্কনশিল্প। ছাত্র, শিক্ষক শিক্ষিকা, বিজ্ঞান ও পরিবেশ কর্মীরা মূল্যবান বক্তব্য রাখলেন।

বক্তব্য রাখেন কল্যাণী স্টাডি সার্কেলের পক্ষে বিজ্ঞান শিক্ষক ও পরিবেশ কর্মী সন্তোষ সেন, ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব ও পরিবেশ কর্মী অনিমেষ দত্ত এবং শুভ্রদীপ অধিকারী, পরিপ্রশ্ন পত্রিকার তরফে বিজন পাল, হালিশহর বিজ্ঞান পরিষদের প্রতিনিধি ও প্রকৃতিপ্রেমিক ত্রিদিব দস্তিদার প্রমুখ। দীর্ঘ সময় জুড়ে বক্তাদের মূল্যবান বক্তব্য থেকে যে নির্যাস উঠে এলো তা হল — পরিবেশের বিপর্যয় ও জলবায়ু পরিবর্তন আজ শুধু সিলেবাসের পাঠ্য বিষয় বা কিছু বিজ্ঞানকর্মীর উষ্মা প্রকাশ নয়। বিষয়টি স্থানীয় বা রাষ্ট্রীয় স্তর থেকে আজ আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যাপ্ত। সুতরাং আমাদের ভাবতে হবে অনেক বড় করে, গভীরে গিয়েই। আজকের পরিবেশ আন্দোলন শুধুমাত্র কিছু বৃক্ষরোপণ বা প্লাস্টিক বর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। আইপিসিসির ষষ্ঠ রিপোর্টের প্রতি ছত্রে ছত্রে যে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা প্রকাশ পেয়েছে তা বক্তারা প্রাঞ্জলভাবে তুলে ধরেন। একদিকে জীবাশ্ম জ্বালানির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, গ্লোবাল ওয়ার্মিং, তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা, দাবানল বায়ুদূষণ। অন্যদিকে হিমালয় ও মেরু প্রদেশের বরফের অতি দ্রুত গলন, সমুদ্র জলের উচ্চতা উষ্ণতা দূই’ই বেড়ে যাওয়া। যার হাত ধরে পৃথিবীর এক প্রান্ত যখন তীব্র দাবদাহে হাঁসফাঁস করছে, দাবানলে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে হেক্টরের পর হেক্টর বনাঞ্চল, দানবীয় ঝড়ঝঞ্ঝায় বিপর্যস্ত হচ্ছেন এক বড় অংশের জনগণ। ঠিক একই সময়ে অন্য প্রান্তের মানুষ মেঘ ভাঙ্গা বৃষ্টি, অল্পসময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি, বন্যা-প্লাবনে আক্রান্ত, যা দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতে বিভিন্ন প্রদেশেও।

বক্তাদের বক্তব্যে আরো উঠে আসে – তথাকথিত উন্নয়ন ও নগরায়নের নামে নির্বিচারে সবুজ বনানী ধ্বংস বন্ধ করতে হবে। কাদের জন্য এবং কিসের বিনিময়ে উন্নয়ন তাকে প্রশ্ন করতে হবে। প্রশ্ন করতে হবে এত শক্তির আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা। কর্পোরেটের স্বার্থে গাদাগাদা ভোগ্যপণ্যের উৎপাদন কতটা মানুষের স্বার্থে, মানুষের প্রয়োজনে এইসব প্রশ্নকেও সামনে আনতে হবে। আমাদের স্পষ্ট বুঝে নিতে হবে নিজেদের ও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুস্থ সুন্দর পরিবেশ, নির্মল আকাশ, দূষণহীন একটা পৃথিবী রেখে যাওয়ার জন্য আমাদের সকলকে সক্রিয় ভাবে এগিয়ে আসতে হবে। জীববৈচিত্র্য ও মানবসভ্যতাকে ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে বাজার-সর্বস্ব পণ্য উৎপাদনের জগত থেকে বেরিয়ে মানুষের ন্যুনতম প্রয়োজনভিত্তিক, সহযোগিতামূলক উৎপাদনের দাবি সামনে আনতে হবে। প্রকৃতির সাথে   মানুষের, সমাজ থেকে মানুষের বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠে আমাদের প্রকৃতি কেন্দ্রিক ভাবনায় জারিত হতে হবে, চিন্তার জগতে পরিবর্তন আনতে হবে, প্রকৃতির পুনরুদ্ধার ও পুনরুৎপাদনের কথা আমাদের ভাবতে হবে, আমাদের জোটবদ্ধ হতেই হবে। বিপর্যস্ত পরিবেশ মেরামতি দাবিতে বিশ্বজুড়েই লক্ষ লক্ষ ছাত্র ছাত্রী, যুবা বাহিনী বিজ্ঞান ও পরিবেশ কর্মীদের যে লড়াই আন্দোলন চলছে দীর্ঘদিন ধরে তাকে শক্তিশালী করতে আমাদের হাতটা বাড়িয়ে দিতেই হবে।

