ফ্যাসিবাদের মুখে দোলাচল ক্ষমা করবে না ইতিহাস

মতামত রাজনীতি

Last Updated on 7 months by admin

                                                   সুকান্ত 

পশ্চিমবঙ্গ কি ফ্যাসিবাদের মুখে?

পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন নির্বাচন উপলক্ষে তিনটে প্রশ্ন খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এক, আমরা কি সত্যিই ফ্যাসিবাদের বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে আছি? দুই, নির্বাচনের মাধ্যমে কি ফ্যাসিবাদ রোখা সম্ভব? আর তিন, যদি সম্ভব হয়, তাহলে তার জন্য নির্বাচনী কৌশলই বা কেমন হতে হবে? প্রশ্নগুলোর উত্তর খুব কঠিন কিছু নয়, কিন্তু এনিয়ে তথাকথিত প্রগতি-শিবিরে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, বিভ্রান্তি আর দোলাচলের শেষ নেই। এখনো যারা ফ্যাসিবাদের বিপদ দেখতে পারছেন না, বা লঘু করে দেখছেন, তাঁরা মনে হয় এযাবত বিজেপি শাসনের যে রূপ প্রকাশ পেয়েছে, সেটাই চূড়ান্ত বলে মনে করছেন। সংঘ পরিবারের রাষ্ট্রবাদের পূর্ণ প্রকাশ (হিন্দু-রাষ্ট্রস্থাপনা) কেমন হবে তা অনুমান করতে পারছেন না, আর সে কারণেই সংঘ পরিবারের সাথে ভারতের অন্যান্য শাসকদের গুলিয়ে ফেলছেন, ভাবছেন, এ দেশে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে কে-ই বা কম যায়!

আর যারা পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতাদখলের মধ্যে দিয়ে ফ্যাসিবাদের আসন্ন বিপদ অনুমান করতে পারছেন, তাঁরাও কেন জানিনা ফ্যাসিবাদ রোখার জন্য উপযুক্ত কৌশল গ্রহণে দোলাচলে ভুগছেন।ফ্যাসিবাদ রুখতে হলে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সমস্ত শক্তির সর্বাত্মক ঐক্য, ওপর থেকে নিচুতলা পর্যন্ত, গড়ে তোলা এবং সবরকম লড়াই-এর পথ গ্রহণ করা যে একান্ত কর্তব্য, এটা তো দীর্ঘ পরীক্ষিত একটা রণনীতি। এটাও পরীক্ষিত যে, ফ্যাসিবাদের মুখে উপযুক্ত কৌশল গ্রহণে দোলাচল, বিশেষ করে সর্বস্তরে সর্বাত্মক ঐক্যের প্রশ্নে বাছবিচার বা ছুঁৎমার্গ ফ্যাসিবাদের পথই প্রশস্ত করে। গত শতকে ফ্যাসিবাদ-বিরোধী লড়াই-এর এই পরীক্ষিত পথ সামনে থাকা সত্বেও পশ্চিমবঙ্গে ফ্যাসিবিরোধী ঐক্য তথা যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলার কোনো উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ তো দূরের কথা, এর সপক্ষে কোনো কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে না।

এই সোজা-সাপটা কথাটা হল, বিজেপি-বিরোধী সংসদীয় দলগুলো কতটা খারাপ, এই মুহূর্তে সেই আলোচনার থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল বিজেপি-বিরোধী জোট করে তারা নির্বাচনে লড়তে রাজি আছে কিনা। নির্বাচনে বিজেপির বিকল্প হিসেবে তো এই দলগুলোই থাকবে।তাই যখন নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে ফ্যাসিবাদ এরাজ্যের ক্ষমতায় আসতে উদ্যত, তখন নির্বাচনে বিজেপি-বিরোধী সকল দল ও মতের মানুষের জোটবদ্ধ হওয়াই যে কাম্য, যাতে বিজেপি-বিরোধী ভোট ভাগ না হয়, একথা খোলাখুলি বলতে অসুবিধা কোথায়?

তাতে কাজ কিছু হোক ছাই না হোক, ক্ষমতালোভী ভোটবাজ দলগুলো ফ্যাসিবিরোধী জোটের পথে না হেঁটে যে এরাজ্যে ফ্যাসিবাদকে এক প্রকার ডেকে আনছে, সে বিষয়ে জনমত গঠন অন্তত এই দলগুলো সম্পর্কে মোহমুক্ত হতে এবংনিচুস্তরে ফ্যাসি-বিরোধী সংগ্রামে স্বাধীন উদ্যোগ গ্রহণের পথ খুলে দিতে পারে। সাধারণ বুদ্ধিতে এটাই তো এই মুহূর্তে ফ্যাসিবাদ রোখার জন্য আশু করণীয় কর্তব্য বলে মনে হয়।

প্রশ্ন জাগে, তাহলে কী ফ্যাসিবাদের বিপদ সম্পর্কে কোথাও একটা বোঝাপড়ার অভাব রয়ে গেছে? কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন যে, হিটলার-মুসোলিনীর মতো বিজেপি তথা মোদীকে কি ফ্যাসিবাদী বলে চিহ্নিত করা যায়? ফ্যাসিবাদী হলে কি আর কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখলের পরও রাজ্যে রাজ্যে নির্বাচনের সুযোগ দিত, না দিল্লির চারপাশে এত কৃষক জমায়েত হতে দিত? এক্ষেত্রে ইন্দিরা জমানার কথা কেউ কেউ মনে করাচ্ছেন, যখন কথায় কথায় ৩৫৬ ধারা জারি করে রাজ্যের নির্বাচিত মন্ত্রিসভা ভাঙা হত, আর জরুরী অবস্থা জারি করে দেশজুড়ে সকল গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, রাতারাতি সকল বিরোধীকে নিক্ষেপ করা হয়েছিল কারান্তরালে। তার থেকে খারাপ আর কী হতে পারে!!

