চলমান কৃষক আন্দোলনের হাল হকিকত : পর্ব – ৪

আজকের খবর কৃষক আন্দোলন বিশেষ খবর

Last Updated on 4 weeks by admin

বিশেষ প্রতিবেদন, ১ নভেম্বর, ২০২১ :

(দেশজুড়ে চলমান কৃষক আন্দোলনের প্রতি সপ্তাহের আপডেট দেওয়া হবে এই বিশেষ সিরিজের প্রতিবেদনে। এই আন্দোলনের ব্যাপ্তির নিরিখে এরকম যেকোনও প্রতিবেদন অসম্পূর্ণ হতে বাধ্য। কিন্তু চেষ্টা করা হবে বিগত সপ্তাহের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে যথাসম্ভব তুলে ধরার। প্রতি সোমবার আমরা তুলে ধরবো আগের সপ্তাহের খবরাখবর। এ সপ্তাহে আগের  সপ্তাহের গুরুত্বপূর্ণ কিছু খবর দেওয়া হল।)

 

পর্ব – ৪

২৬ অক্টোবর: এই বছর ঐতিহাসিক ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা আছে। প্রতিবাদ আন্দোলনের মাঝেও হরিয়ানার কৃষকরা ধান চাষ বন্ধ করেননি। ধান কাটা এবং কৃষক আন্দোলন দুটোই সামাল দিতে  তাঁরা বিশেষ সফল হয়েছেন।  প্রতিবাদী কৃষকদের মধ্যে এমন সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে যে যখন একটি দল ফসল কাটার জন্য ‘দেশে’ (নিজের গ্রামে) ফেরে তখন তাদের জায়গায় অন্য দল প্রতিবাদ স্থলে এসে প্রতিবাদী স্থানে উপস্থিত থাকে।

২৭ অক্টোবর: তুলোর দাম কমে যাওয়ায় মধ্যপ্রদেশের কৃষকরা চরম বিপাকে পড়েছেন।  বাজারে তুলোর সর্বোচ্চ দাম কুইন্টাল প্রতি ৬৫০০ টাকা, যা দিয়ে জমি তৈরী, ফসল বোনা, বাছাই এবং পরিবহন খরচটুকুও কুলোয় না।  কৃষকরা বলছেন যে তাদের ফসল তৈরির জন্যে নেওয়া ঋণের বোঝা কমাতে কুইন্টাল প্রতি কমপক্ষে 12,000 টাকা পেতে হবে – কোভিডের কারণে বাজার বন্ধ থাকায় টানা দুই বছর ধরে সবজি ফসল নষ্ট করতে হয়েছিল।  বর্তমান পরিস্থিতিতে আত্মহত্যা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই বলে জানান তারা। এদিকে রাজ্যের বিজেপি সরকার বর্তমানে খন্ডোয়া লোকসভা এবং রায়গাঁও, জোবাট এবং পৃথ্বীপুর বিধানসভা আসনের উপনির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত।

ভারতে প্রতি ৩০ মিনিটে একজন কৃষক আত্মহত্যা করেন।  ঋণের বোঝায় প্রতি বছরই নতুন ঋণ  যোগ হয়।  সরকারের বাজার উদারীকরণ নীতিতে, শহুরে ভারতে অবিরাম সস্তা শ্রম তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিতভাবে  বাড়ছে  জাল কৃষি রাসায়নিকের বিক্রি। গত কয়েক বছরে নোটবন্দী, কীটপতঙ্গের আক্রমণ, কোভিডের সময় প্রস্তুতিহীন পদক্ষেপ ইত্যাদি ইত্যাদির মাঝে কোনও সরকারই কৃষকদের দিকে নজর দেয়নি।

২৮ অক্টোবর: ফসল সুরক্ষা  বীমা নিয়ে ২০১৮ সালে করা একটি গবেষণা প্রকাশিত হল। দেখা যাচ্ছে। ভারতে মাত্র ২৬ শতাংশ কৃষি জমি বীমার দ্বারা সুরক্ষিত।  কেন্দ্রীয় সরকার প্রধান মন্ত্রী ফসল বীমা যোজনা এবং আবহাওয়া ভিত্তিক ফসল বীমা প্রকল্পের মতো কেন্দ্রীয় সরকারী প্রকল্পগুলি চালু এবং পুনর্গঠন করা সত্ত্বেও, সমীক্ষায় দেখা গেছে যে প্রতি একশো জনের মধ্যে ৫০জন কৃষকই এই ব্যাপারে হয় অবগত ছিলেননা অথবা ফসল বীমার জন্য কীভাবে আবেদন করতে হয় সে সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না।  যারা ফসল বীমা করিয়েছিলেন, প্রিমিয়াম দিয়ে, তাদের মধ্যে গবেষণায় দেখা গেছে যে প্রতিটি ফসলের জন্য ৭০-১০০ শতাংশ বীমার দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।  কি কারণে? আরও অবাক হওয়ার ব্যাপার হল এই দাবিগুলি এই বলে খারিজ করা হয়নি যে বীমার আওতার বাইরে বা সঠিক কাগজ জমা পড়েনি, বরং খারিজ করার কারণ ২০১৮ সালের প্রায় প্রত্যেকটা দাবিতে লেখা হয়েছে  “অন্যান্য কারণ” ।  প্রধান মন্ত্রী ফসল বীমা যোজনায় সাম্প্রতিক বছরগুলিতে “অন্য কারণের” মধ্যে অন্যতম হল যে রাজ্য সরকারগুলি বীমা সংস্থাগুলিকে প্রিমিয়াম ভর্তুকি দিতে ব্যর্থ হয়েছে৷

