পশ্চিমবঙ্গে বাম রাজনীতির ভবিষ্যত

আজকের খবর পর্যালোচনা বিশেষ খবর মতামত রাজনীতি

Last Updated on 1 month by admin

পশ্চিমবঙ্গে বাম রাজনীতির ভবিষ্যত

পার্থ সারথি

 

প্রবীণে-নবীনে দুস্তর ব্যবধান

দীর্ঘ সময় ধরে সারা বিশ্বে পশ্চিমবঙ্গ পরিচিত ছিল এ রাজ্যের আপাত-শক্তিশালী বামপন্থী ঐতিহ্য বা পরম্পরার জন্য। সেই ধারণাসাম্প্রতিক নির্বাচনে বাম দলগুলোর শূন্য হাতে ফেরার পর যে বড় রকম ধাক্কা খেয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। যদিও নিছক নির্বাচনে জয়-পরাজয় দিয়ে বাম রাজনীতির বর্তমান অবস্থার মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না, কিন্তু একথা কি অস্বীকার করার উপায় আছে যে, বাম রাজনীতির পরম্পরা আজকের প্রজন্মে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়েছে। বাম ‘ঐতিহ্য’ টিকে আছে মূলত পুরোনো প্রজন্মের একাংশের মধ্যে, এবং সেটাও প্রায় একটা ধর্ম-বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে।

নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা মূলত বামফ্রন্ট রাজত্বে জন্মেছে, গনতন্ত্রের নামে একদলীয় আধিপত্যের নগ্ন চেহারাটা দেখতে দেখতে তারা বড় হয়েছে, এবং এদের অনেকের সাথে কথা বলে দেখেছি, তারা বাম বলতে মূলত সিপিএম-কেই বোঝে। নকশালপন্থীরাও যে মার্কসবাদী এমন ধারণা অনেকের মধ্যেই নেই। আসলে বাম রাজনীতির সাথে মার্কসীয় মতাদর্শের সংযোগটাই তাদের কাছে স্পষ্ট নয়। মার্কসবাদ নিয়ে তাদের আগ্রহ একেবারে তলানিতে। অথচ ১৯৬০-এর দশকে ছাত্র-যুবরাই মার্কসীয় মতাদর্শে প্রভাবিত হয়ে এরাজ্যকে বাম রাজনীতিতে প্লাবিত করেছিল। আজকের ছাত্র-যুবরা যদি বাম রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে তার পুনরুত্থানের সম্ভাবনা কতটুকু থাকে?

একদা যেসব দেশে কমিউনিষ্ট পার্টির নেতৃত্বে বিপ্লব আর সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী মুক্তিযুদ্ধ সারা দুনিয়াকে আলোড়িত করে আমাদের নবীন মনে অমিত উৎসাহ-উদ্দীপনার জন্ম দিয়েছিল, একটা গোটা প্রজন্মকে বাম রাজনীতিতে প্রাণিত করেছিল, (উল্লেখ্য, সত্যজিত রায় পরিচালিত ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ চলচ্চিত্রে নায়ককে একটি চাকরির ইন্টারভিউ-তে এই শতকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা কী প্রশ্ন করা হলে সে ভিয়েতনামের মুক্তি-যুদ্ধের কথা বলে।সত্যজিত বা তাঁর নায়ক কমিউনিস্ট ছিলেন না, কিন্তু কমিউনিস্ট-পরিচালিত সংগ্রামগুলো সেদিন এভাবেই সকল মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করেছিল। আজকের দিনে তরুণ-যুবকদের কাছে কমিউনিস্ট সাফল্যের কোনো দৃষ্টান্তই অবশিষ্ট নেই।), আজকের দিনে সেসব দেশে প্রায় ব্যতিক্রমহীন ভাবে পুঁজিবাদের প্রত্যাবর্তন ঘটেছে। যে চিন দেশের জন-জাগরণ হিমালয়ের ওপার থেকে প্রতিধ্বনিতুলে বাংলার তরাই হয়ে সারা ভারতে ঢেউ তুলেছিল, সেখান থেকে এখন শুধুই সামাজিক অবক্ষয় আর রাজনৈতিক অবদমনের ছবি ভেসে আসছে, যা নতুন প্রজন্মকে বাম রাজনীতি থেকে আরও দূরে ঠেলে দিয়েছে। তার সাথে এরাজ্যে বাম শাসন সম্পর্কে নিজেদের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা মিলে তাদের মধ্যে বাম তথা কমিউনিস্ট শাসন সম্পর্কে চূড়ান্ত হতাশা আর বামপন্থী মতাদর্শ সম্পর্কে চরম নির্লিপ্ততা তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে পুরোনো প্রজন্মের যারা এখনো বামপন্থায় বিশ্বাস ধরে রেখেছেন, তাদের সাথে নবীন প্রজন্মের দূরত্ব এতটাই বেড়ে গেছে যে, তারা একে ওপরের ভাষা বুঝতে পারছে না, একে অপরকে বুঝে উঠতে পারছে না, যেন দুটি ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা তারা। ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকেও এমন প্রবীণে-নবীনে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, যখন পশ্চিমবঙ্গের এক বড়োসংখ্যক ছাত্র-যুব বাম তথা বিপ্লবী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়াশুনো জলাঞ্জলি দিয়ে সমাজ-বিপ্লবের লক্ষ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সেই ছাত্র-যুবদের অনেকেই রক্ষনশীল অভিজাত পরিবারের বিধিনিষেধ-বন্ধন অগ্রাহ্য করে সেদিন বিপ্লবের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঘর ছেড়েছিল। সেদিনের ছাত্র-যুবরা আজ প্রবীণ বয়সেও বামপন্থার ওপর বিশ্বাস আঁকড়ে বাঁচতে চাইছেন, কিন্তু কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া তাঁদের ঘরের ছেলে-মেয়েরা বাম রাজনীতির প্রতি নিরুত্তাপ।

