জয় শ্রী রামের” এই আস্ফালন নেতাজির স্বপ্ন ছিল না

মতামত সবচেয়ে জনপ্রিয়

Last Updated on 8 months by admin

আজকাল হিন্দুত্ববাদীরা আপ্রাণ চেষ্টা করছে বাংলার তথা ভারতের প্রভেদের মধ্যে ঐক্যের সমস্ত মহান প্রতীক হস্তগত ক’রে তাদের নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহার করার। তারা রবীন্দ্রনাথ, চৈতন্য মহাপ্রভুর ইতিহাস বিকৃত করে এদের উদার শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর ভাবধারায় এদের জোর করে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে চলেছে। একই ভাবে তারা সম্প্রতি নেতাজী সুভাস চন্দ্র বোসকে তাদের সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক দেশ-ভাবনার পূর্বসূরি বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এর আড়ালে কত বড় মিথ্যা লুকিয়ে আছে তা সহজেই বোঝা যায়।
সাপ্তাহিক ফরয়ার্ড ব্লক পত্রিকায় নেতাজি ৪ মে, ১৯৪০ সালে লিখেছিলেন: “সে অনেক দিন আগের কথা যখন কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম লীগের মত সাম্প্রদায়িক সংগঠনের সদস্য হতে পারত। কিন্তু সম্প্রতি কালে এই সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলি আগের থেকে অনেক বেশী সাম্প্রদায়িক হয়ে পরেছে। এর প্রতিক্রিয়া স্বরূপ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস তার সংবিধানে একটি ধারা যুক্ত করেছে যে মুসলিম লীগ বা হিন্দু মহাসভার মত সাম্প্রদায়িক সংগঠনের কোন সদস্য কংগ্রেসের কোন নির্বাচিত কর্মীটির সদস্য হতে পারবে না”।
শিশির চন্দ্র বোস সংকলিত The Indian Struggle 1920-1942 গ্রন্থের ভূমিকায় সুভাস চন্দ্র বোস বলছেন:
“মুসলমানদের আগমনের সূচনা থেকে [ভারতের ইতিহাসে] এক নতুন সমন্বয় ধীরে ধীরে গোড়ে ওঠে। যদিও তারা হিন্দুদের ধর্ম গ্রহণ করে নি, তারা ভারতকে তাদের বাসস্থান বলে স্বীকার করে নেয় এবং এখানকার সাধারণ সামাজিক জীবনের তারা অংশীদার হয়ে ওঠে – তার সুখ দু:খ তারা ভাগ করে নেয়। পরস্পর সহযোগিতার মধ্যে দিয়ে এক নতুন শিল্প আর এক নতুন সংস্কৃতি বিকশিত হয় যা দুই সংস্কৃতির ধারার এক আনন্দময় মিশ্রণের সাক্ষ্য বহন করে”। নেতাজী মুসলমান সংস্কৃতি কি চোখে দেখতেন তা বোঝাবার জন্য কোন টিকার প্রয়োজন হয় না। মনে রাখবেন বিজেপি সরকার এক দিকে নেতাজীকে শুধু স্বাধীনতার বীর যোদ্ধা বলে সম্মানিত করে, তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করার চেষ্টা করছে; অন্য দিকে যে মুসলমান সম্প্রদায় সম্বন্ধে নেতাজীর মনে ভ্রাতৃত্ব বোধ ছাড়া কিছু ছিল না, তাদের আজ নাগরিকত্ব থেকে কি ভাবে বঞ্চিত করা যায় সেই কৌশল ঐ বিজেপি সরকার পরিকল্পনা করেই চলেছে।
শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী যখন হিন্দু মহাসভায় যোগদান করেন তখন তার ডাইরিতে তিনি লেখেন যে সুভাস বোস তার সঙ্গে দেখা করে বলেন যে তিনি (শ্যামা প্রসাদ) যদি বাংলায় হিন্দু মহাসভাকে একটি রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেন তা হলে “তিনি [সুভাস বোস] নিশ্চিত করবেন, যদি দরকার হয় বল প্রয়োগ করে, জন্মের আগেই যাতে তার ভগ্ন দশা হয়”। তৎকালীন হিন্দু মহাসভার নেতা বলরাজ মাধোকের লেখা পড়লে বোঝা যায় যে সুভাস বোস তার কথা রেখেছিলেন। “তার সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে সুভাস বোস সিদ্ধান্ত নেন শক্তি প্রদর্শন করে মহাসভাকে ভয় দেখাতে। তার লোকেরা মহাসভার সমস্ত সভা বানচাল করে এবং তাদের প্রার্থীদের মার-ধোর করে। ড: মুখার্জী ও সব বরদাস্ত না করার মনস্থির করেন। তিনি একটা মীটিং ঘোষণা করেন, যেখানে তিনি বক্তব্য রাখবেন বলে স্থির করেন। যেই তিনি বক্তব্য রাখতে ওঠেন একটা পাথর এসে তার মাথায় আঘাত করে এবং ক্ষত থেকে অঝোরে রক্ত ঝোরতে থাকে”। বল প্রয়োগ করে সাম্প্রদায়িক শক্তি ঠেকানো উচিত কি না তা নিয়ে দ্বিমত থাকতেই পারে, কিন্তু এ বিষয় কোন সংশয়ের জায়গা নেই যে নেতাজী হিন্দুত্ববাদী শক্তিদের ঘোর বিরোধী ছিলেন।
১৯৪২ সালে রচিত সুভাস চন্দ্র বোসের Freee India and her Problems শীর্ষক একটি প্রবন্ধে নেতাজী মুক্ত ভারতের রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও মূল নীতি কি হওয়া উচিত সে সম্বন্ধে তার ধারণা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন ‘রাষ্ট্র সমস্ত ব্যক্তি ও সম্প্রদায়ের সম্পূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে এবং কোন রাষ্ট্রীয় ধর্ম থাকবে না। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে সমগ্র জনগণের মধ্যে সম্পূর্ণ সমতা থাকবে। যখন প্রত্যেকটি মানুষের চাকরি, খাদ্য ও শিক্ষা নিশ্চিত হবে এবং তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সবার স্বাধীনতা থাকবে তখন কোন সংখ্যালঘু সমস্যা থাকবে না’। স্পষ্টত, সুভাস বোস চেয়েছিলেন স্বাধীন ভারত হবে ধর্ম নিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক দেশ।
একই প্রবন্ধে তিনি মুসলমানদের সম্বন্ধে একটি প্রচলিত অপবাদের বিরোধিতা করেন। “ভারতীয় মুসলমানদের বিপুল ভাবে গরিষ্ঠ অংশ ব্রিটিশ বিরোধী এবং ভারতকে স্বাধীন করতে চায়। নি:সন্দেহে, হিন্দু এবং মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্রিটিশ পন্থি পার্টি আছে যেগুলি ধর্মীয় পার্টি হিসাবে সংগঠিত। কিন্তু তারা জন-প্রতিনিধিত্ব করছে এমন ভাবা ঠিক নয়”। তিনি যোগ করেন, “ বর্তমান ভারতে মুসলমান সমস্যা ব্রিটিশদের সৃষ্ট একটি কৃত্রিম সমস্যা…এটা হারিয়ে যাবে যখন ইংরেজ শাসন মুছে যাবে”।
স্বাধীন ভারতের আশু কর্তব্য সম্বন্ধে তার ধারণা এই প্রবন্ধেই পাই। তিনি বলছেন যে দারিদ্র ও বেকারত্ব ভারতের প্রধান সমস্যা। লক্ষ্য করুন এর বিপরীতে বিজেপি সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য হিন্দু রাষ্ট্র স্থাপন। তারা বেকারত্ব দূর করার কোন প্রকল্প তো গ্রহণই করে নি (অতিমারির আগেই, পরিসংখ্যান অনুযায়ী বেকারত্বের হার ছিল গত ৪৫ বছরে সব চেয়ে বেশী) উলটে তারা শ্রম বিধি পরিবর্তন করে চাকরি রত শ্রমিকদের দৈনিক কাজের সময়ের ঊর্ধ্ব সীমার ওপর মোটামুটি সমস্ত বিধি-নিষেধ তুলে দিয়েছেন। এর ফলে যারা কাজ করছে তারা তো বাধ্য হবে অমানবিক শ্রম করতে, আর বেকারদের কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে গেল। তিনি আরও বলছেন, “কৃষকদের প্রায় ৭০ শতাংশের বছরে ছ’ মাস কাজ থাকে না। সুতরাং, ভারতের দারিদ্র ও বেকারত্বের সমস্যার সমাধান জন্য রাষ্ট্রের অনুদানের সাহায্যে শিল্পায়ন ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষের প্রয়োজন আছে”। ভারতের এই অবস্থার জন্য তিনি, এই প্রবন্ধে, ইংরেজদের নানা নীতিকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন। এই