সুন্দরবনে কমিউনিজম ও ক্যাপিটালিজমের সহাবস্থান

আজকের খবর পর্যালোচনা বিশেষ খবর মতামত

Last Updated on 6 months by admin

 

সুন্দরবনে কমিউনিজম ও ক্যাপিটালিজমের সহাবস্থান

          পার্থপ্রতিম মৈত্র               

 

পশ্চিমবঙ্গ সরকার  ২০০২ সালে সাহারা ইন্ডিয়া গ্রুপের সঙ্গে সুন্দরবনে যৌথভাবে একটি মেগা ট্যুরিজম প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছিল। এই মৌ স্বাক্ষরিত হয়েছিল সুন্দরবনকে বিশ্ব মানচিত্রে এক আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলার জন্য। সুন্দরবনে এই পাঁচ তারা মেগা ট্যুরিজম প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সাহারা মালিক সুব্রত রায় ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়। এর সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের দিকে নজর রেখে, অনেক আগেই সুন্দরবনকে একটি বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল এবং ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক “ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের” মর্যাদায় ভূষিত করা হয়েছিল।

তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শ্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে রাজ্য মন্ত্রিসভা সাহারা গোষ্ঠীকে এই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। প্রকল্পের প্রাথমিক আনুমানিক ব্যয় ছিল প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। সাহারার প্রকল্পটি বেশিরভাগ সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের বাফার এরিয়ায় অবস্থিত হওয়ার প্রস্তাব পাশ হয়েছিল। বলা হয়েছিল প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে হাজার হাজার মানুষের প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। এছাড়াও প্রকল্পটি আশেপাশের অঞ্চলে সামগ্রিক উন্নয়ন ঘটাবে বলে জানানো হয়েছিল। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি সূচনাপর্বেই স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম জন্য মাছ ধরার উপর নির্ভরশীল তাদের, জীবিকাতে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ হিসাবে সাহারা গ্রুপ, ২০০৩-২০০৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার জম্বুদ্বীপ দ্বীপ থেকে ১০,০০০ এরও বেশি সুন্দরবনের জেলেকে বহিষ্কার করেছিল। এছাড়াও সরকার এই অঞ্চলে মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। ফলস্বরূপ জেলেরা নিষেধাজ্ঞার কারণে মাছ ধরতে পারছিল না। সমুদ্রের তীরে মাছ শুকানোর কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, এবং সরকার দাবি করেছিল যে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।

সাহারা প্রকাশ্যে ২০০২-০৪ সময়কালে, সুন্দরবনের ইকোলজি সংরক্ষণের এর জন্য তাদের কমিটমেন্টের কথা জানায় এবং তারা এও জানায় যে তাদের মেগা-ট্যুরিজম প্রকল্পে, সুন্দরবন ডেল্টায় ৩৬০০০ বর্গকিলোমিটার জলভাগে বিশ্বব্যাপী পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে পাঁচটি কুমারী দ্বীপের ৭৫০ একর জমির ওপর এই পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে।দ্বীপগুলি হলো সাগর দ্বীপ, ফ্রেজারগঞ্জ, এল-প্লট, কৈখালী, এবং ঝড়খালী।জলের উপর- এই দখলদারীর প্রকল্পে ঘোষণা করা হয়েছিল,পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা হবে ৭৫%ভাসমান বোট হাউসে এবং ২৫% তীরবর্তী কটেজ, কেতাদুরস্ত কুঁড়েঘর এবং অবিশ্বাস্য আর দুর্দান্ত তাঁবুতে। অত্যাধুনিক অগ্নি প্রতিরোধ ব্যবস্থা, অত্যাধুনিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং ছোট, বড় জাহাজের জন্য একটি মাল্টি-ইউটিলিটি  উচ্চগতিসম্পন্ন ৩০ সিটের পাওয়ার ক্র্যাফ্ট ও একটি ভাসমান ক্লিনিক থাকবে। হেলিপ্যাড, মিনি-গল্ফ কোর্স এবং রকমারী জলক্রীড়ার ব্যবস্থা থাকবে। থাকবে ব-দ্বীপ মোহানার খাঁড়ি ঘুরে দেখার জন্য  উচ্চগতি সম্পন্ন বোট।