যারা এইসব প্রশ্ন তুলছেন, তাঁরা আসলে স্বৈরাচার আর ফ্যাসিবাদের মধ্যে তফাতটা গুলিয়ে ফেলছেন। আমাদের দেশে সব শাসকই কমবেশি স্বৈরাচারী, কিন্তু সবাই ফ্যাসিবাদী নয়। ফ্যাসিবাদ স্বৈরাচারের থেকে গুনগতভাবে আলাদা এবং অনেক বেশি বিপদজনক। ফ্যাসিবাদ একটা মতাদর্শ, যে মতাদর্শ প্রত্যক্ষ বলপ্রয়োগের মাধ্যমে শুধু রাষ্ট্র-ব্যবস্থাকেই নয়, সমাজ-সংস্কৃতি-শিক্ষা সবকিছুর ওপর আধিপত্য বিস্তার করে, ভারতবর্ষে যার সূচনাপর্বে আমরা এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি।

ইন্দিরা গান্ধীর কংগ্রেসের সাথে সংঘ পরিবারের মৌলিক তফাত হল সংঘ পরিবার ভারত-রাষ্ট্রকে হিন্দু জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের ভিত্তিতে ঢেলে সাজাতে চায়, চায় হিন্দু-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। যে রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকবে উগ্র মুসলিম-বিদ্বেষ তথা জাতিগত ঘৃণার রাজনীতির ওপর, যা শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার ওপর সংঘ পরিবারের একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় থেমে থাকবে না,নানাবিধ জাতি-ধর্ম-ভাষা-সংস্কৃতি-সমৃদ্ধ অসংখ্য ছোট-বড় জনসম্প্রদায় নিয়ে গঠিত ভারতের বর্ণময় সামাজিক কাঠামোটির বহুমুখী স্রোত:পথ হিন্দু মৌলবাদী ধ্যান-ধারণা,আচার-বিচার-সংস্কারের মরুবালিরাশিতে নি:শেষিত করবে।

মনে রাখা দরকার সংঘ পরিবারের রাষ্ট্র-বাদের প্রয়োগ এখনো কিছুই হয়নি। যারা এ যাবত তাদের কুকর্ম দেখে মোদীর রাজত্বকে ইন্দিরা-জমানার সাথে গোলাচ্ছেন, সন্দেহ জাগে তাঁরাসংঘ পরিবারের ঘোষিত লক্ষ্য-আদর্শ সম্পর্কে অবহিত কিনা, বোঝেন কিনা রাজনৈতিক স্বাধীনতা-হরণ আর আদর্শগত দাসত্বের বাস্তবতার মধ্যে কঠিন-কঠোর তফাতটা। কিছুদিন আগে ‘এ হিডেন লাইফ’ নামে একটা মুভি দেখলাম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান-অধিকৃত অস্ট্রিয়ার একজন ধর্মপ্রাণ গেরস্ত চাষী, অরাজনৈতিক কিন্তু যুদ্ধ-বিরোধী, অনিচ্ছাসত্ত্বেও সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য হলেও শুধুমাত্র ‘হের হিটলার’ জয়ধ্বনি দিতে রাজি না হওয়ায় কীভাবে তাকে অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয়ে শেষ অবধি নাৎসী ঘাতকদের হাতে প্রাণ দিতে হয়। ভারতে হিন্দু ফ্যাসিবাদ ঠিক কী রূপে দেখা দেবে, তা পুরোপুরি অনুমান করা না গেলেও তারা যে প্রতিটি মানুষের কাছে মতদর্শগত আনুগত্য দাবি করবে, এবং অবাধ্য প্রজাদের জীবন নরক করে ছাড়বে, এ বিষয়ে বিশেষ সন্দেহ থাকার কথা নয়।

হিটলারের ফ্যাসিবাদ আর্য জাতির আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হুংকার দিয়ে শুরু হয়েছিল আর শেষ হয়েছিল ইহুদিদের গণনিধনযজ্ঞ আর গোটা বিশ্বকে ভয়ংকর মারণ-যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলার মধ্যে। সংঘ-পরিবারের ফ্যাসিবাদ শুরু হয়েছে হিন্দু-আধিপত্য স্থাপনের হুংকার দিয়ে, শেষ কোথায় হবে কেউ জানে না। এখন পর্যন্ত যা শুরু হয়েছে, যা ছবির ‘ট্রেলার’ মাত্র, তাতে দেশের একমাত্র মুসলিম-প্রধান রাজ্য কাশ্মীরকে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দিয়ে কার্যত উপনিবেশ বানানো হয়েছে, অন্যত্র মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের ওপর রাষ্ট্র ও গেরুয়া-বাহিনীর নিপীড়নের কিছু নমুনা পেশ করা হয়েছে, যেমন কিনা রাজধানীর বুকে প্রকাশ্য উস্কানি দিয়ে দাঙ্গা বাধিয়ে মুসলিমদের ঘর-বাড়ি ব্যবসাস্থল জ্বালিয়ে দিয়ে তাদেরই গ্রেফতার করা হয়েছে দাঙ্গা বাধানোর ষড়যন্ত্র মামলায়।

এছাড়া নাগরিক সমাজের যেসব বিবেকসম্পন্ন মানুষ আদিবাসী, দলিত বা মুসলিমদের হয়ে কথা বলতেন, লেখালেখি করতেন বা মামলা লড়তেন, তাদেরকে ‘শহুরে নকশাল’ তকমা দিয়ে মুখ বন্ধ করার প্রক্রিয়া নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে কী হবে তার নমুনা হিসেবে কয়েকজনকে রাষ্ট্র-বিরোধী ষড়যন্ত্র-মামলায় জেলে পচানোর বন্দোবস্ত করা হয়েছে। এসব যৎ-সামান্য ‘ট্রেলার’ দেখিয়েই আপাতত দেশজুড়ে একটা আতংকের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, যেখানে বিরোধীদের একটা বড় অংশ মুখ বুজে ফেলেছেন, বা সতর্ক হয়ে মুখ খুলছেন। কে আর আজীবন জেলখানায় পচতে চায়!

