নোটবাতিল : অর্ধদশক পরে ফিরে দেখা

অর্থনীতি আজকের খবর বিশেষ খবর মতামত

Last Updated on 3 weeks by admin

নোটবাতিল : অর্ধদশক পরে ফিরে দেখা

সুমন্ত নারায়ণ

আজ ৮ই নভেম্বর। স্বাধীন ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসের একটা ভয়াবহ দিন। আতংকের দিন। এই দিনেই আজ থেকে ৫ বছর আগে ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদি একটি টেলিভিশন বার্তায় হাতের মুদ্রায় ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোটকে বাতিল ঘোষণা করেন। এর ফলস্বরূপ নাগরিকদের মধ্যে যে আতঙ্ক ও দুঃস্বপ্নের সময় শুরু হয়, তা চলে বেশ কয়েকমাস পর্যন্ত। এমনকি, তার প্রভাব ভারতের অর্থনীতিতে এখনো বিদ্যমান। যে পদক্ষেপকে শাসকদল একটা বিরাট সাফল্য ভেবেছিল, সেটাই হয়ে দাঁড়ায় একটা মস্ত বড় বিপর্যয়।এই নোটবাতিলকে যে ভিত্তির ওপরে দাঁড় করানো হয়েছিল তা হল, “কালো টাকা মানে নগদ”। এবং এই কালো টাকা ধরা থাকবে মূলতবড় অংকের নোটের মধ্যে। তাই সেগুলো হঠাৎ বাতিল করে দিলেই দেশের অর্থনীতি থেকে কালো টাকাকে নির্মূল করা যাবে, কারণ এর ফলে বিত্তবান ব্যক্তিদের কাছে থাকা বড় অংকের নোটগুলো একধাক্কায় অচল হয়ে যাবে।

নোটবাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পূর্বে ভারতে প্রচলিত সর্বমোট মুদ্রার পরিমান ছিল ১৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোটের মত বড় নোটের পরিমান ছিল প্রায় ৮৫%। নোটবাতিল ঘোষণার ফলে এই ৮৫% নোট রাতারাতি বেআইনি হয়ে গেল, যদিও পেট্রোল পাম্প, কেন্দ্রিয় ভাণ্ডারের মুদি দোকান আর ওষুধ কেনার ক্ষেত্রে এগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছিল। আমাদের সবারই নিশ্চয়ই মনে থাকবে যে এই নোটবাতিল ঘোষনা করা হয়েছিল হঠাৎ করেই –রাত আটটার সময় ঘোষণা করে বলা হয়েছিল, সেদিন রাত বারোটার পর থেকেই ৫০০/ ১০০০ টাকার নোট বাতিল হয়ে যাবে। এর স্বপক্ষে এই ভাবনা ছিল যে, যত কম সময় দেওয়া হবে ও এই ঘোষণাকে আগে থেকে যতটা গোপন রাখা হবে, কালো টাকার কারবারিদের পক্ষে তাদের কালো টাকা লুকিয়ে ফেলা তত কঠিন হবে। এই ঘোষণার অব্যবহিত পরেই দেখা গিয়েছিল যে, সাধারণ মানুষ সম্পত্তি আর গয়না কিনছেন। এইভাবে কিছু কালো টাকার অন্য সম্পদে রূপান্তর ঘটে। এমন সম্পদ, যাকে পরে টাকায় আবার রূপান্তরিত করে নেওয়া যায়।

