পুরুলিয়া শহরে তিন হাজারের বেশি লোকশিল্পীর মিছিল

আজকের খবর

Last Updated on 7 months by admin

সৌরভ সাহু

গতকাল পুরুলিয়া জেলার তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরে প্রায় তিন হাজারেরও বেশি লোকশিল্পী সরকারের কাছে ডেপুটেশন দিলেন তাঁদের দাবিদাওয়াকে কেন্দ্র করে। রাস্তাজুড়ে মিছিলের মধ্যেই ঢোল-মাদলসহ নানা লোকগান, পুরুলিয়া শহরের রাস্তায় উৎসবের মেজাজ এনে দিয়েছিল। মহিলা শিল্পীদের বিপুল উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। বহু জনজাতির বাস পুরুলিয়া জেলার বহু বিচিত্র লোকশিল্প, যেমন ছৌ, ঝুমুর, বাহা, করমনাচ, পাতানাচ, রায়বেঁশে, নাটুয়া, দং ইত্যাদি বাংলার সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে, বাংলাকে তুলে ধরেছে বিশ্বের দরবারে। কিন্তু এই লোকশিল্পীদের বেশিরভাগের ঘরেই নিত্য অভাব আর তাই হাড়ভাঙ্গা খাটুনি আর দারিদ্রের মাঝেই চলে শিল্পচর্চা। ফলে পরবর্তী প্রজন্ম কাজ করতে চলে যায় বাইরের শহরে, ক্রমশ হারাতে থাকছে শিল্পীসত্ত্বা আর শিল্প। এমন সব কথাই উঠে এল লোকশিল্পীদের সাথে কথা বলতে গিয়ে।

লোকশিল্পীদের সংগঠন সারা বাংলা লোকশিল্পী সংসদ আয়োজিত এই মিছিলে নেতৃত্ব দেন সংগঠনের পুরুলিয়া জেলার সভাপতি তরণী মাহাতো, সম্পাদক সমীর মাহাতো, রাজ্য কমিটির সদস্য বিদেশী মাহাতো, অমরনাথ গোস্বামী, লক্ষণসিং মুড়ি, স্বরূপ বাউরি, রামচরণ মাঝি প্রমুখ। জেলা তথ্য ও সাংস্কৃতিক আধিকারিক পল্লব পাল তাঁদের দাবিকে ন্যায্য বলে মেনে নিয়েছেন বলে জানান সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক কবিয়াল গোকুল হাজরা। গোকুল হাজরা জানান তাঁদের দাবি –

  • যে শিল্পীদের এখনো সরকারি দপ্তরে নাম নথিভুক্ত হয়নি তাদের পরিচয়পত্র আর বহালভাতা চালু করা
  • প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রতিটি লোকশিল্পীকে মাসে চারটি করে সরকারি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ
  • কোভিড আতিমারি ও তজ্জনিত লকডাউনের বিশেষ পরিস্থিতিতে দুর্দশাগ্রস্ত লোকশিল্পীদের জন্য বিশেষ অনুদানের আবেদন
  • মাসিক ভাতা বাড়িয়ে ১০০০ থেকে ৩০০০ করা
  • বয়স্ক লোকশিল্পীদের পেনশন এর ব্যবস্থা করা।

সুদূর মুরুগুমা কিংবা কোটশিলা, বাগমুন্ডি, হুড়া, হেঁটগুগুই, হেঁটজারি, আরশা সহ নানাপ্রান্ত থেকে এসেছিলেন লোকশিল্পীরা। বেশিরভাগই আদিবাসী।

বাংলার গর্ব এই লোকশিল্পীদের দুর্দশা কিন্তু বহুদিনের। মিডিয়ার দৌলতে শহরের সাধারণ মানুষের কাছে লোকশিল্পের মানে দাঁড়িয়েছে শুধু বাউল গান। অথচ বাংলার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা কত রকমের শিল্প, কত প্রতিভা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সেদিকে লোকসমাজের নজর ঘোরানোই মুশকিল সিনেমা আর সিরিয়ালের দাপটের যুগে। সরকারি দপ্তর আর বিশ্ববিদ্যালের ডিপার্টমেন্ট খোলা হয়েছে এই নিয়ে চর্চা আর গবেষণার উদ্দেশ্যে, লোকসংস্কৃতিকে সংরক্ষণের জন্য নেওয়া হয়েছে নানা প্রয়াস। কিন্তু সরকারি দপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার রুম আর ‘লোক’ এর দূরত্ব অনেক, লোকসংস্কৃতির সাথে এসবের দূরত্ব তো আরও কয়েক যোজন। সারা বাংলা লোকশিল্পী সংসদের এক সংগঠকের ফেসবুকে লিখেছেন-

