রিক্ত ভূমির প্রতিবাদ: সবুজ বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলন

কৃষক আন্দোলন

Last Updated on 8 months by admin

শুভ্রকেতন বসু

কৃষকদের পেটে লাথি মারতে গিয়ে মোদী সরকারের এখন বেশ ল্যাজে গোবরে অবস্থা। পাঞ্জাব ও হরিয়ানার  লক্ষ লক্ষ কৃষক দিল্লী অবরোধ করেছে, অন্যান্য রাজ্যের কৃষকেরাও সামিল হচ্ছে এই প্রতিবাদে। বিক্ষিপ্ত হলেও সাড়া দিয়েছে শ্রমিকরাও। কৃষকদের অন্যতম প্রধান দাবি, সদ্য পাশ হওয়া Farmers (Empowerment and Protection) Act 2020 সহ তিন কৃষিবিল ও বিদ্যুৎ বিলের নতুন সংশোধনী প্রত্যাহার করতে হবে। কৃষকরা বিক্ষুব্ধ কারণ এই আইনের ফলে কৃষি পণ্যের বাজারে বৃহৎ পুজিঁর একছত্র আধিপত্য কায়েম হবে। পেপসি-র মত বৃহৎ পুঁজির সাথে কারবার করার তিক্ত অভিজ্ঞতা পঞ্জাব তথা অন্যান্য রাজ্যের চাষিদের ইতিমধ্যেই হয়েছে, তাও তখন এ ধরণের আইন ছিল না। বর্তমান আইনে এইসব কর্পোরেট যত খুশি যে কোনো কৃষিপণ্য কিনে মজুত করতে পারবে, অর্থাৎ মজুতদারি নামক একটি ঘৃণিত অপরাধকে আইনসঙ্গত করে দেওয়া হলো। পণ্যের মান, দর বা পরিমাণ নিয়ে চাষির সাথে কর্পোরেটের ঝামেলা হলে তার নিষ্পত্তি বিচারবিভাগ করবে না, করবে সাবডিভিশন বা জেলাস্তরের আমলারা। অর্থাৎ সোজা কথায় চাষি কোর্টে যেতে পারবে না। বিচারবিভাগ এবং প্রশাসনকে আলাদা রাখা, যা কিনা গণতন্ত্রের একটি মূল অঙ্গীকার, এই আইন তাকে অস্বীকার করলো। কৃষিপণ্যের কেনাবেচা যদি কোনো নিয়ন্ত্রিত বাজার অর্থাৎ কিষাণ মান্ডির মাধ্যমে না হয় তাহলে সহায়ক মূল্যে কৃষিপণ্য কেনার বিষয়টিও অবান্তর হয়ে যাবে। তাই কৃষকরা আতঙ্কিত ও বিক্ষুব্ধ। এই আইন সারা দেশের কৃষকদের কাছেই বড় বিপদ। শুধু কৃষক নয়, অকৃষিজীবী মানুষের বিপদও কম নয়। মজুতদারি আইনসিদ্ধ হবার ফলে মাঝে মাঝেই কোনো কোনো কৃষিপণ্যের দাম অত্যধিক বেড়ে যাবে। গণবন্টন ব্যবস্থা ধ্বসে পড়বে। আকস্মিক কোনো মহামারি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফলন কিছু কম হলে দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। এই যে কোভিডের কারণে লকডাউন হল, তখন অধিকাংশ শ্রমজীবী মানুষের হাতেই কাজ ছিল না, রোজগার প্রায় তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল, এই পরিস্থিতিতে যদি গণবন্টন ব্যবস্থা না থাকত, যদি সরকারি গুদামে যথেষ্ট খাদ্য মজুত না থাকত, তাহলে দেশে দুর্ভিক্ষ অবধারিত ছিলো। সহায়ক মূল্যে খাদ্য কেনা হয়েছিলো বলেই সরকারি গুদামে খাদ্য মজুত ছিলো, না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হত। সুতরাং এই আইন গোটা দেশের কাছেই বিপজ্জনক। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, মূলত পঞ্জাব ও হরিয়ানার কৃষকরাই এই বিক্ষোভে সামিল হয়েছেন। পঞ্জাব ও হরিয়ানা ভারতীয় সবুজ বিপ্লবের আঁতুরঘরস্বরূপ। এই সবুজ বিপ্লবের অন্যতম উদ্দীপক ছিল সহায়ক মূল্যে ফসল কেনা। সহায়ক মূল্যের সুবিধা পঞ্জাবের কৃষকেরা যত পেয়েছেন অন্যান্য রাজ্যের কৃষকেরা তত পাননি। কিন্তু সবুজ বিপ্লবের প্রযুক্তি পঞ্জাবের কৃষি-বাস্তুতন্ত্রকে নিঙড়ে ছিবড়ে করে দিয়েছে। সহায়ক মূল্য আছে বলে আজও পঞ্জাবের কৃষি চলছে, যা তুলে নিলে সমস্ত কৃষক নিশ্চিত ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে। পঞ্জাবের কৃষির এই ভয়াবহতাই এখানে আলোচনা করব, এটা আলোচনা না করলে কেন পঞ্জাবের কৃষক আজ রাস্তায় তার একটি বড় দিক অনালোচিত থেকে যাবে। তাছাড়া মোদী সরকার দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লবের পরিকল্পনা করছে, এমতাবস্থায় এই কৃষিবিল কৃষক তথা খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য কতটা বিপজ্জনক তাও এই আলোচনা থেকে বোঝা সম্ভব হবে।

