শুধু তিন কৃষি আইন বাতিল নয় – এখনও অন্যান্য দাবিগুলি আদায় বাকি আছে কৃষকদের – বাকি আছে গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই

আজকের খবর কৃষক আন্দোলন বিশেষ খবর

Last Updated on 1 week by admin

নিজস্ব প্রতিবেদন, ২১ নভেম্বর, ২০২১ :

গত ১৯ নভেম্বর জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে গিয়ে অবশেষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি ঘোষণা করেলেন যে আসন্ন শীতকালীন অধিবেশনে ক্ষতিকারক তিন কৃষি বিল বাতিল করা হবে।  গত বছর ২৬শে নভেম্বর এই আইনের বিরুদ্ধে কৃষক আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সেই থেকে আন্দোলন ক্রমাগত শক্তিশালী হয়েছে।

বুঝতে অসুবিধা নেই যে যারা ক্ষমতায় আছে তারা কৃষকের বিক্ষোভে কেঁপে উঠেছে।  আমরা মহাপঞ্চায়েত এবং ভারত বন্ধে যা দেখেছি তার মতো জাট-দলিত-মুসলিম জোট এর আগে কখনও দেখা যায়নি।  বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন নিয়মিত কৃষক-আন্দোলনকারীদের সমর্থন করে চলেছে।  নারীরাও বিপুল সংখ্যায় আন্দোলনের সমর্থনে মাঠে নেমেছেন।  দক্ষিণের রাজ্যগুলির কৃষকরা উত্তরের রাজ্যগুলির সাথে হাত মিলিয়েছেন।  সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল যে, ভারতের খাদ্য স্বাধীনতা যারা দায়িত্বের সঙ্গে বজায় রাখেন তাদের সুষ্ঠ জীবনযাপনের অধিকারের লড়াইতে আমরা বড় কৃষক এবং ক্ষেতমজুরদের একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করতে দেখতে পেয়েছি।

যদিও এই কৃষি আইনের প্রত্যাহার কৃষকদের জন্য একটি বিশাল জয়, বলাই বাহুল্য লড়াই এখনও শেষ হয়নি।  বিদ্যুৎ (সংশোধনী) বিল কেন্দ্রীয় সরকারকে প্রত্যাহার করতে হবে।  লখিমপুর খেরিতে  অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। এদেশে কৃষকদের দুর্দশার উন্নতি করতে হবে। এর সঙ্গে কৃষকরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে কৃষি ক্ষেত্রে কর্পোরেট দখল, এমএসপি এর অপসারণ এবং ফসলের সরকারী ক্রয় বন্ধ করার বিরুদ্ধে তারা সদা সতর্ক থাকবেন ।

এই সমস্যাগুলি শুধুমাত্র কৃষকদের জীবিকার জন্য নয়, ভারতের প্রত্যেকের জন্য উদ্বেগের বিষয়। অর্থনীতিবিদ প্রভাত পট্টনায়েক ব্যাখ্যা করেছেন, কর্পোরেট জমি দখলের ফলে দেশে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা দেখা দেবে।  প্রথম বিশ্বের দেশগুলিতে খাদ্যশস্য উদ্বৃত্ত রয়েছে, যা তারা ভারতের মতন দক্ষিণের দেশগুলিতে বিক্রি করতে চায়।  এর পরিবর্তে তারা মৌসুমী ফসল বা গ্রীষ্মমন্ডলীয় ফসল কিনতে চায়, যা ওই দেশগুলিতে জন্মায় না।  বেসরকারি সংসগস্থ কৃষি ক্ষেত্রে প্রবেশ করলে তারা খুব তাড়াতাড়ি এই সত্যটা বুঝবে যে, যদি তারা মুষ্টিমেয় দেশ, যারা বিশ্ব বাজারকে নিজেদের দখলে রেখেছে, তাদের প্রয়োজনীয়তা মেনে চলে, তবে তারা অনেক অনেক বেশি মুনাফা করবে। অর্থাৎ তারা খাদ্যশস্যের বদলে এই ধরণের ফসল উৎপাদনের দিকে বেশি নজর দেবে। অর্থনৈতিকভাবে, অনেকেই যুক্তি দেখান যে এতে কোনো অসুবিধা হবে না কারণ এই রপ্তানির অর্থ দিয়ে দেশে খাদ্যশস্য সহজেই  আমদানি করা যাবে।  কিন্তু ভূ-রাজনৈতিকভাবে এটি ভারতকে অনিরাপদ করে তোলে যদি না তারা প্রথম বিশ্বের দেশগুলির সমস্ত কথা না শোনে।

