সুন্দরবনবাসীর বানভাসি হওয়া কি ভাগ্যলিপি নাকি অবহেলার ফল

আজকের খবর বিশেষ খবর মতামত

Last Updated on 2 months by admin

প্রশ্ন হল, সুন্দরবনে প্রাকৃতিক অনেক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও কি নদী ভাঙ্গনের হাত থেকে সুন্দরবনকে বাঁচানো যায়? আমরা বিজ্ঞানী নই, গবেষকও নই। কিন্তু নদীপাড়ে বাস করতে করতে নদীকে যেভাবে চিনেছি সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, একশো ভাগ সম্ভব। নদী ভাঙ্গনের তিনটি প্রধান কারণ লক্ষ্ করা যাচ্ছে- (১) নদীবাঁধগুলোর দুর্বল অবস্থা ও দেখভালের অভাব; (২) নদীর পাড়ে গাছ না থাকা; (৩) মেছো ভেড়ি ও ইটভাটাগুলোর বেআইনিভাবে নদীর বাঁধ কেটে জল ঢোকানো।

সুন্দরবনবাসীর বানভাসি হওয়া কি ভাগ্যলিপি নাকি অবহেলার ফল

অশোক মুখার্জী

সুন্দরবনবাসীর জীবনযাত্রা, তাদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যা ইত্যাদি নিয়ে লিখতে বসে সবার আগে মনের পাতায় ভেসে উঠছে, কী আছে  সুন্দরবনবাসীর জীবনে? সবই তো নেই এর পাতায় পূর্ণ। শিক্ষার সুব্যবস্থা – নেই; স্বাস্থ্যের জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থা – নেই; কর্মসংস্থানের জন্য কোন ব্যবস্থা – এখানে নেই;  দ্বীপ ঘেরা সুন্দরবনের যাতায়াতের কোন সুব্যবস্থা – নেই; এখনো তিনটি নদীর খেয়া পার হয়ে তাকে বাস, অটো বা ট্রেনের মুখ দেখতে হয়। বাকি যা কিছু একটা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন তার কোনটাই এখানে পাবেন না। এসব না পাওয়া নিয়েও মানুষ নিরুপায় হয়ে এখানে বাস করছিল, কিন্তু তাদের না পাওয়া জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে – প্রতিবছর নদীবাঁধ ভেঙে লোনা জল ঢুকে মানুষের বেঁচে থাকার শেষ সম্বল মাঠের ধান, ক্ষেতের সবজি ফসল, পুকুরের মাছ, কোনক্রমে বেঁচে থাকার মতো চালা ঘর গুলিকেও ভাসিয়ে দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে দিয়ে যাচ্ছে। অসহায় মানুষের অসহায়ত্ব প্রতিদিন বেড়েই চলেছে। প্রতিবছর লোনা জলে ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা আগে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে ঘটত। ২০০৯ সালের আয়লা নামক ঘূর্ণিঝড় সারা সুন্দরবনকে ভাসিয়ে, ভেঙে চুরমার করে দিল। প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে দু-একটা কথা না বলে পারছি না। সেদিন সকাল থেকেই দমকা হাওয়া আর অঝোরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। কী ঘটতে চলেছে মানুষ প্রায় জানেই না, কারণ সরকারিভাবে তেমন কোনো সতর্কীকরণ করা হয় নি। সকাল ন’টা, আমার এক সহকর্মী ফোন করে জানাল, এখানে নদী বাঁধ ভেঙেছে, এক্ষুনি লোকজন নিয়ে যাওয়া দরকার। সাথে সাথে কুড়ি পঁচিশ জন ছেলেকে নিয়ে আমরা ছুটলাম। প্রায় চার কিলোমিটার দূরে নদী বাঁধের কাছে, দূর থেকে দেখতে পেলাম ইতিমধ্যে বাঁধ ভেঙে একটা মাঠ পুরোপুরি ডুবে গেছে। সেই পাড়ার লোকজনেরা কান্নাকাটি শুরু করেছে। সাথে সাথে সেখানকার বাচ্চাদের, মায়েদের নিয়ে রাস্তার উল্টোদিকের মাঠ ধরে স্কুলে আনার জন্য ছুটতে থাকলাম। ইতিমধ্যে ওই রাস্তা ভেঙে জলস্রোত আমাদের তাড়া করেছে, তিন – চার ফুট উঁচু হয়ে জল আসছে। কোনক্রমে বাচ্চাগুলোকে নিয়ে স্কুলের খোলা ছাদে তুলে দিলাম। পাড়ায় ঢুকে আরো করুণ দৃশ্য; মানুষ কোনটা বাঁচাবে বুঝে উঠতে পারছে না, ঘরের চাল – ধান – বিছানাপত্র – ছাগল, গরু – বাচ্চাকাচ্চা! দিশেহারা মানুষ বাঁচার জন্য ছুটছে এদিক-ওদিক। সে করুণ দৃশ্য ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত মানুষ বুঝল সব চেষ্টা ব্যর্থ; ঘরের মধ্যে এক হাঁটু জল, ঘর ভেঙে পড়ার আগে শুধু জীবনটুকু নিয়ে বেঁচে থাকাই শ্রেয় ধরে নিয়ে যে যেখানে উঁচু জায়গা বা ঘর পেল, সেখানেই আশ্রয় নিল। বাকি সারা জীবনের সঞ্চয় ভেসে গেল স্রোতের জলে।

