মতুয়াদের প্রকৃত উন্নয়ন নাকি শুধুই ভোট-ব্যাঙ্কের খেলা?

বিভাগ-বহির্ভূত বিশেষ খবর রাজ্য

Last Updated on 9 months by admin

25 ডিসেম্বর 2020 , নিজস্ব প্রতিনিধির প্রতিবেদন

2021 সালের আসন্ন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে, কেন্দ্রের বিজেপি সরকার অন্যান্য সমীকরণের পাশাপাশি মতুয়া ভোট ব্যাঙ্ককে পুঁজি করে রাজ্যে জয়ের চেষ্টা করছে।

মোট  মতুয়া মহাসঙ্ঘের ছত্রছায়ায় থাকা ভোটের সংখ্যা আগামী বিধানসভা নির্বাচনে বিশেষ গুরুত্ব পাবে।  নমশুদ্র এবং মতুয়া শব্দটি বাংলা এবং জাতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গত দুই দশকে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।  অধিকার ও সাম্যের জন্য মতুয়া আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন হরিচাঁদ ঠাকুর এবং তারপরে তাঁর পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুর।  তাদের চিন্তাভাবনা পুরো মতুয়া সম্প্রদায়কে প্রভাবিত করেছে।  দেশভাগের পরে বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল হয়ে মতুয়ারা ধীরে ধীরে প্রমথ রঞ্জন ঠাকুর এবং তাঁর স্ত্রী বিনাপানি দেবীর ছত্রছায়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি  হিসেবে সামনে আসে। যারা বাংলার রাজনৈতিক শক্তির উত্থানপতনে ক্রমশ গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলায় মতুয়ার রাজনীতির উত্থান

মতুয়া মহাসঙ্ঘের অনুসারীর সংখ্যা প্রায় দুই কোটি এবং এই জনসংখ্যা ৬৫টিরও বেশি আসনের ভোটকে প্রভাবিত করতে পারে।  ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে টিএমসি মতুয়া ভোট সংগ্রহ করতে শুরু করেছিল। ঠাকুরনগর রেল স্টেশন বিকাশ শুরু হয়েছিল, হাসপাতাল ও কলেজ তৈরি হয়েছিল  এবং মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষের সার্বিক উন্নয়নের কথাও আলোচনায় আসে। তৃনমূল কংগ্রেস কপিল কৃষ্ণ ঠাকুর এবং মঞ্জুল  কৃষ্ণ ঠাকুরকে যথাক্রমে লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভাতে নির্বাচনের টিকিট দেয়।

২০১৪ সালে মমতা বালা ঠাকুর তাঁর প্রয়াত স্বামী কপিলের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পরে ঠাকুর পরিবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। ২০১৫ সালে মঞ্জুল বিজেপিতে যোগ দেন।  এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে টিএমসি এবং বিজেপির মধ্যে ভোট ব্যাংক বিভক্ত হয়ে যায়।  দেশভাগের পরে পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে আগমনকারী নমশুদ্র শরণার্থীদের নাগরিকত্বের দাবিতে মঞ্জুলের ছেলে শান্তনু ঠাকুর রাজধানীতে একটি বিক্ষোভ সমাবেশ করেছিলেন।  প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২০১৯ সালের শুরুর দিকে উত্তর চব্বিশ পরগনার মতুয়া ঘাঁটিতে তাঁর সফরের সময় মতুয়াদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য আইন প্রণয়ন করার প্রতিশ্রুতি দেন। অনেকটা সেই প্রতিশ্রুতির ফলে ২০১৯ সালের নির্বাচনে শান্তনু ঠাকুর বনগাঁ (এসসি) লোকসভা আসন থেকে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন।

রাজনৈতিক পরিস্থিতির বদল

এই ঘটনাবলীগুলির সাথে, বিজেপি সংসদে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল উপস্থাপন করেছিল, যা পরে পাশ হয়ে যায়।রাজ‍্য ও দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক সংগঠন ও ব‍্যক্তিদের পাশাপাশি  টিএমসির নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার এর তীব্র বিরোধিতা করে।  নাগরিকত্ব (সংশোধন) আইন, 2019 লোকসভায় পাস হওয়ার পরে, নমশূদ্ররা বিজেপি সরকারের প্রতি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন এবং বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন যে এটি ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের উপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে।কিন্তু, তার পরবর্তী অধ্যায় ক্রমশ বিজেপির পক্ষে প্রতিকূল হতে থাকে।  আসামের ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেন (এনআরসি) সম্পর্কিত ঘটনাগুলি এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।সেখানে  প্রচুর হিন্দু শরণার্থী তালিকাভুক্ত না হওয়ায় বাংলার নমশুদ্রদের মধ‍্যে তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ।

‘ভূমি পূজনে’ ঠাকুরবাড়ির মাটি ও জল প্রত্যাখ্যান

গত বছরের আগস্টে , অযোধ্যার রাম মন্দিরের ‘ভূমি পূজনে’ ঠাকুরবাড়ির মাটি ও জল প্রত্যাখ্যান নিয়ে বিতর্কে মতুয়াদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।  স্থানীয় বিজেপি নেতারা মতুয়াদের প্রবল চাপের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।  অগণিত মতুয়া মানুষ মনে করেন যে হরিচাঁদ ঠাকুর সমাজে ব্রাহ্মণ্যবাদী আধিপত্যের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন তা এই ঘটনায় আহত হয়েছিল।  মতুয়া সমাজের একটা বড় অংশ এ বিষয়ে জোরালো আওয়াজ তোলেন।  এই প্রসঙ্গে শান্তনু ঠাকুর বলেছিলেন যে এই গল্পটি ভিত্তিহীন এবং মাটি এবং জলকে ‘ভূমি পূজনে’ যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল।

আগামী  বিধানসভা নির্বাচনে মতুয়া সম্প্রদায়ের  ভূমিকা যথেষ্ট  গুরুত্বসহকারে আলোচনায় থাকবে ।  স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সাম্প্রতিক সময়ে রাজ‍্য সফর এবং এক মতুয়া শরণার্থীর বাড়িতে দুপুরের খাওয়ার ঘটনায় তা আরো পরিস্কার হয়েছে।  বিজেপিকে প্রায় ৬৫ টি আসনে তাদের সমর্থনের উপর নির্ভর করতে হবে।

অন্যদিকে, হারিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক জমি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে রাজ‍্য সরকার দলিত সাহিত্য একাডেমি, মতুয়া উন্নয়ন বোর্ড এবং নমশূদ্র বিকাশ পরিষদ প্রতিষ্ঠার কাজে হাত লাগিয়েছে।  রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে  ১.২৫ লক্ষ শরণার্থী পরিবারকে জমির অধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।   বোর্ডের উন্নয়নের জন্য বড় অঙ্কের অর্থসাহায্য এবং হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মদিনে সরকারী ছুটির আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, রাজ‍্যে মতুয়া সম্প্রদায় ও নমশূদ্রদের নিজস্ব রাজনৈতিক দল গঠনের গুজব ছড়িয়ে পড়েছে।  এর সত্যতা সম্পর্কে কোন নির্ভরযোগ্য তথ্য এখন পাওয়া যায় নি।

 

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
No Thoughts on মতুয়াদের প্রকৃত উন্নয়ন নাকি শুধুই ভোট-ব্যাঙ্কের খেলা?

Leave A Comment