ইতিহাসের পরিহাসে সেদিনের ‘আলোর পথযাত্রী’ বামপন্থীরা আজকের নবীনদের কাছে রক্ষনশীল হিসেবে পরিগনিত। সামগ্রিকভাবে বাম মতাদর্শ অকেজো বাতিল বিষয় বলে প্রতিভাত। আজকের নবীন সমাজে এমন ঠাট্টা চালু হয়েছে, ‘গ্যাস খেয়ে ক্ষুদিরাম হতে চাই না।’ তার মানে তারা ক্ষুদিরামকে অসম্মান করছে বা শহীদের আত্মদানকে ছোট করে দেখছে তা নয়, কিন্তু আজ আর তারা অনুসরনযোগ্য কোন আদর্শ দেখতে পাচ্ছে না। সমাজ-বদল তাদের কাছে মরীচিকা প্রায়, তাই মিথ্যে আদর্শের পেছনে দৌড়ে মরার থেকে নিজেদের আখের গোছানো বেশি যুক্তিযুক্ত বলে মনে হচ্ছে।

আসলে পুরোনো প্রজন্মের বামপন্থীদের বেশিরভাগ যেভাবে বর্তমান ব্যবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে সবকিছু গুছিয়ে নিয়েও বাম বুলি আউড়ে চলেন, ঘরে পিতৃতান্ত্রিক অভিভাবক, কর্মক্ষেত্রে আপসকামী ইউনিয়ন নেতা, আর পাড়ায় পুজোর কর্মকর্তা সেজে ভন্ডামির নমুনা পেশ করেন, নবীন প্রজন্মের কাছে তা ধরা পড়ে যায়। সে দিক থেকে আজকের নবীনেরা প্রবীন বামেদের থেকে অনেক বেশি সৎ বলেই মনে হয়, অন্তত তারা যা ভাবে তাই করে, এবং সেটা বলতে দ্বিধা বোধ করেনা, তাদের কথা ও কাজে অসঙ্গতি অনেক কম।

যুগে যুগে ছাত্র-যুবরাই নতুন চিন্তার বিকাশে বা নতুন সমাজ গড়ে তোলার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। ১৯৬০-৭০ দশকে ছাত্র-যুবরা শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, ইউরোপ-সহ প্রতিটি মহাদেশকে উত্তাল আন্দোলনে আলোড়িত করেছে। প্রতিষ্ঠান-বিরোধী চেতনার তথা সমাজ-বদলের হাতিয়ার হিসেবে বাম রাজনীতিকে গ্রহণ করেছে। ছাত্র-যুবদের উদ্দেশ্যে মাও সেতুং-এর সেই বিস্মৃত-প্রায় বাক্যটি আমরা স্মরণ করতে পারি, ‘পৃথিবীটা তোমাদের এবং আমাদের, কিন্তু শেষ বিচারে পৃথিবীটা তোমাদেরই ….. তোমাদের হাতেই পৃথিবীর ভবিষ্যত। (Mao Zedong, Talk at a meeting with Chinese students and trainees in Moscow  – November 17, 1957)। এই কথাগুলো যে অপ্রাসঙ্গিক হয়নি, তা আজকের ছাত্র-যুবরা বারবার প্রমাণ করেছে। চিনের তিয়েনআনমেন স্কোয়ার থেকে আরব বসন্ত, অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট থেকে পাশের দেশে শাহবাগ আন্দোলন, বা এই মুহূর্তে হংকং-এর রাস্তায় স্বৈরাচারী শাসক আর কর্পোরেট আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই-এ তরুণ প্রজন্ম সামনের সারিতে থেকেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, তা সত্ত্বেও বাম রাজনীতিতে আজ নতুন রক্ত সঞ্চারিত হচ্ছে না? সমস্যা কি নতুন প্রজন্মের, না বাম রাজনীতির? প্রবীন বামপন্থীদের মধ্যে নতুন প্রজন্ম সম্পর্কে এক ধরনের উন্নাসিকতা লক্ষ করা যায়, ওরা কেরিয়ার-সর্বস্ব, ওরা ভোগবাদী সংস্কৃতিতে আচ্ছন্ন, সব সময় ফেসবুক আর হোয়াটস-অ্যাপ নিয়ে ব্যস্ত, ওদের মাথায় কীকরে রাজনীতি ঢুকবে? এখানেও প্রবীনদের দ্বিচারিতা স্পষ্ট। দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা নিজেদের ছেলেমেয়েদের কেরিয়ার-কেন্দ্রিক হতে শিক্ষা দেন, নিজেরা ভোগবাদী সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন, পুঁজিবাদ নিত্য-নতুন যে সকল উপকরণ, বিশেষ করে ডিজিটাল পণ্যের যে ঢালাও পসরা সাজিয়ে নতুন প্রজন্মের মস্তিষ্ক দখল নিতে প্রয়াসী, তার স্বাদ পেতে বা ব্যবহার করতে আগ্রহী থাকেন। নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখতে এখন প্রতিটি বামপন্থী দলই তো সোস্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে উঠেপড়ে লেগেছে, এবং সেকাজে দক্ষতার জন্য নতুন প্রজন্মের ওপরেই ভরসা করতে হচ্ছে। এই প্রজন্ম নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে আমাদের থেকে বেশি আগ্রহী এবং বেশি অভ্যস্ত বলেই অনেক এগিয়ে থাকে, এতে তাদের দোষ কোথায়?

