“কাজের দাবীতে লড়াই করতে এসেছি, ভিক্ষা করতে নয়” – স্কুল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগে ধর্ণায় হবু শিক্ষক-শিক্ষিকারা

আজকের খবর গণ-আন্দোলন বিশেষ খবর রাজ্য

Last Updated on 1 month by admin

অনিমেষ দত্তের প্রতিবেদন, কলকাতা, ২১ অক্টোবর,২০২১ :

উৎসবের মরশুমে আলোর ঝলকানিতে কতো যে আর্তনাদ চাপা পড়ে যায় তার ইয়ত্তা নেই। সেই আর্তনাদ নিয়ে কারুর কোনো মাথা ব্যথাও থাকে না। সেই চাপা পড়ে থাকা ভাষ্যের একটি হলো স্কুল সার্ভিস কমিশন (এস.এস.সি)-এর চাকুরীপ্রার্থীদের। গত ছয়দিন ধরে এস.এস.সি চাকরীপ্রার্থীরা আবার অবস্থান আন্দোলনে।

‘আবার’ বললাম কেন তার কারণ আছে। এই চাকরীপ্রার্থীরা সকলেই ২০১৬ সালে স্কুল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা স্টেট লেভেল সিলেকশন টেস্ট (এস.এল.এস.টি) দিয়ে মেধা তালিকায় এসেছিলেন। ২০১৬ সালেই প্রথম এস.এল.এস.টি পরীক্ষা হয়।  নবম শ্রেনী থেকে দ্বাদশ শ্রেনী পর্যন্ত শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগের এই পরীক্ষায় প্রথমবারই দেখা যায় ব্যাপক হারে ‘দুর্নীতি’। অনেকে পরীক্ষা না দিয়েই চাকরি পেয়ে যায় বলে অভিযোগ। এমনকি মেধা তালিকায় বাকিদের তুলনায় পিছনে থাকা সত্ত্বেও অনেকে চাকরি পায় অথচ মেধা তালিকায় উপরের দিকে থাকা চাকরীপ্রার্থীরা বঞ্চিত হয় – এমনই অভিযোগ উঠে এসেছে বারবার। তারপরই প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বারবার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চিঠি দিয়ে, দেখা করেও সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। শেষমেশ ২০১৯ সালে ২৮ ফেব্রুয়ারী থেকে কলকাতার প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান অনশনে বসেন বঞ্চিত চাকরি প্রার্থীরা।

একটানা ২৯ দিন অনশন আন্দোলন চলার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে অনশন মঞ্চে এসে স্বীকার করে নেন দুর্নীতি ও এস.এস.সি র শিক্ষক নিয়োগে অস্বচ্ছতার কথা। সামনে লোকসভা নির্বাচন থাকায় এবং মুখ্যমন্ত্রীর মৌখিক প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে সেই সময়ের জন্য অনশন আন্দোলন প্রত্যাহার করেন আন্দোলনকারীরা। মুখ্যমন্ত্রী সর্বসমক্ষে প্রতিশ্রুতি দেন যে লোকসভা নির্বাচনের পরে জুন মাসের মধ্যে স্বচ্ছ ভাবে সমস্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন।

এরপর জল অনেকদূর গড়িয়েছে। আন্দোলনকারীরা বহুবার রাস্তায় নেমেছেন। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে লাগাতার গিয়ে চিঠি দেওয়া, দেখা করার পরও এর কোনো সুরাহা হয়নি। বিকাশ ভবন, নবান্ন, কালীঘাট, আচার্য্য সদন সব জায়গায় গিয়ে আন্দোলনকারীরা একটাই উত্তর পেয়েছেন “আমরা ব্যাপারটা দেখছি”। আবার কখনও এই দপ্তর থেকে ওই দপ্তর ঘোরানো হয়েছে। চাকরি প্রার্থীরা বাধ্য হয়ে সেন্ট্রাল পার্কের ৫ নং গেটের সামনে ১৮৭ দিনের দীর্ঘ অবস্থান বিক্ষোভ ও রিলে অনশন করেছেন। কোভিড অতিমারীর সময়পর্বে পথে আন্দোলন করতে গেলে রাজ্য প্রশাসন বাধা দিয়ে আন্দোলনকারীদের বারবার জানিয়েছে যে “এখন কোভিড প্রোটোকল মেনে এইসব করা যাবে না। অবস্থা ঠিকঠাক হলে তারপর আমরা দেখব আপনাদের বিষয়টি।”