‘লোক’-ই যখন সঙ্কটে তার সংস্কৃতিও সঙ্কটে থাকবে এআর নতুন কি? ‘লোক’-কে বাঁচানোই লোকসংস্কৃতিকে বাঁচানোর সবচেয়ে শক্তিশালী পদক্ষেপ। ডিজিটাল ম্যাগাজিন, গানকে ক্যাসেটবন্দী করা ওয়েবসাইট বা ব্লগ চালানো ছোটখাটো স্টুডিও তৈরি বা ইউটিউবে লোকসংস্কৃতি পরিবেশনের চ্যানেল বানানো কিংবা কমিউনিটি রেডিও চালানো যেতেই পারে, করাই উচিত। এতে কেবলমাত্র বাজারের কবলমুক্ত লোকসংস্কৃতির সঠিক সংরক্ষণ হবে, কিন্তু বাঁচবে না।

বাবুদের শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার সাথে লোকশিল্পের বিরোধ নিয়ে বিবাদটা পুরনো। রবীন্দ্রনাথ লোকহিত প্রবন্ধে বলেছিলেন – “চিরদিনই লোকসাহিত্য লোক আপনি সৃষ্টি করিয়া আসিয়াছে। দয়ালু বাবুদের উপর বরাত দিয়া সে আমাদের কলেজের দোতলার ঘরের দিকে হাঁ করিয়া তাকাইয়া বসিয়া নাই।” কলকাতার বাবুদের পশ্চিমে বেড়াতে গেলে পাহাড় আর জঙ্গলের মাঝে আদিবাসীদের নৃত্য দেখার সাধ কিংবা নামীদামী কলেজের কমবয়েসি ছেলেমেয়েদের কাছে পাহাড়-জঙ্গলের কোলে ছিলিমের সহযোগে বাউলগান চর্চা নিয়ে বিতর্ক এখনো লেগেই থাকে। এমনকি স্বয়ং সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত সিনেমা আগন্তুক-এ কোল উপজাতিদের নৃত্যের যে পরিবেশন, তা নিয়ে সমালোচনা থেকেছে যে দেখলে মনে হয় সিনেমার শুটিং এর জন্য কয়েক ঘণ্টা আগে সামান্য কিছু টাকা বায়না করে আনা হয়েছে আদিবাসীদের। আর তাই সে নাচে মুখে নেই কোনো আনন্দ, শরীরের ছন্দে নেই কোনো স্বতঃস্ফূর্ততা।

কিন্তু এসব ‘বড় বড়’ কথা। মাঠের কাজের অবসরে একতারা কিংবা ধামসা বাজানো ছেড়ে যাদের চলে যেতে হচ্ছে ব্যাঙ্গালোর, চেন্নাইতে রাজমিস্ত্রীর কাজে খানিক সরকারি সাহায্য তাঁদের একাংশকে ধরে রাখতে পারে কিনা, পুরনো বাদ্যযন্ত্র সারিয়ে দেওয়ার জন্য অনুদান দেওয়া যায় কিনা এগুলোই দেখার কেউ নেই। ১০০০ টাকার সরকারি ভাতা চালু হওয়া তাই একটু হলেও অগ্রগতি। তার মধ্যেই লিস্টে নাম ঢোকানোর জন্য কোথাও পার্টির নেতাকে ধরতে হয়, কোথাও রোজ কামাই করে আমলার দরবার করতে হয় দিনের পর দিন। ভাতা বাড়ানোর দাবিতে এসেছিলেন লোকশিল্পীরা। আশঙ্কাও আছে মনে রাজনৈতিক পালাবদলে এই ভাতাটুকুও বন্ধ হয়ে যাবে কিনা আবার? ভোটের বাজারে টিভি আর খবরের কাগজে রোজ দলবদলের গরমাগরম খবরের মাঝে কে আর এদের খোঁজ রাখে?

[নির্বাচন নিয়ে কী ভাবছেন? আপনার ভাবনা ৫০০ শব্দের মধ্যে লিখে আমাদে র পাঠিয়ে দিন। আমাদের যোগাযোগ:

e-mail: edeshaamar@gmail.com

Whatsapp: 8902499477

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
No Thoughts on পুরুলিয়া শহরে তিন হাজারের বেশি লোকশিল্পীর মিছিল

Leave A Comment