দিন বদলের স্বপ্নটাকে হারিয়ে ফেল না

আজকের খবর বিশেষ খবর মতামত রাজনীতি

Last Updated on 2 weeks by admin

দিন বদলের স্বপ্নটাকে হারিয়ে ফেল না

পার্থ সারথি

সমাজ বদলাতে হলে আগে তো সমাজটাকে চিনি। আমরা যারা সমাজ-বদলের কথা ভাবি, এই পোড়া দেশে এখনও দিন-বদলের স্বপ্ন দেখি, আমাদের মূল সমস্যাবোধহয় যেটা পাল্টাতে চাই সেই সমাজটা আমরা ভাল করে চিনি না। সমাজ মানে আমার আশপাশে যারা থাকেন, যারা সংসার চালানোর জন্য উদয়াস্ত কাজ করে চলেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন নানা জাতপাত ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ, শহরাঞ্চল হলে নানা রাজ্যের নানা ভাষাভাষী মানুষ, আমরা তাদের কতটুকু চিনি? তাঁরা কি ভাবেন, কি চান, এই সংকট-কালে কেমন চলছে তাঁদের দিন-গুজরান, কোন ভবিষ্যতের আশায় তাঁরা জুঝছেন কঠিন জীবন-সংগ্রামে, এসব খবর কতটুকু রাখি আমরা?

রাখি না, কেননা এতরকম মানুষের এত-শত খবর রাখা অল্প কিছু মানুষ যারা সমাজ-বদলের কথা ভাবি তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, তার জন্য বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে মিশে থাকা অনেক অনেক মানুষ দরকার, যারা ওইসব মানুষদের জীবনের অংশীদার, ওদের সমাজেরই একজন, যারা ওদের মনের খবর সংগ্রহ করতে পারবে। আসলে আমাদের বড় সমাজের মধ্যে অনেকগুলো ছোট ছোট সমাজ আছে, বড় দেশের মধ্যে আছে অনেক ছোট ছোট দেশ।

সুন্দরবন থেকে যারা কলকাতায় কাজকর্ম করতে আসেন, তাঁরা দেশ বলতে সুন্দরবনকেই বোঝেন, যার সাথে তাঁদের নাড়ির যোগ। তাই তাঁদের ভালভাবে বুঝতে হলে সুন্দরবনের সমাজ-সংস্কৃতিকে জানা জরুরী, পশ্চিমবঙ্গের অন্য সব এলাকার থেকে যা বিশিষ্ট। একইভাবে বিহারী বন্ধুরা মাঝেমধ্যেই ‘দেশে’ যান, তাঁদের দেশ ছাপড়া কি দ্বারভাঙ্গায়। এভাবে দেখলে একটা রাজ্যের মধ্যেই পাই অনেক রকমের মানুষ, নিজস্ব সমাজ-সংস্কৃতি বাদ দিয়ে যাদের বিচার করা যায় না, বোঝা যায় না। এদেশে জীবিকা জাত ধর্ম লিঙ্গ অনুযায়ী মানুষের আশা-আকাঙক্ষা-ভাবনা আলাদা হয়ে যায়।

যদি জীবিকা দিয়ে বিচার করি শুধু শ্রমিকদের মধ্যেই আমরা কত বৈচিত্র দেখতে পাই—দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক আর রাণীগঞ্জ কয়লা খনির শ্রমিক পাশাপাশি অঞ্চলে হলেও যেন দুই আলাদা জগতের বাসিন্দা, কলকাতা-সংলগ্ন শিল্পাঞ্চলে জুট মিল শ্রমিক আর উন্নত ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানার শ্রমিকের চরিত্র অনেক আলাদা, আবার বৃহৎ শিল্পের শ্রমিকের সাথে ক্ষুদ্র শিল্প-শ্রমিককে মেলানো যাবেনা, একই কারখানার স্থায়ী শ্রমিকের সাথে অস্থায়ী বা ঠিকা শ্রমিকের সমস্যা দাবি-দাওয়া আলাদা হয়ে যাবে।