যারা এখনও পশ্চিমবঙ্গে সংঘ পরিবারের বিজয় রথকে আটকানোর কৌশল নিয়ে দ্বিধায় ভুগছেন, তাদের ভাবার জন্য বলা দরকার, সংঘ পরিবারের আসল ছবি কিন্তু শুরু হবে এই বাংলায় ক্ষমতা-দখলের মধ্যে দিয়ে। আর সে কারণেই তারা পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা-দখলের জন্য সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, বাংলা দখলের জন্য তাদের মরীয়া প্রচেষ্টা আরও স্পষ্ট হবে। সমস্যা হল, শত্রু যখন এরাজ্যে ক্ষমতায় আসার জন্য মরীয়া হয়ে উঠেছে, তখন রাজ্যের ফ্যাসি-বিরোধী শিবির নির্বাচনী রণ-কৌশল নির্ধারণ নিয়ে এতটাই দোলাচলে যে, ফ্যাসিবিরোধী জোট তৈরির আহ্বান জানাতেও দ্বিধায় দীর্ণ হচ্ছে। শত্রু যখন লক্ষ্য-স্থির করে এরাজ্যের নির্বাচনকে পাখির চোখ করে এগোচ্ছে, বিরোধী শিবির তখন ছত্রভঙ্গ, একে ওপরের ছিদ্রান্বেষণে এবং নিজেদের জাত-কৌলিন্য বজায় রাখার চিন্তায় ব্যস্ত। যুদ্ধ-শেষে এই দোলাচলের জন্য হাত কামড়িয়েও কোনো লাভ হবে না।

এজন্য পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখল সংঘ পরিবারের কাছে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, সেটা নিয়ে আলোচনা জরুরী।

প্রথম কথা হল, গোটা ভারতবর্ষজুড়ে ক্ষমতা সংহত না করে বিজেপি-র পক্ষে পূর্ণাঙ্গ রূপে আবির্ভূত হওয়া সম্ভব নয়, সম্ভব নয় হিন্দু রাষ্ট্রের প্রকল্প বাস্তবায়িত করা। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার তাদের দখলে থাকলেও দেশের ২৮ টা রাজ্যের মধ্যে মাত্র ৭/৮টায় তারা একক শক্তিতে ক্ষমতায় আছে, আর কিছু রাজ্যে আঞ্চলিক বিভিন্ন দলের সাথে জোট করে সরকার গড়েছে তারা। ইতিমধ্যে কেন্দ্রে তাদের মিত্র দলগুলো বেশিরভাগই জোট ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। এই অবস্থায় তাদের পক্ষে হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শের পূর্ণ প্রয়োগ সম্ভব নয়। সেজন্যই তারা গুজরাত বা উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলিতে ট্রেলার দেখিয়েই ক্ষান্ত আছে। তাদের মতাদর্শেদেশকে ঢেলে সাজানোর জন্য হিন্দু ভোট মেরুকরণ করে বেশিরভাগ রাজ্যে ক্ষমতা আসা দরকার। আর সেটা করতে গেলে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসাটা তাদের একান্ত জরুরী।

বস্তুত, পশ্চিমবঙ্গ হবে দেশজুড়ে সর্বাত্মক ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার পরীক্ষাগার। এরাজ্যে এতাবত হিন্দুত্ববাদীদের রাজনৈতিক শক্তি যতটুকু অর্জিত হয়েছে, তা মূলত রাজ্যের বর্তমান ক্ষমতাসীন দলটির প্রতি রাজ্যবাসীর একাংশের ক্ষোভ ও আস্থাহীনতাকে পুঁজি করেই হয়েছে। উত্তর ও পশ্চিম ভারতের রাজ্যগুলোর মতো হিন্দুত্ববাদের পক্ষে ধর্মীয় মেরুকরণ এরাজ্যে এখনো করা সম্ভব হয়নি। তাই এরাজ্যে এদের ক্ষমতার আস্ফালন যতটা দেখা গেছে, ক্ষমতার প্রয়োগ সে তুলনায় কমই হয়েছে। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখল এরাজ্যের ছবিটাকে রাতারাতি পাল্টে দেবে। পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যার ২৭ শতাংশ (আড়াই কোটির মতন) মুসলিম, এবং বিজেপির মূল আজেন্ডা এনআরসি-সিএএ প্রকল্প মাথায় রেখে এগোলেই বাকি ছবিটা স্পষ্ট হবে। মনে রাখা দরকার, বিজেপি ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গকে ‘সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর’ বলে দাগিয়ে দিয়েছে, অর্থাৎ এরাজ্যের মুসলিমদের সন্ত্রাসী বলে চিহ্নিত করার কাজ এগিয়ে রেখেছে। এই অবস্থায় রাজ্যের ক্ষমতা হাতে পেলে কী হতে পারে তার কল্প-চিত্র আঁকা খুব কষ্টকর বলে তো মনে হয়না।

বিজেপির হাতে পশ্চিমবঙ্গ: চিত্র-১

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা শুরু হয়েছে। বেলা যত গড়াচ্ছে তত স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে এবার এরাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসছে। বিজেপি, তৃণমূল আর কংগ্রেস-সিপিআই(এম) জোট–এই ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজেপি বেশিরভাগ আসন পেয়ে যাচ্ছে। বিজেপি-বিরোধী ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ায় বিজেপি মোট প্রদত্ত ভোটের অর্ধেকের অনেক কম পেয়েও রাজ্যের ক্ষমতায় আসতে চলেছে। অর্থাৎ রাজ্যের বেশিরভাগ মানুষ এখনো বিজেপি-বিরোধী থাকা সত্ত্বেও তাদের ক্ষমতা-দখল আটকানো যায়নি।

