ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণায় দানিশ সিদ্দিকী

আজকের খবর বিশেষ খবর মতামত

Last Updated on 2 months by admin

ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণায় দানিশ সিদ্দিকী

তানিয়া সরকার

 

আজ ১৮ই জুলাই, এখন রাত ১১.২৮। কাজ শেষ করে ফেসবুক লগইন করে যে ছবিটা টাইমলাইনে উঠে এলো, সেটা একটা কফিনের ছবি। অসংখ্য মানুষের ভিড়ের মাঝে একখানা কফিন। মুহূর্তের মধ্যে বুকটা কেঁপে উঠলো। বুঝতে অসুবিধা হলো না  ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ চিত্রসাংবাদিক দানিশ সিদ্দিকীর মৃতদেহ এসে পৌঁছেছে এবং হাজার হাজার মানুষের কাঁধে চেপে সে চলেছে অন্তিমযাত্রায়। গত দুই দিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে ছিল দানিশ। আর থাকবে নাই বা কেন? দুইবছরের বেশি সময় ধরে ও আসলে নিজের ও আশেপাশের দেশগুলোর পঙ্গু গনতন্ত্রের চিত্রটা নিরলসভাবে আঁকছিলো।   আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে  উঠে আসছিলো নিজের কাজের মধ্যে দিয়ে। ছবির প্রতি ভালোবাসা ও দিনবদলের যে দায়ভার ও নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল, শেষ যাত্রায় অসংখ্য মানুষের উপস্থিতি ও ফ্ল্যাশের ঝলকানি তাই আমাদের অবাক করলো না। দিল্লি থেকে অনেক দূরে বসেই তাই শেষ শ্রদ্ধা জানাতে হচ্ছে স্বল্প চেনা এই মানুষটিকে। শুধু বুকের ভিতর একটা দীর্ঘ ঠান্ডা অনুভূতি আর গভীর শূন্যতার শব্দ।

বাদামি-নীল রঙের চেক শার্ট টাক-ইন করে পরা, সযত্নে আঁচড়ানো চুল, থুতনির নিচে স্বল্প কাঁচা-পাকা দাঁড়ি। মুখে স্মিত হাসি। এইভাবেই প্রথম আলাপ গতবছর থমসন রয়টার্সের দিল্লি অফিসে। সেই শেষবার আমার ওর সাথে দেখা হওয়া। বাকি সবটুকু  কথা ই-মেইল ও ওয়্যাটাস অ্যাপে। হ্যান্ডশেক শেষ করে হাতে স্যানিটাইজার ঘষে নিয়ে, একপ্রকার হাসতে হাসতেই আমাদের কথাবার্তা শুরু। পারস্পরিক সৌজন্য বিনিময় শেষে কফি খেতে খেতে ছবি বিষয়ক আলোচনা। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো এটি ২০২০-র মার্চ মাসের কথা অর্থাৎ দিল্লি দাঙ্গার পরবর্তী সময়। ২০১৯ থেকে আমাদের যোগাযোগ শুরু, একটি ফেলোশিপ প্রোগ্রামে ও আমার মেন্টর ছিলো কিন্তু এই প্রথম দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ। ধীর-স্থির চেহারার এই মানুষটিকে দেখে বোঝার চেষ্টা করছিলাম কোন মন্ত্রবলে ফিল্ড থেকে ছবিটা তুলেই ভ্যানিশ হয়ে যায় এই মানুষটি। ঠিক যেভাবে আজ হঠাৎ করেই চলে গেলেন! মুহূর্তের মধ্যে ফিল্ড ছেড়ে এইভাবে যাওয়াতো একপ্রকার অস্বাভাবিক। ঠিক যেভাবে ওর মৃত্যুটাও! এইতো সেদিন কত ভারি ভারি আলোচনা হলো, আজ কিভাবে চিরনিদ্রায় শায়িত? আসলে এত অভিজ্ঞতার পরেও আমরা মৃত্যুর পার্টটা কিছুতেই মুখস্থ করতে পারলাম না!

