শুধুই সীমান্তরক্ষা নাকি আরো একটি ফ্যাসিস্ট পদক্ষেপ?

আজকের খবর বিশেষ খবর মতামত

Last Updated on 1 month by admin

শুধুই সীমান্তরক্ষা নাকি আরো একটি ফ্যাসিস্ট পদক্ষেপ?

ইন্দ্রাণী পাল

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সীমানা সংলগ্ন তিনটি রাজ্য যথা পাঞ্জাব, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে ‘সীমান্ত সুরক্ষা বাহিনী’ বা বিএসএফ এর  ক্ষমতা ও অধিকার  আগের ১৫ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ৫০ কিলো মিটার করা হয়েছে । এই ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে বিএসএফ-কে বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি, গ্রেফতার ও জিনিষপত্র বাজেয়াপ্ত করার অধিকার দেওয়া হয়েছে। সংবাদ সংস্থা ‘এনআই’ এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক এর নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে বিএস এফের যে কোনো নিম্ন স্তরের অফিসারও কোনো ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশ বা গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়াই যে কোনো কাউকে ‘কোড অফ ক্রিমিনাল প্রসিডিউর’ বা (CRPC) ও পাসপোর্ট আইনের আওতায় নিজেদের হেপাজতে নিতে পারবে । স্বাভাবিক ভাবেই কেন্দ্রের এই একপেশে সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভ দানা বেঁধেছে বিভিন্ন মহলে। পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী চরণজিৎ সিংহ চান্নী কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তকে রাজ্যের অধিকার ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবী জানিয়েছেন । পাঞ্জাবের সাধারন মানুষও বিভিন্ন সমাজ মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন । কেউ কেউ জানিয়েছেন পাঞ্জাবের পায় ৫৫৩ কিলোমিটার জুড়ে ভারত ও পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সীমানা রয়েছে, এই পরিস্থিতিতে বিএসএফের উপস্থিতি ১৫ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ৫০ কিলোমিটার করা হলে প্রায় অর্ধেক পাঞ্জাবই ( ৫০,৩৬২ স্কোয়ার কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ২৫,০০০ স্কোয়ার কিলোমিটার) বিএসএফের মত একটি কেন্দ্রীয় বাহিনীর আওতাধীন হয়ে যাবে । বলাই বাহুল্য, স্বাধীনতা আন্দোলনের পর, এই কৃষক আন্দোলনের মাধ্যমে পাঞ্জাব আবারো কেন্দ্রের ফ্যাসিস্ট  শাসন ও কর্পোরেট পুঁজির কাছে দেশ বিকিয়ে দেওয়া রাজনীতির বিরুদ্ধে এক দৃঢ় ও বলিষ্ঠ  বিরুদ্ধতার জন্ম দিতে পেরেছে ।

বিজেপি সরকার কেন্দ্রে ২০১৯ সালে ফের ক্ষমতায় আসার পর থেকে রাজ্যগুলির যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর দাবিকে লংঘন করে ক্রমশ ‘এক দেশ এক ভোট’ ‘এক দেশ এক রেশন কার্ড’র মতো প্রকল্প ও চিন্তা ধারাকে জনমানুষে জনপ্রিয় করে তোলার চেষ্টা চালিয়েছে । বিজেপি বিরোধী কোনো মহলই তাই বিএসএফের এই ক্ষমতা-পরিধি বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে, রাজ্যগুলির অধিকারকে খর্ব করে দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে ক্রমশ কেন্দ্রীকরণ করার প্রচেষ্টাগুলি থেকে আলাদা করে দেখছেন না। এছাড়াও বিভিন্ন আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলি পূর্বেও বিজেপি বিরোধী রাজ্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের জনসংখ্যা বৃদ্ধির গুজব ছড়িয়ে ও বিভিন্ন ভ্রান্ত তথ্য দিয়ে  মানুষের মনে ভয়ের উদ্রেক করার চেষ্টা বারংবার করে গেছে ।

যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের দাবী সীমান্ত এলাকায় বিভিন্ন বেআইনি কার্যকলাপ ও অনুপ্রবেশ রুখতে এই সিদ্ধান্ত এবং  বিএসএফও স্থানীয় পুলিশের সহায়তা ছাড়াই তল্লাশি বা গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হবে বলে কেন্দ্রের এই পদক্ষেপকে সমর্থন করেছে ।

অন্যদিকে, এক পুলিশ কর্তা জানিয়েছেন যে কেন্দ্রের এই পদক্ষেপ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রনোদিত এবং তাঁর মতে বি এসএফ সীমান্তের অভ্যন্তরে ৫০ কিলোমিটার মতো বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বি এসএফ কর্তৃক তল্লাশি বা গ্রেপ্তারীর মতো ঘটনা ঘটতে থাকলে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের সাথে দ্বন্দ্ব বাড়বে । প্রসঙ্গত, পদ্ধতিগতভাবে  অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা না নিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই  বিএসএফ ভারত – বাংলাদেশ সীমান্তে ‘স্যুট-অ্যাট- সাইট’ অর্ডার যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করে। বিএসএফের গুলিতে ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশেরই নাগরিকেরই মৃত্যুর ঘটনা নেহাতই কম নয় ।

 সিআরপিএফ, সিআইএসএফ, ইন্দো-টিবেটান বর্ডার পুলিশ -এর মতই বিএসএফ ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন হওয়ায় তিনটি রাজ্যে তাদের ক্ষমতার পরিধি বাড়ার ফলে যদি কোনো নিরীহ নাগরিককে বিএসএফ বিনা অপরাধে হত্যা করে তাহলেও তারা রাজ্যের প্রশাসন এবং বিচার ব্যবস্থার কাছে দায়বদ্ধ হবে না। পশ্চিমবঙ্গেই বিধানসভা ভোট চলাকালীন উত্তরবঙ্গের শীতলকুচি ভোট কেন্দ্রে ৬ জন সিআইএসএফ অফিসার চারজন ভোটারকে গুলি করে হত্যা করলেও তারা এখনো শাস্তি পাননি । রাজ্য সিআইডি বারবার নোটিশ পাঠালেও তারা কোন প্রকারের সাড়া দেননি ।

সাইরিল রেডক্লিফের নেতৃত্বে ভারতের সীমান্ত নির্ধারণ পূর্বেও কম বিতর্ক ও সংকটের  জন্ম দেয়নি এবং এখনো পাঞ্জাবের বহু কৃষকের দাবি দেশভাগের সময় সীমান্ত নির্মাণের জন্য তাদের চাষের যে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল  তার ক্ষতিপূরণ এখনো তারা পাননি । বিভিন্ন মহল থেকেই আশঙ্কা করা হয়েছে  বিএসএফের এই ক্ষমতা পরিধি বৃদ্ধি সীমান্ত এলাকার মানুষদের জীবন-জীবিকার জন্য সংকটের  কারণ হবে ।

‘বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ’ (মাসুম) নামে ভারতের একটি মানবাধিকার সংগঠনের রিপোর্ট অনুযায়ী এই বছরই বাংলাদেশের এক নাগরিক ও এক বালক সহ, পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার দুই ব্যক্তিকে হত্যা করে বিএসএফ।

এখনকার উদ্বাস্তু সমস্যা ও সংকট নিয়ে গবেষণা করা ব্যক্তিদের মতে দেশের আন্তর্জাতিক সীমানা সুরক্ষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তেমনি মানুষের জীবন ও জীবিকার সন্ধানে পরিব্রাজনও মানব জীবনের একটি প্রক্রিয়া ।

এখনো অনেক মানুষই ভারত – বাংলাদেশের সীমান্ত পারাপার করেন তাদের নিজেদের রুটি-রুজির তাগিদেও, তাই গবেষকরা ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা এই সমস্যা অতিক্রম করার জন্য এই সমস্ত মানুষদের ওয়ার্ক পারমিট দেওয়ার মতো জরুরী বিষয়ও তুলেছেন ।

Please follow and like us:
error17
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on শুধুই সীমান্তরক্ষা নাকি আরো একটি ফ্যাসিস্ট পদক্ষেপ?

Leave A Comment