কোভিড পরিস্থিতিতে লকডাউনের ফলে, সল্প-আয়ের পরিবারগুলির মহিলারা বাধ্য হচ্ছেন কম খাবার গ্রহণ করতে

আজকের খবর পর্যালোচনা বিশেষ খবর

Last Updated on 2 months by admin

জগন্নাথ রায়ের প্রতিবেদন, ২৬ জুলাই, ২০২১ :

কোভিড কালে ভারতে স্বল্প-আয়ের পরিবারের মহিলারা পুরুষদের তুলনায় বেশি করে চাকরি হারিয়ে ফেলেছেন, তাদের খাদ্য গ্রহণ কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিশ্রাম নেওয়ার সময় কমেছে; কিন্তু বিনা বেতনের পরিচর্যার কাজ বেড়ে গেছে – একটি সংস্থার এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

ডালবার্গ (Dalberg) নামের একটি আন্তর্জাতিক স্তরের বেসরকারি পরামর্শদাতা সংস্থার সমীক্ষায় ধরা পড়েছে যে ভারতে কোভিড পরিস্থিতিতে লকডাউনের ফলে, সল্প-আয়ের পরিবারগুলির মহিলারা বাধ্য হয়েছেন আগের তুলনায় কম খাবার গ্রহণ করতে। এর সঙ্গে পরিবারগুলোতে বিনা-মজুরির পারিবারিক পরিচর্যার কাজে অতিরিক্ত শ্রম দেওয়াতে মহিলারা কোনো অবসর পাচ্ছেন না – বিশ্রাম নেওয়ার সময়টাকেও ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন।

প্রায় ১৫০০০ মহিলার ওপর করা ঐ সমীক্ষায় এটাও প্রকাশিত হয়েছে যে, কোভিড-১৯ প্রথম ঢেউয়ের পরে নিজের নিজের কর্মক্ষেত্রে তাদের শ্রমশক্তিকে পুনঃনিয়োজিত করতে ঐ মহিলাদের দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়েছে।

সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে যে গত মার্চ-অক্টোবর, ২০২০ এই সময়ের মধ্যে, প্রতি ১০ জন মহিলার মধ্যে ১ জনের পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার মেলেনি।

ঐ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “ আনুমানিক প্রায় ৩.২ কোটি মহিলা জানিয়েছেন যে, তারা পরিবারে অপর্যাপ্ত খাবারের জন্য উদ্বেগের  মধ্যে দিন যাপন করছেন (যদিও এখনো খাদ্যগ্রহণ কম করার অবস্থা তৈরী হয় নি)। ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে বিরাজমান মহামারী-পূর্ব দুর্বল পুষ্টির কারণে বর্তমানে মহিলাদের মধ্যে পুষ্টির অবস্থা আরো খারাপ দিকে চলে যেতে পারে।”

অবৈতনিক গৃহপরিচর্যার কাজ যত বেড়েছে,  মহিলাদের বিশ্রাম নেওয়ার সময় তত পরিমাণে কমেছে

মহামারীর আগে মহিলারা তাদের পরিবারের পুরুষদের শুধুমাত্র ২৪% কাজ নিজেরা করে দিতেন কিন্তু ঐ পুরুষদের কাজ চলে যাওয়ার পরে এখন তাদের ২৮% কাজ বেড়ে গেছে। যদিও কাজ হারানো ঐ পুরুষদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ এখনও তাদের বেতনপ্রাপ্ত আগের কাজ ফিরে পাননি।

৩৭ শতাংশ পুরুষের তুলনায় নারীদের মধ্যে প্রায় ৪১ শতাংশের অবৈতনিক গৃহপরিচর্যার কাজের পরিমাণ বেড়েছে। অন্যদিকে মহামারীর সময়ে মাত্র ১৮ শতাংশ পুরুষের তুলনায় প্রায় ৩৭ শতাংশ নারীর বিশ্রাম নেওয়ার সময় কমেছে।

“আমরা মনে করি যে মহিলাদের উপর বৃদ্ধি পাওয়া পরিবারের এই বোঝা আগামীদিনে নির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্রে তাদের কর্মশক্তির পুনঃনিয়োগ করার ক্ষেত্রে খুবই কঠিন হয়ে উঠবে। এর ফলে যে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হবে তা অতিমারি পর্ব মিটে যাওয়ার পরেও দীর্ঘ সময় ধরে থেকে যাবে।”

ডালবার্গ রিপোর্ট   

MGNREGAGA-এর মধ্যে তালিকাভুক্ত মেয়েদের প্রায় ৩০ শতাংশ তাদের কাজ হারিয়েছে্ন। এই প্যান্ডামিকের প্রথম ঢেউয়ের পরে কাজ হারিয়েছেন এমন প্রায় ৪৩% মহিলা এখনও তাদের কাজ ফিরে পাননি।

মেয়েদের গর্ভনিরোধক ও ঋতুস্রাবের কারণে ব্যবহার করা দ্রব্যগুলোর ঘাটতি বেড়েছে

গবেষণায় দেখা গেছে, গত বছর কোভিড -১৯ মহামারীর প্রথম ঢেউ-এর পরে তারা আবার হারানো কাজ ফিরে পাচ্ছেন না বা ফিরে পেতে অনেক সময় চলে যাচ্ছে।মহামারীর সময় জনস্বাস্থ্যের কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মহিলারাই।