নির্বাচনের এই ফলাফলে গেরুয়া শিবির উল্লাসে ফেটে পড়েছে। বিভিন্ন জায়গায় গেরুয়া আবির মেখে বিজেপি কর্মী-নেতারা বিজয় উদযাপন করছে। মাথায় ফেট্টি বেঁধে গেরুয়া বাহিনীর মোটর সাইকেল মিছিল ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি তুলে গ্রামে শহরে টহল মারা শুরু করেছে। সমস্ত বিরোধী দলগুলো ভয়ে গুটিয়ে গেছে, তাদের পার্টি অফিস খোলার মতো কাউকে দেখা যাচ্ছেনা। একটা আতংকের আবহাওয়া কলকাতা এবংরাজ্যের মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকাগুলোকে গ্রাস করেছে। হতাশা, আশংকা, ক্ষোভ, ভয় মিলিয়ে সংখ্যালঘু এলাকাগুলো একপ্রকার নিঝুম হয়ে গেছে।বিজেপি-র রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নেতারা অবশ্য সবাইকে আশ্বস্ত করেছে এই বলে যে বিজেপি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করেনা। কারুর আতংকিত হওয়ার কিছু নেই।

পুলিশ শান্তি-শৃংখলা বজায় রাখতে সমস্ত পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। নির্বাচনের সময় যে আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল, তারা উত্তেজনা-প্রবনএলাকাগুলোয় টহল দিচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, যেহেতু রাজ্য পুলিশের ওপর বিজেপির বিশেষ ভরসা নেই, এবং তাদের গেরুয়াকরণ করতে একটা সময় লাগবে, তাই সংঘ পরিবারের হাতে ক্ষমতা সংহত না হওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রীয় বাহিনীএরাজ্যে থাকবে।বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, রাজ্য-স্তরে উপযুক্ত নেতা না থাকায় কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ মূলত এই রাজ্য পরিচালনা করবেন। উল্লেখ্য, অমিত শাহ যখন গুজরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ছিলেন, তিনি সেই রাজ্যের মুসলিম-অধ্যুষিত এলাকাগুলোকে ‘মিনি পাকিস্তান’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। অর্থাৎ এই ভদ্রলোকের হিসেব অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের ৬৪ টা ব্লক এবং তিনটি জেলা ‘মিনি পাকিস্তান’, যাদের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ শুধু সময়ের অপেক্ষা। স্বাভাবিকভাবেই এই রাজ্যের ভবিষ্যৎ পরিণতি নিয়ে অনেকের কপালেই ভাঁজ পড়েছে। কিন্তু বিজেপিরনির্বাচনীজয়লাভের পর এই মুহূর্তে কেউ মুখ ফুটে কিছু বলছেন না।

বিজেপির হাতে পশ্চিমবঙ্গ: চিত্র-২

রাজ্যের ক্ষমতায় আসার পরই বিজেপি সরকার জোরকদমেএনআরসি এবং সিএএ প্রয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে। যদিও রাজ্যে নির্বাচনের প্রাক্কালে এনআরসি বা সিএএ নিয়ে তারা বিশেষ প্রচারে যায়নি, কিন্তু ক্ষমতায় আসার পরই তারা আস্তিন থেকে তাস বের করেছে। রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, এনআরসি নিয়ে হিন্দুদের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। এনআরসি-র জন্য যে প্রতি ব্লকে যে বিশেষ শিবির খোলা হবে সেখানে যেসকল হিন্দু পরিবার তাদের নাগরিকত্বের  সঠিক প্রমাণ-পত্র দেখাতে পারবেনা, তাদের সেই শিবির থেকেই সিএএ আইন মোতাবেক ‘শরণার্থী’ হিসেবে পরিচয়-পত্র দেওয়া হবে। তারপর আইন-নির্ধারিত সময় এবং প্রক্রিয়া অনুযায়ী তাদের নাগরিকত্ব অনুমোদন করা হবে। বাকিরাঅনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত হবে, এবং তাদের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিরোধী রাজনৈতিক দল ও কিছু বুদ্ধিজীবী এনআরসি-সিএএ প্রক্রিয়া চালু করার বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু বিজেপি সরকারের বক্তব্য, অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা ও তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা তো তারা বরাবর বলে আসছেন। রাজ্যের মানুষও সেটা চান বলেই তাদের নির্বাচনে জিতিয়ে ক্ষমতায় এনেছেন। এখন এ নিয়ে বিরোধিতা আসলে দেশ-বিরোধী। কোনো দেশ তার সীমানার ভেতরে বিপুল সংখ্যক অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর অস্তিত্ব মেনে নেয় না। এতদিন যারা রাজ্যের ক্ষমতায় ছিল, তাদের প্রশ্রয়েই বছরের পর বছর এই অবৈধ অনুপ্রবেশ সম্ভব হয়েছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ভোট-ব্যাংক হিসেবে ব্যবহারের স্বার্থে আগের সরকারগুলো অনুপ্রবেশ দেখেও দেখেনি, ইত্যাদি। পশ্চিমবঙ্গবাসী এবং দেশের বৃহত্তর স্বার্থে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা একান্ত জরুরী।

