রাজ্যের নতুন কোভিড-১৯ বিধি ও আসন্ন বিপদ

আজকের খবর পর্যালোচনা বিশেষ খবর মতামত

Last Updated on 3 months by admin

রাজ্যের নতুন কোভিড-১৯ বিধি ও আসন্ন বিপদ

সুমন্ত নারায়ণ

আজ, ১৪/০৬/২০২১ তারিখে প্রতিবারের মতোই মুখ্যসচিবের হাত দিয়ে আগামীদিনগুলোর জন্য কোভিড-১৯ বিধিনিষেধের একটি আদেশনামা প্রকাশিত হয় (আদেশ নং – 753-ISS/2M-22/2020)। এতক্ষণে সবাই জেনে গেছেন যে এই বিধিনিষেধ ১৫ই জুন থেকে চালু হবে এবং বলবৎ থাকবে ৩০ শে জুন বিকেল ৬ টা পর্যন্ত। ইতিমধ্যে মোটামুটি একটা তালিকা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে যে এই সময়পর্বে কী কী করা যাবে আর কী কী করা যাবে না। প্রায় প্রতিটা বিধিনিষেধের এমন আদেশনামাই প্রবল বিতর্কিত এবং সেগুলো আসলে একশ্রেণির মানুষের জীবনজীবিকার ক্ষেত্রে সর্বনাশ ডেকে আনছে যে, সে বিষয়ে আমরা সকলেই একমত। এবং এইভাবে আসলে কোভিড-১৯ এর মতো একটা রোগকে ছড়িয়ে পড়া থেকে আটকানো যায় কিনা, সে নিয়ে সারা পৃথিবীতেই নানা বিতর্ক আছে। সেইসব বিষয়ে ঢুকছি না। এই আলোচনার বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা – এই বিষয় নিয়ে অল্পস্বল্প আলোচনা হলেও সামগ্রিকভাবে এই নিয়ে আসলে অনেক আলোচনা হওয়া দরকার। সেই কারণেই এই লেখার অবতারণা।

প্রথমত আমাদের বুঝে নেওয়া প্রয়োজন যে এই বিষয়ের সমস্ত আদেশনামা আসলে তৈরি হচ্ছে দুটি আইনকে ভিত্তি করে; এক) Disaster Management Act, 2005 এবং দুই) West Bengal Epidemic Disease, Covid-19 Regulation, 2020। প্রথমটি কেন্দ্রীয় আইন, দ্বিতিয়টি রাজ্যের আইন। এই দুটি আইনের বিষয়ে আলোকপাত করার জন্য এই লেখা নয়, কাজেই ওই প্রসঙ্গে যাচ্ছি না। শুধু দেখতে চাইব, এই দুটি আইনকে ভিত্তি করে ঠিক কোন বিপদের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে আমাদের – যার একটা আভাস আমরা পাচ্ছি আজকের ওই আদেশনামায়।

এই আদেশনামার মূল আপত্তিকর জায়গাগুলো হল যথাক্রমে ১১, ১২ ও ১৯ নং অনুচ্ছেদ। বোঝার সুবিধার জন্য তিনটিকেই অবিকল তুলে আনা হল আদেশনামা থেকে:

অনুচ্ছেদ ১১

“All production units and industries including IT&ITES sector may function with 50% of total strength in each shift subject to vaccination of employees, wearing of masks and maintenance of physical distancing

অনুচ্ছেদ ১২

“Parks may remain open for morning walks, physical exercise etc during 6AM to 9AM and only vaccinated people shall be allowed.”

অনুচ্ছেদ ১৯

“Indoor/outdoor shooting and associated activities related to TV programmes and cinema may resume with not more than 50 persons per unit at a time, subject to vaccination, wearing of masks, maintenance of physical distancing.”

 

 

