এক বছর পরে আবারো দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি পরিযায়ী শ্রমিকেরা?

আজকের খবর পর্যালোচনা বিশেষ খবর

Last Updated on 5 months by admin

নিজস্ব প্রতিবেদন, ২৫ এপ্রিল,২০২১ :

এক বছর আগের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার স্মৃতি কি দুঃস্বপ্নের মতো ফিরে এলো পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবনে? গত রবিবার দিল্লির আনন্দ বিহারের ছবি কতকটা সেই কথাই মনে করায়। সেখানে কয়েক হাজার মানুষের ভীড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে বিহারের মতিহারি জেলার তিলক মাহাতো বলছিলেন, “আমি চার বছর ধরে পাঞ্জাবে এক ইস্পাত কারখানার শ্রমিক হিসাবে কাজ করছি। এমনিতে লুধিয়ানা থেকে গ্রামে ফিরতে ট্রেনের টিকিটের খরচ হয় ৭০০ টাকা মতো। কিন্তু একদিকে কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, অন্যদিকে ট্রেনের টিকিটেরও আকাল। বাসের টিকিট করে দেওয়ার জন্য দালালরা মাথাপিছু ২৫০০০ টাকা করে চাইছে।” তিলক মাহাতোর মতোই অভিজ্ঞতা দিল্লির আনন্দ বিহার, প্রগতি ময়দান, পাহাড়্গঞ্জে জড়ো হওয়া পরিযায়ী শ্রমিকদের।  ভিড় ঠেলে টিকিট কাউন্টার অব্দি পৌঁছতে পারছেন না বেশিরভাগ শ্রমিক।

এই বারে এখনো অব্দি কেন্দ্রীয়ভাবে লকডাউন ঘোষণা হয়নি ঠিক। কিন্তু মহারাষ্ট্রে আংশিক লকডাউন, দিল্লিতে এক সপ্তাহের জন্য লকডাউন জারী হয়েছে। অনেক কল-কারখানা, শপিং মল এবং অন্যান্য পরিষেবা ও বিপণন কেন্দ্র কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। কাজ না থাকায় একদিকে যেমন বিনা পারিশ্রমিকে বসে থাকা সম্ভব হচ্ছে না পরিযায়ী শ্রমিকদের, অন্যদিকে আবার তাদের বাড়ি ফেরার জন্য বিশেষ পরিবহনের ব্যবস্থা করেনি কেন্দ্রীয় সরকার। ফলে সব মিলিয়ে চরম দুর্ভোগের শিকার তারা। এই অবস্থা নিরসনে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে এই দুর্ভোগের খবর যাতে বৃহত্তর অসন্তোষ তৈরি না করতে পারে তার জন্য সচেষ্ট কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।

“লকডাউন করে আমাদের কাজের জায়গায় থেকে যেতে বলা হচ্ছে। কিন্তু কাজ না দিয়ে, রেশন না দিয়ে, ফেরার ব্যবস্থা না করে শুধুমাত্র থেকে যাওয়ার আবেদন করলে আমরা কী করে থাকতে পারবো?” বলছিলেন ইমরান। এক ছোটখাটো কারখানার শ্রমিক। দু’দিন ধরে দিল্লির বাস টার্মিনাসে টিকিটের জন্য এসে ফিরে গেছেন।  মুম্বাইয়ে এমব্রয়ডারির কাজ করেন পূর্ব বর্ধমানের সাবির আলি। ওনার কথায় জানা গেল এই অবস্থায় শ্রমিকদের ভাগ্য ঝুলে আছে “শেঠ” অর্থাৎ মালিকের ব্যক্তিগত বদান্যতার ওপর, সরকার থেকে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।  ব্যাঙ্গালোরে কর্মরত পশ্চিমবঙ্গের গৃহশ্রমিকরাও জানাচ্ছেন বিভিন্ন বাড়িতে গৃহশ্রমিকদের কাজ করা বন্ধ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে এই সমস্যা ক্রমবর্ধমান। যেহেতু সরকারীভাবে লকডাউন ঘোষণা হয়নি, কোনও ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে না সুরাহা করার।

আগের বারের লকডাউনের ক্ষত এখনো সারেনি পুরো দেশ জুড়ে। সামাজিক সংহতি আর ব্যক্তিগত বদান্যতার বাইরে সরকারী পরিকল্পনার চূড়ান্ত ঘাটতি, অব্যবস্থা সারিয়ে তুলতে এই এক বছরে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে উঠছে প্রশ্ন। সরকারীভাবে পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য রেশন, বিনামূল্যে পরিবহন, আর্থিক সহায়তা ইত্যাদি বিষয়গুলো  “মানবিক অনুরাগ” নয়, বরং শ্রমিক ও নাগরিক হিসাবে তাদের অধিকার হিসাবেই প্রাপ্য – এরকম মত উঠে এসেছিল সামাজিক আন্দোলন হিসাবে। প্রায় ২০০ জায়গায় শ্রমিকরাও বিক্ষোভ দেখান এই অধিকারগুলোর দাবীতে। এমনকি তাদের জন্য রেল পরিবহনও চালু করে কেন্দ্রীয় সরকার সমাজের একাংশের আন্দোলনের চাপে পড়েই। যদিও দেখা যায় শেষমেশ তার সিংহভাগ খরচ তারা চাপায় রাজ্যগুলোর মাথায়। সেই সময় বাড়ি ফিরতে গিয়ে কতো পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু হয় তার হিসাব চেয়ে রাজ্যসভায় সরকারকে প্রশ্ন করা হলে সরকার সেই প্রশ্নের কোনও জবাব দিতে পারেনি। যদিও বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী সংখ্যাটা কয়েকশো।  বিভিন্ন রাজ্যের অবস্থা পরিষ্কার করে দিচ্ছে যে আজকেও সারা দেশে পরিযায়ী শ্রমিকদের চিত্রটা খুব একটা বদলায়নি। প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, পরিযায়ী শ্রমিকদের মতো তাদের সমস্যা ও দুরবস্থার বাস্তব অবস্থাটাও কি “অদৃশ্য” করে রেখে দেওয়া হবে?

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on এক বছর পরে আবারো দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি পরিযায়ী শ্রমিকেরা?

Leave A Comment