বিজেপির হাতে পশ্চিমবঙ্গ: চিত্র-৩ 

বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এক বছর অতিক্রান্ত। এই সময়কালে নতুন সরকার সবচেয়ে বড় যে কাজটা করেছে, তা হল এনআরসি মারফত সমস্ত রাজ্যবাসীরনাগরিকত্ব যাচাই-এর কাজ। কলকাতা এবং জেলায় জেলায় যে সমস্ত এনআরসি শিবির খোলা হয়েছে, সেখানে লম্বা লাইন পড়েছে, সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে মানুষ নাজেহাল হয়েছেন। ইতিমধ্যে প্রায় দু কোটি মানুষ তাঁদের নাগরিকত্বের প্রমাণ-পত্র দিতে না পারায় ‘ডি-ভোটার’ বা ডাউটফুল ভোটার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। এদের মধ্যে এক কোটির কাছাকাছি হিন্দু আর বাকিরা মুসলিম। সরকার দ্রুততর সাথে এনআরসি থেকে বাদ পরা হিন্দুদের ‘শরণার্থী’ হিসেবে ঢালাও পরিচয়পত্র বিলি করছে। তাদের কাগজপত্র পরীক্ষা করে যত দ্রত সম্ভব তাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব দেওয়া হবে বলে সরকার ঘোষণা করেছে।

দীর্ঘদিনপুরুষানুক্রমে যারা এই রাজ্যের বাসিন্দা, যারা অতীতের বহু নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন, এরাজ্যে চাকরি-ব্যবসা বা বিভিন্ন পেশার সাথে যুক্ত, এমন মানুষের এনআরসি-র লাইনে নাগরিকত্ব প্রমাণ করার কাগজপত্র নিয়ে দাঁড়ানো এবং তাদের অনেকেই ‘সঠিক’ প্রমাণপত্র না দিতে পেরে হয়রাণ হয়ে ক্ষোভ ব্যক্ত করেছেন ঘনিষ্ঠ মহলে, কিন্তু প্রকাশ্যে কেউ মুখ ফুটে কিছু বলতে চাইছেন না। কারণ কেন্দ্র ও রাজ্যের গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন সর্বত্র নজর রাখছে, কোথায় কারা এনআরসি-র বিরোধিতা করছে, তাদের খুঁজে বের করা আর তাদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহীতার মামলা দিতে শুরু করেছে তারা। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্বেরমতো জ্বলন্ত সমস্যাগুলো সামাজিক-রাজনৈতিক পরিসর থেকে একেবারে উধাও হয়ে গেছে।

ইতিমধ্যে রাজ্যের মানবাধিকার সংস্থা এবং কিছু কট্টর বিজেপি-বিরোধী সংগঠন, যারা এনআরসি-সিএএ-র বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছিলেন, তাদের নেতৃস্থানীয় কর্মীদেরমাওবাদীসংযোগের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের বাড়ি তল্লাশি করে মাওবাদী সংযোগের তথ্য-প্রমাণ মিলেছে বলে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ জানিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ইউএপিএ আইন প্রয়োগ করা হয়েছে এবং একাধিক ষড়যন্ত্র মামলা শুরু করা হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা আতংকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, বিরোধিতা করলেই কেস খেতে হবে, তাই যা চলছে আপাতত চুপচাপতা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই বলেই বেশিরভাগ মানুষ মনে করছেন।

অন্যদিকে,মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোর পরিস্থিতি ভিন্ন।মুসলিম সম্প্রদায়ের বিপুল সংখ্যকমানুষ নাগরিক তালিকার বাইরে চলে যাওয়া তাদের আশংকা সত্য বলে প্রমাণ করেছে। তাদের পাশে এখন আর কোনো রাজনৈতিক দল নেই। সিপিএম, কংগ্রেস আর তৃণমূল দলের সংগঠন একেবারে গুটিয়ে গেছে। নেতারা কলকাতায় বসে বিবৃতি দিচ্ছেন, আর কর্মীরাহয় গেরুয়া মিছিলে সামিল হয়ে গেছেন, নতুবা ঘরে ঢুকে গেছেন। রাজ্যের রাজনৈতিক ময়দান এখন আক্ষরিক অর্থেই শুনসান, প্রায় ফাঁকা মাঠেই বিজেপি সরকার গোল দিয়ে চলেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ নেই। রাষ্ট্র-বিরোধী ষড়যন্ত্র মামলায় সারা জীবন কারাগারে কাটানোর ভয় বিজেপি-বিরোধী মহলকে গ্রাস করেছে।

রাজ্যের বিপুল মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে দুরকম মনোভাব তৈরি হচ্ছে। যারা প্রবীণ এবং কোনো ঝঞ্ঝাটে যেতে চান না, তারা এই পরিস্থিতির সাথে কীভাবে খাপ খাওয়ানো যায়, কীভাবে যেসব মুসলিম ভাই-বোনদের নাগরিকত্ব চলে গেছে তাদেরকাগজপত্র যোগাড় করে এবং প্রশাসনিক মহলে তদ্বির করেনাগরিকত্বফিরিয়ে দেওয়াযায়, তার জন্য দৌড়-ঝাঁপ করছেন। কিন্তু মুসলিম সম্প্রদায়েরঅধিকাংশেরমধ্যে নতুন সরকারের এই কার্যকলাপে বিপুল ক্ষোভ জমা হয়েছে। তারা বুঝতে পারছেন, এই সরকার মুসলিম-বিদ্বেষী, এরা তাদের সর্বস্ব কেড়ে নেবে। রাজ্যের আড়াই কোটি মুসলিমের প্রায় এক কোটিরনাগরিকত্বইতিমধ্যেই চলে গেছে, বাকিরাওসন্দেহভাজনের তালিকায়, যেকোনো সময়ে সঠিক কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তাদের যে কাউকে তারা ‘ডি-ভোটার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।

