সিঙ্গুর ফিরে দেখা : “আমরা টাটার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে কোনো ভুল করিনি।”

পর্যালোচনা সবচেয়ে জনপ্রিয়

Last Updated on 7 months by admin

নিজস্ব সংবাদদাতা, 12  ফেব্রুয়ারি, 2021, 11:30PM

কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের আনা তিন কৃষি-আইনের বিরুদ্ধে এই মুহুর্তে দেশের লক্ষ লক্ষ কৃষক গত আড়াই মাস ধরে দিল্লি এবং তার সীমান্তে অবস্থান আন্দোলনে রয়েছেন। বিজেপি দাবি করছে যে তারা পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলে সিঙ্গুরে শিল্প গড়বেন। সিপিএম-কংগ্রেস-বিজেপি – এদের প্রত্যেকেরই দাবি কৃষকরা সেই সময় শিল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে ভুল করেছিল এবং সিঙ্গুরে শিল্প হলে প্রচুর বেকার কাজ পেতো। অন্যদিকে সিঙ্গুরের আন্দোলনের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী  সংগ্রামী বামপন্থী সংগঠনগুলি দাবি করছে যে তারা কৃষি জমি বাঁচানোর দাবিতে কৃষকদের আন্দোলনকে সমর্থন করে ভুল করেননি। তাদের এও দাবি যে ৩৪ বছরের বাম সরকার বেকারদের কাজ তো দিতে পারেইনি উল্টে সিঙ্গুরে শিল্পের নামে হাজার হাজার কৃষকের কর্মসংস্থান কেড়ে নিলো। এই চাপানউতোরের মাঝে সিঙ্গুরের ঐ সময়ের আন্দোলনকারী কৃষক এবং অন্যান্য সাধারণ সিঙ্গুরবাসী কি বলছেন শুনে নেওয়া যাক।

এদেশ আমার-এর নিজস্ব প্রতিনিধি বিগত 11-ই ফেব্রুয়ারী গেছিলেন সিঙ্গুরে। সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণের প্রশ্নে ইচ্ছুক ও অনিচ্ছুক দু-ধরনের অবস্থানে ছিলেন এমন কৃষকদের সাথেই কথা হয়। সেই কথাবার্তার কিছু অংশ এই প্রতিবেদনে উপস্থিত করা হচ্ছে।

সিঙ্গুরের বাজেমেলিয়ার আন্দোলনকারী ক্ষেতমজুর হারাধন মাঝির বক্তব্য, “আমরা টাটার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে কোনো ভুল করিনি। আন্দোলন করেও আমরা লাভবান হতে পারিনি কারন সিপিএম সরকার আমাদের চাষের জমিগুলো পুলিশ দিয়ে দখল করে নষ্ট করে দিয়েছিলো। আমিও লেখাপড়া জানিনা আমার ছেলে মেয়েদেরকেও অতো লেখা পড়া শেখাতে পারিনি। টাটার কারখানা ওখানে হলেও আমরা ওখানে কাজ পেতাম না।এখন তৃণমূল সরকার ১৬ কিলো চাল আর ২ হাজার টাকা প্রতি মাসে  দেয় বলে কোনক্রমে খুদকুড়ো খেয়ে বেঁচে আছি।”

আর এক আন্দোলনকারী কৃষক, খাসের ভেড়ী গ্রামের সঞ্জয় দাসের বক্তব্য, “এই আন্দোলনে সব থেকে বেশি লাভবান হয়েছে ইচ্ছুক কৃষকেরা। তারা সরকারের থেকে একর প্রতি ৯ লক্ষ এক ফসলী জমির জন্য এবং একর প্রতি ১২ লক্ষ তিন ফসলী জমির জন্য টাকাও পেলো আবার তাদের জমিও ফেরত পেলো।ঐ ইচ্ছুক কৃষকেরা এখন আবার তাদের ফেরত পাওয়া জমিতে চাষও করছে।” স্বেচ্ছায় জমি দিয়েছেলেন যারা, তারা কী ভাবছেন আজ ? বেড়াবেড়ি মধ্যপাড়ার বলরাম দাস স্বেচ্ছায় জমি দিয়েছিলেন। তিনি  জানান, “শিল্প হলে ভালোই হতো, অনেক বেকার ছেলে কাজ পেতো। অনেক কৃষক কাজ হারালো ঠিকই কিন্তু শিল্প হলে আস্তে আস্তে সিঙ্গুরের অনেক মানুষের কাজ হতো।” সেই সময় রাজ্য শিল্প উন্নয়ন নিগমের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ঘোষণা করা হয়েছিলো, টাটা ন্যানো ও অন্যান্য অনুসারী শিল্প মিলে মোট ৩৫০০ লোকের কর্মসংস্থান হবে। অন্যান্য সূত্র থেকে জানা জাচ্ছিল যে টাটার শিল্প হলে কাজ হারাবেন  প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ৪০,০০০ কৃষিজীবি মানুষ।আমরা এই পরিসংখ্যানের বিষয়ে তাদেরকে জানালে ঐ সময়ের ইচ্ছুক কৃষকেরা কেউই কোনো  কোনো উত্তর দিতে পারেননি।

