উত্তর সম্পাদকীয়: নয়া কৃষি আইন ও কেন্দ্র সরকারের অস্বচ্ছতা

আজকের খবর কৃষক আন্দোলন বিশেষ খবর

Last Updated on 8 months by admin

ইনসাফ আলী

 

নীতি আয়োগে “ভারতের কৃষিক্ষেত্রের রূপান্তর” সংক্রান্ত একটা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি আছে। বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের নিয়ে গঠিত সেই কমিটি তাদের সর্বশেষ সভা করেছিল ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। এক বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও সেই সভার রিপোর্ট এখনও জনসমক্ষে আসেনি। যদিও এই সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভারতের কৃষিক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নানা গাঠনিক পরিবর্তন সম্পর্কে প্রস্তাব পেশ করা।

সম্প্রতি গত ১৩ ই জানুয়ারি তথ্যের অধিকার আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী অঞ্জলী ভরদ্বাজ তথ্যের অধিকার আইনে সেই সভার বিস্তারিত কার্যবিবরণী, সিদ্ধান্তসমূহ ও প্রস্তাবনা জানতে চেয়ে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই আবেদন খারিজ করা হয়েছে এই মর্মে যে ওই সভার রিপোর্ট ও প্রস্তাব ইত্যাদি এখনও নীতি আয়োগের গভর্নিং কাউন্সিলেই পেশ করা হয়নি। কেন্দ্র নতুন কৃষি আইন প্রণয়ন করার সময় নীতি আয়োগের এই প্যানেলকেই প্রমাণ হিসেবে দেখিয়েছিল যে, এই আইন প্রণয়নের সময় এই আইন বিষয়ে গুরুত্বযুক্ত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সাথে পরামর্শ করা হয়েছিল। যদিও পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং জানিয়েছেন যে ওই প্যানেলের সভায় কখনোই নতুন কৃষি আইন নিয়ে কোনোরকম প্রস্তাবনার আলোচনাই হয়নি।

২০১৯ সালের জুন মাসে নীতি আয়োগের গভর্নিং কাউন্সিলের পঞ্চম সভা চলাকালীন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই কমিটি গঠনের কথা ঘোষণা করেন। এই কমিটির প্রধান করা হয় মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিসকে। অন্যান্য নানা রাজ্যের পাশাপাশি সেই প্যানেলে ছিলেন কর্ণাটক, হরিয়ানা, অরুণাচল প্রদেশ, গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীরা। এদের পাশাপাশি কমিটিতে ছিলেন কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী নরেন্দ্র সিং তোমর। কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল যাতে এটি কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ ও চুক্তিচাষ বিষয়ে প্রস্তাবিত দুই আইনকে বিভিন্ন রাজ্যে কী কী উপায়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্রহণ করা যায় সেই বিষয়ে, এবং জরুরি পণ্য আইন ১৯৫৫ বা এসেনশিয়াল কমোডিটি অ্যাক্ট এর সংশোধন করার বিষয়ে প্রস্তাব পেশ করতে পারে, ও সব মিলিয়ে রিপোর্ট পেশ করে পারে। রিপোর্ট দেওয়ার জন্য কমিটিকে সময় দেওয়া হয়েছিল ২ মাস।

অঞ্জলি ভরদ্বাজকে দেওয়া উত্তর থেকে জানা যাচ্ছে যে ২০১৯ এ এই প্যানেল মোট তিনটে সভা করেছিল – জুলাই, আগস্ট আর সেপ্টেম্বর মাসে, এবং তার রিপোর্টও পেশ করেছিল। অথচ তাঁর আরটিআই আবেদনের উত্তরে এই রিপোর্ট দিতে অস্বীকার করে নীতি আয়োগ। তারা জানায়, “যখন নীতি আয়োগের গভর্নিং কাউন্সিলের ষষ্ঠ বৈঠক হবে, তখন সেখানে আগে এই রিপোর্ট পেশ করা হবে বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের রাজ্যপালদের মূল্যায়নের জন্য। কাজেই এই মুহূর্তে এই রিপোর্ট প্রকাশ করা সম্ভব নয়”। নীতি আয়োগ এমনকি সেই সভাগুলোতে কে কে উপস্থিত ছিলেন, এবং সেই সভাগুলোর মিনিটস এর প্রতিলিপি দিতেও অস্বীকার করে। তাদের বক্তব্য, এগুলো সবই ওই কমিটির রিপোর্টের অংশ, তাই এই পর্যায়ে জানানো যাবে না।

নীতি আয়োগের গভর্নিং কাউন্সিলের সভা ২০১৯ এর জুন মাসের পরে আর হয়নি। ২০২০ সালের জুন মাসে কেন্দ্র সরকার লোকসভায় কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ, চুক্তিচাষ ও ১৯৫৫ সালের জরুরি পণ্য আইন সংশোধন সংক্রান্ত অর্ডিন্যান্স পেশ করে, এবং সেপ্টেম্বর মাসে এই তিনটে অর্ডিন্যান্সকে বিল আকারে পেশ করে। লোকসভায় জরুরি পণ্য আইনের সংশোধন পেশ করার সময়ে রাখা বক্তব্যে মন্ত্রী রাওসাহেব দাভে দাবি করেন যে এগুলো সবই নীতি আয়োগের প্যানেলে আগে আলোচিত হয়েছে এবং ওই প্যানেলে থাকা মুকয়মন্ত্রীরা এগুলোকে লোকসভায় পেশ করার ক্ষেত্রে সর্বসম্মতিক্রমে মত দিয়েছেন। পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং খুব জোরের সাথে এই দাবিকে নস্যাৎ করে বলেন, “কৃষক বিরোধী এমন কোনো অর্ডিন্যান্সকে পেশ করার ক্ষেত্রে ওই প্যানেল কোনোভাবেই কোনো প্রস্তাব দেয়নি“।

অঞ্জলি ভরদ্বাজের কথায়, “এইসব থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে এই অর্ডিন্যান্সগুলোকে তৈরি করা এবং সংসদে পাস করানো হয়েছিল এই বিষয়ক নীতি আয়োগের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মুখ্যমন্ত্রীদের প্যানেলের রিপোর্ট ছাড়াই এবং এই অর্ডিন্যান্সগুলোর বিষয়বস্তুকে জনসাধারণের গোচরে না এনেই। এইভাবে তথ্য দিতে অস্বীকার করা আসলে তথ্যের অধিকার আইনের পরিপন্থী। ওই কমিটির কার্যকলাপের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব খুবই দুর্ভাগ্যজনক, কারণ এই অর্ডিন্যান্স ও আইনের বিষয়ে মতামতের আদানপ্রদান আসলে জনস্বার্থে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়“।

ওদিকে কেন্দ্রের কৃষিমন্ত্রক আইন প্রণয়নের পূর্বে সরকার যা যা আলোচনা ও পরামর্শ করেছে, সেই বিষয়ে অঞ্জলি ভরদ্বাজের করা আরটিআই আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। কারণ হিসেবে তারা দেখিয়েছে যে, গোটা বিষয়টা আদালতের বিচারাধীন।

[সাথে ছবি DD News থেকে প্রাপ্ত]

[সংবাদটি প্রথম প্রকাশিত হয় দ্য হিন্দু সংবাদপত্রে]

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
No Thoughts on উত্তর সম্পাদকীয়: নয়া কৃষি আইন ও কেন্দ্র সরকারের অস্বচ্ছতা

Leave A Comment