শিক্ষাঙ্গনে লকআউট : সমীক্ষায় উঠে এসেছে বৈষম্য আর পিছিয়ে পড়ার ভয়াবহ ছবি

আজকের খবর পর্যালোচনা বিশেষ খবর

Last Updated on 2 weeks by admin

বিশেষ প্রতিবেদন, ৮ সেপ্টেম্বর,২০২১ :

প্রাথমিকভাবে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে গত বছরের মার্চ মাস থেকে দেশের প্রায় প্রত্যেকটি রাজ্যেই স্কুল – কলেজ বন্ধ। সংক্রমণের রেশ কমার সাথে সাথে শপিং মল, সিনেমা হল, রেস্তোরাঁ ইত্যাদি বিভিন্ন ধাপে খুললেও ১৭ মাস তথা ৫০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে বিদ্যালয়গুলি টানা বন্ধ।  এর ফলে দেশের বিভিন্ন  প্রান্তে আর্থ -সামাজিকভাবে দুর্বল পরিবারগুলি থেকে আসা পড়ুয়ারা এবং বিশেষত শিশুরা শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং শিক্ষাব্যবস্থা থেকেই বাদ পড়ছে – এমনই বাস্তবতা উঠে এলো “স্কুল চিলড্রেন্স অনলাইন অ্যান্ড অফলাইন লার্নিং (SCHOOL)” শীর্ষক  সমীক্ষায়। প্রায় ১০০ জন স্বেচ্ছাসেবকের শ্রমে, জ্যঁ দ্রেজ সহ ৪ জনের সমণ্বয়কারী টীমের মাধ্যমে সংগঠিত হয়েছে এই সমীক্ষাটি।

সম্প্রতি ১৫টি রাজ্যের গ্রামীণ এলাকায় ও শহরের বিভিন্ন বস্তি অঞ্চলের সরকারি স্কুলের প্রাথমিক ও উচ্চ প্রাথমিক স্তরের প্রায় ১৪০০ জন পড়ুয়াদের নিয়ে করা এই সমীক্ষার “লকড আউটঃ এমার্জেন্সি রেসপন্স অন স্কুল এডুকেশন” নামক রিপোর্টে উঠে এসেছে নানা দুশ্চিন্তার উদ্রেক করার মতো তথ্য।

দেশের গ্রামীণ এলাকায় মাত্র ৮% পড়ুয়া নিয়মিত অনলাইন পঠন-পাঠনের সঙ্গে যুক্ত  এবং শহরে এই সংখ্যাটি প্রায় ২৪% শতাংশের কাছাকাছি ।  কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষকরা নিজেরা দায়িত্ব নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের মোবাইল, ট্যাবলেট প্রদান ও ইন্টারনেটের জন্য  ডেটা প্যাকেজের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলি অনলাইন শিক্ষার সমস্ত পরিকাঠামোর ভার সম্পূর্ণভাবে পড়ুয়াদের পরিবারগুলির কাঁধে ঠেলে দিয়েছে। তার ফলে লকডাউনে কর্মহীন অবস্থায় আর্থসামাজিক দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠেছে পড়ুয়াপিছু একটি স্মার্টফোন অথবা নিয়মিত ‘ডেটা প্যাকেজের’ জোগান দেওয়া ।

রিপোর্টে বেশকিছু পরিবার জানিয়েছেন অনলাইন ক্লাসে প্রাথমিক স্তরের শিশুরা  অংশগ্রহণ তো করতে পারেই না এবং কিছু ক্ষেত্রে অনলাইন পড়াশোনায় স্কুলগুলি শুধু মাত্র কিছু ভিডিও লিংক ফরওয়ার্ড করেই দায় সারে। প্রায় দেড় বছর অতিক্রান্ত হলেও , শহরে ও গ্রামে সরকারি স্কুলগুলির যে সমস্ত পড়ুয়া অনলাইন পড়াশোনার অংশ হতে পারেনি তাদের শুধু নাম মাত্র হোমওয়ার্ক বা ‘ওয়ার্কশীট’ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা দিবসের এই বিস্তর ক্ষতি কী করে পূরণ করা সম্ভব তার কোনো পরিকল্পনা স্কুলগুলি করে উঠতে পারিনি ।

অনলাইন শিক্ষায় একটা বড়ো অংশের শিক্ষার্থী তো বঞ্চিত হচ্ছেই, অফলাইনেও পড়াশোনার অভ্যাস হারিয়ে ফেলেছে পড়ুয়াদের একটা তাৎপর্যপূর্ণ অংশ। গ্রামে দেখা যাচ্ছে ৩৭% পড়ুয়া সবরকমভাবেই পড়াশোনা থেকে বিচ্ছিন্ন থেকেছে শিক্ষাক্ষেত্রে “লকআউট” এর এই পর্বে। শহরে এই অংশটি ১৯ শতাংশ।

সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী অনলাইন পাঠ্যক্রম থেকে বাদ পড়া শহরের প্রায় ২৭% পড়ুয়া জানিয়েছে এই লকডাউন এর মাঝে স্কুলগুলি তাদের বিভিন্ন পরীক্ষা নিলেও, পাঠ্যক্রমভিত্তিক জ্ঞান নির্ণয় করার মতো প্রশ্নের গুরুত্ব থাকেনি। এই পরীক্ষাগুলি দায়সারাভাবে নেওয়া হয়েছে যাতে স্কুলগুলি ছাত্র- ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ও উপস্থিতি নিয়ে  ঠিক সময়ে রিপোর্ট তৈরী ও উপস্থাপন করতে পারে।