আসলে সমস্যার মূল যে বাম রাজনীতির ভেতরেই নিহিত, এটা স্বীকার করতে আজও আমরা প্রস্তুত নই। যে বাম রাজনীতি ক্ষমতায় গিয়ে পুঁজিবাদের সর্বগ্রাসী প্রসার রোধ করা তো দূরে থাক, তার একদা পীঠস্থান রাশিয়া ও চিনে শোষণ-শাসনের নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে, সেই রাজনীতি কীভাবে আজকের প্রজন্মকে আকর্ষণ করবে? ইন্টারনেট আর সোস্যাল মিডিয়ার দৌলতে এই প্রজন্মের আঙ্গুলের ডগায় আজ সারা দুনিয়ার খবর, এই সংকটপূর্ণ দুনিয়ায় টিকে থাকার কঠিন বাস্তবতা সম্পর্কে তারা অতি-সচেতন এবং অতি-সতর্ক। প্রশ্ন হচ্ছে, রাশিয়া বা চিনের এই পরিণতি কেন হল, তার কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা তাদের কাছে হাজির করা গেছে কি? বা, আজকের সংকট-কালে তারা যে সুকঠিন জীবন-সংগ্রামে লিপ্ত, বাম রাজনীতি সেখানে নতুন কোন দিশা হাজির করতে পারছে কি? যে বাম রাজনীতি আপন সংকটের কারণ খুঁজে বের করতে পারে না, নতুন প্রজন্ম কেন তার পেছনে ছুটবে?

ঘটনা হল, সংসদীয় থেকে অতি-বিপ্লবী সকল ধারার বাম রাজনীতির আদর্শগত দেউলে দশা এই প্রজন্মের কাছে বড় বেশি উন্মুক্ত। নবীন প্রজন্ম চোখের সামনে দেখেছে, কীভাবে বামপন্থীরা মুখে পুঁজিবাদের বিরোধিতা করে আর কাজে বৃহৎ পুঁজির স্বার্থে কৃষকদের জমি ছিনিয়ে নিতে দ্বিধা করে না, কৃষকরা প্রতিরোধ করলে তাদের ওপর অবর্ণনীয় দমন-পীড়ন নামিয়ে আনে। শিল্পায়নের নামে অন্য পাঁচটা রাজনৈতিক দলের মতোই কর্পোরেট পুঁজির কাছে আত্ম-সমর্পণ করে। মুখে বিরোধিতা করলেও কার্যত নয়া-উদারনীতি অনুসরণ করে চলে। মাওবাদীরা মুখে নির্বাচনী রাজনীতির বিরোধিতা করলেও ভোটের সময় সংসদীয় দলের সাথে একটা বোঝাপড়া গড়ে তোলে, সর্বোচ্চ মাওবাদী নেতা ‘মমতা দিদিকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাই’ বলে মিডিয়ার কাছে বিবৃতি দেন। সর্বোপরি, সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকল্প কোন ব্যবস্থা তাঁরা চান, তা কখনও স্পষ্ট হয় না।

আসলে, কী সংসদবাদী – কী ‘বিপ্লবী’ বামপন্থীই আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল আর্থ-সামাজিক সম্পর্কগুলো, যা নিত্য-নতুন প্রযুক্তির দৌলতে নবীন প্রজন্মকে প্লাবিত করছে (প্রবীণদেরও কম করছে না), তার গতি-প্রকৃতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা-বিশ্লেষণের থেকেতাদের পূর্ব-নির্ধারিত (সেই ষাট-সত্তর দশকে প্রণীত) ধ্যান-ধারণার ধাঁচে ফেলেই আজকের জগতকে ব্যাখ্যা করতে বেশি আগ্রহী, ফলে নবীন মনের হদিস তাদের কাছে বহু অলোক-বর্ষ দূরের বিষয় হয়ে থেকে যায়। এই অবস্থায় নবীনরা যে পুরোনো বামপন্থীদের রক্ষণশীল বলে বাতিল করবে, আর এই দুই প্রজন্মের মধ্যে দূরত্ব যে দিন দিন বেড়ে চলবে, এটাকে ভবিতব্য ছাড়া আর কি বলা যাবে? নতুন কোনো ভিত্তির ওপর বাম রাজনীতির পুনর্গঠন ছাড়া এর কোনো সহজ সমাধান আছে কিনা জানা নেই। আর এযাবত প্রচলিত বাম রাজনীতির নির্মম আত্ম-নিরীক্ষা ছাড়া নতুন ভাবনার উদয় হতে পারে বলে মনে হয় না।

‘বলতে হলে নতুন কথা চেনা পথের বাইরে চল’

এই অবস্থায় দুনিয়াজুড়ে বাম রাজনীতির সুদীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য, যা একই সাথে মহান সাফল্য ও বিরাট ব্যর্থতা-মন্ডিত, তার প্রতি নির্মোহ দৃষ্টিতে ফিরে দেখা প্রয়োজন। কোথায় ভুল হল, কীভাবে বাম রাজনীতি পথ-ভ্রষ্ট হয়ে তার বিপরীতে পরিণত হল, এ নিয়ে খোলামেলা আলাপ-আলোচনা শুরু করা জরুরী। আধুনিক বামপন্থা, তথা সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের পৃথিবী-জোড়া বিশাল জটিল কর্মকান্ড নিয়ে সামগ্রিক আলোচনা মোটেই সহজ কর্ম নয়, কিন্তু আমাদের চোখের সামনে পশ্চিমবঙ্গে তথা ভারতবর্ষে গত কয়েক দশক ধরে বাম আন্দোলন যে রূপে প্রকাশিত হয়েছে, বিবর্তিত হয়েছে, সেখান থেকে আমরা শুরু করতে পারি। তার সাথে সাধ্যমত আন্তর্জাতিক বাম রাজনীতির সমস্যাগুলো মিলিয়ে দেখার চেষ্টা চলতে পারে। এই ফিরে দেখার ক্ষেত্রে মূল সমস্যা বাম রাজনীতির বিশাল ব্যাপ্তি নয়, সমস্যা এই রাজনীতিকে কাটা-ছেঁড়ার ব্যাপারে তথাকথিত বাম ও বিপ্লবী শিবিরে আত্মতুষ্টি-সঞ্জাত প্রবল অনীহা।

