“মিত্রোঁ পুঁজিবাদ” ও বাজেট

মতামত সবচেয়ে জনপ্রিয়

Last Updated on 7 months by admin

প্রণব কান্তি বসু

প্রায় সব অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতের সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে মোদী সরকার অতিমারির সময় এবং এবার বাজেটে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির পথে না হেঁটে ব্যক্তিগত পুঁজিকে নানারকম সুবিধা দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে। ফলে, অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনের যতই গল্প সরকার ফাঁদুক না কেন, অর্থনীতির বেহাল অবস্থা থেকে আশু পরিত্রাণের কোন আশা নেই। কিন্তু, সাধারণের এই দুর্দিনে বিজেপি সরকারের মিত্র পুঁজিপতিদের আচ্ছে দিন অব্যাহত থাকবে, যেমন ছিল অতিমারীর মধ্যেও। সাধারনের দুর্দশা নিয়ে বিজেপি বিব্রত নয়; সুদিনের মিথ্যা প্রচার তারা অবলীলায় করতে পারছে কারণ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের বিপরীতে বিজেপির জনসমর্থন অর্থনৈতিক সাফল্যের ওপর নির্ভর করে না। তা অনেক বেশি নির্ভর করে ধর্মীয় মেরুকরণের ওপর।

ব্রাহ্মণ্যবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ক্ষমতাবলে এই সরকার রাষ্ট্রতন্ত্রের ক্ষেত্রে যেমন বুর্জোয়া গণতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখার সমস্ত নিয়ম রীতি উল্লঙ্ঘন করে ক্রমশ দেশে একটি স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দিকে এগোচ্ছে, তেমনই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দেশে crony capital (অনুবাদে মিত্রোঁ পুঁজি)-এর দখল ঘনীভূত করতে সহায়তা করছে। মিত্রোঁ পুঁজিপতিদের উন্নতি কেমন হচ্ছে দেখা যাক। মুকেশ আম্বানির সম্পদ ২০১৪ থেকে ২০১৯-এর মধ্যে দ্বিগুণ হয়। আদানির সম্পদ চারগুণের বেশি বৃদ্ধি পায়। বাবা রামদেবের ছয় গুণের বেশি মাত্রায় বেড়ে তাকে নগণ্য এক ব্যবসাদার থেকে দেশের প্রথম ২০ জন ধনীর মধ্যে নিয়ে যায়। এর পাশাপাশি মনে রাখতে হবে যে অতিমারীর আগেই আমাদের দেশের বেকারের হার ছিল ৪৫ বছরে সব চেয়ে বেশি। অসংগঠিত ক্ষেত্রে যারা কাজ করে এবং সংগঠিত ক্ষেত্রে যারা অনিয়মিত কাজ করে তারা মিলে মোট শ্রমিকের ৮৫%। এরই একাংশ অতিমারীর সময় শত শত মাইল হেঁটে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করেছে, ট্রেনে কাটা পড়েছে, না খেয়ে মরেছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত oxfam-এর একটি প্রতিবেদনে (The Hindu, NEW DELHI, JANUARY 25, 2021 11:58 IST) বলা হয়েছে যে ১০০ কোটি টাকার বেশি সম্পদের অধিকারী ভারতীয়দের লকডাউনের মধ্যে সম্পদ ৩৫% বৃদ্ধি পেয়ে ৩ লক্ষ কোটিতে দাঁড়ায়। এর মধ্যে সবচেয়ে ধনী ১০০ জনের সম্পদ এতটাই বৃদ্ধি পায় যে তা যদি আমাদের দেশের ১৩৮০ লক্ষ গরীবদের মধ্যে বণ্টন করা হত তা হলে প্রত্যেকে ৯৪,০৪৫ টাকা ক’রে পেত।

মুকেশ আম্বানি নিজেকে এশিয়ার সবচেয়ে ধ্বনি ব্যক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। লকডাউনের বাজারে প্রতি ঘণ্টায় সে আয় করেছে ৯০ কোটি টাকা। শুধু তার একার সম্পদ যতটা বেড়েছে তা যদি অসংগঠিত শ্রমিকদের মধ্যে বিতরণ করা হত, তা হলে ৪০ কোটি অসংগঠিত শ্রমিকদের অন্তত পাঁচ মাস দারিদ্র্যের হাত থেকে বাঁচানো যেত। ILO এবং ADB সমীক্ষা অনুসারে ভারতে কোভিডের কারণে ৪১ লক্ষ যুবক কাজ হারিয়েছে।  ১৯২০-২১ অর্থ বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ২৩.৯% এবং দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে ৭.৫% কমেছে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে বাজেটে সরকারি ব্যয় বাড়ানো হবে – এটাই ছিল সাধারণ প্রত্যাশা।

মন্দা থেকে মুক্তির পথ সম্বন্ধে অর্থনীতিতে দুটি প্রচলিত মত আছে। কেইন্সীয় মত বলে পরিত্রাণের উপায় সরকারি ব্যয় ও নিয়োগ বৃদ্ধি। এর বিরুদ্ধ মত – ক্লাসিকাল অর্থনীতির – সরকারের উচিত শুধু ব্যক্তিগত পুঁজিবাদী উদ্যোগগুলিকে বিনিয়োগের বাড়তি উৎসাহ দেওয়া, কর কমিয়ে, সস্তায়  ঋণ যোগানের ব্যবস্থা করে। কিন্তু ২০০৮ সালের বিশ্বব্যাপী অর্থ এবং সম্পদ বাজারে সঙ্কট থেকে উদ্ভূত মন্দার পর থেকেই সমস্ত প্রতিষ্ঠিত অর্থনীতিবিদই একমত হয় যে বড় মন্দার মুখে কেইন্সীয় নীতি পরিত্রাণের একমাত্র পথ। বাজেটে কেন্দ্রীয় সরকার কি করল?

