গোলওয়ালকরের হিন্দুত্বঃ ধর্মের সাথে সম্পর্কহীন এক আগ্রাসী রাজনৈতিক দর্শন

পর্যালোচনা মতামত

Last Updated on 7 months by admin

প্রণব কান্তি বসু

হিন্দু ধর্মের যে দার্শনিক ভিত্তি, তার সাথে গোলওয়ালকর বা সাভারকর প্রদর্শিত হিন্দুত্বের কোনোরকম মিলই নেই। গতকাল আরএসএস-এর দ্বিতীয় সর্বময় কর্তা, অর্থাৎ সরসঙ্ঘ চালক, এম এস গোলওয়ালকরের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রী প্রহ্লাদ প্যাটেল তাঁর সরকারি টুইটার হ্যান্ডেলে বলেন “স্মরণ করি একজন বিরাট চিন্তক, পণ্ডিত এবং অসাধারণ নেতা, এম এস গোলয়ালকারকে তার জন্ম বার্ষিকীতে। তার চিন্তা আগামী অনেক প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে এবং পথ প্রদর্শন করবে“। আপাতভাবে আরএসএস বা সংঘ পরিবার নিজেকে একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে সমাজে হাজির করে। একই সাথে তারা দলিত আদিবাসীদের বন্ধু হিসেবেও নিজেদের তুলে ধরতে চায়। আরএসএস-এর পরিচালিত শাখা সংগঠনগুলি মূলনিবাসী মানুষদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার করছে, মতুয়া এবং অন্যান্য দলিত বহুজনদের বাড়িতে শাহ তার সাঙ্গ-পাঙ্গ সমেত খাচ্ছে, দলিত সম্প্রদায় থেকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু বাস্তবে এটা সঙ্ঘ পরিবারের মুখোশ। তার আড়ালে রয়েছে ভয়ঙ্কর জাত্যাভিমান, যা হিটলারের নাৎসি পার্টির ভাবনাচিন্তার মতই ভয়াবহ। বিষয়টা গোলওয়ালকারের বিভিন্ন লেখা থেকে কিছু উদ্ধৃতি দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যায়।

  • এটাই হিন্দু সংস্কার। আমরা যেন সকাল থেকে সন্ধ্যে অবধি অনুশাসনের ভিত্তিতে আমাদের জীবন গঠন করি। একজন হিন্দু জন্মই নেয় সারা জীবন অনুশাসন ও আত্ম-নিয়ন্ত্রণের শিক্ষা-ব্রতী হতে, যার মধ্যে দিয়ে সে শুদ্ধ ও বলশালী হয় জীবনের মহত্তম লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য” (Bunch of Thoughts, পৃ: ৬৪)। শুদ্ধ/অশুদ্ধ বিভাজন বর্ণ ব্যবস্থার ভিত্তি। অনুশাসন, আত্ম-নিয়ন্ত্রণ এ সমস্ত ধারণাগুলি প্রবর্তন করা হয় শূদ্র এবং দলিত-বহুজন সমাজকে অবদমিত রাখার জন্য।
  • সমাজকে ভাবা হয়েছে সর্বশক্তিমানের চার অংশে প্রকাশ রূপে, যাকে সবাই তার নিজস্ব রীতি ও ক্ষমতা অনুযায়ী পূজা করবে। যদি একজন ব্রাহ্মণ মহৎ হয় জ্ঞান বিতরণ করে, একজন ক্ষত্রীয় মান্যতা পায় শত্রু নিধন করে। কোন অংশে খাট নয় সেই বৈশ্য যে সমাজকে পরিপোষণ করে কৃষি ও বাণিজ্যের মাধ্যমে, অথবা শূদ্র, যে সমাজকে সেবা করে শিল্প ও কলার মাধ্যমে। একত্রিতে, পরস্পর নির্ভরতা জাত অভিন্নতা বোধের মধ্যে দিয়ে তারা সামাজিক শৃঙ্খলা গড়ে তোলে” (ঐ, পৃ: ৯৮)।