নিম্ন-বর্ণের মধ্যে যেমন অনেক সম্প্রদায়— মূলত পূর্ববঙ্গ থেকে আসা শিক্ষা ও কৃষিকাজে এগিয়ে থাকা নমশূদ্র সম্প্রদায়ের সাথে দক্ষিণবঙ্গের বাউরী-বাগদি প্রভৃতি জাতের মানুষের পার্থক্য প্রভূত, আবার উত্তরবঙ্গ জুড়ে যে রাজবংশীদের বাস তাদের মুখের গড়ন ভাষা সংস্কৃতি একেবারে অন্যরকম। আদিবাসীদের মধ্যেও আছে নানান সম্প্রদায়ের মানুষ, তেমনি এই বাংলার বিশাল মুসলিম সম্প্রদায়ের রয়েছে পৃথক সত্তা, পৃথক সমস্যা।

এই এত সম্প্রদায়ের মানুষ সম্পর্কে জানা দরকার যাতে বিশেষ থেকে সাধারণে পৌঁছান যায়, প্রতিটি জনজাতির বিকাশের বাধাগুলো খুঁজে পাওয়া যায়—যে খোঁজ শুরু হবে তাদের ভেতর থেকেই, সম্প্রদায়গুলোর নিজস্ব নেতা-কর্মী-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদের নিজ তাগিদ এবং উদ্যোগে। পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল মূলধারার শিক্ষা-সংস্কৃতি-রাজনীতিতে দলিত-আদিবাসী-মুসলিম সম্প্রদায়ের উপস্থিতি অতি নগণ্য, যদিও এরাই সম্মিলিতভাবে রাজ্যের সংখ্যাগুরু।

এরপর আসি লিঙ্গ পরিচয়ে—যে পরিচিতি নিয়ে বাম রাজনীতিতে বোধকরি সবচেয়ে কম কথা হয়। দেশ রাজ্য সমাজ বা সম্প্রদায়ের কথা ছেড়ে দিলাম, একই পরিবারের পুরুষ আর নারীর ভাবনা কি একই খাতে বয়? বয় না, কারণ পুরুষের জগত আর নারীর জগত আলাদা। অথচ আমরা যখন কোনো একটি অঞ্চলে কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীর সমাজ-অর্থনীতি জাত-ধর্ম ইত্যাদি বিবেচনা করি, তখন পুরুষদের ঘিরেই মূলত আমাদের চিন্তা-ভাবনা আবর্তিত হয়, তাদের ঘরের মেয়েদের খোঁজ নেওয়া খুব প্রয়োজন মনে হয় না। অবচেতনে ভাবি, লড়াই আন্দোলন তো ছেলেরাই করে, তারাই বেরোয় ঘরের বাইরে, দাবি-দাওয়ার আন্দোলনে তাদেরই আগে পাওয়া যায়, তাই আগে তো পুরুষদের সংগঠিত করি, তারপর নয় তাঁরা ঘরের মেয়েদের নিয়ে আসবেন। অথচ দেখুন নতুন শতাব্দীতে মেয়েরাই আছেন আন্দোলনের পুরোভাগে— সেই সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম থেকে সেদিনের শাহীনবাগ পর্যন্ত শাসকের নিষ্ঠুর দমন-পীড়নের মুখে লড়াইয়ে মেয়েরাই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন।

আসল সমস্যাহল বামপন্থী দল বা সংগঠন মাত্রই পুরুষ-প্রধান,সেখানে পুরুষরাই অগ্রণী আর নারী পুরুষের পশ্চাদগামিনী এমন ভাবনার প্রাধান্য থাকাই স্বাভাবিক। এছাড়াও মেয়েদের কাছে পৌঁছতে হলে তো নারী-কর্মী চাই। নারী-কর্মী নেই – তাই মেয়েদের মধ্যে কাজ এগোয় না, আবার মেয়েদের মধ্যে কাজ হয়না বলে নারী-কর্মী তৈরি হয়না, এমন ডিম আগে না মুরগি আগে এই ধন্দে পড়ে আর মেয়েদের মধ্যে কাজ শুরু করাই হয়না। মূল ধারার রাজনীতির মতই বাম রাজনীতিতেও তো বর্ণ-হিন্দু পুরুষদেরই প্রাধান্য, এই প্রাধান্য ভাঙার কাজ দিয়েই বাম রাজনীতির পুনর্গঠন শুরু করতে হবে।

