‘ভগবানের’ দোহাই ও হিন্দুত্ব

মতামত

Last Updated on 8 months by admin

দেবপ্রিয়া রায়

 

কোনও বেকায়দায় পড়ে গেলেই, বা হঠাৎ কোনও ঘটনায় মুষড়ে পড়লে, অস্ফুটে আমাদের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে – “হে ভগবান!” ছোটবেলা থেকে যে হিন্দু আস্তিক্যবাদের মধ্যে আমাদের বড় হওয়া, সে ব্যক্তিগত ঈশ্বর বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের ঊর্ধ্বে আমাদের মধ্যে অনিবার্যভাবে কিছু আচরণগত বৈশিষ্ট্য কিংবা ভাষার অভ্যস্ত লব্জ তৈরি করে, যা ধর্মের সঙ্গে পলকা সুতোয় হলেও আমাদের বেঁধে রাখে। বইয়ে পা ঠেকলেই অজান্তে কপালে হাত চলে যায়, চলন্ত বাসে-অটোয় বসে মন্দিরের ঘন্টা শুনে নমস্কার করতে ইচ্ছে করে, ধূপ-ধুনো আরতির গন্ধে আপনা থেকেই দেবীর সামনে মাথা নত হয়ে আসে।

এতদূর পর্যন্ত কিছুই সমস্যা নেই। সমস্যার সূত্রপাত তখনই হয় যখন শুধু নিজে ভগবান নমস্কার করেই থেমে না থেকে পাশের মানুষটিকেও নমস্কারে বাধ্য করা হয় বা তার উপাস্য ঈশ্বর অন্য জেনেও জোর করে ‘জয় শ্রীরাম’ বলানো হয়। যে বাঙালি রামবোকা, রামপাজি, রামপাঁঠা বলতে অভ্যস্ত তার আর ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে কতটুকুই বা যায় আসে? ঝামেলা তখনই বাঁধে যখন ভগবানকে প্রায় ঘরের লোক বানিয়ে ফেলা বাঙালি, তাকে নাড়ুগোপাল বলে আদর করা বাঙালি, ‘কানু’ ওরফে শ্রীকৃষ্ণকে হারামজাদা ডাকা বাঙালি, শিবঠাকুরকে “কোনো গুণ নাই তার কপালে আগুন” ব্যজস্তুতিতে অভ্যস্ত বাঙালি হঠাৎ দ্যাখে তাকে একটা ক্ষমাহীন চড়াসুরের হিন্দুত্ব চামচে করে গিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।

‘নভরাত্রি’র জায়গায় দুর্গাপুজোর সমস্ত অসৈরণে মেতে ওঠা বাঙালি মন কিন্তু তার বিচ্যুতির প্রশ্রয় পেয়েছে লোকায়ত হিন্দুধর্মের কাছেই! মা কেন ছেলের হাত থেকে প্রসাদ খাচ্ছে না সেই নিয়ে মা কালীর সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের ছেলেমানুষি অভিমান, আকুল কান্নাকাটি, মাকে নিজের এঁটো খাইয়ে দেওয়া – বিশালকায় দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের দৈবী প্রতিমাকে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম থেকে বের করে এনে ঘরের মা করে তোলা – বাঙালির ধর্মচর্চার ইতিহাসকে অনেক বেশি মানবিক করেছে। যদিও এক্ষেত্রে রামকৃষ্ণ একাই পথিকৃৎ নন, বাংলার শাক্ত ও বৈষ্ণব ধারায় ভগবানের সঙ্গে ভক্তের সহজিয়া সম্পর্ক চৈতন্যের সময় থেকেই যথেষ্ট স্পষ্ট।