এই রাজ্যে বাম ও বিপ্লবী শিবিরের কর্মী-সমর্থকরা সাধারণভাবে কোন না কোন দলীয় (অর্থাৎ পার্টি-কেন্দ্রিক) রাজনীতির অনুগামী। তাঁদের ভাবনা-চিন্তা আবর্তিত হয় তাঁদের মতে ‘সঠিক’ কোনো দলের কার্যকলাপ ঘিরে, যার সামান্য সাফল্যে তাঁরা উৎসাহিত হয়ে ওঠেন। এর বাইরে কিছু মানুষ আছেন যাদের বর্তমান কোনো বাম বা বিপ্লবী দলের ওপর ভরসা নেই, কিন্তু তাঁরাও কোনো ‘সঠিক’ দলের উত্থানের প্রত্যাশায় দিনযাপন করেন, হয়ত কোনও ভারতীয় লেনিন বা মাও-এর আবির্ভাবের আশায় থাকেন, যে দল বা নেতার হাত ধরে এদেশে বাম আন্দোলন একদিন মাথা তুলে দাঁড়াবে, এই ভরসায় বুক বাধেন। বাম রাজনীতি সম্পর্কে আশা-ভরসা হারিয়ে ফেলাটা এখানে পাপ, বিপ্লবী আন্দোলনের অতীত ক্রিয়াকর্মে বড় বড় ফাঁক আর ফাঁকি নিয়ে আলোচনা করা বা সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যত নিয়ে প্রশ্ন তোলা এই শিবির-অনুগামীদের কাছে গুরুতর ‘বিচ্যুতি’ হিসেবে গন্য হয়, যা ধর্মীয় শিবিরে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার মত নিন্দনীয়।

এক কথায়, বিশেষ দলের ওপর ভরসা আর প্রথাগত বামপন্থী বা বিপ্লবী রাজনীতির ওপর ‘বিশ্বাস’—- এই দুই স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে বহু মানুষ আজও বামপন্থার প্রতি আনুগত্য অটুট রাখেন, এই ভরসা আর বিশ্বাস নিয়ে সারা জীবন কাটিয়ে দেন। এই পরিবেশে আত্ম-নিরীক্ষার প্রথম শর্ত হল, এই ভরসা আর বিশ্বাসের বিপরীতে মার্কসের প্রিয় শব্দ ‘সংশয়’-এ ফেরা। বাম রাজনীতির সমগ্র ইতিহাসটাকে মুক্ত মন আর উন্মুক্ত সমালোচনার খোলা তরবারি দিয়ে চিরে চিরে দেখা। তবেই নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্ন-সম্ভাবনাময় নতুন ভাবনা নতুন ধ্যান-ধারণার বন্ধ দরজাগুলো উন্মুক্ত হতে পারে। পুরাতনকে নির্মমভাবে সমালোচনা না করলে নতুনের দরজা খুলবে কেন? প্রশ্ন হচ্ছে, পুরোনো প্রজন্মের বামপন্থীরা এই আত্ম-নিরীক্ষার জন্য কতটা তৈরি?

সকলেই মানবেন, একটা আপেলের স্বাদ পেতে হলে তাতে কামড় বসাতে হয়, তার ভেতরে ঢুকে স্বাদ নিতে হয়, কোনো বস্তুর স্বরূপই বাইরের চেহারা দেখে বোঝা যায়না। তাই এটা মানাও জরুরী যে, একটা রাজনৈতিক সংগঠনের স্বরূপ বোঝা সম্ভব কেবলমাত্র তাকে সংশয়ের দৃষ্টিতে দেখে, তার নীতি ও কাজকর্ম নিয়ে সমালোচনা করে, খোলামনে বিরোধ-বিতর্ক তুলে, ছক-ভাঙা ভাবনার দরজা খুলে দিয়ে। একমাত্র এভাবেই একটি রাজনৈতিক দলের অন্তঃস্থলে পৌঁছনো যায়, আসল সমস্যার কাছাকাছি পৌঁছনো যায়। এই দৃষ্টিকোণ ব্যতিরেকে সারা জীবন একটা দলের হয়ে প্রাণপাত করে গেলেও বুঝে ওঠা যায় না, কেন ‘সঠিক’ রাজনীতি থাকা সত্ত্বেও একটা দল দশকের পর দশক প্রায় একই জায়গায় আটকে থাকে, কেন শোষণ-পীড়ন-বঞ্চনা বেড়ে চলা সত্ত্বেও শ্রমজীবী মানুষের কোনও উল্লেখযোগ্য আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হয় না, কেন এমনকি গণসংগ্রামের ময়দানেও দক্ষিণপন্থীরা বামেদের টেক্কা দিয়ে যায় (যেমনটা সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামে দেখা গেল)।

মুশকিল হল, এদেশের বাম আন্দোলনে তাত্ত্বিক চর্চা প্রায় অনুপস্থিত থাকায় তত্ত্বগত বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই বিশেষ কোনো দল এবং দলীয় নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বাস থেকে মানুষজন রাজনৈতিক দলে যুক্ত হন। সংসদীয় বাম বা নির্বাচন-বয়কটকারী সশস্ত্র সংগ্রামরত বিপ্লবী দল, সকল দলের ক্ষেত্রেই এটা সত্য। দলের মতাদর্শ কী, এবং দলের কাজকর্ম সেই মতাদর্শের সাথে কতটা মিলছে, এসব কদাচ পার্টি-রাজনীতির পরিসরে আলোচনার বিষয় হয়। দল ও দলের নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যই এখানে প্রথম ও শেষ কথা। বাম, বিপ্লবী বা দক্ষিণপন্থী সব দলের মধ্যেই এ ব্যাপারে আশ্চর্য মিল!