বিপাকীয় ফাটল:

পঞ্জাবের কৃষি-বাস্তুতন্ত্রের বিপর্যয় নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই বিপাকীয় ফাটল নিয়ে কিছু আলোচনা হওয়া দরকার। কৃষিতে পুঁজিতন্ত্র যত গেঁড়ে বসবে তত কৃষি বাস্তুতন্ত্র বিপাকীয় ফাটলের সমস্যার মধ্যে গিয়ে পড়বে। উদ্ভিদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য প্রায় ১৫ রকমের মৌলিক পদার্থের দরকার হয়। এই মৌলগুলির অধিকাংশই উদ্ভিদ মাটি থেকে শোষণ করে। এদের মধ্যে কয়েকটি মৌল যেমন নাইট্রজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ইত্যাদি একটু বেশি পরিমাণে লাগে, আবার অনেক মৌল যেমন মলিবডেনাম, ম্যাগনেশিয়াম, বোরন, দস্তা ইত্যাদি লাগে খুবই সামান্য পরিমাণে। যে মৌলগুলি বেশি পরিমাণে লাগে তাদের বলে অতিমাত্রিক মৌল, আর যাদের কম পরিমাণে লাগে তাদের বলে স্বল্পমাত্রিক মৌল। এই সমস্ত মৌলগুলি উদ্ভিদের নানান শারীরবৃত্তীয় কাজে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই সব অতিমাত্রিক আর স্বল্পমাত্রিক মৌলগুলির যেকোনো একটির অভাব ঘটলে উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, রোগ প্রতিরোধ শক্তি কমে যায়। এই মৌলগুলি উদ্ভিদের দেহে জমা থাকে। কোনো প্রাণি যখন কোনো উদ্ভিদকে খায়, তখন তখন এই মৌলগুলি উদ্ভিদদেহ থেকে প্রাণিদেহে যায়। প্রাণিদেহের নানান শারীরবৃত্তীয় কাজেও এদের বিশেষ ভূমিকা আছে। একইভাবে এই মৌলগুলি তৃণভোজী প্রাণি থেকে মাংসাশী প্রাণিতে যায়। এই সমস্ত প্রাণি এবং উদ্ভিদের রেচন ও বর্জ্যপদার্থের পচনের মাধ্যমে, অথবা এদের মৃতদেহের পচনের মধ্যমে মৌলগুলি পুনরায় মাটিতে ফিরে আসে। মাটি উদ্ভিদ ও প্রাণিদের মধ্যে মৌলগুলির এই চক্রাকার আবর্তনে বহু ধরনের ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও ছোট ছোট প্রাণির  ভূমিকা অপরিহার্য। বলা বাহুল্য, যেকোন ফসল ও তাদের খাদকের ক্ষেত্রেই এই তথ্যগুলি সত্যি।

