মেহলকলাঁর আন্দোলনঃ পাঞ্জাবের ইতিহাসে ঐক্যবদ্ধ গণ-আন্দোলনের এক অন্যতম মাইলফলক

আজকের খবর কৃষক আন্দোলন বিশেষ খবর মতামত

Last Updated on 7 months by admin

 

দিল্লিতে কৃষকদের আন্দোলন চলছে কয়েক মাস যাবত। দিল্লির কনকনে ঠান্ডায় রাস্তায় কাটিয়ে দিলেন আন্দোলনরত কৃষকরা। প্রশাসনের হুমকি তারা ‘থোড়াই কেয়ার’ করলেন। মারা গেলেন ১৭০ জনের বেশি কৃষক।  তবুও কৃষকরা  লড়াই-এর ময়দান ছাড়েন নি।  এই অবস্থান আন্দোলনের ভূমি থেকে থেকে খবর সংগ্রহ করতে হাজির ছিলেন আমাদের প্রতিনিধিরা। পাঞ্জাবের কৃষকদের সাথে কথা বলে সেখানকার লড়াই-এর কথা জানলেন আমাদের প্রতিনিধি সৌম্য।

 

আজকে দিল্লি, হরিয়ানা, পাঞ্জাব, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ জুড়ে যে তীব্র কৃষক আন্দোলন দেখতে পাচ্ছি আমরা, তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল লড়াইয়ের ময়দানে বিভিন্ন কৃষক সংগঠনের ঐক্য। এই ঐক্য হঠাৎ একদিনে তৈরি হয়নি। আজকের আন্দোলনের প্রাথমিক অবস্থায় যে পাঞ্জাবের পথপ্রদর্শকের ভূমিকা ছিল বলা যায়, সেই পাঞ্জাবের মাটি বছরের পর বছর ধরে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের জমি হিসাবে প্রস্তুত হয়েছে। বিভিন্ন সংগ্রামী ধারার কৃষক সংগঠনের একসাথে দীর্ঘদিন পথ চলার মধ্য দিয়েই বিকশিত হয়েছে আজকের যৌথ আন্দোলন – যার মূর্ত বহিঃপ্রকাশ আজকের সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা বা মোর্চায় না থেকেও ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা ভারতীয় কিষাণ ইউনিয়ন (একতা) উগ্রাহাঁর মতো সংগঠনের ভূমিকা। “মেহলকলাঁ” পাঞ্জাবের বরনালা জেলার একটি গ্রাম। শুধু একটি মামুলি গ্রাম নয়, এই নামটি  চিহ্নিত করে  পাঞ্জাবের ইতিহাসে এক দুর্বার গণ-আন্দোলনকে। মেহলকলাঁর মাটিতে ঘটে যাওয়া এক গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা মানুষের কণ্ঠস্বর ব্যক্ত হয়েছিল কৃষক আন্দোলনের কাণ্ডারিদের নেতৃত্বেই। ধর্ষকদের দল ছিল  প্রতিপত্তিশালী ভূস্বামীদের পোষ্য গুণ্ডা। আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের সাজা নিশ্চিত করা গেলেও আন্দোলনের মূল তিন নেতাকে খুনের অভিযোগে ফাঁসানো হয়। সেই মামলায় কৃষক নেতা মনজিৎ সিং ধানের ও আরো দু’জনকে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছিল।

 