শিক্ষাক্ষেত্র এবং পাঠ্যক্রম  থেকে দীর্ঘকাল বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে, প্রাথমিক স্তরে শিশুদের সার্বিক অক্ষরজ্ঞান ও একটি সম্পূর্ণ বাক্য পড়তে ও লিখতে পারার ক্ষেত্রে যথেষ্ট অবনতি ঘটেছে । ১২ শব্দ বিশিষ্ট একটি সহজ বাক্য পড়তে পারার পরীক্ষা করে দেখা যাচ্ছে, দ্বিতীয় শ্রেণীর পড়ুয়াদের মধ্যে গ্রাম ও শহরের ক্ষেত্রে যথাক্রমে ৭৭% ও ৬৫%  পড়ুয়া কয়েকটি অক্ষরের বেশি পড়তেই পারছে না। উল্লেখ্য, এই পড়ুয়ারা গত বছর প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিল এবং লকডাউনের মধ্যেই তারা দ্বিতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছে। তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণীর পড়ুয়াদের মধ্যে করা একই পরীক্ষায় দেখা গেছে সম্পূর্ণ বাক্যটি স্বাছন্দ্যে পড়তে পারছে গ্রামের মাত্র ২৬% এবং শহরের মাত্র ৩১% পড়ুয়া। এই সমীক্ষাটির পাশাপাশি অন্য একটি সংস্থার করার সমীক্ষার ফলাফল যোগ করলে সামগ্রিক চিত্রের ভয়াবহতা সম্পর্কে আরেকটু ধারণা করা যায়। কর্ণাটকের “প্রথম এডুকেশন ফাউন্ডেশন” নামক একটি অসরকারি সংস্থার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণীতে শুধুমাত্র বিয়োগ করতে পারে এরকম পড়ুয়ার  সংখ্যা  ২০২০ সালের শেষে কমে দাঁড়িয়েছে ১৭.৩ শতাংশে ।

লকডাউনে শিক্ষাঙ্গন বন্ধ থাকার বিপুল প্রভাব পড়েছে স্বাক্ষরতার হারের উপর। ২০১১ এর জনগণনা অনুযায়ী দেশবাসীর স্বাক্ষরতার হার ছিল ৯১ শতাংশ। এই সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে গ্রামের ক্ষেত্রে তা নেমে এসেছে ৬৬ শতাংশে এবং শহরের ক্ষেত্রে ৭৪ শতাংশে।

সমীক্ষায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে স্কুল বন্ধ থাকা এবং মিড ডে মিলে রান্না করা খাবার না দিতে পারার ফলে এবং বিদ্যালয়ে আরো পাঁচজন শিক্ষার্থীর সাথে সামাজিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে পঠন-পাঠনের প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক গঠন বিঘ্নিত হচ্ছে ।

দীর্ঘকাল ধরে সামাজিক  বৈষম্যর শিকার তপশিলি জাতিভুক্ত গোষ্ঠীগুলি এই লকডাউনে শিক্ষার অধিকার থেকে আরো বেশি বঞ্চিত হচ্ছে। সামনে এসেছে ঝাড়খণ্ডের লাতেহার জেলার কুতমু নামে একটি গ্রামের  উচ্চ জাতের শিক্ষক কর্তৃক বিভিন্ন দলিত,  আদিবাসী গোষ্ঠী থেকে আসা পড়ুয়াদের সাথে চরম বৈষম্যমূলক ব্যবহারের ঘটনা।

শিক্ষাঙ্গনে লকআউটের এই পর্বে সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবারের শিশুদের পিছিয়ে পড়ার বিষয়টি তিনটি ধাপের মধ্য দিয়ে ক্রমবর্ধমান হয়ে উঠছে বলে আশংকা করা হয়েছে রিপোর্টটিতে – ১) লকডাউনের আগে থেকেই বিদ্যমান ফারাক, ২) লকডাউনের মধ্যে পড়তে শেখা, লিখতে শেখা ইত্যাদি জ্ঞানের ঘাটতি হওয়া  এবং ৩) শিক্ষার কোনরকম অগ্রগতি ছাড়াই উচ্চতর শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হওয়া।

কয়েকটি রাজ্যে অল্প কিছু সরকারি বেসরকারি স্কুলে অর্ধেক সংখ্যক ছাত্রছাত্রী নিয়ে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর পঠন-পাঠন চালু হচ্ছে।

কিন্তু এই বিশেষ সমীক্ষাটির নজর ছিল গ্রাম, শহরের প্রাথমিক ও উচ্চ-প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলি। দেখা যাচ্ছে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার অনলাইন শিক্ষাকে শিক্ষার একমাত্র বিকল্প মাধ্যম হিসেবে পড়ুয়াদের উপর চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করলেও শহর ও গ্রাম অঞ্চলের ৯০% এর বেশি অভিভাবক কিন্তু স্কুল খোলার পক্ষে সওয়াল করেছেন।  সমাজেরও বিভিন্ন মহল থেকে দাবী উঠছে – স্বাভাবিক পঠন-পাঠন দ্রুত শুরু করা এবং এতদিন বিদ্যালয় শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্নতার ফলে যে অংশের ছাত্র-ছাত্রীরা পিছিয়ে পড়েছে তাদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া। এতোসংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষার আঙিনা থেকে ছিটকে পড়া, পিছিয়ে পড়ার ফলে যে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে সেই নিয়ে সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তা সরকারগুলোকে কতোটা নাড়া দেয় সেটাই দেখার।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on শিক্ষাঙ্গনে লকআউট : সমীক্ষায় উঠে এসেছে বৈষম্য আর পিছিয়ে পড়ার ভয়াবহ ছবি

Leave A Comment