প্রতিটা অনুচ্ছেদের শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় অংশগুলোই তুলে আনা হল। তিনটের মধ্যেই একটা বিষয় উল্লেখযোগ্যভাবে উপস্থিত; সেটা হল টিকাকরণ। শুধু তাই নয়। বিষয়টি বাধ্যতামূলকভাবে টিকাকরণ। অর্থাৎ টিকা না নেওয়া থাকলে কিছু কিছু স্থানে প্রবেশের অধিকার থাকবে না, এমনকি নিজের কর্মস্থলেও নয়! সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গ সরকারই প্রথম টিকাকরণের বিষয়টা বাধ্যতামূলকভাবে পেশ করল। আর বিপদটা এখানেই। সারা পৃথিবীতে কোনো দেশেই কিন্তু কোনো টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। কেউ চাইলে নিতে পারেন, কেউ না-ও পারেন। এমনকি কোভিড-১৯ এর টিকাও বাধ্যতামূলক নয়। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাও তাই বলছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভারতেই এই টিকা বাধ্যতামূলক নয়। কেন্দ্রের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের কোভিড-১৯ টিকা সম্পর্কিত প্রশ্নোত্তরে স্পষ্ট করে বলা আছে যে এই টিকাগ্রহণ ঐচ্ছিক, বাধ্যতামূলক নয়। তবে সেখানে পরামর্শ দেওয়া আছে যাতে মানুষ এই টিকা নেন। পরামর্শ কখনোই বাধ্যতামূলক হয় না। কিন্তু আজকের নবান্ন থেকে প্রকাশিত ওই আদেশনামায় টিকাগ্রহণকে বাধ্যতামূলক পর্যায়ে ফেলা হয়েছে। ঠিক এরকমই একটা আদেশনামাগত ২২ শে এপ্রিল আহমেদাবাদের গুজরাত টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটি পেশ করে জানায় যে, ২০২১ সালের শীতকালীন পরীক্ষার ফর্ম ভর্তি করার আগে ১৮ বছর বয়সী সমস্ত ছাত্র-ছাত্রীকে কোভিড-১৯ টিকা নিতে হবে, নইলে তারা পরীক্ষায় বসতে পারবে না। এই সবগুলোই একাধারে আমাদের দেশের সংবিধান ও চালু সমস্ত আইনের পরিপন্থী এবং চূড়ান্ত অনৈতিকও বটে। কিভাবে? সেটাই দেখা যাক।

প্রথমত নৈতিকতার প্রসঙ্গে আসি। টিকা নিয়ে কারো ক্ষতি বা মৃত্যু হলে তিনি কিভাবে ক্ষতিপূরণ পাবেন, সেই বিষয়ে তথ্যের অধিকার আইনে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রকের কাছে জবাব চাওয়া হলে তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, যেহেতু এই টিকা ঐচ্ছিক, বাধ্যতামূলক নয়, তাই এর থেকে হওয়া কোনো ক্ষতির কোনো ক্ষতিপূরণের প্রশ্নই নেই। যেখানে কেন্দ্র সরকার বলছে এই টিকা ঐচ্ছিক, কাজেই কোনো রাজ্য সরকারের পক্ষে এটাকে বাধ্যতামূলক ঘোষণা করা সম্ভবই নয়। করলে সেটা হবে বেআইনি ও অনৈতিক।

টিকাগ্রহণকে বাধ্যতামূলক করার অর্থ সরকার এটা ধরে নিচ্ছে যে সবার পক্ষে সমানভাবে টিকা নেওয়া সম্ভব, অর্থাৎ টিকার পর্যাপ্ত যোগান আছে এবং সমাজে সকল মানুষের পক্ষে সেই টিকাগ্রহণের সমান সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বাস্তব কি সেই কথা বলছে? একে তো সরকারি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা অন্য কোনো সরকারি মাধ্যমে টিকা পাওয়া এখনো প্রায় অসম্ভব ও বিপুল কষ্টসাধ্য একটা কাজ। আর বেসরকারি হাসপাতাল বা নার্সিং হোম এমনকি প্যাথোলজিক্যাল সেন্টারেও টিকার যা দাম, তাতে সকল স্তরের মানুষের পক্ষে সমানভাবে সেই দাম দিয়ে দুই ডোজ টিকা নেওয়া খুবই কঠিন। দেশের নানা রাজ্যের সরকারই কিন্তু ১ মে থেকে ১৮+ মানুষের টিকাকরণ শুরু করতে পারেনি টিকার অভাবে। কাজেই টিকাগ্রহণকে বাধ্যতামূলক করার অর্থ সেইসব মানুষকে শুরুতেই এই কর্মসূচি থেকে বাতিল করে দেওয়া যারা নিজেদের কোনোরকম ত্রুটিবিচ্যুতি ছাড়াই টিকা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন।