বস্তুত, এদেশে ধর্মীয় জগত যেমন মতান্ধতায় ছেয়ে আছে, তেমনি বাম রাজনীতির জগতেও মতান্ধতা ঘাঁটি গেঁড়ে আছে। ধর্মীয় মতান্ধরা যেমন মনে করেন, প্রাচীন শাস্ত্রে যা বলা হয়েছে, বেদ, বাইবেল বা কোরানে যা লেখা আছে, আজকের দুনিয়াতেও সেটাই সত্য, তেমনি এদেশের বামপন্থী কর্মীরাও মনে করেন, মার্কসবাদে সকল সমস্যার সমাধান আছে, আর তার দলের নেতারাই সবচেয়ে বেশি মার্কসবাদ বোঝেন, তাই ওই নেতারা যা করছেন, যা বলছেন, সব নির্ভুল, কর্মীদের কাজ শুধু নেতাদের নির্দেশ পালন করা। আসল কথা হল, বাম ও বিপ্লবী শিবিরে নেতা-কর্মী কারুরই মার্কসবাদ অধ্যয়ন করা বা তা নিয়ে চর্চা করার বিশেষ সময় নেই, যদিও পবিত্র গ্রন্থের মতো মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন-মাও-এর বই আলমারিতে সাজিয়ে রেখে, আর এদের সারিবদ্ধছবি দেওয়ালে টাঙিয়ে, এদের অনুসরণ করার ভান করে এদেশের বাম দলগুলো দশকের পর দশক রাজনীতি করে চলেছে।

এই অবস্থার ফলেই বাম নেতারা তাদের যাবতীয় জন-বিরোধী কাজকর্ম (পুঁজির স্বার্থে কৃষকের জমি ছিনিয়ে নেওয়া বা কৃষক হত্যার মতো কাজকেও) ওই বিপ্লবী চিন্তা-নায়কদের নাম করে চালিয়ে যেতে পারেন, দলের কর্মীদের মধ্যে তা নিয়ে বিশেষ বিরোধিতা দেখা যায় না। আর এর পরিণতিতে যখন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম, বাম মতাদর্শ সম্পর্কে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে, তখন আম-জনতা ‘ভুল বুঝছেন’ বলে নিজেদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে নেতৃত্ব।

এই অন্ধ আনুগত্য থেকেই বাম ও বিপ্লবী রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে চূড়ান্ত অসহিষ্ণুতার জন্ম দেয়, দলের সমালোচনা শুনলেই নেতা-কর্মীদের মাথা গরম হয়ে যায়। বিরোধী মতামত, সে পার্টির ভেতরে হোক বা বাইরে, তাকে যেকোনো উপায়ে দমিয়ে রাখা ‘পবিত্র’ কর্তব্য বলে মনে হয়। পার্টির শক্তি যত বৃদ্ধি পায় তত নেতা-কর্মীদের মনে সমাজের সকল মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করার বাসনা তীব্র হয়, যেমনটা পশ্চিমবঙ্গে বাম রাজত্বে হয়েছিল। ভিন রাজনীতিকে মুছে ফেলার প্রবল তাগিদ গোটা সমাজকে খাড়াখাড়ি বিভক্ত করে ফেলেছিল, সম-স্বার্থ-সম্পন্ন গরিব-মধ্যবিত্ত মানুষের মধ্যে বিভেদের প্রাচীর তুলে দিয়েছিল, এবং শেষমেষ গরিবে-গরিবে রাজনৈতিক হানাহানি শ্রেণী-ঐক্য শ্রেণী-সংহতির সর্বনাশ ডেকে এনেছিল। পশ্চিমবঙ্গে দলতন্ত্র-কলুষিত পরিবেশ তৈরির পেছনে তথাকথিত বামপন্থীদের অবদান ইতিহাসে কালো অক্ষরে লেখা থাকবে।

বামফ্রন্ট-পরবর্তী সরকার বামেদের পথ অনুসরন করে নিজেদের একাধিপত্য বিস্তার করতে চায়, যদিও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার এবং নিশ্ছিদ্র ক্ষমতার প্রাকার তৈরির বিষয়ে এই দক্ষিণপন্থীরা বামপন্থীদের কাছে শিশু। এইভাবে দলতান্ত্রিক পথে পার্টির ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। লালগড় আন্দোলন পর্বে এই সমস্যা মাওবাদীদের মধ্যেও লক্ষ করা যায়, যখন তারা ‘তাদের এলাকায়’ আন্দোলনের সমর্থক ভিন্ন রাজনৈতিক দলের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।

বাম রাজনীতির পুনর্গঠনে তাই এই প্রশ্নও জরুরী যে, বামপন্থীরা কেন এতো অগণতান্ত্রিক, কেন বিরোধী মতের প্রতি অসহিষ্ণুতাই তাদের সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে? এই অসহিষ্ণুতা বাম দলগুলোর অভ্যন্তরে, তাদের সাংগঠনিক কাজকর্মেও পুরোদস্তুর দেখা যায়। এমনকি বন্ধুত্বমূলক সমালোচনা শুনতেও নেতারা অভ্যস্ত নন। শৃঙ্খলার নামে দলের ভেতরে যেকোন সমালোচনার কন্ঠরোধ করাটাই এখানে রেওয়াজ। পার্টি নেতৃত্ব আর পার্টি লাইন বাস্তবে মুখ থুবড়ে পড়লেও তার সমালোচনা করা যাবেনা, সেটা পার্টি-বিরোধী কাজ হিসেবে তৎক্ষনাৎ চিহ্নিত করা হবে। আর এই সাংগঠনিক পদ্ধতি শুধু সিপিআই (এম) বা সংসদীয় বামেরাই অনুসরণ করে চলেন তা নয়, তথাকথিত বিপ্লবী দলেও সমস্ত রকমের বিরোধিতাকে নিকেশ করার কাজে পার্টি নেতৃত্ব সমান তৎপর থাকে। সর্বত্রই পার্টির রাজনীতি এবং সে সম্পর্কে নেতাদের ব্যাখ্যা চূড়ান্ত বলে শিরোধার্য, পবিত্র বেদ-বাইবেলের মত তা প্রশ্নাতীতভাবে অনুসরনীয়। পার্টি লাইনের বিরোধিতা উঠলেই তা ‘সংশোধনবাদী’ বা ‘সুবিধাবাদী’, ‘অতি-বাম’ বা ‘প্রতিবিপ্লবী’ ইত্যাদি কিছু না কিছু নামে চিহ্নিত করে তাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার জন্য নেতৃত্ব সক্রিয় হয়ে ওঠে।