কৃষিজমিতে উৎপন্ন ফসল যদি স্থানীয়ভাবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে এই চক্রাকার আবর্তন ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, এবং কৃষিজমির উর্বরতাও অক্ষুণ্ণ থাকে। কিন্তু কৃষিজমিতে উৎপন্ন ফসলের বিপুল অংশ যদি ভৌগলিভাবে দূরবর্তী স্থানে (শহরে বা অন্যদেশে) রপ্তানি হতে থাকে, তাহলে সেই ফসলে আবদ্ধ মৌলগুলি আর প্রাকৃতিক চক্রাকার উপায়ে জমিতে ফেরত আসে না। ফলে জমির উর্বরতা কমতে থাকে। এইভাবে জমির বিভিন্ন মৌলের চক্রাকার আবর্তনের ভাঙ্গনকে বলাহয় বিপাকীয় ফাটল

ভারতে উন্নয়নের দাপটে ভিটেমাটি ছাড়া হয়ে বহু মানুষ ভিড় করেছে শহরের বস্তি অঞ্চলে। ট্রাক্টর, হারভেস্টার ইত্যাদি কৃষি যন্ত্রের বহুল ব্যবহারের ফলে গ্রামীণ শ্রমজীবীদের একটা বড় অংশ গ্রামে কাজ হারিয়ে কাজের খোঁজে চলে গেছে শহরে। শহরের, প্রকৃতপক্ষে শহুরে বস্তির জনসংখ্যা ক্রমশই বাড়ছে। অনুমান করা হয় ২০২০-২৫ সাল নাগাদ শহুরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার পৃথিবীর মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারকে ছাপিয়ে যাবে। এই বস্তির মানুষ নির্মাণ শ্রমিক হিসাবে, বাবুদের বাড়ির কাজের লোক হিসাবে, ইত্যাদি নানান অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ নিচ্ছে। এই বিপুল শহুরে মানুষকে খাওয়ানোর জন্য খাবার আসছে গ্রাম থেকে, এবং বলা বাহুল্য সেই খাবারে আবদ্ধ মৌলিক পদার্থগুলিও শহরে চলে আসছে, যা আর কোনো প্রাকৃতিক জৈব-ভূ-রাসায়নিক চক্রে কৃষি জমিতে ফিরে যাবে না।