এটা আশ্চর্যের নয় যে বিজ্ঞানীরা এবং পরিবেশগত কর্মীরা পরিবেশের বিরুদ্ধে এই খোলাখুলি যুদ্ধ ঘোষণায় স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। সুন্দরবন ইকো-জোন তখন আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্ব ঐতিহ্যক্ষেত্র হিসাবে স্বীকৃত এবং সম্ভাব্য ধীরধ্বংসের মুখোমুখি। কিন্তু তখন শিল্পায়নের বৌদ্ধযুগ। পুঁজি বিনিয়োগ আর কর্মসংস্থানের নামে, আধুনিকীকরণের নামে, অন্য সমস্ত ট্র্যডিশ্যনাল উন্নয়নের ধারণাকে গুজরাট মডেলের যূপকাষ্ঠে বলি চড়িয়ে  বুদ্ধদেব ভেঙ্গে ফেলছেন প্রকৃতির যাবতীয় বিধান। পশ্চিমবঙ্গ সরকারেরদুমুখোনীতির ভয়াবহতা সনাক্ত করতে ব্যর্থ বা অস্বীকৃত কিছু উচ্ছিষ্টভোগী লোকের উচ্চকিত ঢক্কানিনাদে চাপা পড়ে যায়, ফ্লোটেল, উচ্চগতির পাওয়ারক্র্যাফ্ট এবং হেলিপ্যাডের বিরুদ্ধে প্রাচীন পরিবেশ সংরক্ষণের আলোচনা।প্রকল্পের জন্য পরিচালিত বিধিবদ্ধ গণশুনানি যথাযথ পাবলিক নোটিশ ছাড়াই করা হতো। বিভিন্ন পাবলিক ফোরাম এবং সিভিল সোসাইটি সংস্থাগুলির পক্ষ থেকে সরকারের সঙ্গে বহুবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তুসরকারের তরফে কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। গোটা বিষয়টি অস্বচ্ছতার পর্দা দিয়ে ঢাকা থাকতো। জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল ভূমি শনাক্তকরণ, সীমানা নির্ধারণ এবং জমির (পাট্টা) প্রত্যাহার করার মাধ্যমে।

হাজার হাজার ক্ষুদ্র কৃষক এবং জেলে কমিউনিটির লোকেরা আতংকে দিন গুণতে শুরু করেছিল। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের কাজে সুন্দরবনে ছবি তুলতে গিয়ে দেখেছি, দূরে সাহারা পরিকল্পিত দ্বীপে তটভূমি বাঁধাই করার ফলে এমব্যাঙ্কমেন্ট ভেঙ্গে জল ঢুকে পড়ছে জনবসতিতে। স্থানীয় বাসিন্দারা নির্দ্বিধায় দায়ী করছে সাহারা প্রজেক্টকে। বলছিল উন্নয়ন চাইনা, সাহারা হটাও। স্থানীয় জনগণ, জাতীয়-আন্তর্জাতিক পরিবেশ কর্মী, বিজ্ঞানী আর সিভিল রাইট মুভমেন্ট এর অগ্রণী বাহিনীর সর্বব্যপ্ত প্রতিরোধের ফলে একটা সময়ে সরকার বাধ্য হয় সাহারা প্রকল্পটি শেলভ করে দিতে। তবে এটি সরকারীভাবে বাতিল করা হয়নি। ফলে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়ে গেছে। কেননা সুন্দরবন মেগা ট্যুরিজম প্রজেক্ট একটি অতি লোভনীয় মুনাফা আকর্ষণ স্কিম।

আজও বড় বিনিয়োগকারীরা অপেক্ষা করছেন। সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা বেঙ্গল-অম্বুজার মতো সরকারী স্নেহধন্য কর্পোরেট হাউস। ঐ প্রকল্পের প্রধান কুশীলব সুব্রত রায় দীর্ঘদিনের সফরে জেলযাত্রায় গেলে, বঙ্গ জনতা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। অন্য কুশীলব বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য চিরতরে না হোক বহুদিনের তরে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়। মধ্যবর্তী সময়ে জনতা অবলোকন করে কমিউনিজম ও ক্যাপিটালিজমের এক অদ্ভূত প্রেমজ সম্পর্ক। পারষ্পরিক সহযোগিতায় সহাবস্থান।

 

