গুজরাটে কোভিড-১৯ চিকিৎসায় অক্সিজেন সরবরাহ করতে ও হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে ব্যর্থ সরকার

আজকের খবর বিভাগ-বহির্ভূত বিশেষ খবর

Last Updated on 5 months by admin

বিশেষ সংবাদদাতা, ৪ মে,২০২১ :

কোভিড-১৯ মারি নিয়ে দিল্লি বা অন্যান্য রাজ্য নিয়ে যত হইচই হচ্ছে গুজরাট নিয়ে সেভাবে কোনো খবর প্রায় আসছে না। বেশির ভাগ সংবাদ মাধ্যম সেখানকার কোভিড পরিস্থিতি ও চিকিৎসার অব্যবস্থা নিয়ে খবর করছে না।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সহ আরো অনেক কেন্দ্রীয় সরকারের নেতা মন্ত্রীর নিজের রাজ্য।  গুজরাটে কোভিড -১৯ –এর দ্বিতীয় ঢেউ কতগুলো বানানো ‘মিথ’কে ভেঙ্গে খান খান করে দিয়েছে।  তার মধ্যে ‘গুজরাট মডেল’ নামক মিথ। এই ’মিথ’ নিয়ে রাজ্যে রাজ্যে ভোটের প্রচার করেছে প্রধানমন্ত্রী ও সরাষ্ট্রমন্ত্রী সহ আরো অনেক বিজেপি নেতারা। সেই ‘মিথ’-এর ফোলানো ফাঁপানো বেলুন ফুটো করে দিল কোভিড ১৯। আর সেই ফুটো বন্ধ করতে মানুষের চোখের সামনে পর্দা ঝোলানোর কাজে ব্যস্ত গুজরাট সরকার থেকে কেন্দ্র সরকার। তাই তারা আজ খবরগুলো চেপে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

শ্বাস কষ্টে হাঁপাতে থাকা শত শত  কোভিড রোগী অক্সিজেনের জন্য গুজরাটের হাসপাতালগুলোর বাইরে লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তখন প্রধানমন্ত্রী মোদী- সরাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ দুজনেই তখন পশ্চিমবঙ্গ ও আরো কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচনী জনসভায় প্রতিশ্রুতির ফানুষ ওড়াচ্ছিলেন – ‘গুজরাট মডেল’-এর গল্প শোনাচ্ছিলেন। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রুপানী সগর্বে ঘোষণা করেছিলেন – রাজ্য সরকার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে আয়ুর্বেদিক ও হোমিওপ্যাথির ওষুধ বিতরণ করবে। গুজরাটের বিজেপি রাজ্য সভাপতি রেমডেসিভির ইনজেকশন সংগ্রহের জন্য লোকজনকে সুরাটে বিজেপি অফিসে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। যখন হাসপাতালে এই জরুরী ওষুধ পাওয়া যাচ্ছিল না – তখন বিজেপি পার্টি অফিসে সেই রেমডেসিভির ইনজেকশন বিলি করা হয়েছে।

কোভিড রোগীদের যখন মৃত্যু হচ্ছে চিকিৎসার অভাবে, ডাক্তার স্বস্থ্যকর্মীরা যখন লড়াই করছেন রোগীর জীবন বাঁচানোর জন্য – প্রধানমন্ত্রী-সরাষ্ট্রমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী তখন ব্যস্ত ফুটো বেলুন ঢাকা দিতে।  ডাক্তাররা বারবার সরকারের কাছে অক্সিজেন সরবরাহের আবেদন জানাচ্ছেন – মুখ্যমন্ত্রী তখন হোমিওপ্যাথি ও আয়ুর্বেদিক ওষুধ বিলির প্রতিশ্রুতিতে ব্যস্ত। আর প্রধানমন্ত্রী তখন পশ্চিমবঙ্গে  ‘দিদি, ও দিদি’ বলে অভিনয় করে সস্তার হাততালি পেতে ব্যস্ত ছিলেন। (যদিও পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, তামিলনাড়ুতে তাঁরা ধাক্কা খেয়েছেন ভোটের ফলাফলে)।