বক্তব্যের মাঝে মাঝে ছিল শিল্পী-সাহিত্যিক-কবিদের নানান বর্ণের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। পরিবেশ বিষয়ক একটি আলেখ্য পাঠ করলেন পরিপ্রশ্ন পত্রিকার তরফে শিক্ষিকা সুপর্ণা দে, একটি ইংরেজি কবিতা পাঠ ও পরিবেশ বিষয়ক কয়েকটি অনুভূতির কথা তুলে ধরল ছাত্রবন্ধু সৃজন সেন। সমবেতভাবে গান পরিবেশন করলেন অগ্নিবীণা সাংস্কৃতিক সংস্থা, হালিশহর সাংস্কৃতিক পরিষদ, নৈহাটি জুভেনাইল অ্যাসোসিয়েশন । জঙ্গল ছোড়াব নেহি—লড়াই ছোড়াব নেহি গানটি দীপ্তকণ্ঠে গাইলেন ছাত্রবন্ধু রিতেশ দাশ, রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করেন শিলা দেবনাথ।

অরণ্য সংরক্ষণ এই বিষয়ের ওপর একটি দুর্দান্ত প্রণবন্ত নাটিকা পরিবেশন করলেন পিএনএসি-এর কুশীলবেরা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলার পাশাপাশি শিল্পবিতান সংস্থার দুই ছাত্র ছাত্রী পরিবেশকে কেন্দ্র করে দুটো সুন্দর চিত্র আঁকল ক্যানভাস ভরে। সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিজ্ঞান আন্দোলনের বিশিষ্ট কর্মী, পরিপ্রশ্ন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক বঙ্কিম দত্ত।

উদ্যোক্তারা চেয়েছিলেন বিপর্যস্ত প্রাণ-প্রকৃতি পরিবেশকে পুনরুদ্ধার করার দাবিতে একটি যৌথ মঞ্চ গড়ে উঠুক। মূলত এন আই এস সি (নৈহাটি ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স এন্ড কালচার)-এর সদস্যরা করোনা সংক্রমণের প্রথম পর্বে  উদ্যোগটি শুরু করেন, সাথে যুক্ত হয় নৈহাটি, হালিশহর, কল্যাণীর বেশ কয়েকটি ক্লাব ও সংগঠন এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের নাগরিকরা। গড়ে উঠে “পরিবেশ বিষয়ক নাগরিক উদ্যোগ”। গতকালের অনুষ্ঠানটি ছিল এই উদ্যোগের প্রথম কর্মসূচি। অনেকগুলো সংগঠন, সংস্থা ও ব্যক্তি মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে হয় গেল যৌথ উদ্যোগ। উদ্যোক্তাদের বক্তব্য – “এই ধরনের উদ্যোগ ডালপালা মেলে বিকশিত হোক পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতেও।  জোট বাঁধি নিজেদের স্বার্থেই।”

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on “পরিবেশ বিপর্যয় সভ্যতার বিলুপ্তি” স্লোগানে জলবায়ু ধর্মঘট পালিত হলো নৈহাটিতে

Leave A Comment