স্বাধীনতা ৭৫ : স্বাধীন – তবু শৃঙ্খল – তবু বিভাজন !!

আজকের খবর বিশেষ খবর মতামত

Last Updated on 1 month by admin

স্বাধীনতা ৭৫ :  স্বাধীন – তবু শৃঙ্খল – তবু বিভাজন !!

সুরভী দাস

 

আমরা আমাদের গর্বের অহংকারের স্বাধীনতার ৭৫তম বর্ষ পালন করছি। স্বাধীন দেশে নিশ্বাস নেওয়ার একটা আলাদা সুখ আছে! স্বাধীন ভারতের সূর্যের আলো গায়ে মাখার স্পর্শের একটা আলাদা রকমের অনুভূতি আছে! স্বাধীন আমরা কারণ আমাদের দেশ স্বাধীন, তাইতো এই দিনটাতে আমরা খুব অহংকারী আর আবেগী হয়ে উঠি, অনেক লড়াই অনেক রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এই স্বরাজ এইটুকু অহংকার এইটুকু আবেগী না হলে চলে নাকি!!

 

বড়ই অদ্ভুত আমাদের দেশ এত গর্বের সাথে স্বাধীনতা দিবস পালন করছি অথচ যাদের জন্য আমরা এই স্বাধীনতার সুখ ভোগ করছি  সত্যিই কি  তাদের দেখানো পথ আমরা অনুসরণ করি?

সহস্র শহীদদের জীবনের বিনিময়ে এই স্বরাজ পাওয়া, সত্যিই কি তাদের দেখা স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন  আমরা গড়তে পারছি?

তাঁরা যে আগুন আমাদের শতকোটি ভারতীয়দের বুকে জ্বালিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, সত্যিই কি আমরা সে আগুন জ্বেলে রাখতে পেরেছি?

তাঁরা স্বাধীন ভারতের এক অন্য সূর্যের ভোর চেয়েছিলেন, তাঁরা চেয়েছিলেন জাতি-ধর্ম-বর্ণ মুক্ত এক প্রজাতান্ত্রিক দেশ – যেখানে ধনী-গরীব নির্বিশেষে সবাই থাকবে সমান আইনি অধিকার নিয়ে। আদৌ কি তাদের নিঃস্বার্থ জীবনের বলিদানের মর্যাদা আমরা দিতে পারছি?

স্বাধীনতা ৭৫-এ এসেও আমাদের হিসাব করতে হচ্ছে আমরা কী পেলাম আর কী পেলাম না!!

  • এখনো আমাদের দেশে একটু উসকানি মূলক ধর্মীয় প্ররোচনায় দাঙ্গার আগুন জ্বলে ওঠে, এক ধর্মের মানুষ অন্যধর্মের মানুষকে নির্দ্বিধায় খুন করে ধর্ম রক্ষার তাগিদে!!!
  • এখনো আমাদের দেশ ক্ষুধা সূচকে বিশ্বের ১০৭টি দেশের মধ্যে ৯৪নম্বরে। পাকিস্তান, নেপাল, বাংলাদেশের মতো দেশগুলিও ভারতের থেকে এগিয়ে গেছে অপুষ্টি দূরীকরণে। যেখানে স্বাধীনতার ৭৫বছরেও ভারতের মোট জনসংখ্যার ১৪শতাংশের বেশি মানুষ অপুষ্টিতে ভোগেন  আর প্রায় ৩৭ শতাংশেরও বেশি বাচ্চার বৃদ্ধি থেমে গেছে অপুষ্টির কারণে অথচ দেশের সরকারি গুদামে প্রায় ১০ হাজার কোটি  টন খাদ্যশস্য পচছে  – আর দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো ব্যস্ত গুটিকতক ভারতীয়র পরিবারের পক্ষে সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে তাদের সেবা করতে।
  • এখনো সারাবিশ্বের মোট ৪০শতাংশ মেয়েদের বাল্যবিবাহের মত কুপ্রথার শিকার হতে হয় এই ভারতে।
  • এখনো সারাবিশ্বের ধর্ষণের পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে প্রথম দশটি দেশের মধ্যে চার নম্বরে রয়েছে ভারত। NCRB -এর রিপোর্ট অনুযায়ী প্রতি ১৫মিনিট অন্তর আর প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯১টি ধর্ষনের ঘটনা ঘটে এরমধ্যে বিবাহ সম্মত ধর্ষণ আর শিশুদের যৌন নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে এই স্বাধীন দেশে। সেখানে একটি মেয়ের স্বাধীনতার বিষয়টা ঠিক কোথায় তা বলাবাহুল্য।
  • এখনো দৈনিক গড়ে ২৮৯টি অপহরণের আর ৮০টি হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে। সময়ের সাথে সাথেও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিশু আর নারী নির্যতনের ঘটনা।
  • স্বাধীনতার ৭৫তম দিবসের পরেও দেশে বেকারত্বের সংখ্যা সর্বোচ্চ। তার ওপর অপরিকল্পিত লকডাউনে প্রায় ১৩কোটি মানুষ কর্মহীন   হয়ে পড়েছেন। অসংগঠিত শ্রমিকের সংখ্যাটা না হয় বাদের খাতায় রাখলাম!
  • এখনো কিছু ভেকধারী মানুষ মন্ত্রিত্ব লাভ করে সারা দেশের মানুষের বিধাতা হয়ে আপামর জনসাধারণের ওপর ছড়ি ঘোরায়, আমাদের জীবনশৈলি, জীবনযাপনের নিয়ম কানুন তৈরি করেন। আর আমরা কিছু অন্যায় দেখেও চুপচাপ বসে থাকি, প্রশ্ন করতেও পিছপা হই।

সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশের একজন শতোর্ধ কৃষক বলেছেন এই স্বাধীন ভারত দেখার জন্য তারা স্বরাজের জন্য আন্দোলন করেননি!!!

স্বাধীনতা সংগ্রামীরা শুধুমাত্র ইংরেজদের হাত থেকে দেশ এবং দেশের মানুষদের আজাদ করতে চাননি! তাঁরা সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে স্বাধীন ভারতীয়দের মধ্যে বিভেদ চাননি। দেশকে শুধুমাত্র ইংরেজ সরকারকে সরিয়ে দেশের কোনো ক্ষমতালোভীর সরকারের হাতে তুলে দিতে চাননি! রাজার ছেলে রাজা হোক এটা তাঁরা চাননি! শুধুমাত্র জননেতাদের কথা মান্যতা পাবে আর সাধারন জনগনের কথার দাম থাকবে না, এটা তারা চাননি! রাস্তার ধারে ভুখা শিশুর ঢল শুয়ে থাকবে এটা তাঁরা চাননি! ধনীর সন্তানেরা স্কুলে যাবে শিক্ষার আলো পাবে আর গরিবের সন্তানেরা শিশুশ্রমিক হবে এটা তাঁরা চাননি! যার অর্থ থাকবে সে স্বাস্থ্য পরিষেবা পাবে আর যার অর্থ থাকবে না সে  বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে এটা তাঁরা চাননি! বেকারত্বের জ্বালায় স্বাধীন ভারতের কর্মহীনরা আত্মহত্যা করুক এটা তাঁরা চাননি! তাঁরা চাননি দেশ এক শাসকের হাত থেকে আরেক শাসকের হাতে চলে যাক – আর আপামর জনতা পরাধীন হয়েই থেকে যাক!

তাঁরা চেয়েছিলেন স্বাধীন ভারতকে পুঁজির দালালদের হাতে দেশকে তুলে না দিয়ে সার্বভৌমত্বের দেশ গঠন করতে। যেখানে সবার সমানাধিকার থাকবে, সবাই শিক্ষার আলো আর স্বাস্থ্যের পরিষেবা পাবে, যেখানে মন্ত্রীর ছেলে মন্ত্রী হবে না যোগ্য জন দেশ চালানোর কাণ্ডারি হবে, রাস্তার ধারে কেউ অনাহারে দিন গুজরান করবে না, সবার হাতে কাজ আর পেটে দুবেলার খাবার থাকবে,কুসংস্কার  নয় যুক্তিসংগত তর্কে সব কিছু বিচার করা হবে, যেখানে দেশের এক প্রান্তিক দেশবাসীরও কথা একজন মন্ত্রীর কথার সমান মান্যতা পাবে, যেখানে নারী আর শিশুরা স্বাধীনভাবে সসম্মানে বাঁচবে, যেখানে অপরাধীর বিচার অপরাধের সীমা দেখে শাস্তি ধার্য করা হবে সেখানে তার প্রতিপত্তি বা ক্ষমতা দেখে নয়।

এবার আরও একবার হিসাব করতে বসি স্বাধীনতার ৭৫তম বর্ষ উদযাপন করেও ,এতগুলো বছরে আমরা ঠিক কতটা স্বাধীনতার সুখ পেয়েছি আর কতটা পরাধীনতার কাঁটা জড়িয়েছে?? থাক উত্তরটা নিজের মননকে জিজ্ঞাসা করলেই হয়ত পাওয়া যাবে!! সবাই একবার নিজেকে প্রশ্ন করুন – হিসেব পেয়ে যাবেন!!

 

* এই বিভাগে মতামত লেখকের নিজস্ব

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on স্বাধীনতা ৭৫ : স্বাধীন – তবু শৃঙ্খল – তবু বিভাজন !!

Leave A Comment