এদিন ভোরে টিকরি সীমান্তে একটি মালবাহী ট্রাকের ধাক্কায় তিনজন প্রতিবাদী মহিলার (মনসা জেলার খিভা দিয়ালুওয়ালার শ্রীমতি অমরজিৎ কাউর,শ্রীমতি গুরমেল কাউর এবং শ্রীমতি সুখবিন্দর কাউর) মৃত্যু হয় এবং আরো দুজন মহিলা (গুরমেল কাউর ও হরমিত কাউর) সাংঘাতিক ভাবে আহত হন। আহতদের রোহতকের পোস্ট গ্রাজুয়েট ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সাইন্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সংযুক্ত কিষান মোর্চা দুর্ঘটনায় মৃত তিন সাহসী মহিলা প্রতিবাদকারীদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছে । মোর্চা এই দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ নিরপেক্ষ তদন্তেরও দাবী জানিয়েছে।

পাঞ্জাবের ঘারুয়ান নামক স্থানে এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে প্রতিরক্ষামন্ত্রী শ্রী রাজনাথ সিংয়ের উপস্থিত থাকার কথা। সেখানে অসংখ্য কৃষক বিক্ষোভ দেখায়। ফলস্বরূপ অনুষ্ঠানটি বাতিল ঘোষণা করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয় এবং তারা কৃষকদের কাছে এই ঘটনায় ক্ষমা প্রার্থনা করে।

২৯ অক্টোবর: দিল্লিতে রাস্তা অবরোধের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট এ একটি জনস্বার্থ মামলা চলছে এবং গত সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টের দুই-বিচারকের একটি বেঞ্চ বলেন যে কৃষকদের আন্দোলন করার অধিকার থাকলেও অনির্দিষ্টকালের জন্য রাস্তা অবরোধ করা যাবেনা। অথচ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৯(২) এবং ১৯(৩) অনুযায়ী প্রতিবাদ করার অধিকারের অন্তরায়ের মধ্যে পড়ে শুধুমাত্র সেই বিষয়গুলি যেগুলো ভারতের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার পক্ষে ক্ষতিকারক, রাজ্যের নিরাপত্তা, জনসৃঙ্খলতা, শালীনতা ইত্যাদির পরিপন্থী অথবা আদালতের অবমাননা, মানহানি বা অপরাধের প্ররোচনামূলক। আইনানুযায়ী যদি কোনো প্রতিবাদ নিষিদ্ধ বা সীমিত করা হয় তাহলে এক বা একাধিক উপরোক্ত কারণ সুস্পষ্টভাবে সুপ্রিম কোর্টকে বলতে হবে। এই  বিষয়ে উপরের কোনটি প্রতিবাদী কৃষকরা লঙ্ঘন করেছেন? যদি তা নাই হয় তাহলে ধরা যায় যে সুপ্রিম কোর্ট এ ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করার অধিকারের বিরুদ্ধে কাজ করছে।

কৃষক সংগঠনের আইনজীবী  অ্যাডভোকেট দুস্যান্ট দাভে বলেছেন যে প্রথমত রাস্তা অবরোধ প্রতিবাদ আন্দোলনের জন্যে নয়, পুলিশের ব্যারিকেডের জন্যে হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ  এর আগে (১২ জানুয়ারী, ২০২১) সুপ্রিম কোর্টের আরেকটি বৃহত্তর বেঞ্চ স্পষ্টভাবে রায় দিয়েছিলো যে কৃষকদের প্রতিবাদ করার সমস্ত অধিকার আছে। অ্যাডভোকেট দাভের মতে এই নতুন জনস্বার্থ মামলার কৃষক বিরোধী রায়টি সুপ্রিম কোর্টের আগের নির্দেশের কারণেই সরাসরি বাতিল হয়ে যাবে। এই সপ্তাহে পুলিশকে টিকরি এবং সিংগু বর্ডারের প্রতিবাদস্থলের কাছাকাছি থেকে ব্যারিকেড অপসারণ করতে দেখা গেছে।

