সারা বিশ্বের সাথে কলকাতাতেও সংগঠিত হয়ে গেল ‘বিশ্ব জলবায়ু ধর্মঘট’

আজকের খবর গণ-আন্দোলন বিশেষ খবর

Last Updated on 4 weeks by admin

নিজস্ব সংবাদদাতা, ২৫ সেপ্টেম্বর,২০২১ :

“There is no plan(B)et” -, কথাটা পাথরের মতো অটল। সত্যিই যাওয়ার মতো কোনো দ্বিতীয় বিকল্প প্ল্যানেট নেই। বেচেবর্তে থাকতে হবে এই পৃথিবীতেই। আর এই পৃথিবী গত কয়েক বছর ধরে এবং আগামী কয়েক দশক বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীদের জন্য। জলবায়ু পরিবর্তন লাগাতার ঘটে চলেছে। কিন্তু রাষ্ট্রনেতাদের সেদিকে হেলদোল নেই। তারা শুধুই বৈঠক করে, আর রিপোর্ট প্রকাশ করে। আর সেখানেই বলা হচ্ছে যে NO PLAN-B। সুস্থ পরিবেশে বাঁচার জন্য এই ব্যবস্থার মধ্যে থেকে কোনো প্ল্যান-বি সমাধান বেরিয়ে আসবে না। গত তিনবছর ধরে চলা বিশ্বব্যাপী আন্দোলন “ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার” এর ডাকে গতকাল ২৪শে সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বিশ্ব জলবায়ু ধর্মঘট বা গ্লোবাল ক্লাইমেট স্ট্রাইক।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কয়েক লক্ষ পরিবেশপ্রেমী, বিজ্ঞানী, ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, গণ-আন্দোলন, সামাজিক আন্দোলন, সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ অংশ নিলেন জলবায়ু ধর্মঘটে। সরাসরি ডাক দেওয়া হল এই মুনাফাকেন্দ্রীক, পরিবেশ-প্রকৃতি হরণকারী ব্যবস্থা উপড়ে ফেলার।

চলমান ব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলার ডাক দিয়ে বার্লিনে জলবায়ু আন্দোলনের মুখ গ্রেটা থুনবার্গের উপস্থিতিতেই ছয় লক্ষ মানুষের জমায়েত হয়েছে। বার্লিন বাদেও ক্যালিফোর্নিয়া, রিও ডি জেনেরিও, নিউ ইয়র্ক, অ্যামস্টারডাম, মেলবোর্ন, টোকিও, মস্কো, মিলান, প্যারিস সহ বিশ্বের বিভিন্ন সেন্টার শহরে কোথাও পঞ্চাশ হাজার, কোথাও বা এক লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন জলিবায়ু সুবিচারের দাবীতে। আর জলবায়ু সুবিচার যে সামাজিক সুবিচার, লিঙ্গ সুবিচার, অর্থনৈতিক সুবিচার, সাংস্কৃতিক সুবিচার তথা রাজনৈতিক সুবিচার ছাড়া আসা সম্ভব নয় তাও তুলে ধরেছেন গতকাল রাস্তায় নামা কয়েক লক্ষ জনতা।

#UprootTheSystem এই হ্যাশট্যাগ আজকের গোটাদিন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটারে ট্রেনডিংয়ে শীর্ষে থাকল। বার্লিন, মস্কো, ক্যালিফোর্নিয়া, ওয়াশিংটন, ম্যানচেস্টার, মিলান, মাদ্রিদ, মেলবোর্ন, রিও ডি জেনেরিও, ঢাকা হয়ে আমাদের দেশের দিল্লি, কলকাতা, মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোর; বিশ্বের বিভিন্ন বড়ো শহরে পথে নামলেন সাধারণ মানুষ।

গতকাল পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা সহ অন্যান্য জেলাতেও অনুষ্ঠিত হলো জলবায়ু ধর্মঘট। মালবাজারে “ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার মালবাজার” সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত হল ধর্মঘট। কচিকাঁচাদের গলায় উঠে এল কৃষক আন্দোলনের সমর্থনে গান। পরিবেশ আন্দোলনের সাথে কৃষক আন্দোলন যে অঙ্গাগীভাবে জড়িত তা গানে – স্লোগানে বুঝিয়ে দিল ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা। দুর্গাপুরে বিকেল থেকে চলল ধর্মঘটের সমর্থনে পথসভা। “দুর্গাপুর রেসপন্স অন ক্লাইমেট চেঞ্জ” সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত হল এই সভা। হাওড়ায় ডুমুরজলা স্টেডিয়াম চত্ত্বরে ছাত্রছাত্রী – শিক্ষকদের উপস্থিতিতে নাচে, গানে, কবিতায় তুলে ধরা হলো জলবায়ু সংকটের কথা। “হাওড়া বিজ্ঞান চেতনা সমন্বয়”, “সাঁতরাগাছি ঝিল বাঁচাও কমিটি” র উদ্যোগে আয়োজিত হলো এই কর্মসূচী। কলকাতার শ্যামবাজারে সকাল বেলায় আয়োজিত হলো ধর্মঘট।