এরপর আসে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়–তা হল কোনো ব্যক্তির সম্মতি ও স্বাধিকারের প্রশ্ন। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ব্যবহারিক শাস্ত্র অনুযায়ী এই সম্মতি, (বিশেষ করে চিকিৎসার পদ্ধতি ও প্রকরণ সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত হবার পর সেই বিষয়ে সম্মতি) ও ব্যক্তির স্ব-অধিকারের প্রশ্নগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই শর্ত পূরণ হলে তবেই কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসাপদ্ধতির দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব। এবার এই “সম্যকভাবে অবহিত হবার পর সম্মতি” কেউ তখনই দিতে পারেন, যখন তাঁর কাছে বিষয়টির সমস্ত ভালোমন্দ দিকের একটা পরিষ্কার হদিস থাকে। যদি না থাকে এবং তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হয়, তবে সেটা আর সম্যক অবহিত-সম্মতি থাকে না। সেটা জোর করে চাপানো একটা সিদ্ধান্ত হয়ে যায়, যে সিদ্ধান্ত তিনি নেননি, তাঁকে নিতে বাধ্য করা হয়েছে । এখনো পর্যন্ত কোনো সরকারের তরফে কোভিড-১৯ টিকার কুফল বা অপ্রত্যাশিত ক্রিয়া বা প্রতিক্রিয়া নিয়ে পরিষ্কার করে কিছুই কোথাও বলা হয়নি। ফলে এই সম্মতি ও স্বাধিকারের প্রশ্নদুটো চূড়ান্তভাবে অবহেলিত হচ্ছে যে শুধু তাই নয় –এগুলো জানাটা যে আসলেব্যক্তির অধিকার, সেটাও অস্বীকার করা হচ্ছে। এবং এর মধ্যে দিয়ে কোনো ব্যক্তির গোপনীয়তার অধিকারও হরণ করা হচ্ছে। এই সবকটা অধিকারই আমাদের সংবিধানের ২১ নং অনুচ্ছেদের অন্তর্গত, যার মূল শিরোনাম হল “Right to Life” বা জীবনের অধিকার। এই ২১ নং অনুচ্ছেদের দীর্ঘ ব্যাখ্যা রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের নানা রায়ে। সর্বোচ্চ স্তরের সরকারি আধিকারিকরা সেগুলো জানেন না, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। বর্তমানে যেভাবে এই কোভিড-১৯ রোগের বিস্তার ঘটছে এবং যে হারে আমাদের দেশে টিকারণ চলছে, তাতে হিসাব করে দেখা যাচ্ছে যে দেশের সমস্ত মানুষকে যদি টিকা দিতে হয় তাহলে মোটামুটি ৪ বছর মতো লাগবে।এই বছরের শেষে মোটামুটি ৩০ শতাংশ মানুষের টিকাকরণ হতে পারে – এরকম একটা হিসাবও পাওয়া যাচ্ছে। তাছাড়া এই টিকা কতদিন কাজ করবে, বা এই টিকা নতুন নতুন করোনা ভাইরাসের মিউট্যান্টের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকরি, এই সবকিছুর সঠিক কোনো উত্তর নেই। এগুলো জানতে চাওয়া শুধু প্রয়োজনীয়ই নয়, সংবিধানের ১৯ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তা যেকোনো ব্যক্তি-মানুষের অধিকারও বটে। এই সবকিছুকে অস্বীকার করে জোর করে টিকা চাপিয়ে দেওয়া তাই আদতে সব আইনকানুন ও সংবিধানকে অস্বীকার করারই সমান।

এই প্রসঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উল্লেখ না করলেই নয়। সেটা হল রোগ (disease) ও সংক্রমণ (infection)। দুটো যে এক নয়, টিকাগ্রহণের এই বাধ্যতামূলক সরকারি আদেশনামা থেকে তা বোঝার উপায় নেই। আসলে দুটো বিষয়কে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। রোগ হল যখন কোনো জীবাণু আমাদের দেহের কোষকে আক্রমণ করে ও আমাদের দেহে সেই সংক্রান্ত উপসর্গ ফুটে ওঠে। আর সংক্রমণ হল যখন রোগসৃষ্টিকারী কোনো জীবাণু আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। প্রথমেই এটা বুঝে নেওয়া ভাল যে এই টিকাগুলো কিন্তু বানানো হয়েছে রোগের বিস্তার ঠেকানোর জন্য নয়, রোগ দেহে প্রবেশ করলে তার ভয়াবহতা যাতে বেশি না হয় সেইজন্য। অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তিমানুষের নিজের সুরক্ষার জন্য। কোনো টিকার ক্ষেত্রেই এখনো এই সিদ্ধান্তে আসা যায়নি যে জনসংখ্যার বিশাল অংশকে বেশি বেশি করে টিকাকরণ করলেই এই রোগের বিরুদ্ধে সামগ্রিক অনাক্রম্যতা তৈরি হবে। কারণ সেই সংক্রান্ত পরীক্ষাই হয়নি।

কাজেই এই অবস্থায় এই টিকাগ্রহণ সম্পূর্র্ণভাবেই ব্যক্তিগত পছন্দের স্তরে রাখা দরকারি। কারণ সবটাই এখনো পরীক্ষামূলক স্তরে রয়েছে। এইভাবে টিকাগ্রহণকে বাধ্যতামূলক করে দেওয়ার অর্থ কোনো ব্যক্তির সংবিধান-স্বীকৃত অধিকারকে কেড়ে নেওয়া। এর বিরুদ্ধে সামগ্রিক প্রতিবাদ জরুরি।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
One Thought on রাজ্যের নতুন কোভিড-১৯ বিধি ও আসন্ন বিপদ
    গার্গী হাজরা
    15 Jun 2021
    10:09am

    সম্পৃর্ণ একমত।

    0
    0

Leave A Comment