“থোড়িই না হম পার্লামেন্ট সে দেশ বেচনে কে লিয়ে ভোট অওর ট্যাক্স দেতে হ্যায়!” – জাগছে হরিয়ানা

মতামত

Last Updated on 9 months by admin

 অনীক চক্রবর্তী
 “মোদি বঢ়া ভগওয়ান বননে নিকলে থে, হামে তো সির্ফ উসসে ধুল চাখানা হ্যায়; বাতানা হ্যায়, ভাই তু য্যাদা উছল মত…
আমাদের ডিপার্টমেন্টের আন্ডারে তিনটে রুরাল সেন্টারের অন্যতম হ’ল দীঘল। সাব-ডিভিশনাল হাসপাতাল। পিজিআই রোহতাকের অধীনে হলেও দীঘল পড়ে পাশের জেলা ঝাজ্জরে।
আমার গাইডের সঙ্গে সাপ্তাহিক ভিজিটে আজ গিয়েছি সেখানে। তিনি একাধারে দিলদরিয়া মানুষ আর অন্যধারে এ পৃথিবীর সব্বার সাথে প্রায় পারিবারিক পর্যায়ে সম্পর্ক। হাসপাতালে যে লোকটি সওদা- সব্জি- দুধ সরবরাহ করে তার কুশল সংবাদ নেওয়ার পরেই স্যর জিজ্ঞেস করলেন “অওর, উধর সব ক্যায়সা চল রহা হ্যায়?
তো তার উত্তরে হাসতে হাসতে মাঝ তিরিশের লোকটি যা বলল তার বাংলা তর্জমা করে দিচ্ছি।
গ্রাম থেকে রোজ ট্রাকে করে আনাজ, দুধ, চাল যাচ্ছে সিংঘু বর্ডারে। শীতের পোশাক, কম্বলের সেরকম একটা দরকার পড়ছে না, কিন্তু সেসবও রেডি; একবার আদেশ এলেই রওনা হয়ে যাবে। গ্রামের লোকজনকেও আর আলাদা করে বলার দরকার পড়ছে না, তবুও ছোট ছোট দল করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ে আপডেট দেওয়া চলছে, এই প্রচন্ড ঠান্ডায় জমায়েত চলছে পাল্লা দিয়ে। “মোদি বঢ়া ভগওয়ান বননে নিকলে থে…
এই হচ্ছে মোটামুটি গোটা হরিয়ানার পরিস্থিতি। মানে, অবশ্যই গোটা হরিয়ানা ঘুরতে হয়নি পরিস্থিতি বুঝতে। আমাদের ‘রিসার্চ মেথডলজি’তে পড়ানো হয়- গোটা ‘পপুলেশন’ এর ওপর স্টাডি যেহেতু সম্ভব নয়, তাই তার ‘রিপ্রেজেন্টেটিভ স্যাম্পল’ নিয়ে এগোই আমরা। তো সেই স্যাম্পলেরই আরও কয়েকটা উদাহরণ দিই।
গত সপ্তাহে ডিপার্টমেন্টে দু’দিনের কনফারেন্স হয়ে গেল। শেষ দিন সব কাজকম্মো মিটে যাওয়ার পর লাঞ্চ চলছে। টেবিলে মেডিসিন, অর্থো, ফার্মার সিনিয়র প্রফেসররা। খাওয়ার সঙ্গেই হিহিহাহা চলছে, আমি চুপচাপ পাশে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ আলোচনায় উঠে এলো এক ধাক্কায় হরিয়ানার মেডিকেল পড়ার খরচকে সাধারণ মানুষের হাতের বাইরে নিয়ে ফেলা। ক্ষোভে ফেটে পড়লেন একে একে সবাই। সেখান থেকে আলোচনা পৌঁছোল সরকারি উদ্যোগে গোটা দেশ জুড়ে ক্রসপ্যাথি প্রোমোট করায়। আবার একগাদা ক্ষোভ- খিল্লি- খিস্তিখাস্তা। এবং সেখানেই শেষ নয়, আলোচনা বেয়ে বেয়ে ঠিক পৌঁছে যায় কৃষক আন্দোলনে। প্রত্যেকে নিখুঁতভাবে আপডেটেড, পয়েন্ট ধরে ধরে বলছেন আসল প্রবলেমটা ঠিক কোথায়। বলছেন কৃষিবিল পাশের অনেক আগেই, সেই এপ্রিল-মে’র লকডাউনের মধ্যেই, হরিয়ানার কোথায় কোথায় আদানি বা আম্বানিদের উদ্যোগে খাদ্যশস্য মজুত করার জন্য বিশাল বিশাল আড়ত তৈরি হয়েছে। গোটা দেশের একের পর এক সেক্টরের বেসরকারিকরণ চলছে। “থোড়িই না হম পার্লামেন্ট সে দেশ বেচনে কে লিয়ে ভোট অওর ট্যাক্স দেতে হ্যায়!
