গুজরাতে টাটার ন্যানো গাড়ির উৎপাদন কি বন্ধ হতে চলেছে?

আজকের খবর বিশেষ খবর

Last Updated on 8 months by admin

বিশেষ প্রতিবেদন, ২৪ জানুয়ারি

টাটার ন্যানো গাড়ির কারখানা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ উত্তাল হয়ে উঠেছিল। অভিযোগ ছিল – ২০০৭ সালে কৃষকদের জমি জোর করে অধিগ্রহণ করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। তারপর আন্দোলনের চাপে টাটা চলে যায় গুজরাতে তাদের ন্যানো প্রকল্প নিয়ে। এই আন্দোলনের ওপর ভর করেই ৩৪ বছরের বাম জামানাকে হঠিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসে। এখন সেই ন্যানো প্রকল্প কী অবস্থায় আছে – উৎপাদন কি চলছে সেখানে? – একটি বিশেষ প্রতিবেদন ।

বন্ধ হয়ে যেতে পারে বহু চর্চিত ন্যানো গাড়ির উৎপাদন। ২০১৯ এর একটা রিপোর্ট বলছে, টাটার রেগুলেটরি ফাইল অনুযায়ী ২০১৯ এর জানুয়ারি মাস থেকে টাটা মোটরস একটাও তাদের এক লাখি গাড়ি ন্যানো তৈরি করতে পারে নি। এমনকি ফেব্রুয়ারি মাস থেকে একটাও ন্যানো গাড়ি বিক্রি অবধি হয় নি!!

ফলে টাটা মোটরস হয়তো খুব তাড়াতাড়িই ন্যানো গাড়ি তৈরি নিয়ে একটা বড়সড় সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে। যদিও কোম্পানির তরফ থেকে জানানো হয়েছে, ন্যানো গাড়ির উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হবে -এরকম কোনো সিদ্ধান্ত এখনও নেওয়া হয় নি।

ন্যানো গাড়ি যখন প্রথম বাজারে আসে, তখন টাটা’র তরফ থেকে গাড়িটিকে ‘সাধারণ মানুষের গাড়ি’ হিসেবেই প্রচার করা হয়। অত্যন্ত কম দামের মধ্যে হওয়ায় প্রথম প্রথম মানুষের মধ্যে গাড়িটির চাহিদাও কিছু  ছিল। কিন্তু তারপরেই ধীরে ধীরে বাজারে ন্যানোর চাহিদা কমতে থাকে। রেগুলেটরি কমিটির মতে, টাটা মোটরসের সানন্দ প্লান্ট ইউনিটে শেষ ন্যানো গাড়ি তৈরি হয়েছিল ২০১৮’র ডিসেম্বর মাসে, তাও মাত্র ৮২ টি।

তারপর ২০১৯এর জানুয়ারি – জুন সময় পর্বে ফেব্রুয়ারী মাসে মাত্র এক ইউনিট গাড়ি বিক্রি হয়।

তারপর থেকেই ন্যানো গাড়ির উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে টাটা মোটরসের ভেতর কথা চলতে থাকে। এই ব্যাপারে টাটা মোটরসের একজন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “বাজারে অন্যান্য গাড়ির তুলনায় ন্যানো গাড়ির চাহিদা খুবই কমে গেছে এটা সত্যি। কিন্তু প্রোডাকশন পুরোপুরিভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে কিনা সেই বিষয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কোম্পানির তরফে নেওয়া হয় নি। তবে, এটাও সত্যি, কোম্পানি গাড়ির প্রোডাকশনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে বাজারে তার কী চাহিদা আছে সেটা বুঝেই।”

এমনিতেও ২০১৮ থেকেই কোম্পানির তরফ থেকে নানাভাবে বোঝানো হচ্ছিল যে ২০২০-র মধ্যেই পুরোপুরিভাবে ন্যানো গাড়িকে বাজার থেকে তুলে নেওয়া হবে, কারণ রতন টাটার এই ‘স্বপ্নের গাড়ি’তে কেউই আর বিশেষ বিনিয়োগ করতে চাইছেন না। এর একটা বড় কারণ অবশ্য গাড়িটিকে দূষণ নিয়ন্ত্রণের নতুন নিয়ম অনুযায়ী BS-VI ধারাটি সঠিকভাবে পূরণ করতে হবে এবং তা করতে হলে ন্যানো’র প্রোডাকশন নিয়মে যথেষ্ট বদল আনতে হবে। কিন্তু এত কম চাহিদায় এরকম একটা বদল আনতে কেউই আগ্রহী নয় খুব একটা।

২০১৮’র জুনে সানন্দ প্লান্টে এক ইউনিট ন্যানো গাড়ি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সেই বছর আভ্যন্তরীণ বাজারে তিন ইউনিট ন্যানো বিক্রি হয়। এরপরেই কোম্পানির অভ্যন্তরে প্রোডাকশন বন্ধ করে দেওয়ার ব্যাপারে দ্বিমত তৈরি হয়। ফলে সেইসময় ঝোঁক থাকলেও গাড়ি প্রোডাকশন পুরোপুরিভাবে বন্ধ করে দেওয়া কোম্পানির পক্ষে সম্ভব হয় নি।