এ ছাড়াও, যদি ভারতের মতো জনবহুল দেশ নিজেদের খাদ্যশস্যের চাহিদা মেটাতে বিশ্ব খাদ্যশস্যের বাজারে ক্রেতা হয়ে এসে দাঁড়ায়, সারা বিশ্বে খাদ্যশস্যের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার ফলে খাদ্যের দাম অবশ্যই বেড়ে যাবে। পট্টনায়ক যুক্তি দিয়েছেন এর ফলে ভারতের মুষ্টিমেয় অপেক্ষাকৃত ধনী ক্রেতাদেরও খাদ্যশস্য কেনার সামর্থ চ্যালেঞ্জের মুখে এসে দাঁড়াবে।  অর্থাৎ বিকল্প খাদ্যের অত্যধিক মুনাফা দেশের খাদ্যের দাম বাড়াবে বই কমাবে না. আরও চিন্তার এই ধরণের  বিকল্প খাদ্য উৎপাদনে অনেক কম শ্রমের প্রয়োজন হয়, অর্থাৎ বহু কৃষি শ্রমিক তাদের চাকরি হারাতে পারে। এর ফলে তাদের ক্রয় ক্ষমতাও  কমবে, যা দেশের অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকারক।

একইভাবে, খাদ্যশস্যের উপর এম.এস.পি. শুধুমাত্র কৃষকদের আয়ের নিরাপত্তাই দেয় না, বরং খাদ্যশস্যের উৎকর্ষতা, খাদ্য চাহিদা মেটানো এবং ভারতকে খাদ্য নিরাপদ রাখার জন্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করে।  যদিও কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে এমএসপি থাকবে, বাস্তব বলছে অন্য কথা।  এ বছরই অনেক রাজ্যে সরকারি ধান সংগ্রহে গাফিলতি দেখা গেছে।  বেশ কয়েকটি রাজ্যে, পর্যাপ্ত ফসল সংগ্রহ কেন্দ্র খোলা হয়নি।  শুধুমাত্র উত্তরপ্রদেশেই যখন ৬৪২২২৪ জন কৃষক ধান বিক্রির সুবিধা পাওয়ার জন্যে নাম লেখালেও, এখনও পর্যন্ত মাত্র ৭১৩৫২ জন কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা হয়েছে।

ভারত সম্পর্কে আরেকটি মজার তথ্য হল যে খাদ্য শস্যের বাজারের হার তাদের MSP থেকে বিয়োগ করা হয় না।  যখন এমএসপি বাড়ানো হয়, তখন খাদ্য ফসলের বাজারের হারও বেড়ে যায়, এমনকি যখন চাহিদা বাড়ে না।  কারণ যারা খাদ্যশস্য কিনতে পারে না তাদের পিডিএসের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়।  যারা খোলা বাজারে খাদ্য ক্রয় করেন তাদের একটি বড় শতাংশ খাদ্যশস্যের মূল্য বৃদ্ধিকে ধরে রাখতে পারে – তাই চাহিদা না বাড়লেও ভারতে কৃষকদের তাদের বাজার মূল্য MSP-এর সাথে সম্পর্কিত করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করার ক্ষমতা রয়েছে।

ভিন্নমত গণতন্ত্রে যে কতটা জরুরী, কৃষক প্রতিবাদ তার একটি অসামান্য উদাহরণ।  আমরা আশা করি প্রতিটি নাগরিক আমাদের কৃষকদের পাশে দাঁড়াবে কারণ বাকি দাবি ও জীবনযাপনের নিরাপত্তার জন্য আন্দোলন  অব্যাহত থাকবে।

Please follow and like us:
error17
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on শুধু তিন কৃষি আইন বাতিল নয় – এখনও অন্যান্য দাবিগুলি আদায় বাকি আছে কৃষকদের – বাকি আছে গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই

Leave A Comment