সবার আগে অবশ্য স্বীকার করা দরকার, আমরা বামপন্থীরা (সিপিআই থেকে মাওবাদী সব ধারার) যে নিজেদের প্রায় সর্বজ্ঞ বলে মনে করি, মনে করি বলেই জনগণের কি করা উচিত সে সম্পর্কে মানুষকে জ্ঞান-গর্ভ উপদেশ বিতরণ করি, ‘লড়াই করে বাঁচতে হবে’ বলে শ্লোগান দিই, তারপর অপেক্ষা করি মানুষ কবে তাদের সমস্যা নিয়ে আমাদের কাছে আসবে, বা কিছু আন্দোলন শুরু করবে, তখন আমরা তাদের ‘নেতৃত্ব’ দেব, তাদের ‘সঠিক পথে’ পরিচালনা করব— এই ভাবনার মধ্যেই একটা বড় ফাঁকি আছে। এদেশে বামপন্থীরা কখনও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীগুলোর প্রতিনিধি হয়ে উঠতে পারেনি।

এতদিন এই ফাঁকি ধরা পড়েনি, সংসদীয় বামেরা তো বহুদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে রাজ করেছে, নকশালপন্থীদের পেছনেও কিছু না কিছু মানুষ জুটেছে, কারণ তখন মূলত বামপন্থীরাই তৃণমূলস্তরে কাজ করতেন, মানুষ তাদের অভাব-অভিযোগ বলার জন্য একমাত্র বাম দলের কর্মী-নেতাদেরই পেতেন। কিন্তু এখন জমানা বদলে গেছে, যাদের আমরা দক্ষিণপন্থী বলি সেই দলগুলো নিতান্ত ভোটে জেতার তাগিদেই কে কার আগে মানুষের কাছে পৌঁছবে, তার জন্য প্রতিযোগিতা শুরু করেছে। তাদের পেছনেই মানুষ ভিড় করছেন এটা-সেটা নানা কাজে, নানা প্রকল্পের সুবিধা নিতে। সংসদীয় বামেরা যখন ক্ষমতায় ছিল, তারাই মানুষকে শিখিয়েছিল কিছু পেতে গেলে ক্ষমতার সাথে থাকতে হয়, সেই শিক্ষা থেকেই মানুষ আজকের ক্ষমতাসীন দলগুলোর সাথে থাকছেন, ভাগ্যের পরিহাসে একদা প্রতাপশালী বামেরা আজ জন-বিচ্ছিন্ন।

মোদ্দা কথা, মানুষকে সংগঠিত করা আজকের দিনে অনেক কঠিন হয়ে গেছে, সমাজ হয়ে গেছে অনেক জটিল, রাজনীতি হয়ে গেছে অনেক অংকের খেলা। এই খেলায় শাসক দলগুলো যেমন মানুষকে ব্যবহার করে, তেমনি সাধারণ মানুষও রাজনৈতিক দলগুলোকে কাজে লাগিয়ে নেয় নিজেদের ছোট ছোট কাজ হাসিল করার জন্য। আর কে কত মানুষ নিজের দলে টানতে পারে তা নিয়ে শাসক দলগুলোর মধ্যে চলে নিরন্তর প্রতিযোগিতা, এই খেলায় শাসক দলগুলোকে পেছনে ফেলে জনতার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার কোনো সহজ পথ নেই।

সেজন্যই মনে হয় গোড়া থেকে শুরু করা দরকার, চারপাশের সমাজটাকে গভীরভাবে অনুসন্ধান করার মধ্যে দিয়ে যে কাজ শুরু হতে পারে, যাতে প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, নিজস্ব আশা-আকাঙক্ষা-চাহিদার খোঁজ পাওয়া যায়, এবং তাদের কাছের মানুষ হয়ে ওঠা যায়। শাসক দলগুলো প্রতিটি জনগোষ্ঠীর স্বাতন্ত্র্য ও জীবন-জীবিকার অধিকার স্বীকার করে না, সাধারণ কিছু জনমোহিনী প্রকল্প ছড়িয়ে মানুষের মন জয় করতে চায় মাত্র। সেখানে কোনো জনগোষ্ঠীর একান্ত নিজস্ব সমস্যা নিজস্ব অধিকার বুঝে নেওয়ার আন্দোলন অনায়াসে শাসক রাজনীতির সীমা অতিক্রম করে যেতে পারে।