কিন্তু এখন পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে ন্যানো নিয়ে শীঘ্রই রতন টাটার কোম্পানি কোনো বড়সড় সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে।

এরকম বহু গাড়ির প্রোডাকশনই অবশ্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে বহু কোম্পানি বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু ন্যানো প্রোজেক্টটির গুরুত্ব অন্য একটি কারণে ভারতের রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৭ সালে প্রথম যখন পশ্চিমবঙ্গের সিঙ্গুরে ন্যানো প্রোজেক্ট শুরু হয়েছিল সেইসময় তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কম জলঘোলা হয় নি। তৎকালীন রাজ্য সরকারের নেতৃত্বে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে সেইসময় প্রায় ১১ মাস ধরে চলা সিঙুরের সাধারণ মানুষের সাথে প্রশাসনের ঝামেলা আন্তর্জাতিক মঞ্চেও যথেষ্ট সাড়া ফেলেছিল। এমনকি অনেকেই সেইসময় সিঙ্গুরের কৃষক আন্দোলনকে ‘বাম’ শাসনের পতনের শুরু বলে চিহ্নিত করেছিল। তা্রপর সিঙ্গুরের ধারাবাহিকতায় নন্দীগ্রামের আন্দোলন। এই সিঙ্গুর – নন্দীগ্রামের কৃষক আন্দোলনকে গৃহযুদ্ধ বা সিভিল ওয়ার বলতে শুরু করেছিলেন অনেকে। কারণ, সর্বসমক্ষে আন্দোলনকারী কৃষকদের ওপর প্রশাসনের গুলি চালানোর ঘটনা তৎকালীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর ইতিহাসে প্রায় নজিরবিহীন।

আসলে, ২০০৭-০৮ এ রতন টাটা সিঙ্গুরে ২৭০০০ একর জমিতে ন্যানো গাড়ি তৈরির প্রোজেক্টকে পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম সেজ প্রোজেক্ট বানানোর স্বপ্নে প্রায় ৪৮০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ অবধি করেছিলেন। সেইসময় এই প্রোজেক্টে তার পার্টনার ছিল ইন্দোনেশিয়ান রিয়েল এস্টেট টাইকুন সেলিম গ্রুপ। আর প্রোজেক্টটিকে বাস্তবায়িত করতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সেইসময়কার রিপোর্ট দেখলেই বোঝা যায় শিল্পের খাতিরে অনিচ্ছুক কৃষকদের ওপর যাবতীয় বল প্রয়োগ করতেও সরকার দুবার ভাবে নি এবং প্রকাশ্যে নিজেদের মর্জিমাফিক দমনপীড়ন নীতি চালিয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য আন্দোলনের চাপের কাছে সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় এবং এই আন্দোলনের ওপর ভর করেই ৩৪ বছরের বাম জামানাকে হঠিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসে। আর রতন টাটা তাঁর স্বপ্নের প্রোজেক্টটিকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে সরিয়ে গুজরাটে নিয়ে যায়। সেইসময় গুজরাটে ক্ষমতায় থাকা নরেন্দ্র মোদীর সরকারের মধ্যে এই প্রোজেক্টটিকে নিয়ে উৎসাহ কিছু কম ছিল না।

সিঙ্গুর থেকে টাটা’র ন্যানো গাড়ির কারখানা চলে যাওয়ার পর থেকেই বামফ্রন্ট বিশেষত সিপিআইএম দল কৃষদের আন্দোলনকে বিপথ গামী চিহ্নিত করে। এখনও সিঙ্গুর নিয়ে আক্ষেপের সুর শোনা যায় সিপি আইএম-এর গলায়।

কিন্তু বর্তমানে ন্যানো উৎপাদনের অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে সাধারণ মানুষের জন্য গাড়ি’র রতন টাটার স্বপ্নের প্রোজেক্টটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। ২০০৯ সালে প্রথম যখন ন্যানো গাড়িটি বাজারে আসে তখন গাড়িটির দাম ছিল এক লাখ টাকা। সেইসময় গাড়িটি নিয়ে একটা দূর অবধি মানুষের উৎসাহ তৈরি হয়েছিল বটে। তারপর বাজার অনুযায়ী গাড়িটির দাম বাড়তে বাড়তে গেলেও প্রযুক্তিগত কোনো পরিবর্তন চোখে না পড়ায় ধীরে ধীরে সে তার চাহিদা হারাতে থাকে, যা এখন প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে। ফলে টাটা মোটরস কতদিনে ন্যানো গাড়ি উৎপাদন পুরোপুরিভাবে বন্ধ করে দেয় সেটা এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা!!

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
No Thoughts on গুজরাতে টাটার ন্যানো গাড়ির উৎপাদন কি বন্ধ হতে চলেছে?

Leave A Comment