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের প্রচার শেষ হওয়ার পরেই অমিত শাহ তার নিজের রাজ্য গুজরাটে এসেছিলেন। তখন সেখানে করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় তরঙ্গ  সুনামির মতো ছড়িয়ে পড়ে এক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। শাহ আহমেদাবাদের একটি ডিআরডিও-গুজরাট বিশ্ববিদ্যালয়ে কোভিড হাসপাতালের উদ্বোধন করতে গিয়েছিলেন (যদিও সেই হাসপাতাল কোনো কার্যকরিতা নেই বলে অভিযোগ)। তাঁর নিজের নির্বাচনী এলাকা গান্ধিনগরে একটি আয়ুর্বেদিক হাসপাতালে ২৮০ লিটার অক্সিজেন প্ল্যান্ট উদ্বোধন করেন। তখন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন, – শীঘ্রই গুজরাটে আরও ১১ টির মতো অক্সিজেন প্লান্ট স্থাপন করা হবে।

আহমদাবাদের জিএমডিসি মাঠে শাহ যে কোভিড হাসপাতালটি উদ্বোধন করেছিলেন, সেখানে গুরুতর রোগীরা ভর্তি হওয়ার জন্য ছুটে আসেন, তাদের  ফিরিয়ে দেওয়া হয় – হাসপাতাল চালু হয় নি বলে। সেই হাসপাতালকে পুলিশ ঘিরে রেখেছিল। অত্যাধুনিক এই হাসপাতালটি আজ খালি বিছানা এবং সাজানো গোছানো – সিনেমার সাজানো হাসপাতালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। অমিত শাহ যখন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন অক্সিজেন প্ল্যান্টের ব্যাপারে, তখন আহমদাবাদ, ভদোদরা এবং রাজকোট সহ গুজরাটের বেশ কয়েকটি শহরে অক্সিজেনের অভাবে হাঁপাতে হাঁপাতে মারা গেছে ৫০ জনেরও বেশি গুরুতর কোভিড রোগী।

২৩ এপ্রিল অক্সিজেন সরবরাহের অভাবে রাজকোটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চার রোগী মারা গিয়েছিলেন। এর আগে, নওসরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ছয়জন রোগী মারা গিয়েছিলেন, বনাসকণ্ঠের দুটি হাসপাতাল থেকে ১০ জন এবং হিমন্তনগরে ১৩ জন মারা গেছেন হাসপাতালে অক্সিজেন না পাওয়ার কারণে।

আহমেদাবাদ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের একজন প্রবীণ সদস্য বলেছেন, “রাজকোট, মেহসানা, সাবারকণ্ঠ এবং সুরেন্দ্রনগরের মতো কয়েকটি জেলায় হাসপাতালের অক্সিজেন সরবরাহের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।” তিনি আরো বলেন, “মেডিকেল গ্রেড অক্সিজেনের সরবরাহ চাহিদা অনুযায়ী পাওয়া যাচ্ছে না, অথচ রোগীদের সংখ্যা প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে,”। মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রুপানীর নিজ শহর রাজকোটে, অক্সিজেনের জন্য রোগীদের ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। হাসপাতালগুলির কর্তৃপক্ষ চিকিৎসার জন্য আসা মানুষদের জানিয়েছেন যে তারা যদি ভর্তি হতে চায় তবে তাদের নিজেদেরই অক্সিজেনের ব্যবস্থা করতে হবে।