মাওসে-তুং একবার বলেছিলেন, অনুসন্ধান না করে আপনার বলার অধিকার নেই। মাও নিজে হুনান প্রদেশে চলমান কৃষক সংগ্রাম তদন্ত করেছিলেন, এবং তার ভিত্তিতে চিন বিপ্লবের পথ নির্ণয় করেছিলেন। লেনিন একদম শুরুতে রাশিয়ার সমাজে পুঁজিবাদের বিকাশ নিয়ে তাত্ত্বিক গবেষণা  করেছিলেন। ভারতের আজকের পরিস্থিতি সেসময় চিন বা রাশিয়ার থেকে অনেক জটিল, অনেক বৈচিত্রে ভরা, তাই এখানে অনুসন্ধান ও তাত্ত্বিক গবেষণা অনেক অনেক বেশি জরুরী, অথচ আমরা বামপন্থীরা এই কাজটাই সবচেয়ে বেশি অবহেলা করে এসেছি।

মজার কথা হল, যারা নিজেদের মাওবাদী বলে মনে করেন, তাঁদেরই একাজে অবহেলা বোধহয় সবচেয়ে বেশি, ভারতের বিভিন্ন জাতিসত্তার অন্তর্ভুক্ত অসংখ্য জনগোষ্ঠীর স্বাতন্ত্র্য এবং তাদের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক বৈচিত্র অনুসন্ধান ও গবেষণা ছাড়াই তারা ভারতীয় বিপ্লবের জন্য একটা সাধারণ পথ নির্ণয় করে ফেলেছেন, সেটাও নিজেরা করেননি, করেছেন মাও-সে তুং – আজ থেকে একশো বছর আগে চিনা সমাজ নিয়ে অনুসন্ধান ও গবেষণা করে।

অথচ গভীর অনুসন্ধান ছাড়াই মোটা দাগের অনেক বৈশিষ্ট্য এই দেশ ঘুরলেই নজরে আসে। যেমন উত্তর ভারতের গোবলয়ের সাথে পশ্চিমবঙ্গের সমাজ-সংস্কৃতি অনেকটাই আলাদা। আবার এই বাংলার মধ্যে কলকাতা এবং শহরতলী এলাকার মানুষের সাথে রাঢ় বাংলা বা উত্তরবঙ্গের মানুষের অনেক তফাত, এমনকি একই অঞ্চলের বাসিন্দা বর্ণ-হিন্দুদের সাথে নিম্নবর্ণ মুসলিম ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক গঠনে অমিলই বেশি পাওয়া যাবে। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার শাসন চালাবার স্বার্থেই ভারতের নানান জনজাতির স্বাতন্ত্র্য অধ্যয়নের প্রয়োজন বুঝেছিল এবং নৃতাত্ত্বিক গবেষণার কাজে হাত দিয়েছিল। অবাক লাগে, ঔপনিবেশিক শাসকরা এই দেশের বৈচিত্র অনুসন্ধানের যে প্রয়োজনীয়তা বুঝেছিল, এদেশের সমাজ-বিপ্লবীদের কাছে তা কখনই গুরুত্ব পেলনা কেন।