কার্টুনিস্ট সতীশ চন্দ্রের আঁকা কার্টুন

নোটবাতিলের নীতির পেছনে কাজ করেছিল একটাই ভাবনা – কালো টাকা নগদে সঞ্চিত থাকে। বলাই বাহূল্য, এই ধারণা সর্বৈব ভুল। আয় এবং সম্পদের মধ্যে ফারাক আছে। ধরা যাক, কোনো ব্যবসায় ররোজ ১০০০ টাকার বিক্রি হয়, কিন্তু বিক্রির হিসাব দেখানো হয় ৭০০ টাকার। তাহলে বাকি ৩০০ টাকা এখানে কালো টাকা হয়ে যায়। এইধরনের বিষয় কমবেশি সব ধরণের ব্যবসাতেই করা হয়ে থাকে।এইভাবে কয়েক বছর বা দশক ধরে ওই টাকা জমতে জমতে তাওই ব্যবসায়ীর সম্পদে পরিণত হয়। কিন্তু এই সম্পদ কি সবসময় মুদ্রায় থাকে? মোটেই তা থাকে না। এই সম্পদ অন্য সম্পদে পরিণত হয়ে যায়, ফলে সেগুলোর হিসাব মুদ্রা দিয়ে করা সম্ভব হয় না। এছাড়াও বড় ব্যবসায়ী। পুঁজিপতির টাকা বিদেশের ব্যাঙ্কে চলে যায়। কাজেই বিমুদ্রাকরণের মাধ্যমে কালো টাকা ধরতে গেলে তা শুধু মুদ্রাকেই ধরবে, তারও পরিমাণ খুব বেশি হলে ১% এর আশেপাশে হবে। কিন্তু এইভাবে কালো টাকার আয় চলতেই থাকবে, যা কিনা বিমুদ্রাকরণের মাধ্যমে নির্মূল করা সম্ভবই না।

দেশে যে পরিমাণে দুর্নীতি আছে, তাতে করে পুরনো টাকাকে নতুন টাকায় রূপান্তরিত করা খুবই সহজ হয়ে গেল। এমনকি, কিছু ব্যাঙ্কও তাদের বিত্তশালী গ্রাহককে এই কাজে সাহায্য করেছিল সেইসময়। এর জন্য তারা ৩০% চার্জ নিয়েছিল। এবং এই সবকিছুর ফলে আবার নতুনভাবে কালো টাকার আয় শুরু হল। বিভিন্ন ব্যবসায়ী তাদের পুরনো টাকাকে (হতে পারে সেগুলো কালো টাকা) নতুন টাকায় পাল্টে নেবার জন্য হিসাবে দেখাল যে তাদের হাতে নগদ বেশি আছে। ফলে সেই টাকা পাল্টে গিয়ে হিসাবের মধ্যে ঢুকে গেল। এমনকি সেই সময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের জন ধন অ্যাকাউন্টগুলোকেও এই টাকা রাখার জন্য ব্যবহার করা হয়।মজার ব্যাপার হল, নোট বাতিলের মধ্যে দিয়ে এইরকম আয়ের সুবিধা করে দেওয়া হল, এবং ৫০০/১০০০ টাকা বাতিল করে নতুন ২০০০ টাকার নোট চালু করার ফলে কালো টাকাকে (অর্থাৎ হিসাব-বহির্ভূত) ধরে রাখা আরো সহজ হয়ে গেল। সহজ কথায়, হঠাৎনোটবাতিল ঘোষণাকরে কালো টাকা উদ্ধার তো করা গেলই না, উল্টে কালো টাকা আয়ের নতুন নতুন পন্থা চালু করে দেওয়া হল পুরনো পন্থাগুলোকে অক্ষুন্ন রেখেই।