মনে হয়, এই অসহিষ্ণুতা শুধু পশ্চিমবঙ্গে বাম রাজনীতির বৈশিষ্ট্য নয়, বরং সারা পৃথিবীতে যেখানেই বাম রাজনীতি একটু শেকড় গাড়তে পেরেছে, সর্বত্র এমনটাই দেখা গেছে। আমাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশের প্রবীণ কমিউনিস্ট নেতা (যিনি কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে তুলতে সারাজীবন ব্যয় করেছেন এবং সুদীর্ঘকাল কারাগারে কাটিয়েছেন) সত্য মৈত্র একটি পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন,

…..এই দেশের (বাংলাদেশের) কমিউনিস্ট আন্দোলনে আমরা বিরাট অসহিষ্ণুতা দেখেছি। পার্টিতে কেউ একটা মতামত দিলেন, যাদের মতের সঙ্গে মিলল না, তারা বৈরী হয়ে গেল। তার বিরুদ্ধে ঘোট তৈরি হতে লাগল, তাকে পার্টি থেকে বের করে দেয়া হলো। আর তার পক্ষের শক্তি বেশি হলে পার্টি ভাগ হয়ে গেল। এটা দুই লাইনের সংগ্রামের পদ্ধতি বিকশিত করতে না পারার ফল। এই যে দ্বিমত মানেই বৈরিতা, এই রেষারেষিটা এসেছে পেটি বুর্জোয়া সংস্কার থেকে। কোনো পার্টি এখান থেকে আজও বের হতে পারেনি। (ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘সপ্তাহের বাংলাদেশ সাপ্তাহিক’ পত্রিকার জন্য সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন আনসি রায়হান। সূত্র : www.shaptahik.com)

 

সমস্যা হল, এদেশের বাম তথা কমিউনিস্ট রাজনীতিতে পেটি বুর্জোয়া আধিপত্য নিয়েও কোনো কথা চলবে না। দলিল-দস্তাবেজে যদিও সোনার অক্ষরে ‘শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্ব’ লেখা থাকবে, কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি দল পরিচালিত হবে পেটি-বুর্জোয়া ঘর থেকে আসা উচ্চবর্ণের পুরুষ নেতাদের দ্বারা। অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এইসব দলে পেটি-বুর্জোয়া পুরুষ আধিপত্য এতটাই শক্তিশালী যে, শ্রমিক কর্মীদের দ্রুত পেটি-বুর্জোয়াকরণ হয়, উল্টোটা নয়। একইভাবে, পার্টি দলিলে সমাজে ব্রাহ্মণ্যবাদের আধিপত্য নিয়ে লেখা হলেও পার্টি সংগঠনের অভ্যন্তরে পিতৃতন্ত্র, বর্ণবাদ ইত্যাকার প্রভাব নিয়ে কোনো আলোচনা হয়না, সবচেয়ে নিপীড়িত নারী দলিত আদিবাসী কেন পার্টির নেতৃত্বে প্রায় অনুপস্থিত, এমন অস্বস্তিকর প্রসঙ্গ পার্টির পর্যালোচনা রিপোর্ট থেকে বাদ পড়ে যায়।

এই অবস্থায় কোনও কর্মী যদি দলের রাজনৈতিক লাইন বা অনুশীলন নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন তোলেন এবং তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা-বিতর্ক চালিয়ে যেতে চান, তাহলে তিনি যে নেতৃত্বের রোষের মুখে পড়বেন এতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে। এতেও আশ্চর্য হবার কিছু নেই যে, শেষ পর্যন্ত বামপন্থীরাই বামপন্থীদের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দেখা দেয়, একে অপরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, এমনকি একে অপরকে খুন করতেও দ্বিধা করেনা। সিপিএম-এর সাথে শুধু নকশালদের নয়, ফ্রন্ট শরিক আরএসপি-ফরওয়ার্ড ব্লকের সংঘর্ষের দীর্ঘ ইতিহাস আছে, আর মাওবাদী দলে যুক্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত পিপলস ওয়ার আর এমসিসি নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী লড়াই করে গেছে।

ঘটনা হল, দলের ভেতরে ও বাইরে সমস্ত বিরোধীদের নিকেশ করার এই নীতি শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়ে কমিউনিস্ট দলগুলোর অস্তিত্বই বিপন্ন করে তুলেছে। পশ্চিমবঙ্গের মত বহু জায়গায় যেমন কমিউনিস্ট নামধারী দলগুলো ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে, রাশিয়ার মত বাম বিপ্লবের সূতিকাগারে কমিউনিস্ট দল প্রায় অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে (একদা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কমিউনিস্ট দল ‘কমিউনিস্ট পার্টি অফ সোভিয়েত ইউনিয়ন’ বিলুপ্ত হয়ে গেছে)। চিনের মত কিছু দেশে কমিউনিস্ট দলের শাসন টিকে আছে বটে, কিন্তু তা বিরোধী-দমনে যেকোনো ফ্যাসিবাদী দলের আদর্শ হতে পারে। অর্থাৎ আমাদের রাজ্যে বা দেশে বাম রাজনীতির যে হাল আমরা দেখছি, তা বিশ্বের বাম রাজনীতির পরিণতির সাথে খুব অসঙ্গতিপূর্ণ, এটা বোধহয় বলা যাবে না।