সরকার তার মোট ব্যয় ৩৪,৫০,৩০৬ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৪,৮৩,২৩৬ কোটি করল। অর্থাৎ, টাকার অঙ্কে ১%-এরও কম।মূল্য বৃদ্ধির হার যদি কমিয়ে ৩% ধরি, তাহলে প্রকৃত ব্যয় ২% থেকে বেশি হারে কমানো হবে বলে সরকারের ঘোষণা। ঘাটতি ব্যয় (সরকারের আয়ের অতিরিক্ত ব্যয়, যা নোট ছেপে বা ধার করে পূরণ হয়) যা দিয়ে কেইন্সীয় মতে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা যায়, ১৮,৪৮,৬৫৫ কোটি থেকে সরকারের প্রস্তাব অনুসারে কমিয়ে করা হবে ১৫,০৬,৮১২ কোটি টাকা। অর্থাৎ, টাকার অঙ্কে প্রায় ২৩% হ্রাস; প্রকৃত হিসাবে (৩% মূল্য বৃদ্ধি ধরলে) ২৬%-এর বেশি। এত বড় একটা অতিমারী যখন সারা বিশ্ব এবং আমাদের দেশেরও সরকারি স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর অপ্রতুলতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, তখন সাধারণ প্রত্যাশা থাকে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের বিপুল বৃদ্ধির। বাজেটে নানা হিসাবের কারচুপি করে সরকার দাবি করছে যে বরাদ্দ ১৩৭% বাড়ানো হয়েছে। অন্যান্য খাতের খরচ, যা সরকার চালাকি করে স্বাস্থ্য খাতে ঢুকিয়ে এই হিসাবটায় পৌঁছেছে, তা যদি বাদ দি তা হলে দেখা যায় যে বাস্তবে ব্যয় কমেছে ৭৮৮৩ কোটি টাকা। এমন কি ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প, যা দিয়ে অতিমারীর সময় কর্মচ্যুত, দরিদ্রদের কিছুটা আর্থিক সহায়তা করা গিয়েছিল, সে খাতেও বরাদ্দ কমেছে ৭৩০০০ কোটি টাকা। ব্যয়ের খরার মধ্যে নির্বাচনমুখী বাংলা, কেরালা, তামিলনাড়ু, আসামের জন্য শুধু রাস্তা তৈরির খাতে মোট ১,৯৬,৪০০ কোটি টাকা অবশ্য আলাদা করে ঘোষণা করা হয়েছে।এ ছাড়া অন্যান্য খাতেও এই রাজ্যগুলির জন্য আলাদা অর্থ বরাদ্দ ঘোষণা আছে!

অবশ্য, আগেই যেমন উল্লেখ করেছি, সরকারের ব্যয় না বাড়িয়ে বৃহৎ পুঁজিপতিদের সুবিধা দেওয়ার প্রবণতা অতিমারীর সময় থেকেই লক্ষ্য করা যায়। IMF Fiscal Monitor, 2020-তে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মধ্যম আয় বর্গের ১৯ টি দেশের মধ্যে, কোভিড মোকাবিলায়, মোট  GDP-র অনুপাত হিসাবে সরকারি ব্যয়বৃদ্ধির বিচারে ভারতের স্থান তলা থেকে চতুর্থ। আর আর্থিক ঋণ বৃদ্ধির মাপে ওপর থেকে তৃতীয়। ভারত মোট GDP-এর মাত্র ২%-মত সরকারি ব্যয়বৃদ্ধি করে, যেখানে থাইল্যান্ড, ব্রাজিল, চিলি, ইত্যাদি ৮%- এর মত ব্যয় বৃদ্ধি করে। ব্যক্তিগত সংস্থাকে ভারত সরকার ঋণ, ইত্যাদির মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেয় GDP-এর ৫%-এর মত।

অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক দুর্যোগের মোকাবিলায় সরকারি নীতি হতাশাজনক তো বটেই, তবে সঙ্ঘ পরিবারের রাজনৈতিক প্রকল্পের সঙ্গে মানানসইও বটে। এর থেকে অবশ্যই মোদী সরকার এবং তার সহায়ক দেশি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাদের বিজ্ঞাপিত দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন সম্ভব নয়, তবে তার ফলেই যে এই একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটবে এমনও ভাবার কারণ নেই কারণ এদের ক্ষমতার উৎস ধর্মীয় মেরুকরণ।

(লেখক বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক)

[মতামত লেখকের নিজস্ব ]

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
No Thoughts on “মিত্রোঁ পুঁজিবাদ” ও বাজেট

Leave A Comment