স্থানীয় তৃণমূল নেতা দুধকুমার ধাঁড়া  বলেন, “বেশ কিছু জমিতে চাষের কাজ শুরু করা হয়েছে, নষ্ট হয়ে যাওয়া জমিগুলি রাজ্য কৃষি দপ্তরের পক্ষ থেকে পুনরুদ্ধার করার কাজ চলছে।”

দোবাধী জয়মোল্লা গ্রামের বাসিন্দা সেই সময়ের আন্দোলনকারী  একজন নারী-কৃষক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ) বলেন, “জমি ফেরত পেয়ে আমাদের ভালোই হয়েছে।আমরা এখন তিন বিঘে জমি চাষ করে সংসারটা ভালোভাবে চালাতে পারছি।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, পেশায় গাড়ী-চালক  বেড়াবেড়ি গ্রামের মধ্যপাড়ার একজন জানালেন, ” আমি প্রথমে শিল্পের পক্ষেই ছিলাম, আমি ভাবতাম সিঙ্গুরে কৃষকরা শিল্প না হতে দেওয়ার জন্য ভুল করেছে। আমি শুনলাম, গুজরাতে ন্যানো কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন মনে হচ্ছে কৃষকদের ঐ সময়ের আন্দোলনের মধ্যে যৌক্তকতা ছিলো।”

আজকের সিঙ্গুরের পরিপ্রেক্ষিতে ঐ সময়ের আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা SUCI,CPIML এবং MKP-র মতো সংগঠনের নেতারা যা বলতে চাইছেন, তার মূল কথা হল –  সিঙ্গুরের কৃষকরা বামফ্রন্টের শিল্পায়নের তত্ত্বকে বিশ্বাস করেনি।কারণ  তাদের আমলেই একটার পর একটা কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। তারা সিঙ্গুরের মানুষকে বিশ্বাস করাতেই পারেনি যে ওখানে প্রচুর মানুষের কাজ হবে।আর শিল্প যদি সত্যিই করার সদিচ্ছা ছিলো অন্য অনেক পতিত জমিও তো ছিলো রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে।কৃষি জমিকে ধ্বংস করে , হাজার হাজার কৃষকের পেটে লাথি মেরে ওখানেই শিল্প করার কিসের জন্য জরুরি ছিলো? সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম-ভাঙ্গর ও সম্প্রতি দিল্লির কৃষক আন্দোলন প্রমাণ করে কোনো সরকারই মানুষের প্রকৃত কর্মসংস্থান নিয়ে ভাবিত নয়। তারা বরং কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষা করতে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান কেড়ে নিতে পারে।  টাটা , আম্বানি , আদানি-দের স্বার্থ রক্ষায় সিপিএম, তৃনমূল কংগ্রেস, কংগ্রেস  বা বিজেপি  সকলেই কৃষকের সর্বনাশ করতে নানা-মাত্রায় সক্রিয়। যদিও কর্পোরেট-দের স্বার্থ-রক্ষায়, কর্পোরেটদের  প্রতি আনুগত্যের দৌড়ে বিজেপি অন্যদের থেকে অনেকটাই এগিয়ে।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
No Thoughts on সিঙ্গুর ফিরে দেখা : “আমরা টাটার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে কোনো ভুল করিনি।”

Leave A Comment