কলকাতার শহীদ মিনারে হল কেন্দ্রীয় জমায়েত। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ উপস্থিত হলেন কেন্দ্রীয় জমায়েতে। “গ্লোবাল ক্লাইমেট স্ট্রাইক অরগানাইজিং কমিটি (কলকাতা)” সংগঠনের সদস্যরা পরিবেশ বিপর্যয় এবং তার জন্য দায়ী পুঁজিবাদী ব্যবস্থা উপড়ে ফেলার ডাক দিলেন। পরিবেশপ্রেমীরা সহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা এদিন নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরলেন। ছাত্রছাত্রী সংগঠন গুলির মধ্যে PDSF, ISU, AISA; Fridays For Future West Bengal এর সদস্যরা এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বিজ্ঞান সংগঠন, পরিবেশ সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন পার্ক সার্কাসের CAA-NRC বিরোধী আন্দোলনের প্রতিনিধিরা।  বজবজের চড়িয়াল খাল বাঁচানোর আন্দোলন, যশোর রোডের গাছ বাঁচাও আন্দোলন, ধুলাগড়ের অম্বুজা সিমেন্ট কোম্পানির দূষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন, পুরুলিয়ার অযোধ্যায় ঠুরগা পাম্প স্টোরেজ এর বিরুদ্ধে আন্দোলনরত প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখলেন। সুদূর বীরভূম জেলার দেওচা পাঁচামী থেকে এদিন হাজির ছিলেন আন্দোলনরত শ্রমজীবী মানুষেরাও। তাদের বক্তব্যে উঠে এল কীভাবে ‘উন্নয়নের” নামে দেওচা পাঁচামিতে সরকার প্রাণ-পরিবেশ-প্রকৃতি বিরোধী খোলামুখ কয়লা খনি তৈরি করার পরিকল্পনা করেছে এবং তার ফলে সেই অঞ্চলের মানুষ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এছাড়াও নদী বাঁচাও আন্দোলন, জলাভূমি বাঁচানোর আন্দোলন গুলি থেকেও প্রতিনিধিত্ব করলেন সংশ্লিষ্ট আন্দোলন গুলির প্রতিনিধিরা। ফেসবুকের জনপ্রিয় গ্রুপ “আঁকিয়েদের আড্ডা” র তরফ থেকে জল-জঙ্গল-জমির অধিকার বিষয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হলো, শিল্পের মাধ্যমে ফুঁটিয়ে তোলা হলো জলবায়ু সংকটকে৷ সুন্দরবন বিশ্বের এইমুহূর্তে পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম হটস্পট। সেই সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার লড়াই করার জন্য সদ্য তৈরি সংগঠন “সুন্দরবন শ্রমজীবী অধিকার রক্ষা সমিতির” প্রতিনিধিরাও নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরলেন আজকের সুন্দরবনের মূল সমস্যাগুলি।

বক্তব্যের সাথে সাথেই সাংস্কৃতিক ভাবেও পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষার ডাক দেওয়া হলো। কমিটির পক্ষ থেকে একাধিক দাবী সম্বলিত দাবীপত্র ও সেখানে একাধিক মানুষের সাক্ষর সহ রাজ্যপালের কাছে ডেপুটেশন দেওয়া হয়। এবং অনুষ্ঠান শেষে গ্লোবাল ক্লাইমেট স্ট্রাইক অরগানাইজিং কমিটির পক্ষে জানানো হয় – “এই লড়াইয়ের মুখ্য অভিমুখ থাকবে ব্যবস্থা বদলের। যে ব্যবস্থা আসলে আজকের এতো বড়ো জলবায়ু সংকটের জন্য দায়ী।“ এই একদিনের প্রতীকী ধর্মঘটে এই আন্দোলন শেষ নয়, বরং সমাজের মধ্যে লাগাতার প্রকৃতি পরিবেশ জীবন জীবিকা রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাবেন বলে তাঁরা জানান।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on সারা বিশ্বের সাথে কলকাতাতেও সংগঠিত হয়ে গেল ‘বিশ্ব জলবায়ু ধর্মঘট’

Leave A Comment