মধ্যপ্রদেশে কৃষকের আত্মহত্যা, প্রধানমন্ত্রী মোদীর উদ্দেশ্যে লিখে গেছেন ‘সুইসাইড নোট’

বিশেষ খবর

Last Updated on 9 months by admin

বিশেষ সংবাদদাতা, ৪ঠা জানুয়ারি: লকডাউনের সময়কার বকেয়া বিদ্যুতের বিল পরিশোধ না করায় একজন কৃষকের আটাচাকী (আটাকল) এবং মোটরসাইকেল বাজেয়াপ্ত করেছিল মধ্যপ্রদেশের এক বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা (ডিসকম)। সেই কারণে মারাত্মক মানসিক চাপের মধ্যে ছত্তরপুর জেলায় একজন পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী কৃষক গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। এমনটাই অভিযোগ করলেন সেই কৃষকের পরিবার ও প্রতিবেশীরা।

 ‘‘আমার শরীর সরকারকে দিয়ে দিও। আর শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বেচে মিটিয়ে দিও যাবতীয় বকেয়া।’’ আত্মঘাতী কৃষকের পাঁচ পাতার ‘সুইসাইড নোট’এ এমনটাই লেখা আছে! করোনা পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের বিল মেটাতে পারেননি বলে আত্মহননের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন ওই কৃষক, ছত্তরপুর জেলার মতগুনওয়া গ্রামের মুনেন্দ্র সিং রাজপুত। মুনেন্দ্র নিজেকে বিজেপি সমর্থক বলে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে তাঁর সুইসাইড নোটে লিখে গেছেন। নিজের জমিতে চাষাবাদের পাশাপাশি একটি ছোট আটার কল ছিল মুনেন্দ্রর। করোনা প্রভাবে ও লকডাউনের কারণে সেই আটাকল বন্ধ থাকলেও এই কয়েক মাস মিলে বিদ্যুৎ বিল তাঁর বকেয়া পড়ে যায় প্রায় ৮৮ হাজার টাকা। তিনি এই সংকটকালে কোনওভাবেই ওই টাকা জোগাড় করতে পারেননি। তাই তিনি আত্মহননের মতো চরম পথ বেছে নেন।

মুনেন্দ্র-র ভাই লোকেন্দ্র অভিযোগ করেছ, “বকেয়া পরিশোধ না করায় আটাচাকী এবং মোটরসাইকেল বাজেয়াপ্ত করে নেয় বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা। তারা বহু লোকে সামনে ভাইকে পমান করে। সেকারণে আমার ভাই মুনেন্দ্র তার জীবন শেষ করে দিল“। বকেয়া পরিশোধ করতে না পারার কারণ হিসাবে লোকেন্দ্র আরো বলেন, “লকডাউনের কারণে আমার ভাই গভীর আর্থিক সংকটে পড়েছিলআগের খরিফের ফসলখুব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। সে পুরোপুরি ছোট্ট আটাচাকী উপর নির্ভরশীল ছিলসোমবার ত্তরপুর গ্রামীণ ডিসকম কর্মীরা তাকে ধরে নিয়ে যায়। সে বকেয়া পরিশোধের জন্য আরও কিছু সময় দিতে বারবার অনুরোধ করেতারা কোনো কথা শুনতে চায়নি এবং প্রকাশ্যে তাকে অপমান করে।

সবার সামনে অপমান এবং পাঁচ সদস্যের সংসার চালানোর চাপ নিতে না পেরে মুনেন্দ্র আত্মঘাতী হন। বিরোধী দলের অভিযোগ, “কেন্দ্র ও রাজ্যের বিজেপি সরকারের ‘কৃষক স্বার্থবাহী’ নীতি আসলে যে ফাঁপা ও ভাঁওতা তা আবারও চোখে আঙ্গুল দিয়ে প্রমাণ করে দিল এই কৃষকের আত্মহনন। মুনেন্দ্রর সুইসাইড নোটেও সেকথা স্পষ্ট। আরও স্পষ্ট, লকডাউনে সাধারণ, গরিব মানুষের দিকে কোনওভাবেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়নি কেন্দ্র বা রাজ্যের বিজেপি সরকার

ব্যাপক টাকার বিদ্যুৎ বিলের কথা তুলে ধরে মুনেন্দ্র লিখেছেন, ‘‘লকডাউনে মিল বন্ধ থাকলেও বিদ্যুৎ বিল বেড়েই চলেছে। আমার তিনটে মোষের মধ্যে একটি তড়িদাহত হয়ে মারা যায়। আর দুটো চুরি হয়ে যায়। প্রবল বর্ষণে যা চাষ করেছিলাম তাও নষ্ট হয়ে যায়। একমাস আগে আমি বিদ্যুৎ দপ্তরে বিল বাবদ ৩৫ হাজার টাকা জমা করেছিলাম। আর সময়সীমার মধ্যে বকেয়া বিল শোধ করতে না পারার জন্য সর্বসমক্ষে আমাকে অপমান করার পাশাপাশি আমার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়।’’ স্পষ্ট করে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে উদ্দেশ্য করে লেখা চিঠিতে তিনি অভিযোগ করে বলেছেন, ‘‘কৃষক এবং গরিবদের জন্য প্রকল্পগুলি দুর্নীতির বেড়াজাল পেরিয়ে আদৌ নিচুস্তরে নামছে কিনা, তা আপনার খতিয়ে দেখা উচিত। সব প্রকল্পই খাতায়কলমে থাকে।’’

পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। বিষয়টি নিয়ে যাতে বেশি প্রতিবাদ তৈরি না হয় তাই ইতিমধ্যে জেলাশাস শীলেন্দ্র সিং মুনেন্দ্রের নিকট আত্মীয়কে তাত্ক্ষণিক আর্থিক সহায়তা হিসাবে ২৫০০০ টাকা ঘোষণা করেছেন। এটি মধ্যপ্রদেশে বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলে কৃষক আত্মহত্যার চতুর্থ ঘটনা। এর আগে দুজন কৃষক পান্না জেলায় আত্মহত্যা করেছিলেন ঋণের দায়ে, অপর একজন সাগর জেলায় আত্মহত্যা করেছিলেন একই কারণে কৃষক আত্মহত্যার মিছিল বেড়েই চলেছে দেশজুড়ে।

বস্তুত কেন্দ্রীয় সরকার বড় বড় শিল্পপতিদের ঋণ ও বকেয়া বিদ্যুৎ বিলে ছাড় দিলেও কৃষকদের বিল ছাড় বা ঋণ ছাড়ের কথা ভাবে না। সারা দেশের কৃষক আজ কেন্দ্র সরকারের নয়া কৃষি বিল প্রত্যাহারের দাবিতে সামিল। মাসাধিক কাল ধরে কৃষকদের প্রতিবাদ, ধর্না চলছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা কৃষকরা অবস্থান করছেন দিল্লির সীমান্ত লাগোয়া সমস্ত অংশে। কেন্দ্র সরকার কৃষকদের কথা শুনছে না। আর কত কৃষক “মরলে পরে মানবে তুমি শেষে” – কেন্দ্র সরকারের কাছে যেন এই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে গেলেন মধ্যপ্রদেশের আত্মঘাতী কৃষক।

মধ্যপ্রদেশের আত্মঘাতী কৃষকের সুইসাইড নোট।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
No Thoughts on মধ্যপ্রদেশে কৃষকের আত্মহত্যা, প্রধানমন্ত্রী মোদীর উদ্দেশ্যে লিখে গেছেন ‘সুইসাইড নোট’

Leave A Comment