মা যেমন কোনও কিছুতেই তেমন দোষ ধরেনা, সংসারের নানান দাবিদাওয়া নিয়ে ব্যতিব্যস্ত ক্লান্ত হয়ত খানিক উদাসীনও, তেমনই বাঙালির ভগবানও অনেকটাই অগোছালো, অন্যমনস্ক, কে কী পাপ করে ফেলল, দিনান্তে একবার স্মরণ করল কি করল না সে সম্পর্কে হেলদোলহীন। ভয় জর্জর ভক্তির বদলে তাই বাঙালির ঈশ্বরের প্রতি ব্যাকুল ভালবাসাই সম্বল। শ্রীরামকৃষ্ণের কথায় বলতে গেলে – “ঈশ্বরের প্রতি খুব ভালবাসা না এলে হয় না। খুব ভালবাসা হলে তবেই তো চারিদিক ঈশ্বরময় দেখা যায়।” আবার একইসঙ্গে তিনি বলেছেন – “আমার ধর্ম ঠিক, আর অপরের ধর্ম ভুল – এ মত ভাল না। ঈশ্বর এক বই দুই নাই। তাকে ভিন্ন ভিন্ন নাম দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন লোকে ডাকে।” “যত মত তত পথ।” এই যে উদারতার পাঠ আমরা পেয়েছি, ধর্মকে দম্ভ বা অন্যকে দমনের অস্ত্র হিসাবে ব্যবহারের বদলে মায়ের নরম কোলের মতন আদরণীয় জেনেছি, যেখানে বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী নির্বিশেষে সকলের ঠাঁই আছে, তার চরিত্র বদল করার আপ্রাণ চেষ্টা হয়ে চলেছে।

এবার প্রশ্ন উঠতেই পারে, নাহয় বাঙালি এমনিতেই হিন্দুধর্মে ‘পতিত’ জাত, মাছ-মাংস খায়, কোনও বাছ-বিচার নেই, তাই বলে কি তার উদ্ধার নেই? বিজেপি-আরএসএস –এর হাত ধরেই বাঙালি আবার হিন্দু হিসাবে শ্রেষ্ঠ আসন লবে, তাতে ক্ষতি কী? কিন্তু তর্কের খাতিরে আচ্ছা তা-ই সই বলেও পার পাওয়া যাচ্ছে কই? কয়েকশো কোটি টাকা খরচ করে হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী রামমন্দির নির্মাণ, অসংখ্য দাঙ্গায় উস্কানি, গোরুর মাংস খাচ্ছে সন্দেহে পিটিয়ে মারা, মন্দিরের ভেতর নাবালিকা ধর্ষণ, সেই ধর্ষকের স্বপক্ষে মিছিল করা এক উগ্র, আগ্রাসী, ক্ষমতালোভী ও একদেশদর্শী ধর্মের রূপের সঙ্গে কি মেলানো যায় সেই আদি রূপকে যা বেদমন্ত্রের প্রশান্তিতে, জ্ঞানের আকুতিতে ধ্বনিত হয়েছিল? দেখে নিই একটু।

“অসতো মা সদ্‌গময়। তমসো মা জ্যোতির্গময়।/ মৃত্যোর্মামৃতং গময়।।” বৃহদারণ্যকোপনিষৎ থেকে নেওয়া, অর্থ – অসৎ হইতে আমাকে সতে লইয়া যাও। অন্ধকার হইতে আমাকে আলোকে লইয়া যাও, মৃত্যু হইতে আমাকে অমৃতে লইয়া যাও।

“মধু বাতা ঋতায়তে মধু ক্ষরন্তি সিন্ধবঃ।/ মাধ্বীর্ন সন্ত্বোষধীঃ।।/ মধু নক্তমুতোষসি মধুমৎ পার্থিবং রজঃ।/ মধু দ্যৌরস্তু নঃ পিতা।।” ঋগ্বেদ, ১/৯০/৬-৯; বৃহদারণ্যক, ৬/৩; অর্থ – সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তির প্রতি বায়ুসমূহ মধুর হয়। নদীসমূহ মধুময় রস ক্ষরণ করে, ওষধিসমূহ আমাদের নিকট মধুময় হউক। রাত্রি এবং দিবসসকল মধুময় হউক; পিতৃস্থানীয় দ্যুলোক আমাদের নিকট মধুময় হউন।