এই রাজ্যের দিকে তাকালে দেখব, পশ্চিমবঙ্গ নানা কারণে বিশিষ্ট, এখানে জাতপাত-ভিত্তিক নিপীড়ন তুলনামূলক ভাবে কম, অথচ ভেদাভেদ সূক্ষ্ম এবং প্রবল। এখানে ইংরেজি শিক্ষায় লালিত মূলত উচ্চবর্ণের অভিজাত সম্প্রদায়ের আধিপত্য রাষ্ট্র-রাজনীতি থেকে শিক্ষা-সংস্কৃতি-কর্মজগৎ সর্বত্র বিস্তৃত। ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার আজও যাদের রক্তে বহমান, যাদের কাছে মাতৃভাষার থেকে ইংরেজি অধিক আদরণীয় (সন্তানদের বাংলা মাধ্যমে পড়ানোর কথা যারা ভাবতেই পারেনা), তারাই এরাজ্যের সমাজ-সংস্কৃতিতে অভিভাবকত্ব করে থাকেন, এতটাই যে যারা বাংলা-মাধ্যমে পড়াশুনা করে নিম্নবর্ণ আদিবাসী বা মুসলিম সম্প্রদায় থেকে মূল ধারায় উঠে আসতে চান, তাঁরা ভয়ংকর হীনন্মন্যতা শিকার হন, প্রাণপণ চেষ্টা করেও ‘ওদের’ সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারেন না, দিনে দিনে এই সামাজিক বিভাজন গভীর থেকে গভীরতর হয়।

আসলে একই ভৌগলিক সীমানার মধ্যে বসবাস করলেও বর্ণ-হিন্দু ‘ভদ্রলোক’-দের সাথে নিম্নবর্ণ আদিবাসী ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর মানুষকে একপাতে বসানো যাবেনা কিছুতেই। একই অঞ্চলে বাস করেও তারা যেন দুই ভিন জগতের বাসিন্দা। যেমন, ব্রাহ্মণ্যবাদী ভদ্রলোক গোষ্ঠী যে বাংলা ভাষা ব্যবহার করেন, সেই ভাষাতেই লেখা হয় সব পাঠ্য পুস্তক, রাজ্যের বিপুল সংখ্যক দলিত-মুসলিম-আদিবাসী ছাত্র-ছাত্রী, যারা অধিকাংশ প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী, তাদের কাছে সে ভাষা কতটা বোধগম্য, তা নিয়ে তাদের বিশেষ মাথাব্যথা নেই।

রাজবংশী ভাষা ব্যবহার করেন এমন মানুষের সংখ্যা পশ্চিমবঙ্গ আসাম বিহার মিলিয়ে প্রায় এক কোটি, অথচ স্কুল-শিক্ষায় রাজবংশী ভাষার এতটুকু স্বীকৃতি নেই। উত্তরবঙ্গে স্কুল-সমীক্ষা করতে গিয়ে এক গবেষক দেখেন, স্কুলের ভেতরে রাজবংশী ভাষাতে কথা বলা পর্যন্ত বারণ (Rajbangshi Language: A Geographical Observation by Artery Sarkar)। শিক্ষা-ক্ষেত্রে এই ভাষাগত সমস্যা বাম ছাত্র আন্দোলনের বিষয় হতে পারত, সেখানে আজ দেখছি বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে নানান বঞ্চনা-জনিত ক্ষোভকে পুঁজি করে হিন্দুত্ববাদী শক্তি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, উত্তরবঙ্গে রাজবংশী ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে তারা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

সম্প্রদায়গত বঞ্চনার ভয়ংকর ছবি ধরা পড়বে যদি এরাজ্যে মুসলিমদের অবস্থা বিচার করতে বসি, উচ্চশিক্ষায় মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব কম কেন তা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে যা এই লেখকের নজরে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার ২৭ শতাংশ মুসলিম অথচ কলেজ-স্তরে তাদের উপস্থিতি মাত্র ১১ শতাংশ, যত উচ্চতর স্তরে যাওয়া যাবে তাদের উপস্থিতি তত কমে যাবে, যার একটা বড় কারণ মুসলিম-অধ্যুষিত তিনটি জেলা ও ৬৫ টি ব্লকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্কুল এবং কলেজের সংখ্যা অন্যান্যএলাকার থেকে অনেক কম। যেখানে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় আছে তেমন হিন্দু-প্রধান এলাকায় মুসলিম বলেই তাদের বাসস্থান মেলেনা, আর্থিক সমস্যা তো আছেই। মুর্শিদাবাদ জেলার গ্রামাঞ্চল মুসলিম-প্রধান আর বেশিরভাগ কলেজ হিন্দু-প্রধান বহরমপুর শহরে, যেখানে মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীরা ঘর ভাড়া পায় না।

