কমলি সোরেনকে পদ্মশ্রী পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমে কি সঙ্ঘচালিত বিজেপি সরকার আদিবাসীদের নিজস্ব আত্মপরিচিতি কেড়ে নিতে চাইলো?

আজকের খবর পর্যালোচনা বিশেষ খবর মতামত

Last Updated on 6 months by admin

 

কমলির সোরেনকে পদ্মশ্রী পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমে কি সঙ্ঘচালিত বিজেপি সরকার আদিবাসীদের নিজস্ব আত্মপরিচিতি কেড়ে নিতে চাইলো? 

শুভদীপ 

মালদহের গাজলের তুড়ি মোড় থেকে পাঁচ কিলোমিটার গেলেই কোটালহাটি গ্রাম। কিছুদিন আগে আশেপাশের গ্রামের মানুষ কমলি সোরেন নামটা চিনতেন না। নামটা জিজ্ঞাসা করলে সবাই  চিন্তায় পড়ে যেতেন। তাঁরা  ‘গুরুমা’কে চেনেন। ‘গুরুমা’র কথা জিজ্ঞাসা করলেই এককথায় সবাই দেখিয়ে দেন তাঁর বাড়ির রাস্তা। কোটালহাটি গ্রামেই ৭ কাঠা জমির ওপর গড়ে উঠেছে ‘গুরুমা’র একটি আশ্রম। এবছর প্রজাতন্ত্র দিবসে পদ্ম সম্মান পেয়েছেন প্রায় ৫০বছর বয়সী ‘গুরুমা’ কমলি সোরেন। সেদিন সেখানে বিজেপি নেতা-নেত্রীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। ফুল, কম্বল, মিষ্টি দিয়ে তাঁকে সেদিনই সংবর্ধনা জানান গাজল-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের বিজেপি প্রধান বিন্দু পুঝোর মাল। সঙ্গে ছিলেন মালদহ বিজেপির মহিলা মোর্চা প্রধান সাগরিকা সরকারও।

 

কিন্তু কে এই কমলি সোরেন? আপাতদৃষ্টিতে সোরেন সাঁওতাল আদিবাসীদের একটি পদবী। এহেন পশ্চিমবঙ্গের এক অখ্যাত পাড়ার একজন সাঁওতাল মহিলা হঠাৎ কীভাবে দেশের সরকারের নজরে পড়লেন? এইটা জানার জন্যই আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে তাঁর কাজকর্মের ইতিহাসে। আশেপাশের গ্রামে কমলি পরিচিত ‘গুরুমা’ হিসেবে। শোনা যায় তাঁর স্বামী ধর্মচর্চা করতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি কোটালহাটি গ্রামে ত্রিপলের ছাউনিতে থাকতে শুরু করেন। স্বামীর পথে তিনিও চলতে শুরু করেন। বিভিন্ন গ্রাম মিলিয়ে এখন কমলির শিষ্যের সংখ্যা একশো ছাড়িয়েছে। কমলির কথায়, ভিক্ষাবৃত্তি এবং শিষ্যদের দানেই দিন চলে তাঁদের।

 

তিনি রাজনীতিতে যুক্ত নন বলে দাবী করলেও কমলি আসলে একটা গভীর ও ভয়ানক রাজনীতি করেন গ্রামের আদিবাসী মানুষদের মধ্যে। গত পঁচিশ বছরে খ্রিস্ট ও ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী একাধিক আদিবাসীকে টাকা ও অন্যান্য লোভ দেখিয়ে হিন্দু ধর্মে দীক্ষিত করেছেন কমলি। আদিবাসী ও দলিত গ্রামে ঘুরে ঘুরে কমলি হিন্দুত্বের মাহাত্ম্য প্রচার করে বেড়ান। গত বছর হিন্দুধর্মে পরিবর্তিত করার লক্ষ্যে কমলি নাকি একটি গণবিবাহেরও আয়োজন করেছিলেন। সেটি অবশ্য স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরোধিতায় ভেস্তে যায়। কমলি বলেন, “আদিবাসীদের ভুল বুঝিয়ে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। তাঁদের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনাই আমার একমাত্র লক্ষ্য।” কমলির এই বক্তব্যের মধ্যে ‘মূলস্রোত’ শব্দটি লক্ষ্যণীয়। ‘মূলস্রোত’ অর্থে কিন্তু কমলি সাঁওতাল আদিবাসীদের চিরাচরিত ধর্ম অর্থাৎ মারাংবুরু, জাহেরএরা ইত্যাদি দেবদেবীর পূজাকে বোঝান না। মূলস্রোত বলতে তিনি বোঝান হিন্দুত্বকে। তিনি নিজেও যে আসলে খ্রিস্টান মিশনারি বা মুসলমান প্রচারকদের মতোই আদিবাসীদের ধর্মান্তরিত করছেন সেটা কমলি কিছুতেই স্বীকার করবেন না। কমলির এই কথার মারপ্যাঁচ বুঝতে গেলে আমাদের ঢুকতে হবে কমলিদের রাজনীতির গভীরে।