পশ্চিমবঙ্গ দ্বিতীয় কাশ্মীর: চিত্র-৪

এনআরসি-সিএএ প্রক্রিয়ায় নাগরিকত্ব-হারানো বিপুল সংখ্যক মুসলিম পুরুষ-নারী-শিশু-বৃদ্ধকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে বিভিন্ন কারাগারে পাঠানো শুরু হওয়ায় রাজ্যের মুসলিম জনগণের মধ্যে ব্যাপক বিক্ষোভ ও বিদ্রোহের মনোভাব জন্ম দিয়েছে। রাজ্যের কারাগারগুলোতে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় বাইরের রাজ্যে, এমনকি সুদূর গুজরাতে বন্দীদের চালান করা শুরু হয়েছে। বহু এলাকায় মুসলিমরা তাদের নাগরিকত্ব-হারানোপরিজন-প্রতিবেশীদের রক্ষা করার জন্য পথে নামছেন, পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনীর অভিযান আটকানোর চেষ্টা করছেন, অনেক জায়গায় তাদের হিন্দু প্রতিবেশীরাও প্রতিরোধে সামিল হয়েছেন। কিছু অঞ্চলে রাস্তা খুঁড়ে দিয়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পথ আটকানোর চেষ্টা হয়েছে। যথারীতি এই প্রতিরোধের পেছনে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার আতংকবাদী শক্তির হাত খুঁজে পেয়েছে, এবং এসব দমন করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছে।

পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম অধ্যুষিত বিস্তীর্ণ অঞ্চল অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলি মুসলিমদের বিক্ষোভ, প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের পেছনে ইসলামিক স্টেটস এবং আল কায়দার হিন্দুস্তানকে ‘মুসলিমস্তানে’ পরিণত করার নকশা খুঁজে পেয়েছে। বাংলাদেশের জেহাদীগোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে এরাজ্যে অস্ত্র-পাচার চলছে, তার প্রমাণ-স্বরূপ বিভিন্ন জায়গায় অস্ত্র ও বিস্ফোরক আবিষ্কার করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় একাধিক সুড়ঙ্গও আবিষ্কৃত হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রতিবেশী রাজ্য থেকে জেহাদীরাএরাজ্যে অনুপ্রবেশ করেছে, এবং অস্ত্র ও বিস্ফোরক আমদানি করেছে। নিত্যদিন এহেন প্রচার সারা দেশের সংবাদ মাধ্যমের শিরোনামে উঠে এসেদেশবাসীর বিবেক-বুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।

রাজ্যের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী নোবেল-জয়ী অপূর্ব সেন বলেছেন, এযাবতএরাজ্যের মুসলিম জনগণ সামাজিকভাবে অবহেলিত ও আর্থিকভাবে বঞ্চিত হলেও রাজনীতি ও ধর্মাচরণের ক্ষেত্রে বিশেষ বৈষম্যের স্বীকার হননি। এখন যেভাবে তাদের বৈষম্য আর অত্যাচারের শিকার হতে হচ্ছে, তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এর বিরুদ্ধে মুসলিম জনগণের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ ন্যায়সঙ্গত। রাজ্যের বিজেপি নেতারা তাঁর বক্তব্য উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, রাজনীতি করতে হলে বিদেশে বসে দেশ-বিরোধী কথাবার্তা না বলে তাঁর উচিত দেশে এসে নির্বাচনে দাঁড়ানো।

যাই হোক, রাজ্যে বিজেপির সরকারের একেরপর এক পদক্ষেপমুসলিম সম্প্রদায়কে যেভাবে কোণঠাসা করেছে, তা এখন এই সম্প্রদায়ের কেউই মেনে নিতে পারছেন না। যারা শুরুতে নাগরিকত্বের প্রশ্নে আপস-আলোচনার কথা বলছিলেন, তাঁরাও এখন সোচ্চার হয়ে উঠছেন। বিশেষ করে নাগরিকত্বহারানো বিপুল সংখ্যক মানুষকে যেভাবে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন বন্দী শিবিরে নিক্ষেপ করা হচ্ছে, তাতে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছে। আর সংঘাত যত বেড়ে উঠছে, ততই মুসলিম প্রতিরোধের পেছনে শুধু আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদীগোষ্ঠীগুলোরই নয়, পাকিস্তান ও কিছু আরব দেশের হাতও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে,আর সেসব উল্লেখ করে সারা দেশজুড়েবিজেপি ‘হিন্দুস্তান বিপন্ন’ শ্লোগান তুলে ভয়ংকর শোরগোলফেলে দিয়েছে। বিজেপি নেতারা এবং তার সাথে প্রায় সব সংবাদমাধ্যম এক সুরে প্রচার করছে, ‘পশ্চিমবঙ্গকে পশ্চিম বাংলাদেশ’ তথা ইসলামিক রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্র দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল, যা এতদিন মুসলিম-তোষণকারী সরকারগুলো দেখেও দেখেনি। এই রাজ্য থেকে শুরু করে ভারত-জুড়ে মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র চলছে, যার পেছনে আছে আন্তর্জাতিক ইসলামিকউগ্রবাদী জঙ্গী গোষ্ঠীগুলো, আর তাদের আঁতুড়ঘর পাকিস্তান।

এইসব প্রচারের মুখে বিরোধী দলগুলো ক্রমেই চুপ হয়ে যাচ্ছে, কেননা গোয়েন্দা সংস্থার প্রকাশিত তথ্য বিরোধিতা করা যায়না। কংগ্রেস সরকারই তো এক সময়ে সন্ত্রাস-দমনের নামে ইউএপিএ-র মতোকালাকানুন  আর এনআইএ-র মতো গোয়েন্দা সংস্থা বানিয়েছিল, তৃণমূল বাবাম দলগুলোর তাতে বিশেষ আপত্তি ছিল না। তাই পশ্চিমবঙ্গে যখন একটা বিশেষ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে যথেচ্ছ কালাকানুন প্রয়োগ করা হচ্ছে, ধরপাকড় চলছে, তখন আর এদের কারুর খুব একটা কিছু বলার থাকছে না।