৮০র দশকে পাঞ্জাবের অবিভক্ত ভারতীয় কিষাণ ইউনিয়ন পরবর্তীকালে যে অনেকগুলো টুকরো হয়ে যায়, সেই টুকরোগুলো “মেহলকলাঁ আন্দোলনে” পুনরায় একজোট হয়ে লড়াই করে। সামাজিক ন্যায় এবং কৃষক নেতাদের নামে মিথ্যে মামলা প্রত্যাহার করার দাবীতে এই লড়াইয়ে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দেয় বিকেইউ (একতা) ডাকোন্ডা, বিকেইউ (একতা) উগ্রাহাঁ, কীর্তি কিষাণ ইউনিয়ন, পাঞ্জাব কিষাণ ইউনিয়ন  ইত্যদি  সংগ্রামী ধারার কৃষক ইউনিয়ন। পাঞ্জাবের ইতিহাসে একমাত্র লড়াই যেখানে দু’বার আদালত যাবজ্জীবনের সাজা ঘোষণা করার পরেও গণ-আন্দোলনের চাপে রাজ্যপালের ক্ষমা ঘোষণার মধ্য দিয়ে সাজা মকুব করতে বাধ্য হয়। সাজা মকুবের এই আন্দোলনের প্রথম ধাপে ২০০৭-এ পাঞ্জাবের রাজ্যপাল তিনজনকেই “ক্ষমা” করে দিলেও পরবর্তীকালে ধর্ষণ ও খুনে দোষী সাব্যস্তদের পরিবার পুনরায় কৃষক নেতাদের বিরুদ্ধে করা এই মামলাকে সুপ্রিম কোর্টে  নিয়ে যায়। দ্বিতীয়বারের জন্য সুপ্রিম কোর্ট তিনজনের মধ্যে শুধুমাত্র মনজিৎ ধানেরের যাবজ্জীবনের সাজা বহাল রাখেন। উচ্চতম আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালে ৪২টি কৃষক সংগঠন মিলে গড়ে তোলে “সংঘর্ষ  কমিটি ফর মনজিৎ সিং ধানের”। বরনালা জেলের বাইরে  লাগাতার ধর্ণা, মিছিল ইত্যাদির মাধ্যমে ২০১৯-এর নভেম্বরে রাজ্যপাল পুনরায় বাধ্য হন কৃষক নেতাকে “ক্ষমা” করতে। এক তীব্র ঐক্যবদ্ধ্য গণ-আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে মনজিৎ সিং ধানেরের কারামুক্তি ঘটে। মনজিৎ সিং ধানের নিজে একজন প্রত্যন্ত কৃষক পরিবার থেকে এসেছেন এবং যৌবন থেকেই খেটে-খাওয়া মানুষের লড়াইয়ে সমর্পিত তাঁর জীবন। তিনি বর্তমানে বিকেইউ (একতা) ডাকোন্ডা সংগঠনের অন্যতম এক নেতৃত্ব। চলমান কৃষক আন্দোলনের শুরু থেকেই তিনি টিকরি বর্ডারে অবস্থানে সামিল। আমরা এদেশ আমার এর পক্ষ থেকে মেহল কলাঁর আন্দোলনের বিষয়ে মনজিৎ ধানেরের এক সাক্ষাৎকার নিই গত ফেব্রুয়ারি মাসে। নীচে তার সংক্ষেপিত রূপ প্রবন্ধাকারে দেওয়া হল।

 

 

১৭ বছর বয়সী কিরনজিৎকে ন্যায় দেওয়ার মিশন

১৯৯৭ সালে পাঞ্জাবের বরনালা জেলার মেহলকলাঁ গ্রামের এক স্কুল শিক্ষকের ১৭ বছর বয়সী মেয়ে যখন বিকেল বেলাতেও বাড়ি ফেরে না, তখন পরিবারের লোকজন আর প্রতিবেশীরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। খোঁজাখুঁজি শুরু হতেই  যে সমস্ত প্রমান মিলতে শুরু করে তা গোটা ঘটনার জন্য গ্রামের গুন্ডা রাজনৈতিক পরিবারের দিকেই ইশারা করে। সমস্ত রাজনৈতিক পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এলাকার বড়ো ভূস্বামীর পোষ্য ছিল এই গুণ্ডারা। ক্ষেতের পাশের ঝোপঝাড়ের মধ্যেই লুকিয়ে রাখা ছিল কিরনজিৎ এর সাইকেলটি।  ওখানেই ক্ষেতের মধ্যে তার অন্তর্বাসও মেলে কিন্তু কিরনজিৎ এর কোন খোঁজ পাওয়া যায় না। পুলিশে রিপোর্ট লেখানোর পরেও পুলিশ কোন পদক্ষেপ নেয় না। তখন তার পরিবারের লোকজন স্থানীয় কৃষক ইউনিয়নের কাছে যান।  রাজনৈতিক চাপ আর হুমকির বিরূদ্ধে চলা ২৩ বছরের দীর্ঘ এক লড়াইয়ের এটাই প্রথম পদক্ষেপ হয় পরিবারের। পরের কিছুদিনের মধ্যেই হাজার হাজার গ্রামবাসী বারংবার রাস্তায় নেমে দোষীদের গ্রেপ্তার করতে বাধ্য করেন। দোষীদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে শেষপর্যন্ত লাশ ক্ষেতের মধ্যে বিকৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন গণসংগঠন একত্রিত হয়ে বানায় “কিরনজিৎ অ্যাকশন কমিটি”, এবং এই কমিটির লাগাতার প্রচেষ্টায় ২০০১ সালে দোষীদের সাজা হয়।

