উত্তরপ্রদেশে “জঙ্গল-রাজ” চলছে : একের পর এক ঘটনার পর অভিযোগ বিরোধীদের

আজকের খবর বিভাগ-বহির্ভূত বিশেষ খবর

Last Updated on 3 months by admin

বিশেষ সংবাদদাতা, ১৭ জুন, ২০২১ :

এক মাসের মধ্যে একের পর এক ঘটনা চখে আঙুল দিয়ে যেন দেখিয়ে দিচ্ছে যে উত্তরপ্রদেশে আইনের শাসন বলতে যেন কিছু নেই। কখনও প্রকাশ্য দিবালোকে মাংস বিক্রেতাকে গোরক্ষক বাহিনীর মারধর, কখনও মুসলমান বৃদ্ধকে হেনস্থা, কখনও সাংবাদিক হত্যা।

সাংবাদিকের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু না হত্যা !

উত্তরপ্রদেশের প্রতাপগড় জেলার এক সাংবাদিক, সুলভ শ্রীবাস্তবকে ‘মদ মাফিয়া’রা হত্যার হুমকি দিয়েছিল। সেই হুমকির কথা জানিয়ে – জীবন নাশের আশঙ্কার কথা ১২ জুন পুলিশকে জানিয়েছিলেন। তৎক্ষণাৎ উত্তরপ্রদেশ পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয় নি। পরের দিন, ১৩ জুন রাতে  তিনি যখন কাজের শেষে বাড়ি ফিরছিলেন, তখন এক “বানানো সড়ক দুর্ঘটনা”য় তিনি মারা যান বলে অভিযোগ।

প্রতাপগড়ের এক বরিষ্ঠ পুলিশ আধিকারিক সুরেন্দ্র দ্বিবেদী এক বিবৃতিতে বলেন, “মিঃ শ্রীবাস্তব রবিবার রাত ১১ টার দিকে মিডিয়া কাভারেজ শেষে নিজের মোটরসাইকেলে ফিরছিলেন। তিনি একটি ইট ভাটারের কাছে মোটরসাইকেল থেকে পড়ে গিয়েছিলেন। কয়েকজন শ্রমিক তাঁকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে তার বন্ধুদের ফোন করেছিলেন, এবং তাঁরা একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তাঁকে জেলা হাসপাতালে নিয়ে যান যেখানে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।“  তিনি আরও জানান, “প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে যে তিনি (শুলভ শ্রীবাস্তব) মোটরবাইকে একা ছিলেন এবং তাঁর বাইকটি রাস্তার পাশে হ্যান্ডপাম্পে ধাক্কা মারার ফলে তিনি পড়ে যান। তবুও আমরা অন্যান্য দিক খতিয়ে দেখছি”।

NDTV সুত্রে জানা গেছে যে “দুর্ঘটনাস্থলে” মৃতদেহের একটি ছবি পাওয়া গেছে যা দেখে পড়ে থাকা সাংবাদিকের মুখের উপর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে – তাঁর জামাকাপড় খুলে ফেলা হয়েছে – তাঁর শার্টটি পুরোপুরি পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং তাঁর ট্রাউজারের বোতাম খুলে তা টেনে নামানো হয়েছে।

সুলভের স্ত্রী, রেণুকা অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে খুনের মামলা দায়ের করেছেন। তাঁর সন্দেহ যে তাঁর স্বামীকে মদ-মাফিয়ারা হত্যা করেছে এবং সন্দেহভাজনরা এটিকে দুর্ঘটনার মতো ঘটানোর চেষ্টা করেছিল। তিনি অভিযোগ করেন যে তাঁর স্বামী মদ-মাফিয়াদের বিরুদ্ধে খবর পর থেকেই তিন দিন ধরে খুনের হুমকি পেয়েছিলেন এবং লিখিতভাবে হুমকির খবর পেয়েও পুলিশ কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। রেণুকা আরো জানান যে রাঁর স্বামী ঘটনার দিন উত্তরপ্রেদেশে বে-আইনি অস্ত্র কারখানা নিয়ে একটি প্রতিবেদন করার জন্য বেরিয়েছিলেন।