কলকাতায় বসে এই লেখা যখন লিখছি তখন ওকে সমাধিস্থ করার কাজ চলছে দিল্লিতে। বারবার মনে হচ্ছে, ওর মুখে কি এখনো সেই স্মিত হাসি লেগে আছে? ঠান্ডা মাথার বিচক্ষণ মানুষটির মুখের হাসিটা কি পরিতৃপ্তির? নাকি এতোটা পথ পেড়িয়ে কাছের মানুষ, প্রিয় সন্তান, স্বপ্নের দেশ ও অসংখ্য ভক্তের কাছে পৌঁছাতে পেরে খানিকটা ক্লান্ত ও? যুদ্ধে আফগানিস্তানের কান্দাহারে মারা গেলেও শেষ একবছরের বেশি সময় ধরে আমরা কি যুদ্ধের  মধ্যেই ছিলাম না? ওর নিজের দেশেও তো যুদ্ধ! অথবা আরো অনেক বেশি সময় ধরে আরো অনেক যুদ্ধ পেড়িয়ে সফলতার উচ্চতায় পৌঁছাতে হয়েছে এই চল্লিশ বছরের জীবনে। আসলে সফলতা ও স্বীকৃতির চাপে ব‌্যক্তিগত সংগ্রামগুলো উপেক্ষিতই।

ঘন্টা আড়াইয়ের আলাপচারিতার বেশীরভাগ জুড়েই আমার তোলা ছবি দেখা, মতামত দেওয়ার পাশাপাশি যেটা সবথেকে বেশি ছিল সেটা আমাদের দেশে আপদকালীন পরিস্থিতিতে মহিলারা কিভাবে নিরাপত্তার সাথে কাজ করবেন। কিভাবে আরো অনেক বেশি সংখ্যক মহিলারা এই পেশায় এগিয়ে আসতে পারেন। হিন্দুত্ববাদের জিগির আরো  কিভাবে স্বতন্ত্র সাংবাদিকদের অধিকার খর্ব করবে তা ভাবতে ভাবতে দানিশকে সেদিন অসহায়ই লাগছিলো। তবু ছবি দেখতে দেখতে একসময় বললেন, ‘ You have taken some intense portraits of women.. You should think about your safety first. But certainly, you have made riots an art!’। অস্বস্তিতে জানতে চাইলাম- এটা প্রশংসা নাকি লজ্জার বিষয়। সত্যি কথা বলতে আমি কিছুটা কনফিউজড হয়ে গেছিলাম। মুহূর্তের মধ্যে উত্তর দিয়েছিলেন, ” We, photojournalists are important to capture the moment to reveal what exactly is happening. We need the people like you who spent a long-time with the people to listen to their pain and to photograph them to make an intense body of work” ।

অজানা শহরে দাঙ্গাকালীন পরিস্থিতিতে কিছু না জেনে, কোনো প্রতিষ্ঠানের ছত্রছায়া ছাড়া যে অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে তা ওকে ভাবিয়েছিল। কিছুটা বকা দেওয়ার পাশাপাশি সাহসিকতার কথাও বলেছিলেন বারংবার। আসলে সাহসিকতাতো ওর নিজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আর সেই সাহসিকতাই বারবার ধরা পরেছে ওর  লেন্সে। সাম্প্রদায়িক ভারতের ঘৃণিত রূপ, মাইলের পর মাইল ক্ষুধার্ত পরিযায়ী শ্রমিকের বাড়ি ফেরার নির্মম চিত্র এবং করোনা কালে গোটা দেশের কার্যত মৃত্যুপুরীতে পরিণত হওয়ার ‘বার্ডস আই ভিউ’  আসলে নিপাট সাহসিকতা যা একবিংশ শতকের ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রসাংবাদিককে কান্দাহার পর্যন্তও টেনে নিয়ে গেল। পেশাগত দায়বদ্ধতা, প্যাশান, নিরাপত্তা সব জল্পনার উর্ধ্বে এই মুহূর্তে দানিশ। প্রিয় সন্তান, স্ত্রী, সহকর্মী, বন্ধু এবং ভক্তদের ছেড়ে যেতে যেতে ইতিহাস সৃষ্টি হচ্ছে যার মাপকাঠি পুলিৎজার না, যা  ক্লান্ত  বাবার কাঁধে চেপে সন্তানের বাড়ি ফেরার পথটুকু নিশ্চিত করে। হ্যাঁ, দিনবদলের স্বপ্নে । একইসাথে হিন্দুত্ববাদ ও তালিবানের চোখে চোখ রেখে বলে যায়,

“যত বড়ো হও, তুমি তো মৃত্যুর চেয়ে বড়ো নও। আমি মৃত্যু-চেয়ে বড়ো এই শেষ কথা বলে, যাব আমি চলে।”

 

  • তানিয়া সরকার  – স্বাধীন চিত্র সাংবাদিক
  • চিত্রগ্রহণ করেছেন তানিয়া সরকার নিজে
Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
One Thought on ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণায় দানিশ সিদ্দিকী
    আশিস নবদ্বীপ
    20 Jul 2021
    12:31am

    খুব ভালো লাগলো। আপনার কাজ কিভাবে দেখতে পারি জানাবেন।

    0
    0

Leave A Comment