একটি হিসাব দিলে কৃষি জমি থেকে মৌলিক পদার্থ নিষ্কাশনের ছবিটা একটু মূর্ত করা যাবে। ২০০১ সালের জন গণনায় দেখা যাচ্ছে যে ভারতে শহুরে জনসংখ্যার পরিমাণ ২৮,৫৩,৫৪,৯৫৪ জন। ১৯৯৯-২০০০ সালে ভারতের শহুরে মানুষেরা গড়ে মাথাপিছু মাসে ৫.৫ কেজি চাল আর ৪.৪ কেজি গম খেয়েছিল। প্রতি গ্রাম চালে ও গমে পটাসিয়ামের পরিমাণ যথাক্রমে ১.১৬ এবং ৩.৮৬ মিলিগ্রাম। তাহলে প্রতিমাসে প্রতিটি শহুরে ভারতীয় গড়ে (৫.৫ x ১.১৬ x ১০০০) + (৪.৪ x ৩.৮৬ x ১০০০) = ২৩৩৬৪ মিলিগ্রাম পটাসিয়াম গ্রহণ করেছে, তাহলে বছরে করেছে ২৩৩৬৪ x ১২ = ২৮০৩৬৮ মিগ্রা বা ২৮০.৪ গ্রাম পটাসিয়াম। অর্থাৎ শহুরে মানুষ ঐ বছর মোট (২৮০.৪ x ২৮৫৩৫৪৯৫৪) / (১০০০ x ১০০০) = ৮০০১৩.৫ মেট্রিক টন পটাসিয়াম শুধু চাল ও গমের মাধ্যমে গ্রহণ করেছে। বলা বাহুল্য, এই পটাসিয়াম এসেছে গ্রামের কৃষিজমি থেকে, এবং যা কোনো প্রাকৃতিক উপায়েই আর কৃষিজমিতে ফেরত যাবে না। এই হিসাব শুধু চাল ও গম ধরে করা হয়েছে, সমস্ত ধরণের খাদ্যদ্রব্য হিসাবের মধ্যে আনলে নিশ্চিতভাবেই দেখা যাবে যে নিষ্কাশিত পটাসিয়ামের পরিমাণ আরও অনেক বেশি। আজ জমি থেকে শুধু চাল ও গমের মাধ্যমে যে পরিমাণ পটাসিয়াম নিষ্কাশিত হচ্ছে ,সবুজ বিপ্লবের প্রথমদিকে সামগ্রিক ভাবে তার থেকে কম পরিমাণে পটাসিয়াম জমিতে প্রয়োগ করতে হত। যেমন ১৯৬৪-৬৫ সালে ভারতীয় কৃষিজমিতে মোট প্রযুক্ত পটাসিয়ামের পরিমাণ ছিল ৬৯৩০০ মেট্রিক টন। বিপাকীয় ফাটলের কারণে জমির পটাসিয়ামের ভান্ডার যেমন যেমন রিক্ত হয়েছে, তেমনই বেড়েছে পটাসিয়াম সারের চাহিদা। তাই ২০০০-২০০১ সালে ১৫,৬৭,৫০০ মেট্রিক টন পটাসিয়াম ব্যবহার করতে হয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য ভারতে ব্যবহৃত সমস্ত পটাসিয়াম সারই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, ভারতে কিছুই তৈরি হয় না। অন্যান্য মৌলিক উপাদানের ক্ষেত্রেও চিত্রটা প্রায় একই রকম ভীতিপ্রদ; তফাৎ শুধু এইটাই যে এই ঘাটতি পূরণের জন্য প্রায়ই কোনো সার প্রয়োগ করা হত না। আর একটা কথা এখানে বলা দরকার যে, উদ্ভিদ মাটি থেকে ১৫ রকমের মৌল শোষণ করে বটে, কিন্তু তাদের মধ্যে যে কোনো একটির অভাব থাকলেই তার বৃদ্ধি ব্যাহত হবে।

নিঃস্ব, রিক্ত পঞ্জাব:

সবুজ বিপ্লবের ফলে পঞ্জাবে কৃষি-উৎপাদন বহুগুণ বাড়ে।সবুজ বিপ্লবের কৃষিপ্রযুক্তি অনুসারে বিদেশি সংকর জাতের গম ও ধান প্রচুর জল, সার, কীটনাশক বিষ, এবং ট্রাক্টর ইত্যাদি ব্যবহার করে চাষ করা হয়েছিল। পঞ্জাবের ভৌগলিক অঞ্চল ভারতের মাত্র ১.৫৪ শতাংশ, অথচ এই রাজ্য ভারতের মোট খাদ্যশস্যের ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ উৎপাদন করে। গত দুই দশক ধরে পাঞ্জাব ভারতের মোট চালের ৩৫ থেকে ৪০% এবং মোট গমের ৪০ থেকে ৭৫% উৎপাদন করে ভারতীয় শস্যাগার এর তকমা পেয়েছিল।