এই ঘটনার কথা উল্লেখ করে বিরোধীরা অভিযোগ করছেন যে উত্তরপ্রদেশে “যোগী-রাজ্যে জঙ্গল রাজ” চলছে।

মুসলিম বৃদ্ধকে হেনস্থা

৫ জুন উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদ জেলার লোনিতে নামাজ পড়তে যাওয়ার পথে এক প্রবীণ মুসলিম ব্যক্তিকে নির্যাতন করা হয়। তাঁকে চড়-থাপ্পড় মেরে ‘বন্দে মাতরম’ ও ‘জয় শ্রীরাম’ বলায় এক দল লোক। ফাঁকা জায়গায় নিয়ে গিয়ে হাত বেঁধে জোর করে তাঁর দাড়ি কেটে দেওয়া হল। বৃদ্ধের নাম আব্দুল সামাদ, পেশায় ছুতোর মিস্ত্রি। বৃদ্ধ সেই ঘটনার কথা বলছেন— এমন একটি ভিডিয়ো সশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়।  টুইটারে পোস্ট ও শেয়ার করা হয়। তাই উত্তরপ্রদেশ পুলিশ টুইটার কর্তৃপক্ষ, কয়েকজন সাংবাদিক (অনলাইন সংবাদ মাধ্যম ‘দ্য অয়্যার’-এর কর্তৃপক্ষ, সাংবাদিক রানা আইয়ুব, সাবা নকভি, মহম্মদ জুবায়ের) এবং  কয়েকজন কংগ্রেস নেতার বিরুদ্ধে ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করা এবং দাঙ্গা লাগানোর চক্রান্ত’-এর অভিযোগ এনে এফআইআর দায়ের করেছে। পুলিশের দাবী, সামাদের হেনস্থার ঘটনায় দুষ্কৃতীদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের লোক ছিল। তাই এটি কোনো সাম্প্রদায়িক ঘটনা নয়। বরং যে অভিযুক্তরা সামাজিক মাধ্যমে ভিডিয়োটি প্রচার করেছে  সাম্প্রদায়িক রং দিয়ে তারাই দাঙ্গা লাগানোর চক্রান্ত করেছিল। পুলিশের এই ‘কাহিনি’কে সামাদের পরিবার মিথ্যা ও বানানো বলেছে।

৫ জুনের ঘটনার পরের দিন বৃদ্ধ আব্দুল সামাদ লোনি থানায় গিয়ে অভিযোগ দায়ের করেন। উত্তরপ্রদেশের আদিত্য যোগীর পুলিশ এ ঘটনায় সাম্প্রদায়িকতার কোনো কিছু পায় নি। তাই তারা ঘটনাটির নতুন একটি ‘গল্প’ তৈরি করেছে বলে অভিযোগ। পুলিশ বলেছে, সামাদ তাবিজ-কবচ বেচতেন। তাবিজ কাজ না-করায় তাঁর পূর্ব পরিচিত কিছু লোক তাঁকে সামনে পেয়ে হেনস্থা করে। যদিও স্থানীয়দের ও সামাদের প্রদিবেশীদের বক্তব্য – সামাদ কোনোকালেই তাবিজ-কবচ বিক্রি করেন নি। উত্তরপ্রদেশের সাংবাদিকদের একাংশের অভিযোগ – এই ঘটনা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছে যে পুলিশ শুধু হিন্দুত্ববাদীদের আড়াল করতে চাইছে তাই নয়, প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে দাঙ্গা ছড়ানোর অভিযোগ এনে কণ্ঠরোধও করতে চাইছে – প্রকৃত দাঙ্গাবাজদের আড়াল করছে।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on উত্তরপ্রদেশে “জঙ্গল-রাজ” চলছে : একের পর এক ঘটনার পর অভিযোগ বিরোধীদের

Leave A Comment