সামগ্রিকভাবে বাম রাজনীতির এমন পরিণতি এই রাজনীতি সম্পর্কে গভীর অন্তর্তদন্ত দাবি করে। বাম দলগুলো যেমন ৪/৫ বছর অন্তর পার্টি কংগ্রেস বা সম্মেলন করে কাজের পর্যালোচনা করে থাকে, যেখানে নেতৃত্ব-নির্ধারিত মূল রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক লাইন নিয়ে কাটা-ছেঁড়া হয়না বললেই চলে, তেমন চেনা ছকে হেঁটে এই সমস্যার গভীরে পৌঁছনো যাবে বলে মনে হয়না। বরং আজকের বিশ্বজুড়ে নতুন ভাবনা আর নতুন ধরণের জন-জাগরণের যে ঢেউ আছড়ে পড়ছে, খোলা মন নিয়ে তা অনুধাবন করা প্রয়োজন। সর্বোপরি, গত শতকের কমিউনিস্ট বিপ্লব আর সমাজতন্ত্রের গরিমা নিয়ে চর্বিত-চর্বণ না করে বরং মানব সমাজের সর্বশ্রেষ্ঠ এই গণ-বিপ্লবগুলো কেন এবং কীভাবে এমন জনবিরোধী পরিণতি লাভ করল, গোড়া থেকেই তার তত্ত্ব-তালাশ করা জরুরী বলে মনে হয়।

আজকের দুনিয়ায় পুঁজিবাদ আরো বেশি আগ্রাসী ও বিধ্বংসী হয়ে উঠেছে। নিত্য নতুন প্রযুক্তির বিকাশকে পুঁজির অমিত খিদে মেটাতে কাজে লাগানো হচ্ছে। মুনাফার সন্ধানে বিশ্বের প্রতিটি কোণে, প্রত্যন্ততম অঞ্চলেও নিজের জাল বিস্তার করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট করে এক ধ্বংস-যজ্ঞে লিপ্ত হয়েছে পুঁজিবাদ। যতই পুঁজিবাদ ডানা বিস্তার করছে, ততই এই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ তমসাচ্ছন্ন হচ্ছে, হলিউড সিনেমার মত কোনো ‘এলিয়েন’ বা ভিন গ্রহের জীব নয়, তথাকথিত সভ্য আধুনিক মানুষই উন্নয়নের নামে এক অন্ধকার ভবিষ্যত ডেকে আনছে, এই পৃথিবীর যা কিছু সুন্দর তাকেই ব্যবসার সামগ্রী বানিয়ে লুঠ করছে তার রূপ-রস-গন্ধ, রিক্ত করছে প্রকৃতিকে, বিপন্ন করে তুলছে এই ধরিত্রীর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণী থেকে মানুষ পর্যন্ত প্রতিটি প্রজাতির অস্তিত্ব।

পুঁজিবাদের বিকল্প অনুসন্ধান থেকেই আধুনিক বামপন্থার জন্ম, সমাজবাদ তথা সাম্যবাদী তত্ত্বের নির্মাণ ও অনুশীলনের সূত্রপাত। বলা যায়, বিগত শতক জুড়ে এই বিকল্প অনুসন্ধানের প্রথম পর্ব চলেছে, শেষ পর্যন্ত বিকল্প-নির্মাণের প্রচেষ্টা সফলতা পায়নি বটে, কিন্তু প্রায় এক শতক-ব্যাপী সমাজ-বিপ্লবের নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা মানব সমাজের ইতিহাসকে পুনর্নির্মাণ করেছে, বিকল্প অনুসন্ধানের তাগিদ আরো অনেক বিস্তৃত হয়েছে, এই অনুসন্ধান ছড়িয়ে পড়েছে সমাজের প্রায় সর্বস্তরে, প্রতিটি নিপীড়িত জন-গোষ্ঠির মধ্যে। পুঁজিবাদ বিরোধী চেতনা আজ বৃহত্তর জনসমাজে বহু বিচিত্র রূপে প্রকাশ পাচ্ছে।

এই বহুমাত্রিক চেতনাকে ধারণ করার জন্য একবিংশ শতকের বাম রাজনীতিকে পুনর্গঠন করতে হবে, নতুন চিন্তা, নতুন ভাবনা, নতুন নীতি ও কৌশল দিয়ে তাকে ঢেলে সাজাতে হবে। এবং অবশ্যই তা হতে হবে অনেক অনেক বেশি গণতান্ত্রিক, বিভিন্ন মত ও পথকে ধারণ করে এগনোর মত উদার ও সহনশীল। সাধারণভাবে মনে হয়, পুরনো বাম দলগুলো সেই কাজে অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে, প্রথাগত ভাবনা ছেড়ে বের হবার প্রায় কোনো লক্ষণ তাদের ভেতরে নেই, নেই নতুন ভাবনা বেড়ে ওঠার পরিসর। স্পষ্ট করে বললে,কেন্দ্রীভূত সাংগঠনিক কাঠামো আর বাঁধা-ধরা ছকে সমাধান খোঁজার অভ্যাস থেকে মুক্ত না হলে বোধ করি সাম্যবাদী রাজনীতির মুক্তিলাভ হবে না।

এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, ১০০ বছর আগে ঘটে যাওয়া ‘দুনিয়া কাঁপানো’ রুশ বিপ্লব একদিকে যেমন পুঁজিবাদের ভিত নড়িয়ে দিয়েছিল, অন্যদিকে এই বিপ্লবের কামান গর্জন পৃথিবী জুড়ে মার্কসবাদ তথা সাম্যবাদের বার্তাকে পৌঁছে দিয়েছিল। সূচনা হয়েছিল আধুনিক সাম্যবাদী আন্দোলনের এক গৌরবময় অধ্যায়ের। দুনিয়াব্যাপী নিপীড়িত মানুষের এমন জাগরণ মানব ইতিহাসে আর কখনো দেখা যায় নি। মানবসমাজ আর কখনো এমন করে আলোড়িত হয়ে মথিত হয়ে ওঠেনি, এমন করে নিপীড়িত মানুষ আর কখনো ইতিহাসের রঙ্গমঞ্চে উঠে আসেনি, এমন করে আর কখনো পুরাতন সবকিছুকে ভেঙ্গে-চুরে পুনর্নির্মাণ করার কাজ শুরু হয়নি, এমন করে আর কখনো মানুষ মুক্তির স্বপ্নে উদ্বেল হয়ে ওঠেনি।