কেউ যদি ফিরাযাত্রায় যেতে চান, তবে আর একটু পিছিয়ে যেতে হবে। যখন পশ্চিমবঙ্গকে বৃহৎ পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দেবার পরিকল্পনা সবে শুরু হয়েছে, সেখানে ফিরে গিয়ে দেখতে হবে, বৃদ্ধ-ধৃতরাষ্ট্রকে তোল্লা দিয়ে প্রমোদ দাসগুপ্তের পঞ্চপাণ্ডব কেমনভাবে নিলামে তুলছে রাজ্যকে। পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ সুন্দরবনকে। সাগর দ্বীপের উত্তরে অবস্থিত কুলপি কিন্তু সুন্দরবনে পড়ে না। তবে সুন্দরবন সংলগ্ন কুলপিতে যে কোনও মারাত্মক পরিবেশগত সমস্যা সুন্দরবনের ইকোলজি এবং জীবন-জীবিকার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে বাধ্য।

 

সব জেনেশুনেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং মুকান্দ-কেভেন্টার কনসোর্টিয়াম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস (মুকান্দ গ্রুপ) দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার কুলপিতে হুগলি নদীর পূর্ব তীরে একটি বন্দরভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার জন্য ১০ জানুয়ারী, ১৯৯৭ সালে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে।কলকাতা থেকে মাত্র ৭৮ কিলোমিটার দূরে যার অবস্থান।

বিস্তৃতভাবে তৈরী করা এই মূল-পরিকল্পনায় দাবি করা হয়েছিল, কুলপি অর্থনৈতিক অঞ্চলটিকে একটি আধুনিক, সব ধরণের আবহাওয়াবিশিষ্ট  বন্দর পত্তনেরর উপযুক্ত, পরিবেশ-বান্ধব, শিপ-ব্রেকিং-ইয়ার্ড এবং একটি ইনডাস্ট্রিয়াল পার্কের সমন্বয় কেন্দ্র (ইন্টিগ্রেটেড হাব) হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল বন্দর ট্র্যাফিকের উন্নতিতে প্রস্তাবিত শিল্প কমপ্লেক্সটি অনেকটা পথ পাড়ি দিতে পারবে কারণ কমপ্লেক্সটিতে মূলত বন্দরভিত্তিক শিল্পই থাকবে। বন্দরটি ৩০০০ হেক্টর জমির উপর নির্মিত হবে। কুলপি শিল্প পার্কের জন্য প্রয়োজন ৫০০০ হেক্টর জমি। দেবে রাজ্য সরকার। এই বন্দরের মসৃণ কার্যক্রমের জন্য কলকাতা বন্দর ট্রাস্টের সাথে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রকল্পের ব্যয় প্রাথমিকভাবে ধরা হয়েছিল ৯২৫ কোটি টাকা। মনে রাখতে হবে শিপ ব্রেকিং এখনও পর্যন্ত পৃথিবীর সর্বাধিক দূষিত শিল্পগুলির মধ্যে একটি।   এবং শিল্পবান্ধব শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড গড়া একটি অবাস্তব পরিকল্পনা।

স্বাভাবিক কারণেই পরিবেশ বিজ্ঞানী ও পরিবেশ কর্মীদের সঙ্গে স্থানীয় জনগণ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। বায়ু, জল ও মাটির তীব্র দূষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ শুরু হয়। মাছধরার কাজ প্রভাবিত হবে, এবং মূল প্রজেক্টের কাজ সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করবে এই আশংকায় বিরোধিতায় সামিল হয় স্থানীয় থেকে আন্তর্জাতিক মহল। মনে রাখতে হবে পরবর্তী এক দশকের ও বেশী সময় ধরে এই ধরণের বহু প্রজেক্ট মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেছে যেগুলির অ্যাকিলিস হিল ছিল একদিকে অস্বচ্ছতা, গোপনীয়তা, অন্যদিকে অগণতান্ত্রিকতা ও ঔদ্ধত্য । প্রতিটি প্রকল্পই স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আলোচনা না করে তাদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেবার বাম প্রবণতা। এক দশকেরও বেশী সময় ধরে এই ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছে , সিঙুর বা নন্দীগ্রাম সেই অগ্নুৎপাতের লাভা বিষ্ফোরণ মাত্র।

 

পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যমণি পাণ্ডব বাংলার আকাশের উজ্জ্বলতম লাল তারা হতে হতেও হলেন না। জনশ্রুতি বলে, চন্দ্রবিন্দুর এই গানটি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কে লক্ষ্য করেই রচিত।“তব মুকুট পড়িল পদতলে, হায় একি দশা……”

 

  • এই বিভাগে মতামত লেখকের নিজস্ব
Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on সুন্দরবনে কমিউনিজম ও ক্যাপিটালিজমের সহাবস্থান

Leave A Comment