এমন অজস্র বঞ্চনার কথা উঠে আসে, যদি ঠিকমত তাদের কথা জানার চেষ্টা করি। এরাজ্যের সরকারী কর্মচারীদের মধ্যে মুসলিম ৬ শতাংশেরও কম, বাম আমলে যা ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। এভাবে বঞ্চনার লম্বা ফিরিস্তি বানানো যেতে পারে, এরাজ্যে মুসলিমদের অবস্থা নিয়ে প্রতীচী-স্নাপ-এর সমীক্ষা রিপোর্ট এই সম্প্রদায়ের মধ্যে দারিদ্র ও শিক্ষা-স্বাস্থ্য প্রতিটি ক্ষেত্রে নিদারুণ বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরে। অথচ হিন্দুত্ববাদী শক্তি এরাজ্যে মুসলিম-তোষণ নিয়ে ভয়ংকর সরব, আর বামপন্থীরা মুসলিমদের ওপর চলে আসা বঞ্চনা নিয়ে আশ্চর্যরকম নীরব।

এইভাবে অনুসন্ধান ও গবেষণা করলেই দেখা যাবে,এই রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সমস্ত ক্ষেত্রে নানাভাবে বঞ্চিত এবং এই বঞ্চনার পেছনে রয়েছে যুগ যুগ ধরে তাদের প্রতি কলকাতা-কেন্দ্রিক শাসক ও বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের অসীম অবহেলা অজ্ঞতা উদাসীনতা। কিন্তু বাম রাজনীতিতে এই সমস্যাগুলো উঠে আসে না কেন? কারণ এই দলগুলোর নীতি-নির্ধারণে এহেন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা এতই কম থাকে যে দলের ভেতরে তাদের কন্ঠস্বর ওপরতলা অবধি উঠে পৌঁছয় না, তাদের সমস্যা সম্পর্কে বাম নেতারা থেকে যান উদাসীন, প্রান্তিক মানুষজন বাম দলেও প্রান্তিক হয়েই থেকেযান।

সমস্যা হল, হাজার হাজার বছরের ব্রাহ্মণ্যবাদী ঐতিহ্য থেকে এদেশের তথাকথিত মূলধারার রাজনীতি যেমন বেরোতে পারেনি, তেমনি পারেনি বাম বা বিপ্লবী দলগুলোও। তাই মুখে শ্রমিকশ্রেণীর রাজনীতির কথা বললেও, এদেশের শ্রমজীবী নিপীড়িত মানুষের মধ্যে সাম্যবাদসহ আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কোনো পরিবেশ এদেশের বাম ও বিপ্লবী মহলে কোনদিন তৈরী হয়নি। ‘বাম’ ও ‘বিপ্লবী’ দলগুলোর পতাকা কাঁধে নিয়ে এদেশের নিপীড়িত মানুষজন অসংখ্য লড়াই চালিয়েছেন, কিন্তু দলীয় নেতৃত্বে তাঁরা বিশেষ স্থান পাননি, এইসব দলেও তাঁরা ‘অপর’ হয়েই থেকে গেছেন। দলের নেতৃত্ব উঠে এসেছে বর্ণ-হিন্দু শিক্ষিত সমাজ থেকে, যাদের কাছে আদিবাসী ও দলিত সমাজের সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-মূল্যবোধের চর্চা যেমন অর্থহীন, তেমনি অর্থহীন নিপীড়িত মানুষের মধ্যে চিরাচরিত জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অনুসন্ধান।

বাম দলগুলোকে নিপীড়িত মানুষের সত্যিকারের প্রতিনিধি হয়ে উঠতে হলে ব্রাহ্মণ্যবাদী ভাবধারা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ ঘটিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলির কাছে নতমস্তক হয়ে পৌঁছতে হবে, দাঁড়াতে হবে ‘ওই মানহারা মানবীর দ্বারে’, তাদের জানতে হবে, তাদের কাছ থেকে শিখতে হবে। তবেই হয়তো নতুন শতাব্দীতে বাম রাজনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

 

*লেখক সমাজকর্মী ও গবেষক

*মতামত লেখকের নিজস্ব

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on দিন বদলের স্বপ্নটাকে হারিয়ে ফেল না

Leave A Comment