সবুজ বিপ্লবের এই সাফল্য কিন্তু স্থায়ী হয়নি, বিগত কয়েক বছরে জাতীয় কৃষি উৎপাদনে পঞ্জাবের ভুমিকা ধীরে ধীরে কমছে। সবুজ বিপ্লব পঞ্জাবের কৃষির চালচিত্র বদলে দিয়েছিল। সবুজ বিপ্লবের আগে পঞ্জাবে মূলতঃ গম ডাল ও মিলেট জাতীয় শস্যের চাষ হতো। সাধারণ পঞ্জাবীদের খাদ্যাভ্যাসও এই ফসলগুলিকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল। সবুজ বিপ্লবে খাদ্য উৎপাদন বাড়াবার হুজুগে চাষিদের কেবল ধান ও গম চাষে উৎসাহ দেওয়া শুরু হল। এই উৎসাহদানের একটি বড় উপায় ছিল সহায়ক মূল্যে উৎপাদিত ধান ও গম কিনে নেওয়া। পঞ্জাবের অধিকাংশ অঞ্চলই ধানচাষের অনুকূল নয়, কারণ জলাভাব। ধানচাষের বিপুল জলের চাহিদা মেটানোর জন্য শুরু হল অপরিকল্পিত সেচ, বহু ক্ষেত্রে উপযুক্ত নিকাশি ব্যবস্থা ছাড়াই। সবুজ বিপ্লবের আগে যে ধান গম মিলেট ইত্যাদি চাষ করা হত তাতে শস্যদানা আর খড়ের অনুপাত ছিলো ১:৪ থেকে ১:৫, কিন্তু সবুজ বিপ্লবে যে বেঁটে জাতের ধান গমের চাষ শুরু হলো তাতে দানা ও খড়ের অনুপাত দাঁড়ালো ১:১। সবুজ বিপ্লবের আগে শহরে খাদ্যশস্যের রপ্তানি হলেও জমি থেকে নিষ্কাশিত মৌলের ৮০ থেকে ৮৫% ই খড় হিসাবে কৃষিজমির আশেপাশেই থেকে যেত, সেগুলি পশুখাদ্য হিসাবে বা আগাছার বৃদ্ধি কমাবার জন্য জমি ঢাকা দেবার কাজে (Mulching) ব্যবহৃত হত, এবং স্বাভাবিক জৈব-ভূ-রাসায়নিক চক্রের মাধ্যমে আবার জমিতে ফিরে আসত। এই ভাবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কৃষিজমির উর্বরতা অক্ষুন্ন থাকতো। সবুজ বিপ্লবের ফলে এমন জাতের ধান গম চাষ শুরু হল, যাতে জমি থেকে নিষ্কাশিত মৌলের ৫০% ই রপ্তানি হয়ে যায় শহরে। জমির রিক্ত হবার পালা এবার শুরু হলো। ডাল চাষ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জমিতে প্রাকৃতিক উপায়ে নাইট্রোজেন আসার একটা বড় উৎস বন্ধ হয়ে গেল। নাইট্রোজনের জন্য সম্পূর্ণভাবে রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরশীলতা শুরু হল, ফলে জমির অনেক উপকারী প্রাণি মরে গেলো, ভূমিক্ষয় বাড়ল। পাঞ্জাবে জমির উর্বরতাশক্তিও দ্রুত হারে কমতে শুরু করল। ১৯৭০-৭১ সালে প্রতি হেক্টরে ৩৭ কেজি সার প্রয়োগ করে যে ফলন পাওয়া যেত, ২০১০-১১ সালে সেই পরিমাণ ফলন পেতে হেক্টর প্রতি ২৪৩ কেজি সার প্রয়োগ করতে হয়েছে। বর্তমানে রাজ্যের অধিকাংশ জমিতেই নাইট্রোজেন ও দ্রবণীয় ফসফরাসের পরিমাণ নিচু থেকে মাঝারি। অনেক জমিতেই স্বল্পমাত্রিক মৌলের অভাব দেখা গেছে। সাম্প্রতিককালে বেশ কিছু জমিতে সালফারের অভাব দেখা গেছে। বহু জমিতেই দস্তা, ম্যাঙ্গানিজ ও লোহার অভাবে ফলন ভীষণভাবে মার খাচ্ছে। বিপাকীয় ফাটলের যাবতীয় বৈশিষ্ট পঞ্জাবের কৃষিতে ক্রমশই প্রকট হয়ে উঠছে।