কার্টুনিস্ট সতীশ চন্দ্রের আঁকা কার্টুন

আমরা যদি ঠিক একবছর আগে ফিরে যাই তাহলে দেখব বিজেপি দু’রকম প্রতিজ্ঞাকে তুমুলভবে প্রচারে এনেছিল, ক) কালো টাকার উৎসে পৌঁছনো, খ) বিদেশে থাকা কালো টাকাকে দেশে ফিরিয়ে আনা। দলের ছোট বড় মেজো সব নেতারা ২০১৫ র নির্বাচনী প্রচারের ভাষনে বলেছিলেন, যদি বিদেশে থাকা কালো টাকা ফিরিয়ে আনা যায়, তাহলে দেশের সব পরিবারকে ১৫ লাখ করে টাকা দেওয়া যাবে। ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে গেল যে, এটা একটা মিথ্যা কথা বা ‘জুমলা’। বিদেশে আসলে ঐ পরিমান কালো টাকা নেই, বা থাকলেও সরকার জানে না তাকোথায় আছে, কিংবা তাকে ফিরিয়ে আনা যাবে কিভাবে। এইসব মিথ্যা কথা প্রচার করার মূল্য বিজেপি-কে দিতে হয়েছিল ২০১৫-র বিহারের বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে। এরপর বিজেপি নানাভাবে এই কালো টাকা ধরার ক্ষেত্রে তার সংকল্পকে প্রমাণ করার চেষ্টা করে গেছে। সেসুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে বিশেষ তদন্তকারী সংস্থা গঠন হোক, বা আইন পাশ/ সংশোধন করে হোক, কিংবা ২০১৬ সালেরবাজেটেএই বিষয়ে ব্যবস্থা এনেই হোক। সবকটি পন্থাই ব্যর্থ হয়। তাই শেষপর্যন্ত এই বিমুদ্রাকরণের হাস্যকর সিদ্ধান্ত। নরেন্দ্র মোদি ৮ই নভেম্বরের ভাষণে তিনটে বিষয়কে বিমুদ্রাকরণের লক্ষ্য হিসাবে দেখিয়েছিলেন: ১) কালো টাকার উৎস সন্ধান, ২) নকল মুদ্রাকে চিহ্নিত করে তাকে শেষ করা ও ৩) সন্ত্রাসবাদীদের টাকার জোগান বন্ধ করা। এর আগেই আমরা দেখলাম, বিমুদ্রাকরণ কালো টাকার উৎস সন্ধান বা তার প্রচলনকে বন্ধ করতে পারেনি। এইভাবে নকল মুদ্রার চলনও বন্ধ করা যায়নি, কারণ তাতে বিদেশিনানা শক্তির হাত রয়েছে; আর সন্ত্রাসবাদীদের অর্থের জোগান আসে নানাভাবে – যেমন হাওয়ালা, ডলার, আর ড্রাগের চোরাচালান। এগুলোর কোনোটাই নোটবাতিলের মধ্যে দিয়ে আটকানো সম্ভব না।

৮ই নভেম্বরের ঘোষণার কিছুদিনের মধ্যেই সরকার তার ভুল বুঝতে পারে ও বিমুদ্রাকরণের ঘোষিতলক্ষ্য পাল্টাতে থাকে। প্রথমে বলে যে বিমুদ্রাকরণের উদ্দেশ্য হল অর্থনীতিকে “ক্যাশলেস” বানানো। পরেরদিনই লক্ষ্য হয়ে যায় “লেস ক্যাশ অর্থনীতি”, কারণ সরকার বুঝতে পারে যে ভারতকে পুরোপুরি ক্যাশলেস অর্থনীতির দেশ বানাতে অনেক সময় লাগবে। মজা হল, এগুলোর কোনোটার সাথেই কালো টাকা কোনোরকম সম্বন্ধ নেই। যেমন, জাপানের নগদ আর জিডিপি-র অনুপাত ১৮%, আর সেখানে কালো টাকার পরিমাণ খুবই কম। আবার নাইজেরিয়ায় এই নগদ আর জিডিপি-র অনুপাত ১.৪% হলেও সেখানকার অর্থনীতিতে বিপুল পরিমানে কালো টাকা বিদ্যমান। হঠাৎ বিমুদ্রাকরণের ফলে মানুষের হয়রানি, শুধুমাত্র এটিএম থেকেটাকা তুলতে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে অসুস্থ হয়ে মানুষের মৃত্যু – এইসবকে ছাপিয়েও বিজেপি উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করে। বিজেপি বিপুল সংখ্যক গরীব ভোটারকে বারবার এই মিথ্যা বলে ভোট আদায় করতে সমর্থ হয়েছিল যে, গরীবা মানুষেরা কষ্ট হলেওবিত্তবান মানুষেরা এই নোটবাতিলে তাদের সব কালো টাকা খুইয়েছেন।