প্রবন্ধ ও ‘The Indian Struggle’ নামের গ্রন্থে প্রকাশিত অন্যান্য রচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে তিনি গভীর ভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন ইংরেজরা কি ভাবে আমাদের দেশীয় অর্থনীতি ধ্বংস করেছিলেন। অর্থনৈতিক সমস্যার সঙ্গে ভারতের অন্যান্য মৌলিক সমস্যা নিয়ে একই প্রবন্ধে উনি সংক্ষেপে আলোচনা করেছেন। তিনি দেশীয় লোকায়ত জ্ঞান ও পাশ্চাত্যের বিজ্ঞানের সমাহারে, রাষ্ট্রের অর্থ সাহায্যের ভিত্তিতে একটি এমন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব বলে মত দেন যার ফলে কেউ স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হবে না এবং দেশে মহামারির অবসান ঘটবে। শিক্ষার সমস্যা নিয়ে নেতাজী বলছেন, “আমাদের দেশে নিরক্ষরের অনুপাত প্রায় ৯০ শতাংশ। কিন্তু এই সমস্যার সমাধান কঠিন নয়, যদি রাষ্ট্র উপযুক্ত অর্থ সাহায্য করে। দেশে অনেক শিক্ষিত, বেকার যুবক, যুবতিরা আছে যাদের দেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের জন্য রাষ্ট্র অর্থ সাহায্য দেবে”। এর সঙ্গে তিনি মনে করতেন শান্তিনিকেতন, গুরুকুল, জামিয়া-মিলিয়া, এই সমস্ত দেশীয় পরীক্ষামূলক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে স্বাধীন ভারতের শিক্ষা নীতি পরিকল্পনার রসদ জোগাড় করতে হবে।
অর্থনীতির, শিক্ষার, স্বাস্থ্যের সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি যে বিরাট কর্ম কাণ্ডের স্বপ্ন দেখেছিলেন তা রূপায়ন করার জন্য একটি পরিকল্পনা আয়োগ বা কমিশনের প্রয়োজন তা তিনি বুঝেছিলেন এবং ঐ প্রবন্ধে সে মত প্রস্তাবও রয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে ১৯৩৮ সালে, তিনি যখন কংগ্রেসের সভাপতি ছিলেন তখন তিনি, এই সমস্ত সমস্যা নিয়ে গবেষণার জন্য, পরিকল্পনা কমিশনের উদ্বোধন করেছিলেন ।
নেতাজির ভাবধারা এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে তার মতে স্বাধীনতা পরবর্তী অধ্যায়ে দেশের মৌলিক সমস্যার থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় ছিল রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও আইনি অধিকারের কাঠামো পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে একটি ধর্ম নিরপেক্ষ, সাম্যবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থা স্থাপন। বুঝতে অসুবিধা হয় না, তার ভাবনে চিন্তা থেকে হিন্দুত্ববাদী, মিত্রোঁ পুঁজির আজ্ঞাবাহী বিজেপির ধ্যান ধারণার অসীম দূরত্ব। বাংলায় নির্বাচনে ঠাঁই পাওয়ার লক্ষ্যে বিজেপি যেমন রবীন্দ্রনাথ, চৈতন্য দেবকে বিকৃত করে অধিকার করার চেষ্টা করছে, তেমনই নেতাজীকেও তারা ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। না হলে নেতাজীকে সম্মান জানাবার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার আয়োজিত অনুষ্ঠানে কেন এত গেরুয়া বাহিনীর উপস্থিতি? কি করে আদ্যোপান্ত ধর্মীয় সহাবস্থানের প্রতীক এই মহামানবকে সম্মান জানাবার ওজুহাতে ‘জয় শ্রী রাম” ধ্বনি ওঠে?

লেখক – প্রণব কান্তি বসু
বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাক্তন অধ্যপক

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
No Thoughts on জয় শ্রী রামের” এই আস্ফালন নেতাজির স্বপ্ন ছিল না

Leave A Comment