তারপর ১১ বছর পার হয়েছে, কিন্তু নদী ভাঙ্গনের হাত থেকে মানুষ আজও রেহাই পায়নি। এরপর ফনী – বুলবুল – আমফান – একটার পর একটা দুর্যোগ সুন্দরবনের জনজীবনকে বিধ্বস্ত করেই চলেছে। ২০২১ -এর ‘ইয়াস’ এর পর যখন লিখছি- তখনও সেই একই অভিজ্ঞতা। ২৬ শে মে’র পর এক  – দেড় মাস হয়ে গেল, এখনো মাঠে এক কোমর লোনা জল। আজও ফ্লাড সেন্টারে মানুষ বাস করতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যান্য গ্রামে আজও রাস্তায় কালো পলিথিন এর নীচে মানুষ দিন কাটাচ্ছে। একে কি বেঁচে থাকা বলে? এবছর আমন চাষ হবে না সবাই বুঝে গেছে। বোরো চাষের সম্ভাবনাও নেই। ভালো বর্ষা হলে ক্ষেতের সবজি চাষ শীতকালে কিছুটা হওয়ার আশা মানুষ করছে। গ্রামে কোন কাজ নেই; বাইরে কাজে যাওয়ার উপায় নেই, কারণ কোভিডের কারণে যানবাহন বন্ধ ছিল। এখন বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়   ত্রাণের উপর ভরসা। বিভিন্ন মানবিক সংগঠনগুলি তাদের সাধ্যমতো সাহায্য করার চেষ্টা করছে, আর সেইটুকু নিয়েই বেঁচে আছে মানুষ। সরকারীভাবে একটা করে পলিথিন ছাড়া আর কোন সাহায্য মানুষ পায় নি। সবচেয়ে দুঃখের বিষয়, লাখো লাখো অসহায় মানুষ যাদের ভোটে এই সরকার, তারাই ত্রাণের ব্যাপারে এতটা নিরুৎসাহ হন কীভাবে! কিছু কিছু জায়গায় রান্নাঘর করে খাওয়ানো হচ্ছে, যার সবটাই করছে কোন না কোন NGO।  ২৬ শে জুন ভরা কোটালের আগে মানুষ আশঙ্কাগ্রস্ত ছিল –  আবার কিছু হবে না তো? গৃহহীন – খাদ্যহীন – নিরন্ন সুন্দরবন।।

এটাই কি আমাদের ভাগ্যলিপি? নাকি সরকারের অবহেলার ফল?

সুন্দরবনের নদীবাঁধ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে, গবেষকরা বইয়ের পর বই লিখে ফেলেছেন। ব্রিটিশরা তাদের স্বার্থে ভূমির পূর্ণতাপ্রাপ্তির আগেই জঙ্গল সাফ করার জন্য বিহারের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আদিবাসী মানুষজনদের এখানে এনে বনকাটা ও নদীবাঁধ দেওয়ার কাজ শুরু করে। তৈরি করে চাষের জমি। ফলে জঙ্গল থেকে ভূমি অনেকটা নিচু। তাই শক্ত বাঁধ এবং তার নিয়মিত দেখভাল করাটা জরুরি। এ ধরনের সুন্দরবনের ইতিহাসও লেখা হয়ে গেছে। আজকের সুন্দরবনে ষাট লক্ষের অধিক মানুষের বাস। তাকে কী করে রক্ষা করা যাবে, সেটাই আলোচ্য হয়ে ওঠা উচিত। বড় বড় খরস্রোতা নদীও যেমন আছে, ক্ষীণস্রোতা নদীও এখানে আছে। উষ্ণায়নের ফলে বরফ গলা জল নিয়মিত বেড়ে চলেছে, আবার ক্ষীণস্রোতা নদীগুলির মধ্যে বেশ কিছু নদী পলি পড়ে মজেও যাচ্ছে। ফলে জোয়ারের সময় মজে যাওয়ার কারণে জলতল আরো উপরে উঠে আসছে। প্রশ্ন হল, এই সমস্ত সমস্যা থাকা সত্ত্বেও কি নদী ভাঙ্গনের হাত থেকে সুন্দরবনকে বাঁচানো যায়? আমরা বিজ্ঞানী নই, গবেষকও নই। কিন্তু নদীপাড়ে বাস করতে করতে নদীকে যেভাবে চিনেছি সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, একশো ভাগ সম্ভব। নদী ভাঙ্গনের তিনটি প্রধান কারণ লক্ষ্ করা যাচ্ছে- (১) নদীবাঁধগুলোর দুর্বল অবস্থা ও দেখভালের অভাব; (২) নদীর পাড়ে গাছ না থাকা; (৩) মেছো ভেড়ি ও ইটভাটাগুলোর বেআইনিভাবে নদীর বাঁধ কেটে জল ঢোকানো।