হঠাৎ করে নাটকীয়ভাবে এই নোট বাতিলের ফলাফল ভারতীয় অর্থনীতির জন্য মোটেও ভাল হয়নি। যেকোনো অর্থনীতিতেই নগদ হল তার শরীরের রক্তের মত, যা পুরো শরীরকে পুষ্টি জোগায়। পুরো অর্থনীতি জুড়ে নগদের চলন সেইরকমভাবেই আয়সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিকে পুষ্ট করে। যদি শরীর থেকে ৮৫% রক্ত তুলে নেওয়া হয়, এবং প্রতি সপ্তাহে ৫% করে তা জোগান দেওয়া হয়, তাহলে সেই শরীর মরে যাবে। অর্থনীতির ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। ৫০০/১০০০ টাকার নোট বাতিল করে এক বছর ধরে একটু একটু করে সেই অর্থ পুনরায় অর্থনীতিতে ফেরানো হয়েছিল। এর ফলে গোটা অর্থনীতিটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। যদি এই নগদকে নোটবাতিল ঘোষণার সাথে সাথেই ফেরানো যেত, তাহলে হয়ত অর্থনীতির ধ্বস্ত চেহারা কিছুটা হলেও তাড়াতাড়ি পুনরুদ্ধার করা যেত। ভারতের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হল তার অসংগঠিত ক্ষেত্র। এই ক্ষেত্রে দেশের ৯৪% কর্মক্ষম মানুষ কাজ করেন। এই গোটা ক্ষেত্রটাই কাজ করে নগদে। এখানে ব্যাঙ্কের মারফত কাজ হয় না বললেই চলে। যেখানে সংগঠিত ক্ষেত্রগুলো মার খায় চাহিদা কমে যাওয়ার জন্য (কারণ অনেক মানুষ তাদের কাজ হারিয়েছে), অসংগঠিত ক্ষেত্রে নগদের অভাবে কাজকর্ম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অথচ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ সালের উন্নয়ন হার এই দশকের সবচেয়ে বেশি। এর কারণ হল, অসংগঠিত ক্ষেত্রের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, আর তাই জিডিপি-র হিসাবে অসংগঠিত ক্ষেত্রের একটা আনুমানিক হিসাব ধরে গোটা হিসাবটা করা হয়। নোটবাতিলের আগে হলে হয়ত হিসাবটা মেনে নেওয়া যেত, কিন্তু নোটবাতিলের পরে অসংগঠিত ক্ষেত্রে যেভাবে মার খেয়েছে, তাতে এই হিসাব মোটেও সঠিক নয়। এই হিসাবে যদি অসংগঠিত ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করা হত তাহলে দেখা যেত অর্থনীতির উন্নয়ন তো হয়ইনি, উল্টে অবনমন ঘটেছে।

অবশ্যম্ভাবীভাবেই নোটবাতিলের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে। এর ফলে কর্মহীনতা বেড়ছে, অসাম্য বেড়েছে, ফলে বাজারে চাহিদা কমেছে। এই সবকিছুর মিলিত ফলস্বরূপ করোনা অতিমারীর আগেই ভারতের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়তে শুরু করেছে। আর, অতিমারীর পর্যায়ে এসে তা আরো ভয়ানক রূপ ধারণ করেছে। কোনোভাবেই এটি তার ঘোষিতলক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি, পরিবর্তে অর্থনীতিতে বিরাট ফাটল ধরিয়ে গেছে, বিশেষ করে অসংগঠিত ক্ষেত্রে। প্রান্তিক মানুষ, অর্থাৎ, নারী, শ্রমিক ও কৃষকের অবস্থা ক্রমেই সঙ্গীন হয়েছে। হয়ত বিজেপি এই বিমুদ্রাকরণের অন্তঃসারশূন্যতা বুঝেছে, তাই পরবর্তী কোনো নির্বাচনী প্রচারে এটিকে খুব জোরের সাথে প্রচারে আনেনি। কিন্তু যে ক্ষতি করে দিয়ে গেছে, তা অপূরনীয়।

Please follow and like us:
error17
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on নোটবাতিল : অর্ধদশক পরে ফিরে দেখা

Leave A Comment