ডাল ও মিলেটের মত কম জলের ফসল চাষ বন্ধ করে কেবল ধান আর গম চাষ করার জন্য পঞ্জাবের কৃষিতে জলের চাহিদা প্রচুর বেড়ে গিয়েছিল। পাঞ্জাবের কৃষিজমির শতকরা ৯৮ ভাগই সেচ সেবিত। অধিকাংশ স্থানেই জলের অত্যধিক ব্যবহারের ফলে ভৌমজলের স্তর মাটির ১০ মিটারের বেশি নিচে নেমে গিয়ে সংকটজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ২০১০ সালের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, পঞ্জাবের ১৩৮ টি ব্লকের মধ্যে ১১০ টি ব্লকেই জলসম্পদের অবস্থা অত্যন্ত সংকটজনক।

পঞ্জাবের কৃষিতে রোগ ও পোকার উপদ্রবও ক্রমশই বেড়ে চলেছে। সবুজ বিপ্লবের ধান ও গমের জাতগুলি এদেশের রোগ ও পোকার প্রতি খুবই সংবেদনশীল ছিল, এই জাতগুলি চাষের পর থেকেই এই উপদ্রব বাড়তে থাকে। অতিরিক্ত সার ও জলের ব্যবহারের কারণে আগাছার বাড়বাড়ন্তও হতে থাকে খুব। পঞ্জাবের কৃষি সম্পূর্ণভাবে কীটনাশক ও আগাছানাশকের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। কীটনাশকের এই লাগামছাড়া ব্যবহারের কারণে কৃষকদের মধ্যে ক্যান্সার সহ নানান মারণরোগ বাসা বাঁধছে।

পঞ্জাবের এই অতিরিক্ত কৃষি উৎপাদন কোনো সুস্থায়ী ঘটনা ছিল না। কৃষি-বাস্তুতন্ত্রকে নিঙড়ে ছিবড়ে করে এই উৎপাদন বাড়ানো হয়েছিল। এর জন্য সার, আগাছা নাশক ও পোকামারা বিষ, বিদ্যুৎ, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদিতে ভর্তুকী দেওয়া হয়েছে, এবং কৃষিপণ্য সহায়ক মূল্যে কিনে নেওয়া হয়েছে। এতে চাষির লাভ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু গোপনে চাষির জমি চুরি হয়ে গেছে, জমির উর্বরতা বলে আর কিছুই প্রায় অবশিষ্ট নেই। উর্বর জমি চাষ করতে অনুর্বর জমির তুলনায় সার ইত্যাদি কম লাগে, ফলনও খানিক বেশি হয়। উর্বর জমির মালিক তাই কিছুটা বাড়তি লাভ পায়, কিন্তু কৃষি-বাস্তুতন্ত্রের বিপর্যয়ে জমির উর্বরতা হারিয়ে গেলে চাষি সেই বাড়তি লাভ থেকে বঞ্চিত হয়। পঞ্জাবের জমির উর্বরতার এখন এমন হাল যে, ভর্তুকিপুষ্ট রাসায়নিক সার আর কীটনাশক ইত্যাদি না পেলে সেখানে আর ফসল ফলবে না, সহায়ক মূল্যে ফসল না কিনলে লাভ থাকবে না। এই অবস্থায় যদি কৃষি উপকরণে ভর্তুকী তুলে দেওয়া হয়, যদি সহায়ক মূল্যে ফসল কেনা বন্ধ করে দেওয়া হয়, তবে তার ফল হবে মারাত্মক। চাষির যে অবস্থাই হোক, সার, কীটনাশক বিষ, কৃষি যন্ত্রপাতির কোম্পানি কিন্তু ফুলে ফেঁপে লাল হয়ে গেছে।