“ওঁ সহ নাববতু, সহ নৌ ভুনক্তু, সহ বীর্যং করবাবহৈ/ তেজস্বিনাবধীতমস্তু, মা বিদ্বিষাবহৈ।।/ ওঁ শান্তিঃ, শান্তিঃ শান্তিঃ।।” তৈত্তিরীয়োপনিষৎ, ২/১; অর্থ – (ব্রহ্ম) আমাদের উভয়কে (আচার্য ও শিষ্য) সমভাবে রক্ষা করুন; উভয়কে তুল্যভাবে বিদ্যাফল দান করুন; আমরা যেন সমভাবে সামর্থ্য অর্জন করতে পারি; আমাদের উভয়ের লব্ধ বিদ্যা সফল হউক; আমরা যেন পরস্পরকে বিদ্বেষ না করি। শান্তি শান্তি শান্তি।

ধর্মের বৃহত্তর অর্থ ‘ধারণ করা’। উপরের সূক্তগুলির মধ্যে সেই সুর যেভাবে ফুটে উঠেছে, তার সঙ্গে আজকের হিন্দুত্বের চিৎকৃত ধারণা কোনওভাবেই কি মেলে? মানব চরিত্রের কমনীয়তা, জ্ঞানের অন্বেষণ, প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড়তা, সর্বোপরি এই পৃথিবী এবং সৃষ্টিজগৎ সম্পর্কে অগাধ বিস্ময় – বক্তা ও স্রোতা উভয়ের হৃদয়কেই যে বিপুল বিস্তার দেয়, বোধকে প্রসারিত করে – তার বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে ‘মন্দির ওঁহি বনায়েঙ্গে’–এর আস্ফালন কি চূড়ান্ত রকম অশ্লীল নয়? এই কদর্য, উগ্র হিন্দুত্ব আসলে আমাদের ভারতীয়ত্বর মূলেই কুঠারাঘাত। সত্যিকারের ভগবৎ প্রেমের থেকে জয় শ্রীরাম-এর ‘নাড়া’-র দূরত্ব অপরিসীম। বরং আমাদের বাঙালি সহজিয়া ভক্তির টানটুকু ওই ঔপনিষদিক সারল্যের, মায়ার বড় কাছাকাছি।

কৃত্রিমভাবে, রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হিন্দুত্ব নিজেকে আজকের হিন্দু সমাজের রক্ষক বলে দাবি করলেও তা এক বিকৃত, সংকুচিত রূপ যার মধ্যে হিন্দুধর্মের বিবিধের মাঝে মিলন মহানের মূল সুরটুকুই বাদ পড়েছে। তাই দিয়ে লোক ঠকিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা হয়ত হয়, কিন্তু দীর্ঘদিনের জন্য হৃদয়হরণ কি সম্ভব? শ্রীরামকৃষ্ণ যেমন বলেছিলেন – একমাত্র জ্ঞান, দয়া, প্রেম ও ভক্তি মানুষের চৈতন্যকে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে যেতে পারে। মন যেন সাদা কাপড়, যে রঙে ছোপাবে সেই রঙই হবে।

বাঙালির সামনে মহাকাল তাই কৌতুক করে এই চাল দিয়েছে। আজ বাঙালিকে ঠিক করে নিতে হবে – সে নিজের হৃদয় ‘অপর’-এর প্রতি ঘৃণার রঙে ছোপাবে, নাকি ভারতের চিরায়ত উদারতার বিচিত্র বর্ণে রাঙাবে।

 

[ব্যবহৃত গ্রাফিক্স The Wire, Rediff News ও Criterion Quarterly থেকে সংগৃহীত]

 

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
No Thoughts on ‘ভগবানের’ দোহাই ও হিন্দুত্ব

Leave A Comment