“অবস্থা ঠিকঠাক” হয়েছে কি না জানা নেই। কারণ বিধানসভা নির্বাচন, উৎসব, সরকারি বেসরকারি অনুষ্ঠান, বড়ো বড়ো জমায়েত সবই হয়েছে ‘কোভিড’ অতিমারী পর্যায়ে। আর এস.এস.সি চাকরীপ্রার্থীদের জমায়েতে বারবার নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়েছে।

এরপরে আর কোনো রাস্তা না পেয়ে শেষমেশ কলকাতার ধর্মতলায় গান্ধী মুর্তির পাদদেশে অবস্থান আন্দোলন শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আন্দোলন কারীরা। অবস্থানের জন্য ময়দান থানা, লালবাজার হেড কোয়ার্টারকে চিঠি দিয়ে অনুমতি চাইলেও মেলেনি সদুত্তর। কোভিডের জুজু দেখিয়ে বলা হয়েছে “এখন আমরা পারমিশন দিতে পারব না”। তারপর শেষমেশ আদালতের দ্বারস্থ হন আন্দোলনকারীরা। আদালত থেকে গান্ধী মুর্তির পাদদেশে অবস্থান করার অনুমতি পাওয়া যায় – কোভিড রীতি মেনে অত্যন্ত কম জমায়েত করে।

চাকরীপ্রার্থী আন্দোলনকারী রাজশ্রী দাসের সাথে কথা বলতে গিয়ে উঠে এসেছে ভয়ংকর কিছু তথ্য। তিনি জানাচ্ছেন, “আন্দোলনকারীদের সাথে কথোপকথনে সরকার পক্ষ জানিয়েছিল যে আন্দোলনকারীদের তরফ থেকে ৫ জন ও সরকারের তরফ থেকে ৫ জন প্রতিনিধি মিলে একটা কমিটি গঠন করা হয়েছিল যেখান থেকে এই সমস্যার সুরাহা করা যায়। ঘটনাচক্রে আন্দোলনকারীদের ৫ প্রতিনিধিরা মেধা তালিকায় পিছনে থাকা সত্ত্বেও তারা চাকরি পেয়ে যায়। শুধু তাই নয় তাদের নিকট আত্মীয়রাও পরীক্ষা না দেওয়া সত্ত্বেও চাকরী পেয়ে গেছেন।“

“বর্তমানে সেই প্রতিনিধিদের কিছু জিজ্ঞেস করা হলে তারা বাকি আন্দোলনকারীদের হুমকি দিয়ে বলেন, ‘যা পারিস করে নে, সরকারের হাতে আছে বিষয়টা। আমরা তোদের ওপেন চ্যালেঞ্জ করছি’ ইত্যাদি। আন্দোলনরত চাকরিপ্রার্থীদের কথায় উঠে এসেছে যে সরকার আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের এক অর্থে কিনে নিয়ে সেইসময় আন্দোলনটাকে বন্ধ করিয়ে দেয়। ৫ প্রতিনিধি যাঁরা ছিলেন,  ‘যুবছাত্র মঞ্চের’ সভাপতি ইনসান আলী, রাকেশ প্রামাণিক, হাফিজুল গাজী, তানিয়া শেখ, অর্পিতা দাস। এনারা আজ বহাল তবিয়তে চাকরী করছেন।

“আমরা পরীক্ষায় পাশ করে চরম অপরাধ করে ফেলেছি! অথচ যারা পরীক্ষায় পাশ করেনি, তারা আজ শিক্ষকতা করছে”, রাজশ্রী দাস জানিয়েছেন।

“ওয়েবসাইটে নোটিফিকেশন ছাড়াই মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠিয়ে কাউন্সিলিং এর কথা জানানো হয়েছে। কোনো রকম স্বচ্ছতা দেখা যায়নি নিয়োগ প্রক্রিয়ায়। একেবারে গোপনীয়তার মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলেছে,” জানাচ্ছেন আরেক আন্দোলনকারী রাকিবুর শেখ।