 

নেতৃত্বপ্রদানকারী সাথীদের ওপর মিথ্যে মোকদ্দমা এবং যাবজ্জীবনের সাজা

 

মার্চ ২০০১-এ আন্দোলন চলাকালীন আদালত প্রাঙ্গণে এক মারপিটের সময় দোষীদের পক্ষের এক ব্যাক্তি আহত হন। পরে তার মৃত্যু ঘটার ফলস্বরুপ কমিটির নেতা-নারায়ন দত্ত, মনজিৎ সিং ধানের এবং প্রেম কুমারদের মিথ্যে হত্যার মামলায় ফাঁসানো হয়। মার্চ ২০০৫-এ সেশন কোর্ট ওনাদের যাবজ্জীবনের রায় দেয়। দেড় বছর ভাতিন্ডা জেলে কাটানোর পর, জনতার অক্লান্ত লড়াইয়ের ফলস্বরূপ জুলাই ২০০৭-এ রাজ্যপাল ওনাদের সাজা মকুব করে বেকসুর খালাস করে দেন। ২০০৮ সালে কেস যখন উচ্চ আদালতে ওঠে তখন বিচারক রাজ্যপালের মাফী খারিজ করে দেন। শুনানীর সময় প্রেম কুমার আর নারায়ণ দত্তকে ছেড়ে দেওয়া হলেও মনজিৎ সিং ধানেরকে যাবজ্জীবনের সাজা দেওয়া হয়। সর্বোচ্চ আদালতে অ্যাপিল করেও মনজিৎ সিং ধানের সঠিক বিচার পাননি। সেপ্টেম্বর ২০১৯-এ আরেকবার সুপ্রিম কোর্ট যাবজ্জীবনের সাজাকেই স্বীকৃতি দেয়। রায় বেরানোর পর ৩০ হাজার মানুষের মিছিলের সাথে মনজিৎ সিং ধানের আত্মসমর্পন করতে পৌঁছান কোর্টে। এর পর যতদিন তিনি জেলে ছিলেন ততদিন জেলের বাইরে শয়েশয়ে মানুষ তাঁর ছাড়া পাওয়ার দাবীতে ধর্না চালিয়ে যান। জনসংঘর্ষের জোরের ফলে পাঞ্জাব সরকারকে মাথা নোয়াতে হয় এবং জনতার সম্মিলিত লড়াই এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করার মাধ্যমে ৫৪ দিন পর ৭ নভেম্বর ২০১৯ সালে মনজিৎ সিং ধানের এর শাস্তি পুনরায় রাজ্যপালের মাফ করে দেন।

 

মহিলাদের সুরক্ষার দাবী প্রত্যেক সরকার করে থাকে কিন্তু দেশে মহিলাদের এক বড় অংশের এবং বিশেষত সবথেকে অবদমিত অংশের সাথে যে যৌন হিংসার পিছনে প্রায়শতই পুলিশ, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক গুন্ডা দের সংযোগ দেখতে পাওয়া যায়। এই যোগসুত্রের  সামনে পীড়িত ব্যাক্তি এবং তার পরিবার অসহায় বোধ করেন।  কিন্তু মেহল কলাঁর মাটিতে সংঘটিত লড়াই জয়ী হওয়ার ফলে দেশ দুনিয়াতে প্রত্যেক মহিলার সুরক্ষা, প্রত্যেক শ্রমজীবী মানুষের সম্মানের পতাকা ওড়ান হল।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on মেহলকলাঁর আন্দোলনঃ পাঞ্জাবের ইতিহাসে ঐক্যবদ্ধ গণ-আন্দোলনের এক অন্যতম মাইলফলক

Leave A Comment