আমি পাশে দাঁড়িয়ে শুনছি আর মুচকি মুচকি হাসছি। এঁরা প্রত্যেকে যাকে বলে সমজের ‘ক্রিমিয়েস্ট অফ দ্য ক্রিম লেয়ার’, এসব সাতে-পাঁচে না থাকলেই চলে। সে জায়গায় কনফারেন্সে এসে সরকারকে এরকম খুলে কাপড় পরানোর বন্দোবস্ত করতে গিয়ে সেধে ‘অ্যান্টিন্যাশনাল’ তকমা জোটানোর চাপ কে নেয় ভাই!
আরও আছে। ছেলে মেয়ের বেকারত্বের কথা বলতে বলতে প্রায়- ষাট গাড়ির ড্রাইভার নিজে থেকেই বলে ওঠে “সাব, ইসবার তো দেখ লেনা হ্যায়“।
এক বিশাল গোশালায় গিয়ে ঘুরে ঘুরে দেখার পর বছর পঁয়ষট্টির সাদা দাড়ির প্রধানের সঙ্গে আলাপ চলছে। এর আগে তিরিশ বছর আর্মিতে কাজ করে এসেছেন। ভারি গলায় খুব মেপে মেপে কথা বলেন। জানালেন, ঢাক ঢোল পিটিয়ে, মিডিয়া নিয়ে ঘোষণা হয়েছিল তাদের গোশালার জন্য সরকার কুড়ি লক্ষ টাকা দেবে; এতদিনে হাতে পেয়েছেন এক লাখ। হাসতে হাসতে বললেন “সাব, জীবনে অনেক ‘ঝুটা’ দেখেছি, কিন্তু মোদির মতো ‘ঝুটা, দিখানেওয়ালা’ আর একটিও দেখলাম না“।
এদের সবাইকে সঙ্গে নিয়েই কৃষকরা দিল্লি গিয়েছেন। আমরা যারা শান্তিতে রুমে ফিরে কম্বলের তলায় ঢুকে কৃষকদের জোর দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছি তারা ঠিক জানিইনা পঞ্জাব- হরিয়ানা জুড়ে কৃষকদের সামাজিক- রাজনৈতিক প্রভাব কতখানি। এপাশে তাদের স্যোয়াগটাই বা ঠিক কীরকম। তারা ঠিক কোন লেভেলে মাস মবিলাইজেশনের ক্ষমতা রাখেন। এদের কিছু যায় আসে না ন্যাশনাল মিডিয়া এদের কতখানি কভার করল, নাকি খলিস্তানি বলল তা নিয়ে। শহরে বেরোলে মাঝে মাঝেই চোখে পড়ে বড় রাস্তায় উচ্চস্বরে গান চালিয়ে দু’হাত উঠিয়ে নাচতে নাচতে যাচ্ছে ট্রাক্টরে সওয়ার যুবকেরা। ডিপার্টমেন্টে কৃষক পরিবারের ফার্স্ট ইয়ার পিজিটি এসে খুব টান দিয়ে চার অক্ষরের সম্বোধনে মোদিজীর গুণগান শুরু করে; হনুমানের বুক জুড়ে রামসীতার ডিপি লাগানো থার্ড ইয়ার  তখন একটাও উচ্চবাচ্য না করে হাসতে বাধ্য হচ্ছে খ্যা খ্যা করে…
এবং এঁরা আজ প্রত্যেকে সরকারের ওপর বীতশ্রদ্ধ। সরকার তাঁর ন্যূনতম বিশ্বাসযোগ্যতার জায়গাটাই হারিয়েছে এঁদের কাছে। কৃষকরা জিতে ফিরবেন কিনা জানিনা, কিন্তু তাঁদের দেখে, তাঁদের ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে থাকা একেকটা গোটা রাজ্যকে দেখে যারা এখনও দিশেহারা তারা কিছুটা চোয়াল-চাপা লড়াইয়ের সাহস পেলেও পেতে পারেন।
থোড়িই না হম পার্লামেন্ট সে দেশ বেচনে কে লিয়ে ভোট অওর ট্যাক্স দেতে হ্যায়!
[লেখক স্নাতকোত্তর  ছাত্র, কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগ, পিজিআই রোহতক।]
মতামত লেখকের নিজস্ব
Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
No Thoughts on “থোড়িই না হম পার্লামেন্ট সে দেশ বেচনে কে লিয়ে ভোট অওর ট্যাক্স দেতে হ্যায়!” – জাগছে হরিয়ানা

Leave A Comment