২০১৯ সালে ২৯ দিন অনশন চলাকালীন প্রশাসনের তরফ থেকে চরম দুর্ব্যবহার পেয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা। খাবার জল, মাথার উপর ছাদ, বাথরুম ইত্যাদি কোনো বন্দোবস্তই প্রশাসন থেকে করা  হয়নি। সন্তান সম্ভবা মহিলারাও সেই আন্দোলনে ছিলেন, কোলে বাচ্চা নিয়ে আন্দোলনকারীরা ২৯ দিন না খেয়ে অনশন চালিয়ে গেছেন। যেহেতু গোটা স্টেট লেভেলের পরীক্ষা এস.এল.এস.টি, তাই মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর ২৪ পরগণা, কলকাতা, কোচবিহার সহ বিভিন্ন জেলা থেকে আন্দোলনকারীরা আবার অবস্থানে বসেছেন।মেধা তালিকায় থাকা, যোগ্য প্রার্থী হিসেবেই তারা দাবী করছেন চাকরিতে স্বচ্ছ ভাবে নিয়োগ করা হোক৷

আদালত থেকে অবস্থানের ক্ষেত্রে আন্দোলনকারীদের সংখ্যা এবং সময় বেধে দেওয়া হয়েছে। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অবস্থান চালাতে পারবেন তারা। আন্দোকারীরা ৪টি জায়গা অবস্থানের জন্য বাছাই করে কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। কলেজ স্কোয়ার, প্রেস ক্লাব, ওয়াই চ্যানেল ও গান্ধীমুর্তির পাদদেশ। কোর্ট সেক্ষেত্রে গান্ধী মুর্তির পাদদেশে অবস্থান করার অনুমতি দেয়। মাথার উপর ছাদ নেই। কাছাকাছি শৌচাগার নেই। প্রেস ক্লাব অবধি গিয়ে শৌচাগার ব্যবহার করতে হচ্ছে আন্দোলনকারীদের।

রোদ, ঝড়-জল-বৃষ্টির মধ্যে ৫ দিন ধরে বসে থাকার পরও এখনও সরকারের তরফ থেকে ইতিবাচক কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। গতবছর সেন্ট্রাল পার্কে একই ভাবে যখন অবস্থান আন্দোলন চালাচ্ছিলেন তারা তখন তাদের মঞ্চ ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়া হয়। লাগেজ ব্যাগ ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হয়। স্কুল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান শুভ শঙ্কর সরকারের সাথে আলোচনা হয়। আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিরা ৫৬ টি অভিযোগ প্রমাণ সহ পেশ করেন। সরকারের তরফে দুর্নীতির কথা স্বীকারও করা হয়, কিন্তু তারপরও শুধুই মিলেছে প্রতিশ্রুতি। কোনো সুরাহা হয়নি। রাকিবুর শেখ জানাচ্ছেন, “কোর্টে বিচারাধীন থাকাকালীন এই মামলায় সরকার পক্ষের আইনজীবী পর্যন্ত কেসে এতো দুর্নীতি ও অবৈধতা  দেখে কেসটি ছেড়ে দিয়েছিলেন”।

আপাতত গান্ধী মুর্তির পাদদেশে অবস্থান আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলেই জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। সমাজের প্রতিটা স্তরের মানুষকে এই আন্দোলনের পাশে থাকার জন্যও আবেদনও জানিয়েছেন রাকিবুর শেখ, সজল দে, রাকিব হোসেন, কোয়েল দে, কৃষ্ণা সর্দার, লক্ষী পাল, প্রথমা মিত্র, তমা হোসেন, প্রশান্ত বাউরি, রাজশ্রী দাস ও অন্যান্য চাকরিপ্রার্থীরা। পশ্চিমবঙ্গে বিগত কয়েক বছর ধরেই সরকারি চাকরিতে নিয়োগে দু্নীতি, অস্বচ্ছতা নিয়ে বারবার আন্দোলনে নেমেছেন চাকরীপ্রার্থীরা। কোনো ক্ষেত্রে পরীক্ষা গুলিই হয়নি। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরীক্ষা হলেও সেখানে সঠিকভাবে নিয়োগ হয়নি। তাই হয়তো রাস্তাই একমাত্র রাস্তা হিসেবে বেছে নিয়েছেন এই হবু শিক্ষক-শিক্ষিকারা। এরপরে সরকার কতটা নড়েচড়ে বসবে তা সময়ই বলবে।

Please follow and like us:
error17
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on “কাজের দাবীতে লড়াই করতে এসেছি, ভিক্ষা করতে নয়” – স্কুল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগে ধর্ণায় হবু শিক্ষক-শিক্ষিকারা

Leave A Comment