সরকারের বঞ্চনার বিরুদ্ধে কয়েক বছর বেতন না পাওয়া মাদ্রাসা শিক্ষকদের লাগাতার অনশন অবস্থান

আজকের খবর বিশেষ খবর রাজ্য

Last Updated on 7 months by admin

 

নিজস্ব সংবাদদাতা, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ :

২০২১ এর গত ১২ ই জানুয়ারি থেকে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার মাদ্রাসা শিক্ষক-শিক্ষিকারা সল্টলেক সিটি সেন্টার ওয়ান-এর সামনে টানা অবস্থান বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন। আজ এই অবস্থান ৪৫ দিনে পড়লো। তাঁদের মূল দাবী অবিলম্বে ২৩৫ টি সরকারী আনএডেড মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং নন টিচিং কর্মচারীদের স্থায়ী বেতনকাঠামোর আওতায় আনতে হবে এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য মিড-ডে মিলের ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পরপরই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্যে চালু ৬৩০ টি সরকারী মাদ্রাসার সাথে সাথে আরও ২৩৫ টি মাদ্রাসাকে সরকারী অনুমোদন দেওয়ার কথা বলেন। লক্ষ্য ছিল প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সুযোগ করে দেওয়া। স্বভাবতই, উপযুক্ত ট্রেনিং প্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকারা তাঁর এই পদক্ষেপকে সাদরে গ্রহণ করেন। কিন্তু তারপর সময় গড়িয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ সরকার, তাঁর নিজস্ব অনুমোদন প্রাপ্ত এই মাদ্রাসাগুলির শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জন্য বা নন-টিচিং স্টাফদের জন্যও কোনোরকম বেতন পরিকাঠামো চালু করে উঠতে পারে নি। এমনকি বারবার আবেদন করা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য কোনো প্রকার মিড-ডে মিলের ব্যবস্থা অবধি সরকারী তরফে করা হয় নি।

কিন্তু মজার বিষয় হল, এই মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে সরকারী অনুমোদন পাওয়ার জন্য যাবতীয় রীতি-নীতি সঠিকভাবেই পূরণ করতে হয়েছে। এমনকি পড়াশোনা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য, নিয়ম মাফিক গত ৯ বছরে, মাদ্রাসা গুলিকে সরকারী তরফে তিনবার রিনিউয়াল অবধি জোগাড় করতে হয়েছে। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলির শিক্ষক-শিক্ষিকাদের জন্য কোনোরকম বেতন কাঠামো চালু করা যায় নি। এবং তাঁরা এই সময়পর্বে একপ্রকার বিনা বেতনেই মাদ্রাসাগুলিকে চালু রেখেছেন। শুধু তাই নয়, প্রায় প্রত্যেক আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরই মত, মূলত আর্থিকভাবে দুর্বল, নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা ছেলে-মেয়েরা এই মাদ্রাসাগুলির শিক্ষার্থী। কিন্তু এই ৯ বছরে বহু আবেদন নিবেদন করেও তাদের জন্য পোশাক বা মিড-ডে মিলের কোনোরকম ব্যবস্থা চালু করতে না পারায় মাদ্রাসা গুলিতে শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে হু হু করে, বাড়ছে স্কুল ছুটের সংখ্যা।

এই অবস্থায় একপ্রকার বাধ্য হয়েই মাদ্রাসা শিক্ষক শিক্ষিকারা এখন রাস্তায় নেমেছেন। এই বিষয়ে আন্দোলনকারী পশ্চিমবঙ্গ সরকার অনুমোদিত আনএডেড মাদ্রাসা টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের রাজ্য সম্পাদক, পলাশ রমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই ঘোষণা করেন ১০০০০ মাদ্রাসাকে সরকারী অনুমোদন দেওয়া হবে অথচ বাস্তবে মাত্র ২৩৫ টি মাদ্রাসা এই অনুমোদন পেয়েছে। এবং এই ৯ বছরে এই মাদ্রাসাগুলির শিক্ষক -শিক্ষিকাদের কোনোপ্রকার সাম্মানিক দেওয়া হয় নি। এমনকি অন্যান্য সরকার অনুমোদন প্রাপ্ত স্কুলগুলির মতো এই মাদ্রাসাগুলির ছাত্র-ছাত্রীদের মিড ডে মিল বা বিদ্যালয়ের পোশাক দেওয়ার কোনো উদ্যোগও সরকারী তরফে নেওয়া হয় নি। শিক্ষক-শিক্ষিকারা বারবার আবেদন-নিবেদন, অবস্থান, বিক্ষোভ দেখিয়েও আজ পর্যন্ত সমস্যার কোনো সুরাহা করতে পারেন নি। তাই আজ তাঁরা বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমেছেন দাবী আদায়ের আশায়।”

এ বিষয়ে প্রতিবাদী শিক্ষক অ্যাসোসিয়েশনের রাজ্য কমিটির সদস্য নাগমা নাজ জানান, “৪৫ দিন ধরে টানা অবস্থান বিক্ষোভ কর্মসূচি চালানোর পরেও সরকারী তরফে এখনও কোনো সদুত্তর কেউ দিতে পারে নি। এমনকি তাঁরা দাবী আদায়ের আশায় এই বছরেরই ১৬ই জানুয়ারি থেকে আজ পর্যন্ত টানা ৩৮ দিন অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। এরফলে অনশনকারী অনেকেরই শারীরিক অবস্থার সংকটজনক পরিস্থিতি হয়। তা সত্ত্বেও সরকার পক্ষের কেউই এখনও অবধি তাঁদের সাথে আলোচনায় বসার সময় করে উঠতে পারেন নি।”