এই অবস্থায় রাজ্যে ধর্ম-ভিত্তিক মেরুকরণ দ্রুত বেড়ে চলেছে। হিন্দুদের একটা অংশ তো আগে থেকেই ভাবত, মুসলিমরা উগ্র, সন্ত্রাসবাদী মানেই মুসলিম। এখন এই বিশ্বাস দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। মুসলিমদের হিন্দু এলাকায় যাতায়াত, এবং হিন্দুদের মুসলিম এলাকায় যাতায়াত কমে আসছে। একটা অজানা আশংকা দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে চলেছে।এই আশংকা থেকেই হিন্দু যুবকদের আরএসএস-এ যোগ দেওয়ার হিড়িক পড়েছে। বেড়ে চলেছে বজরং দল আর বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মতো সংগঠনগুলো। পাড়ায়-পাড়ায়, গ্রামে-গঞ্জে সংঘের অসংখ্য শাখা গজিয়ে উঠেছে, যুবকরা সেখানে নাম লেখতেএকপ্রকার বাধ্য হচ্ছে। এই সব শাখায় প্রকাশ্য লাঠি খেলার পাশাপাশিঅন্যান্য অস্ত্র-শিক্ষাওব্যাপকভাবেদেওয়া হচ্ছে। মুসলিমদের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের পাশাপাশি একতরফা দাঙ্গা-হাঙ্গামা দৈনন্দিন ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি ক্রমেই আরও অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের দাঙ্গার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠছে, পশ্চিমবঙ্গ সত্যিই গুজরাত হয়ে উঠছে।

তফাত হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজ সহজে বাগ মানার নয়। আর এটা সংঘ পরিবারের জানা ছিল, সে কারণেই পশ্চিমবাংলাতথাএরাজ্যেরমুসলিমরাছিল তাদের বিশেষ টার্গেট। অবাধ্য বিদ্রোহী না হলে মুসলিম সমাজে সন্ত্রাসী ঠিকানা কীভাবে পাওয়া যাবে! এরাজ্যেরপ্রতিবাদীমানুষ, প্রতিবেশী মুসলিম-জনবহুল বাংলাদেশ, দুই বাংলার মধ্যে তিক্ত-মধুর সম্পর্ক, অসংখ্য আদানপ্রদানের মাধ্যম— এই সবকিছু মাথায় রেখেই সংঘ পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এরাজ্যে  ‘অনুপ্রবেশ’ এবং মুসলিম-আধিপত্যের গল্প মানুষকে শুনিয়ে আসছে।দেশজুড়ে ‘ইসলামিকসন্ত্রাসবাদের’ জুজু তৈরি করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষকে সন্ত্রস্ত করে এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদে আপ্লুত করে রাখতে সংঘ পরিবারের একটা ঘুঁটি যদি হয় কাশ্মীর, অন্যটি পশ্চিমবঙ্গ। আর দুর্বিনীত বাঙালি জাতিকে সাম্প্রদায়িকভাবে বিভক্ত না করে বাগে আনা যাবে না, একথাও ভালই জানা আছে তাদের।

অত:কিম

ওপরের চিত্রগুলো আনুমানিক এবং অবশ্যই অসম্পূর্ণ। আরও বহু কিছু ঘটতে পারে, ঘটবেও, ঘটনা একবার গড়াতে শুরু করলে কোথায় গিয়ে শেষ হবে, তার সবকিছু আগাম অনুমান সম্ভব নয়। এখানে সংঘ পরিবারের ঘোষিত কর্মসূচির রূপায়নের ফলাফল কেমন হতে পারে, তার একটা আন্দাজ করার চেষ্টা করা হল মাত্র । সংঘ পরিবারের যে হিন্দুত্ববাদীমতাদর্শ, যার লক্ষ্য ভারতে হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রভাব বাড়লেও সেই মতাদর্শের পক্ষে কিন্তু খুব বেশিমানুষ নেই। গোটা ভারতেও খুব বেশি আছে তা নয়। তাই জনমত পক্ষে আনার জন্য বিজেপি এবং তার বর্তমান প্রধান ব্যক্তি নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার আগে ও পরে নানা জনমোহিনী নীতি ও কার্যক্রম ঘোষণা করেছে। কিন্তু শুধু মুখের কথায় মানুষকে ভুলিয়েবেশিদিনচলেনা, এবং যতদিন যাচ্ছে মানুষ এদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি নিয়ে কথা বলতে শুরু করছে বলে এরা দ্রুত এদের মূল আজেন্ডায় চলে যেতে চাইছে। আর সেই আজেন্ডা কার্যকর করার জন্য পশ্চিমবঙ্গের থেকে ভাল জায়গা আর কিছু নেই।

এই রাজ্যে হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায় একসাথে পাশাপাশি বাস করছে, গ্রামবাংলায় যেখানে এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মুসলিম, অথচ তাদের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় আছে, এটা বিজেপি তথা সংঘ পরিবারের কাছে দু:সহ। এই সম্প্রীতি না ভাঙতে পারলে তাদের মতাদর্শের জাল বিস্তার সম্ভব নয়। সেইজন্য তারা আস্তিনের তলায় সযত্নে রেখে দিয়েছে সাম্প্রদায়িক বিভেদের তাস, এনআরসিএনপিআর আর সিএএ। তাদের প্রধান হাতিয়ার বাংলাদেশ থেকে এরাজ্যে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’।

লক্ষ করার বিষয়, এনআরসি নিয়ে নির্বাচনের মুখে বিজেপি নেতারা আদৌ সোচ্চার নয়। এক বছর আগেও তারা ‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে কতনা জল ঘোলা করেছে। কিন্তু আসাম রাজ্যে এনআরসি-র অভিজ্ঞতা এবং এরাজ্যেতার বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচারের ফলে এনআরসি নিয়ে মানুষ সন্দিগ্ধ হয়ে পড়ায় চতুর নেতারা আপাতত এটাকে সামনে না আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু একবার রাজ্যের ক্ষমতা কব্জায় এলেই তারা তাদের স্বরূপ ধারণ করবে। আর একবার এরাজ্যে ক্ষমতা দখল করলে তা অপরিবর্তনীয় হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রদায়িক মেরুকরণসম্পন্ন আর সমস্ত রকম বিরোধী স্বর নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে ফেরার আর পথ থাকবে কি?