আপনারা যদি রায়মঙ্গল থেকে ইছামতী, কালিন্দী হয়ে ডাঁসা-বেতনি-মাতলা-বিদ্যাধরী ইত্যাদি নদীবাঁধগুলো দেখেন, সেগুলোকে আপনার মেছো আল মনে হবে, যার তলা কুড়ি ফুট আর মাথা দুই ফুট। এটাকে কি নদীবাঁধ বলা যায় ? অন্তত ১০০ ফুট তলা, কুড়ি ফুট মাথা যুক্ত নদীবাঁধ যদি করা যায় এবং রিভার সাইডে যদি সিমেন্টের ব্লক লাগানো যায় ও নদীর পাড়ে বহুল পরিমাণে ম্যানগ্রোভ বানানো যায়, বাঁধের উপর অংশ ঢালাই করা হয় যাতে আরও বেশি জলোচ্ছ্বাস হলেও মাথাটা ভেঙে ফেলতে না পারে, তাহলে বছর বছর বানভাসি হতে হয় না সুন্দরবনবাসীকে। এর সাথে যেটা অবশ্য জরুরি তা হল নিয়মিত দেখভালের জন্য কর্মী নিয়োগ করা, যা আগে ছিল ‘বেলদার’ নামে। কারণ নদীর বাঁকে বাঁকে স্রোতের গতিমুখ পরিবর্তন হয়, ফলে অনেক সময় বাঁধের তলদেশে মাটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে বাঁধকে বসিয়ে দেয়।

দেখাশোনার জন্য যারা থাকবেন তারা নিয়মিত মাটির কাজ যেমন করবেন, প্রয়োজনে ইরিগেশনকে খবর দিয়ে বিপজ্জনক জায়গা মেরামতির ব্যবস্থা করবেন। তাতে বিপদ নব্বই ভাগ কেটে যাবে। নদী বাঁধ কেটে মেছো ভেড়ির জল ঢোকানো ও বার করার যে বে-আইনী কারবার সরকারি দলগুলোর মদতে চলছে এবং সেখানেই নদীবাঁধগুলো আগে ভাঙছে, সেই কাজ বন্ধ করার ব্যবস্থা নিতে হবে। ভেড়ি করার জন্য লোনাজল নেওয়ার বিকল্প ব্যবস্থা- (১) নদী থেকে পাম্প করে, (২) কিংবা সুইস গেটের খাল ব্যবহার করে মাছ চাষ করতে বাধ্য করতে হবে। এই কাজগুলি করা সত্যিই কি অসম্ভব? যদি না হয় তাহলে এই বারবার ভাঙ্গনের কারণ সরকারী উদাসীনতা বললে কি ভুল বলা হবে?

স্বাধীনতার পর থেকে একটার পর একটা সরকার এসেছে চলেও গেছে, কিন্তু সুন্দরবনের মানুষ সেই অসহায় অবস্থার মধ্যেই দিনপাত করছে। আর অন্যদিকে সরকারি দলগুলোর নেতাকর্মীরা এই সুযোগে সরকারি অর্থ লুট করতে শুরু করে – প্রায় অবহেলায় পড়ে থাকা নদীবাঁধ যা সুন্দরবনবাসীর কাছে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর অসহায় নিরুপায় মানুষ প্রতিবার বানভাসি হচ্ছে আর ত্রাণ নিয়ে কোনোক্রমে বেঁচে থাকছে। মূল সমস্যার সমাধান না করে ত্রাণে নির্ভর করে তুলছে সুন্দরবনবাসীকে। গড়ে তুলতে চাইছে অনন্যোপায় সরকার নির্ভর, আত্মমর্যাদাহীন, অসহায় এক জনসমাজ। তাই আজকের সুন্দরবনকে যদি আদর্শ সমাজ হিসাবে গড়ে তুলতে হয় তাহলে দলমত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে যাতে আর বানভাসি হতে না হয় সেজন্য স্থায়ী পরিবেশ-বান্ধব নদীবাঁধের দাবিতে সোচ্চার হতে হবে। আর সেই কাজে সমস্ত ধরনের মানবিক ব্যক্তি, সংগঠন – সকলকে এসে সুন্দরবনবাসীর পাশে দাঁড়াতে হবে, যাতে কেন্দ্র-রাজ্য উভয় সরকারকেই বাধ্য করা যায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণে। গৃহহীন, শিক্ষাহীন, কর্মহীন জনজীবনে নতুন করে আশার আলো জাগবে; গড়ে উঠবে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ, শিক্ষায় আলোকপ্রাপ্ত হবে। নিজেরাই আদায় করে নিতে পারবে তাদের বেঁচে থাকার বাকি উপাদানগুলো। গড়ে উঠবে আদর্শ গ্রাম,  আদর্শ সুন্দরবন।

  • লেখক সুন্দরবনের বাসিন্দা, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও সমাজকর্মী
  • এই বিভাগে মতামত লেখকের নিজস্ব 
Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on সুন্দরবনবাসীর বানভাসি হওয়া কি ভাগ্যলিপি নাকি অবহেলার ফল

Leave A Comment