৩০ অক্টোবর : অনাবাসী ভারতীয় ব্যবসায়ী এবং কৃষক বিক্ষোভের সমর্থক, দর্শন সিং ধালিওয়ালকে সম্প্রতি ভারতে ঢুকতে দেওয়া  হয়নি।  সীমান্ত কর্মকর্তারা তাঁকে বলেছেন যে ভারতে প্রবেশের অনুমতি পেতে হলে তাঁকে কৃষক বিক্ষোভ মঞ্চের লঙ্গর খানাগুলিকে অনুদান দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

৩১ অক্টোবর : এদিন গুজরাটের আনন্দে, দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সারা দেশজুড়ে সমবায় আন্দোলন জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলার সময় চলমান কৃষকদের বিক্ষোভের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন যে প্রতিবাদ হওয়া উচিত সমাধানের জন্য, সমস্যা বাড়ানোর জন্য নয়। তিনি আরও বলেন, কৃষকদের স্বাবলম্বী করতে হবে। সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা বলে যে তারাও মনে করে কৃষকদের আত্ম-নির্ভর হওয়া উচিত  কিন্তু বহিরাগত মুনাফাখোর সংস্থার উপর নির্ভরশীল হয়ে নয়। আর কৃষক মোর্চা আরও বলে যে তারাও আলোচনা চায়; কিন্তু সরকার আলোচনা ব্যাপারে নীরব।

হরিয়ানার জিন্দে খাটকর টোল প্লাজায় যুব, ছাত্র, কৃষক এবং শ্রমিকের যৌথ পঞ্চায়েতে বিশাল জনসমাগম হয়েছিল। বহু যুবক এই মহা পঞ্চায়েতে অংশগ্রহণ করেছিল এবং  সংযুক্ত কিষান মোর্চার নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।

পূর্ব পরিকল্পনা মতো শহীদ কিষান অস্থি কলস যাত্রা দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত হয়েছে – এইরকম এক যাত্রা উত্তরপ্রদেশের এটোয়াতে হয়েছে এবং কেরালা, কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্রেও এই যাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

টিকরি সীমান্তে এদিন পুলিশ ব্যারিকেড সরিয়ে নেওয়ায় দুই চাকার যান এবং এম্বুলেন্স যাওয়ার জন্য আলাদাভাবে রাস্তা করে দেওয়া হয়েছে, যদিও প্রতিবাদকারী কৃষকরা আগেও রাস্তায় যান চলাচলে সাহায্য করেছে। সংযুক্ত কিষান মোর্চা আগেই জানিয়েছে যে সুপ্রিম কোর্টের চাপের ফলে পুলিশ এখন তৎপরতা দেখাচ্ছে এবং মোর্চা সবকিছু নজরে রেখেই সম্মিলিত সিদ্ধান্ত যথাযোগ্য সময় গ্রহণ করবে।

১ নভেম্বর : গ্লাসগোতে ভারতের কৃষক আন্দোলনের সমর্থনে প্রবাসী ভারতীয়রা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখান  – প্রবাসীরা ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলনকে সংহতি জানান। বিক্ষোভে ভারতীয় বংশোদ্ভূত সব বয়সের মানুষের হাতে প্ল্যাকার্ড ছিল – যাতে লেখা ছিল, “ভারতীয় কৃষকদের সংগ্রাম আমাদের সংগ্রাম” (“Struggle of Indian Farmers is Our Struggle”) এবং ব্যানারে মোদীকে “শতশত নিরীহ কৃষক বিক্ষোভকারীর হত্যাকারী” বলে অভিহিত করে। বিক্ষোভকারীদের ব্যানারের আরো লেখা ছিল – মিঃ মোদীকে স্কটল্যান্ডে স্বাগত জানানো হয়নি। উল্লেখ্য, মানবতার ভবিষ্যত রক্ষার জন্য বিশ্বের সকল দেশ জরুরী এবং প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে গ্লোবাল ওয়ার্মিং মোকাবিলা করার জন্য জাতিসংঘের COP26 শীর্ষ সম্মেলনে এসেছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী সেই শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন। এমন সময়ে প্রবাসী ভারতীয়দের এই প্রতিবাদ ঘটেছে।

Please follow and like us:
error17
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on চলমান কৃষক আন্দোলনের হাল হকিকত : পর্ব – ৪

Leave A Comment