 

আরএসএসের শাখা বনবাসী কল্যাণ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত কমলি। আদিবাসীদের উগ্রহিন্দুমতে দীক্ষিত করতে ১৯৫২ সালে আরএসএস বনবাসী কল্যাণ আশ্রমের সূচনা করে। বিভিন্ন শাখা ছড়িয়ে এই সংগঠনটি আদিবাসীদের মধ্যে আজও কাজ করে চলেছে। প্রকৃতিপূজারী আদিবাসীদের হিন্দু ধর্মে আনার জন্য উপহার, লোভ, ভয় ইত্যাদি নানান কায়দায় কাজ করে এই সংগঠন। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এই হিন্দুত্বের সরাসরি উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে আদিবাসীরা। তারা চিরকাল ‘দিকু’ অর্থাৎ হিন্দুদের দ্বারা শোষিত হয়ে এসেছে, তাদের জঙ্গল কেটে সাফ করা চাষজমি দিকুরা দখল করেছে— সব হারাতে হারাতে শান্তিপ্রিয় আদিবাসীরা পালাতে বাধ্য হয়েছে গভীর জঙ্গল-পাহাড় ইত্যাদি দুর্গম এলাকার দিকে আর নাহয় ‘দিকু’দের জন্য গায়েগতরে খেটে দুমুঠো ভাত যোগাড় করতে হয়েছে। কিন্তু এতকিছুর মধ্যেও তাঁরা তাঁদের নিজস্ব ভাষা-ধর্ম-সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে গেছে। সেই ভাষা আর্য ভাষা নয়, সেই ধর্ম হিন্দুধর্মের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, সেই সংস্কৃতিও হিন্দু সমাজের চেয়ে অনেক বেশি সাম্যপরায়ণ। এহেন আদিবাসীদের যেভাবেই হোক হিন্দুত্বের সৈনিক করাই লক্ষ্য বনবাসী কল্যাণ আশ্রমের। এভাবেই এক অভিন্ন হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নের দিকে অগ্রসর তারা। আর অদ্ভুত হলেও সত্যি যে কমলি সোরেনের মতো একজন আদিবাসী মহিলা তাদের সেই নকশায় শামিল হয়ে নিজের জাতভাইদের মধ্যে হিন্দুত্বের মিথ্যে বুলি ছড়িয়ে সঙ্ঘের হাত শক্ত করছেন, মেরে ফেলছেন আদিবাসীদের নিজস্ব ঐতিহ্যকে। কমলির কাজের সূত্রেই পঞ্চায়েত ও লোকসভা ভোটে কোটালহাটি গ্রামে সাফল্য পেয়েছে বিজেপি। এভাবেই সঙ্ঘ ঘনিষ্ঠতার জন্যই মিলল পদ্মশ্রী সম্মান।

 

দেশের প্রায় সমস্ত অঞ্চলেই আদিবাসী মানুষদের বংশানুক্রমিক বাসস্থান জল-জঙ্গল-জমি কেড়ে নেওয়া চলছে কেন্দ্রের ইউপিএ আমল থেকেই। কিন্তু এই পুরস্কার প্রদান জিনিসটাকে একটা অন্য মাত্রায় নিয়ে গেল। কমলির মতো একজনকে পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে গেল যে আদিবাসীদের শেষটুকু সম্বল নিজস্ব আত্মপরিচিতি কেড়ে নেওয়া একজনকে মান্যতা দিল সঙ্ঘচালিত কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। বুঝিয়ে দিল যে হিন্দুরাষ্ট্র কায়েমের লক্ষ্যে অবিচল সঙ্ঘপরিবারের কাছে আদিবাসীদের সুপ্রাচীন সংস্কৃতি ধ্বংস করা কত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ।

 

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on কমলি সোরেনকে পদ্মশ্রী পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমে কি সঙ্ঘচালিত বিজেপি সরকার আদিবাসীদের নিজস্ব আত্মপরিচিতি কেড়ে নিতে চাইলো?

Leave A Comment