অক্সিজেন না থাকায় ভোদদরায় প্রায় ১৬৪ টি বেসরকারি হাসপাতাল নতুন কোভিড রোগী ভর্তি করতে অস্বীকার করেছিল। এমনকি শহরের বৃহত্তম সরকারী হাসপাতালেও অক্সিজেন ফুরিয়ে গিয়েছিল যার ফলে সেখানে আসা রোগীদের ভর্তি করা যায়নি এবং অক্সিজেনের ব্যবস্থা হওয়ার আগে চার ঘন্টা অ্যাম্বুলেন্সে অপেক্ষা করতে হয়েছিল গুরুতর অসুস্থ রোগীকে।

অক্সিজেনের অভাবে কোভিড -১৯ রোগী মারা যাওয়ায়, আহমেদাবাদ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (এএমএ) গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রুপানীর কাছে একটি জরুরী আবেদন করেছে, যাতে হাসপাতালের জন্য উৎপাদিত অক্সিজেন ১০০ শতাংশ সংরক্ষণ করতে হবে। রূপানীর কাছে এই চিঠিতে এএমএ গুজরাট সরকারকে অনুরোধ করেছে যেন তারা রাজ্যে সমস্ত অক্সিজেন উৎপাদন ইউনিটকে  আপাতত শিল্পগুলিতে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ করে এবং কেবল কোভিড -১৯ রোগীদের চিকিৎসা করা হাসপাতালে সরবরাহ করতে হবে।

গুজরাট হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন সরকারের কোভিড-১৯ মোকাবিলায় কর্ম পরিকল্পনা পর্যবেক্ষণ এবং গাইড করার জন্য উপদেষ্টা কমিটি চেয়ে হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা করে। হাইকোর্ট অ্যাডভোকেটসস অ্যাসোসিয়েশন এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার জন্য উচ্চ আদালতকে অনুরোধ করেছে যাতে সরকারী কর্মকর্তা বাদে ভাইরোলজিস্ট, এপিডোমোলজিস্টস, পরিসংখ্যানবিদ, পেশাদার চিকিৎসক এবং এনজিওভুক্ত সদস্যদের সমন্বয়ে একটি স্থায়ী পরামর্শদাতা কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়ার ব্যাপারে আবেদন জানিয়েছেন। এই কমিটি কোভিড-১৯ এর বিষয়ে রাজ্য সরকারকে পর্যবেক্ষণ ও উপদেশ দেওয়ার জন্য।

গুজরাট হাইকোর্ট রাজ্য সরকারের কোভিড-১৯ মহামারী মোকাবিলার বিষয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। কোভিড-১৯ চিকিৎসার বিষয়ে “স্বচ্ছতা” নেই এবং “ডাক্তারদের সংখ্যা কম থাকায়” হাসপাতালের বাইরে রোগীদের মৃত্যুর দিকে ইঙ্গিত করেছে হাইকোর্ট।

“আমরা বলছি না যে সরকার কিছু করছে না বা (আহমেদাবাদ পৌরসভা) কর্পোরেশন কিছু করছে না, তবে যেভাবে এটি করা হচ্ছে তা সন্তোষজনক নয়, স্বচ্ছ নয়, এবং এই কারণে এই সমস্ত সমস্যা দেখা দিচ্ছে,” এই কেসের রায়ে প্রধান বিচারপতি বিক্রম নাথ এবং বিচারপতি বিডি কারিয়ারের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছেন।

‘শিল্পোন্নত” গুজরাটে – ‘ডাবল ইঞ্জিনের’ গুজরাটে কোভিড -১৯-এর চিকিৎসা পাচ্ছে না মানুষ। তাহলে কি ‘ডাবল ইঞ্জিন’ মুখ থুবড়ে পড়েছে? ‘গুজরাট মডেল’ মিথ কি মুখ থুবড়ে পড়েছে? এসব প্রশ্ন উঠে আসাটাই স্বভাবিক।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
No Thoughts on গুজরাটে কোভিড-১৯ চিকিৎসায় অক্সিজেন সরবরাহ করতে ও হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে ব্যর্থ সরকার

Leave A Comment