তাই এই অবস্থায় পৌঁছনোর আগে সঠিক পদক্ষেপ না নিতে পারলে পরে আর কিছু করার থাকবেনা। বিজেপির কাছে পশ্চিমবঙ্গ হবে তুরুপের তাস, একদিকে কাশ্মীর অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ, যে দুই রাজ্যের সীমানা দিয়ে মুসলিম সন্ত্রাসীদেরঅনুপ্রবেশ ভারতের হিন্দুদের বিপন্ন করে তুলছে বলে তাদের প্রচার, দেশ ও (হিন্দু)জাতিকে রক্ষার জন্য সেই দুটি স্থান বিজেপিরআয়ত্বে রাখা অতি জরুরী বলে প্রমাণিত হবে। কাশ্মীরকে যেমন রাজ্য থেকে কেন্দ্র-শাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হয়েছে, পুরো সামরিক শাসনে জনজীবন করা হয়েছে অবরুদ্ধ, সেই একই যুক্তিতে পশ্চিমবঙ্গেও ভবিষ্যতে তেমন পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা থাকছে। ইতিমধ্যেই সংঘ পরিবার পশ্চিমবঙ্গকে সন্ত্রাসবাদী তথা মুসলিম জেহাদিদেরআঁতুড়ঘর বলে চিহ্নিত করেছে। এরপরও যদি আমরা ভবিষ্যতের পাঠ নিতে ভুল করি, তাহলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে কি?

শেষে একথা বলার যে, যারা অত্যন্ত সঠিকভাবেআরএসএস বা সংঘ পরিবারকে ‘মুসোলিনী-হিটলারদের ভারতীয় সংস্করণ’ বলে চিহ্নিত করে ‘বিজেপিকে ভোট নয়’ বলে শ্লোগান দিয়েছেন, তারাও কিন্তু ফ্যাসিবিরোধীব্যাপকতম ঐক্য গড়ে তোলার বিষয়ে একটা কথাও বলেন নি।নির্বাচনের মুখে ‘নো ভোট টু বিজেপি’ এই নেতিবাচক শ্লোগান মানুষের মধ্যে কতটুকু ছাপ ফেলবে? নির্বাচনের প্রাক্কালে কাকে ভোট দেবনা, এটা নিয়ে মানুষ যতটা না মাথা ঘামায়, তার থেকে অনেক বেশি মাথা ঘামায় কাকে ভোট দেওয়া যায়, এই কথা নিয়ে। আমরা চাইছিমানুষ বিজেপি-র বিরুদ্ধে ভোট দিক, কিন্তু সেই ভোট কাকে দেবে সেটা বলতে চাইছি না। এখানে একটা ফাঁক থেকে যাচ্ছে না কি?

নির্দিষ্ট করে বললে, রাজ্যের সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রভাব আছে, এমন যেসব রাজনৈতিক শক্তি তথা পার্টিগুলো নিজেদের বিজেপি-বিরোধী বলে দাবি করে, তাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এই দাবিতে অবিলম্বে জনমত গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সেই ঐক্য যেহেতু বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে, তাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য হবে সংসদীয় দলগুলোকে এই প্রশ্নে অবস্থান নিতে বা অন্তত মুখ খুলতে বাধ্য করা। তাহলেই স্পষ্ট হবে, এদের মধ্যে কারা ফ্যাসি-বিরোধী ঐক্য চায়, আর কারা তার অন্তরায়। অত:পর প্রতিটি কেন্দ্রে বিজেপিকে নির্বাচনে পরাস্ত করতে সক্ষম এমন সবচেয়ে সম্ভাবনাময়প্রার্থীকে ভোট দিতে মানুষকে আহ্বান জানানো যায়।

এটা আসন্ন নির্বাচনে ফ্যাসি-বিরোধী ভোট সংহত হতে অর্থাৎ বিজেপি-বিরোধী ভোট-ভাগ রুখতে কিছুটা হলেও কার্যকর হবে। নিচুতলায়ফ্যাসিবিরোধী সংহতি শুধু নির্বাচনী ফলাফলকে প্রভাবিত করবে তাই নয়, তা ভবিষ্যতের কঠিন দিনগুলোতে সাধারণ মানুষকে একজোট হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতেও সহায়ক হবে। নির্বাচনের মাধ্যমেই যখন ফ্যাসিবাদএরাজ্যের ক্ষমতা দখল করতে চাইছে, তখন এই লড়াই-এ কোনরকমদোলাচল না রেখে এটুকুইতিবাচক বার্তা কি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়না?

(অনীক, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারী ২০২১-এ প্রকাশিত)

[নির্বাচন নিয়ে কী ভাবছেন? আপনার ভাবনা ৫০০ শব্দের মধ্যে লিখে আমাদে র পাঠিয়ে দিন। আমাদের যোগাযোগ:

e-mail: edeshaamar@gmail.com

Whatsapp: 8902499477

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
No Thoughts on ফ্যাসিবাদের মুখে দোলাচল ক্ষমা করবে না ইতিহাস

Leave A Comment