ব্রাহ্মণ্য ধর্মে যাদের নিচু জাত বলে গণ্য করে আরএসএসের দ্বিতীয় প্রধান গোলয়ালকার তাদের জিনগত কারণে নিম্ন প্রজাতির মানুষ মনে করত: “আজকের দিনে ক্রস প্রজনন বা সঙ্কর প্রাণির প্রজননের পরীক্ষা শুধু মাত্র পশু শ্রেণিতেই সীমিত। কিন্তু মনুষ্যপ্রজাতির ওপর এই পরীক্ষা করার সাহস আজকাল এমন কি তথাকথিত আধুনিক বিজ্ঞানীরা দেখায় না। কোন কোন মানুষের মধ্যে এই প্রবৃত্তি দেখা যায়, তবে তা যৌন লালসার ফল, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার কারণে নয়। এবার দেখা যাক এই বিশেষ ক্ষেত্রে আমাদের পূর্বপুরুষদের পরীক্ষা নিরীক্ষা। মনুষ্যপ্রজাতির উন্নতিসাধনের উদ্দেশ্যে উত্তর ভারত থেকে নাম্বুদিরি ব্রাহ্মণদের এনে কেরলে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়। এবং নিয়ম করে  দেওয়া হয় যে নাম্বুদিরি পরিবারের বড় ছেলে শুধু ক্ষত্রিয় বৈশ্য অথবা শূদ্র কন্যাকে বিয়ে করতে পারবে। সমাজ আরও সাহসী নিয়ম চালু করেছিল যে, যে কোন বর্ণের বিবাহিত কন্যার প্রথম সন্তান হবে ব্রাহ্মণের ঔরসজাত, তার পরে সে তার বিবাহিত স্বামীর সন্তান ধারণ করতে পারবে। আজ এই ধরণের পরীক্ষাকে ব্যভিচার বলা হবে কিন্তু তা তো ছিল না কারণ এ তো শুধু প্রথম সন্তানের ক্ষেত্রে সীমিত ছিল”। (গোলওয়ালকার, জানুয়ারি ২, ১৯৫১ অরগানাইজার পত্রিকার পঞ্চম পৃষ্ঠা থেকে উদ্ধৃত)

নাগপুর, যেখানে আরএসএস এর প্রধান কার্যালয়, সেখানকার একটি পার্লার এর ছবি। ছবি: শ্রেণিক রাও

তার জাতি চিন্তার সঙ্গে জার্মান নাৎসিদের চিন্তার হুবহু মিল পাওয়া যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ ছিল আর্য হিসাবে জার্মান নাৎসিদের জাত্যাভিমান। শ্রেষ্ঠ জাতি হিসাবে তারা তাদের আধিপত্য সারা বিশ্বে বিস্তার করার চেষ্টা করে। এর থেকেই বিশ্বযুদ্ধের সূচনা। জাত্যাভিমানের অপর দিক অন্যদের প্রতি ঘৃণা। নাৎসিদের বিশেষ ঘৃণার পাত্র ছিল ইহুদিরা। লক্ষ লক্ষ ইহুদিদের বন্দিশিবিরে নানা নিপীড়নের পর তাদের শরীরের ওপর গিনিপিগদের মত নানা পরীক্ষানিরীক্ষার পর, তাদের অন্তিম গন্তব্য ছিল গ্যাস চেম্বার। হিসাব মত ৩০ লক্ষ্যের বেশি ইহুদি হত্যা হয়েছিল এই বীভৎস বন্দি শিবিরগুলিতে, শুধু মাত্র পোল্যান্ডেই। সোভিয়েত রাশিয়াতে প্রায় ২০ লক্ষ এবং বাকি ইয়োরোপে সহস্র ইহুদি খতম হয় নাৎসি পার্টির এই নৃশংস গণহত্যা অভিযানে।

এই সম্বন্ধে গোলওয়ালকারের বক্তব্য: “জার্মানদের জাত্যাভিমান আজকের দিনে সব চেয়ে আলোচিত বিষয়। জার্মানি বিশ্বকে প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়েছিল তাদের জাতি ও সংস্কৃতিকে বিশুদ্ধ রাখার জন্য দেশকে ইহুদি জাতি মুক্ত করে। এখানে জাত্যাভিমান তার শিখর ছুঁয়েছে। জার্মানি দেখিয়ে দিয়েছে যে, যে জাতি এবং সংস্কৃতিগুলির মধ্যে পার্থক্য তাদের শিকড়ে, তাদের একটা সামগ্রিক ঐক্যে মিলিত করা প্রায় অসম্ভব, এটা আমাদের হিন্দুস্তানের পক্ষে একটি মূল্যবান শিক্ষা যার থেকে আমরা লাভ করতে পারি” (গোলওয়ালকার, We or Our Nation Defined পৃ: ৩৫)

গোলওয়ালকার যে দেশের পথপ্রদর্শক, সেই দেশ হিটলারের দেশ। গোলওয়ালকরের হিন্দুত্বের সাথে হিন্দুধর্মের সম্পর্ক প্রায় নেই বললেই চলে। বরং এর সাথে হিটলার মুসোলিনির ফ্যাসিবাদের মিল বহুগুণে বেশি। তাই গোলওয়ালকরের ভাবশিষ্য মোদি – অমিত শাহরা যে দেশ তৈরি করতে চায় সে দেশে ভ্রাতৃহনন, নারী অবদমন, বর্ণভেদ চিরস্থায়ী ব্যবস্থা হয়ে থাকবে। 

ছবি: রিয়াজ শেখ
Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
No Thoughts on গোলওয়ালকরের হিন্দুত্বঃ ধর্মের সাথে সম্পর্কহীন এক আগ্রাসী রাজনৈতিক দর্শন

Leave A Comment