এখনও সারা ভারতে কিন্তু পঞ্জাবের আদলেই কৃষির উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা চলছে, শুধু তাই নয়, তার সাথে আবার জিন-প্রযুক্তিজাত ফসল চাষেরও পরিকল্পনা হচ্ছে। এর ফলে কৃষিবাস্তুতন্ত্রে আরো ভয়াবহ বিপর্য্যয় ঘটবে। ফলন যতটুকু বাড়বে, তা বাড়বে জমির উর্বরতাকে নিঃশেষ করে। কর্পোরেট যখন চাষিদের সাথে চুক্তি চাষ করবে, সে এমনভাবে চুক্তি করবে যাতে জমির সবটুকু উর্বরতা শুষে নিঃশেষ করে দিতে পারে। পড়ে থাকবে রিক্ত ভূমি, নিঃস্ব চাষী। কর্পোরেট লাভ নিয়ে পালাবে, তার ভর্তুকি দেবারও দায় নেই। আর সরকার তো আইন করে সে দায় ঝেড়ে ফেলেছে! পুঁজিবাদী কৃষির এই ভয়াবহ রূপ ইউরোপ-আমেরিকা বহু আগেই প্রত্যক্ষ করেছে, উপনিবেশগুলো লুঠ করে তারা অবস্থা সামাল দিয়েছে। কৃষিতে পুঁজিতন্ত্রের এই আগ্রাসী চেহারা দেখে মার্ক্স মন্তব্য করেছিলেন-

“All progress in capitalist agriculture is a progress in the art, not only of robbing the worker, but of robbing the soil; all progress in increasing the fertility of the soil for a given time is a progress toward ruining the more long-lasting sources of that fertility… Capitalist production, therefore, only develops the technique and the degree of combination of the social process of production by simultaneously undermining the original source of all wealth-the soil and the worker.”

আমাদের দাবিঃ

কৃষকরা সঙ্গত কারণেই বিদ্রোহের পথে। কিন্তু প্রশ্ন হল, যদি আপাতত এই আইন রদও হয়ে যায়, কৃষকের সমস্যা কি মিটবে? সাময়িকভাবে মিটলেও স্থায়ীভাবে যে মিটবে না, তা বলাই যায়। একথা ঠিক যে ক্রমাগত ধানের পর গম আর গমের পর ধানচাষ করে পঞ্জাবের কৃষিজমির ক্ষতি হয়েছে। এখন ডাল ও মিলেট চাষ বাড়াতে পারলে সমস্যার কিছু সমাধান হতে পারে, আর এটা তখনই হবে যদি সরকার সহায়ক মূল্যে চাষিদের কাছ থেকে ডাল ও মিলেট কেনে। কৃষিজমিতে জৈব সার প্রয়োগ একান্ত দরকার, তার জন্য চাষিকে জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে। সরকার সার কোম্পানিকে ভর্তুকি দেয়। দাবি তুলতে হবে যে, যে চাষি জৈব সার ব্যবহার করছে তাকেও সরাসরি ভর্তুকি দিতে হবে। এভাবে উর্বরতা সমস্যার কিছু সমাধান হয়ত করা যাবে। কিন্তু যদি এই সমস্যার প্রকৃত সমাধান করতে হয়, তাহলে এমন কোনো উন্নয়নের মডেল দরকার যেখানে গ্রাম-শহরের বৈরিতামূলক দ্বন্দ্বের অবসান ঘটবে, যা এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সম্ভব নয়। আজ কৃষক আন্দোলনে কমিউনিষ্ট ম্যানিফেষ্টোর সেই দাবিকে তুলে ধরতে হবে “কৃষিকে ম্যানুফ্যাকচারিং এর সাথে যুক্ত করতে হবে, এবং জনসংখ্যার যতদুর সম্ভব সমবন্টনের মাধ্যমে গ্রাম ও শহরের বিভেদ ঘোচাতে হবে” এই দাবি পূরণের লক্ষ্যে আমাদের সংগ্রাম করে যেতে হবে। যদি জয়ী হই, তাহলেই আমরা পারবো বিপাকীয় ফাটল অতিক্রম করে এক নতুন পৃথিবীতে পা রাখতে।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
One Thought on রিক্ত ভূমির প্রতিবাদ: সবুজ বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলন
    1 Jan 2021
    5:28am

    The environmental impact of green revolution in Punjab has been discussed nicely. Punjab has experienced green revolution more than any other states of India and today Punjab is opposing Farm bill more than any other states. I thought from the title , this article will try to find the rationale behind these two facts. It has been discussed but the relationship has not been established in very definitive way. Can we extend this relationship to other states – more green revolution more protest again farmers bill? At this point what should be the demand for alternate Farm bill be ?

    0
    0

Leave A Comment