কিন্তু শতকের শেষে এসে দেখা গেল সেই গৌরব-গাঁথা মলিন হয়ে গেছে, বিপ্লবের স্বপ্ন জনমানস থেকে হারিয়ে গেছে, প্রতিটি বিপ্লব প্রায় অনিবার্যভাবে প্রতিবিপ্লবে পরিণত হয়েছে, বিপ্লবে অর্জিত যা কিছু সাফল্য সব মুছে যাচ্ছে জনমানস থেকে, আর বিপ্লবী নায়কদের চূড়ান্ত অবমূল্যায়ন চলছে, সাম্যবাদী উত্থানের নাম-নিশানা মুছে দিয়ে পুঁজিবাদ যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে চাইছে। কিন্তু গত এক শতকের ঘটনাবলী দেখিয়ে দিয়েছে, মানব-সমাজ পতন-অভ্যুদয়-বন্ধুর-পন্থা ধরে এগিয়ে চলে, এখানে সর্বাধিক জ্ঞানী মানুষটিও শেষ কথা বলার অধিকারী নন। অথচ ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ তত্ত্বের জনক মার্কিন অধ্যাপক ফ্র্যান্সিস ফুকুয়ামার নিদেন দিয়ে দিলেন পুঁজিবাদই শেষ কথা, কারণঃ

পশ্চিম দুনিয়া তথা পশ্চিমী ধ্যান-ধারনার বিজয় সর্বোপরি একথা প্রমাণ করছে যে, পশ্চিমী উদারতাবাদের কার্যকরী বিকল্প নিঃশেষিত হয়ে গেছে। (Francis Fukuyama, ‘The End of History?’, The National Interest, Summer 1989)।

অর্থাৎ পুঁজিবাদের বিকল্প আর কিছু হবে না, হতে পারে না। গত শতকে অনুশীলিত পার্টিতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র যে পুঁজিবাদের বিকল্প হতে পারেনি, সে তো প্রমাণিত। কিন্তু তার মানে এই নয় যে পুঁজিবাদেই ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’। এর বিপরীতে আমরা সমাজতন্ত্র নিয়ে অতি আশাবাদ দেখি লাতিন আমেরিকার মাটিতে যেখানে কিছু দেশে (মূলত ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া ও ইকোয়াডর) সাম্প্রতিক সমাজবাদী পরীক্ষা-নিরীক্ষাকে ‘একুশ শতকের সমাজবাদ’ বলে সমাজতাত্ত্বিক হেইঞ্জদিয়াতারিক ঘোষণা করেছেন। (Economic and Political Weekly, 25 February 2012  সংখ্যার সম্পাদকীয় থেকে উদ্ধৃত)। লাতিন আমেরিকার কিছু রাজনৈতিক দল ও নেতার সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী অবস্থান ও কাজকর্ম নিঃসন্দেহে সাম্প্রতিককালের উল্লেখযোগ্য ঘটনা, কিন্তু তা বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদের বিকল্প মডেল হয়ে উঠেছে, এমনটা ভাবা কষ্ট-কল্পনা ছাড়া আর কিছু নয়।

একুশ শতক কেমন যাবে, সেকথা কেউ বলতে পারে না। ১০০ বছর লম্বা সময়, এই সময়ের মধ্যে অনেক কিছুই ঘটতে পারে যা আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে কল্পনাতেও আনা সম্ভব নয়। ১৯১৪ সালে যখন সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো পৃথিবীকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার জন্য মরণপণ যুদ্ধে সারা পৃথিবীকে জড়িয়ে দিয়েছিল, তখন কে কল্পনা করতে পেরেছিল সেই বিশ্বযুদ্ধের গর্ভে একটা শ্রমিক বিপ্লবের বীজ অংকুরিত হচ্ছে, যে বিপ্লব ওই শতকের ইতিহাসকে ওলটপালট করে দেবে, মানবেতিহাসে বহু নতুন উপাদানে যুক্ত করবে, মানব সভ্যতার গতি-পথকে নির্ধারকভাবে পাল্টে দেবে। রুশ বিপ্লব না ঘটলে আজকের পৃথিবীটা নিঃসন্দেহে অন্য রকম হত।

মানুষের ইতিহাস তাই কোনো ব্যক্তির সদিচ্ছা বা পূর্বানুমানের ওপর নির্ভর করে এগোয় না। অনুসন্ধানী মন নিয়ে আমরা তাই গত শতকের বাম রাজনীতির ইতিহাস আত্মানুসন্ধান শুরু করতে পারি, যে শতক শুরু হয়েছিল বিপ্লবী রাজনীতির বিপুল উত্থানের মধ্যে দিয়ে, বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদের বিকল্প প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন আর প্রতিজ্ঞা নিয়ে, আর শেষ হল বাম রাজনীতির মুমূর্ষু দশায়, যখন আজকের সময়ে এই রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতাই প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে।

বাম রাজনীতির এই বিবর্তনকে আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করতে পরি? এটা কি এক বস্তুর ভিন্ন এক বস্তুতে রূপান্তর, না কি একটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক পরিণতি, যা স্থান-কাল নির্বিশেষে সর্বত্র ঘটে চলেছে, যা অনিবার্য? দেশে দেশে যখন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়, তখন তার পেছনে সাধারণ কিছু নিয়ম বা সূত্র খোঁজাই কী স্বাভাবিক নয়? বাম রাজনীতির সুদীর্ঘ ইতিহাস এমন বহু মতাদর্শগত প্রশ্ন তুলে সামনে নিয়ে এসেছে, যা এড়িয়ে গিয়ে বাম রাজনীতির পুনরুজ্জীবনের দিকে এক ধাপও এগনো যাবে বলে মনে হয় না

 

  • লেখক সমাজকর্মী, গবেষক ও প্রাবন্ধিক
  • মতামত লেখকের নিজস্ব
Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on পশ্চিমবঙ্গে বাম রাজনীতির ভবিষ্যত

Leave A Comment