এই সমীক্ষা তীব্র কটাক্ষের সঙ্গে দেখায় যে মেয়েদের মধ্যে প্রায় ১৬% (সংখ্যায় আনুমানিক প্রায় ১.৭ কোটি) যারা অতিমারির আগে মাসিকের প্যাড ব্যবহার করতেন, এই অতিমারির সময় অর্থাৎ ২০২০-র এপ্রিল-নভেম্বর এই সময় পর্বে তাদের কাছে কোনো প্যাডের জোগান ছিলনা বা থাকলেও তা ছিলো খুবই সীমিত। এর প্রাথমিক কারণ লকডাউনের পরে এগুলোর ব্যায় বহন করার মতো ক্ষমতা আর তাদের নেই।

এই সমীক্ষা  অত্যন্ত নিন্দাপূর্নভাবে তুলে ধরে, “যে মহিলারা তাদের রজঃস্রাবের সময় যথাযথ জিনিস ব্যবহার করতে পারেননা এবং যে মহিলারা ঋতুস্রাব জনিত স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন, তাদের প্রজনন নালীর সংক্রমণ (RTIs), মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTIs) এবং জরায়ুর ক্যান্সারের প্রবণতার ঝুঁকি অনেক বেশি পরিমাণে থাকে।”  

সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে জনস্বাস্থ্যের প্রচার কর্মসূচী বিঘ্নিত হওয়ার কারণে বিবাহিতদের মধ্যে প্রায় ৩৩ শতাংশ নারী, প্রথম লকডাউনে গর্ভনিরোধক সামগ্রী ব্যবহার করতে পারেননি।

অতিমারিজনিত লকডাউনে সবথেকে বেশি আক্রমণের শিকার হয়েছেন মুসলিম এবং কর্মসূত্রে বাইরে থাকা নারীরা।  

সমীক্ষায় খুব পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে, যে সল্প-আয়ের পরিবারগুলোর মহিলারা, মুসলিম সহ কাজের সূত্রে বাইরে থাকা মহিলারা এবং একলা থাকা বা বিবাহ বিচ্ছিন্না মহিলারা, এই অতিমারিতে সবথেকে বেশি আক্রমণের শিকার হয়েছেন।

“সল্প-আয়ের পরিবারগুলোর মহিলারা খুব দেরিতে তারা তাদের বেতনপ্রাপ্ত কাজ এবং আয়ের পুনঃরুদ্ধার করতে পেরেছে। খাদ্যবঞ্চনার মাত্রা এবং প্যাডের অপ্রতুলতা এই মহিলাদের মধ্যে সবথেকে বেশি প্রকট ছিলো। উদাহরণ হিসেবে অন্য মহিলাদের তুলনায়, প্রায় ২০ শতাংশের উপর বেশি একলা, স্বামীর থেকে আলাদাভাবে থাকা অথবা বিবাহবিচ্ছিন্না মহিলারা প্যান্ডামিকের সময়ে খুবই সীমিত পরিমাণ খাবার পেয়েছেন বা এই সময়ে তিব্র খাদ্যসংকটে ভুগেছেন। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত বেশি আয়ের পরিবারগুলোর মহিলাদের তুলনায়, মাসে ১০,০০০ এর নীচে আয় করা পরিবারগুলোর মহিলাদের মধ্যে ৩ থেকে ৬  শতাংশের বেশি মহিলারা এই প্যান্ডামিকে অপুষ্টির শিকার হয়েছেন।”    

ডালবার্গ সমীক্ষা

 এই শূন্যতার পূরণ সম্ভব  কিভাবে?

ডালবার্গের সমীক্ষায় এটাও বলা হয়েছে, এদেশের বর্তমান সরকারি পরিকাঠামোর একার পক্ষে এই শূন্যতার পূরণ সম্ভব নয়। মহিলাদের এই সমস্যা থেকে উদ্ধারে সরকারগুলোকে মহিলাদের জন্য অতিরিক্ত সহায়ক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এই সমীক্ষা নীচের বেশকিছু প্রস্তাব তুলে ধরেছে যেমনঃ

  • MGNREGAএর জব কার্ডে মহিলাদের নাম তালিকাভুক্ত করার কাজে সরকারকে আরও বেশি জোর দিতে হবে। মোট শ্রমশক্তি ও মোট শ্রমদিনের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে।
  • পিডিএস বা গণবন্টন ব্যবস্থার মাধ্যমে মহিলাদের পর্যাপ্ত পরিমাণে প্যাড সরবরাহ করতে হবে। ঋতুস্রাবের স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে মহিলাদের সচেতন করতে হবে যাতে তারা এই সময় প্যাডের ব্যবহার বাড়ান।
  • পরিবার পরিকল্পনার উদ্যোগকে শক্তিশালী করতে গর্ভনিরোধক দ্রব্যের সরবরাহ এবং ব্যবহার বাড়াতে হবে।
  • একলা, স্বামীর থেকে আলাদাভাবে থাকা, বিবাহবিচ্ছিন্না এবং স্বামীহারা মহিলাদের এক জাতি, এক রেশন কার্ডের (ONORC) আওতায় আনার কাজকে প্রসারিত করতে হবে।

 

সংবাদ সূত্র : The Quint, Covid Work – Dalberg, The Indian Express ও অন্যান্য

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on কোভিড পরিস্থিতিতে লকডাউনের ফলে, সল্প-আয়ের পরিবারগুলির মহিলারা বাধ্য হচ্ছেন কম খাবার গ্রহণ করতে

Leave A Comment