তিনি আরও জানান, “গত বছর ২৯শে সেপ্টেম্বর, বেঙ্গল আর্মির অনুমতি নিয়েই ধর্মতলায় গান্ধীমূর্তির পাদদেশ থেকে মিছিল হয়। সেই মিছিলে এই মাদ্রাসা শিক্ষকদের ওপর অকথ্য পুলিশি সন্ত্রাস নেমে এসেছিল। এমনকি এক মধ্য বয়স্ক মহিলা শিক্ষিকার বুকে লাথি অবধি মারা হয়েছিল, শিক্ষক শিক্ষিকাদের করা হয়েছিল গণ গ্রেপ্তার। কিন্তু তারপরেও তাঁরা আন্দোলন থামিয়ে দেন নি।”

প্রসঙ্গত, সেইসময় স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে প্রতিবাদী শিক্ষক শিক্ষিকারা জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন। যদিও কিছু প্রতিশ্রুতির বুলি আওড়ানো ছাড়া সমস্যার কোনো সমাধানসূত্র মুখ্যমন্ত্রী সেইসময় দিতে পারেন নি। এমনকি এই ৪৫ দিনেও সরকারী তরফে না কোনোরকম সাড়া মিলেছে, না তো অবস্থানরত মহিলাদের সুরক্ষার ন্যূনতম কোনো ব্যবস্থা করা হয়েছে। অসুরক্ষিত অবস্থাতেই প্রায় ২০০-২৫০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা রাস্তায়, খোলা আকাশের নীচে রাত কাটাচ্ছেন বলে জানান আরেক প্রতিবাদী শিক্ষক।

এই মূহুর্তে আন্দোলনের অবস্থা সম্পর্কে জানতে আমাদের সাংবাদিকরা টিচার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট সেখ জাভেদ মিঞাদাদকে প্রশ্ন করলে তিনি জানান, “কেন্দ্র-রাজ্যের ভোটব্যাঙ্ককে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বচসার স্বীকার হচ্ছেন তাঁরা। আসলে দুপক্ষই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষজনকে অশিক্ষিত করে রেখে দিতে চাইছেন, যাতে ক্ষমতা দখলের খেলায় উপযুক্ত সময়ে তারা এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের কাজে লাগাতে পারে। 

একদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভেদমূলক ধর্মীয় রাজনীতি, আরেকদিকে রাজ্য সরকারের মুসলিম তোষণের আড়ালে সাধারণ নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত মুসলিম শোষণের স্বীকার হচ্ছেন। কিন্তু এবারে তাঁদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। আর তাই, নিজেদের দাবী সরকার বাহাদুরের কান অবধি পৌঁছাতে এই মাসের ১২ তারিখ প্রতিবাদী শিক্ষক শিক্ষিকারা নিজেদের রক্ত দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন। আদালতেও তাঁরা স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন জানিয়েছেন। কারণ, আকাশ ছোঁয়া দ্রব্যমূল্যের এই যুগে বিনা বেতনে ৯ বছর ধরে মাদ্রাসাগুলিতে পড়ানো আর তাঁদের পক্ষে সম্ভবপর হচ্ছে না। তাই এরপরেও তাঁদের দাবীদাওয়া পূরণ না হলে তাঁরা শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যারই পথ বেছে নেবেন।”

এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, গত দশ বছরে একবারও এম.এইচ.সি’র কোনোরকম নিয়োগ রাজ্যসরকারের তরফ থেকে করা হয় নি। এরফলে মাত্র ৩৩০ টি মাদ্রাসা ছাড়া বাকি কোনো মাদ্রাসাতেই বর্তমানে কোনো প্রধান শিক্ষক বা প্রধান শিক্ষিকা নেই। এতদিন ধরে বলতে গেলে শিক্ষকরা একপ্রকার নিজেদের গরজেই মাদ্রাসা গুলিকে চালু রেখেছিলেন। অথচ এই শিক্ষক শিক্ষিকারা প্রত্যেকেই সরকারী নিয়মানুযায়ী উপযুক্ত ডিগ্রী ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফলে সরকারী নিয়মে তাদের বেতনকাঠামোয় যুক্ত হতে কোনো বাঁধা থাকার কথা নয়। তা সত্ত্বেও কোনোরকম সাম্মানিক না দিয়ে তাঁদের প্রতি যে অবিচার দীর্ঘ ৯ বছর ধরে রাজ্যসরকার করে চলেছেন তা সরকারের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের প্রতি চূড়ান্ত উদাসীনতা এবং অবহেলাকেই সামনে আনে। অবশ্য আন্দোলনের চাপে রাজ্যসরকার বাধ্য হয়েছেন একটি সরকারি নির্দেশিকা প্রকাশ করতে। কিন্তু ভুলে ভরা ও অসঙ্গতিপূর্ণ সেই সরকারি নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করে নিজেদের আন্দোলনকে দিশা দিতে নারাজ আন্দোলনকারীরা। তাই তাঁদের বক্তব্য তাঁরা তাঁদের দাবী আদায় না হওয়া অবধি রাস্তাতেই থাকবেন এবং প্রয়োজনে নিজেদের জীবন্ত জ্বালিয়ে দিয়ে সরকারের বঞ্চনার উপযুক্ত জবাব দেবেন।

এবার, সামনের বিধানসভা ভোটের আগে রাজ্যসরকারের আদৌ টনক নড়ে কি না সেটাই আমাদের দেখার।

 

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on সরকারের বঞ্চনার বিরুদ্ধে কয়েক বছর বেতন না পাওয়া মাদ্রাসা শিক্ষকদের লাগাতার অনশন অবস্থান

Leave A Comment