অর্থনীতির অতিমারি

অর্থনীতি আজকের খবর পর্যালোচনা বিশেষ খবর মতামত

Last Updated on 1 month by admin

অর্থনীতির অতিমারি

প্রণব কান্তি বসু

সমস্ত অর্থনৈতিক যুক্তির বিরুদ্ধে গিয়ে অতিমারি মোকাবিলায় মোদী সরকার সাধারণের ক্রয় ক্ষমতা না বাড়িয়ে কর্পোরেট পুঁজি, বিশেষ করে তার দোসর পুঁজির কলেবর বৃদ্ধির সুবিধা করে দিয়েছে।

মোদী সরকার তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে অতিমারি উদ্ভূত অর্থনৈতিক সঙ্কটের মোকাবিলা করেছে। প্রথমত, সরকার একাধিক জনমোহিনী প্রকল্প উদ্ঘাটন করেছে, যা বেশীর ভাগটাই খাতায় কলমে থেকে গেছে। যেমন প্রধানমন্ত্রী গরীব কল্যাণ যোজনার অন্তর্গত একটি প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছিল: মৃত কোভিড যোদ্ধাদের পরিবার পিছু ৫০ লক্ষ টাকা বিমার অর্থ বিতরণের। প্রকল্পটি গত মার্চ মাসে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তাতে গোটা দেশে মাত্র ২৮৭ টি পরিবার উপকৃত হয়েছে। দ্বিতীয়ত সামগ্রিক ভাবে সরকার যে আর্থিক নীতি অবলম্বন করেছে তা অর্থনীতির যুক্তি বিরোধী।

অতিমারির মোকাবিলায় পৃথক ভাবে প্রত্যেকটি  ঘোষিত প্রকল্পের তাৎপর্য এবং সাফল্য নির্ণয় করার চেষ্টা আমরা করব না। এর কারণ প্রথমত প্রকল্পগুলি রূপায়ণ সম্বন্ধে প্রকাশিত তথ্যের অভাব; দ্বিতীয়ত, বর্তমান সরকারের পরিবেশিত তথ্যের বিশ্বাস যোগ্যতার অভাব যা নিয়ে কৌশিক বসুর মত অনেক অর্থনীতিবিদ মন্তব্য করেছেন। আমরা দেখার চেষ্টা করব অতিমারির পর্যায়ে সরকারের সামগ্রিক আর্থিক নীতি এই সঙ্কট মোকাবিলার জন্য কতটা উপযুক্ত ছিল। সরকারি তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই আমরা আলোচনা করছি। ধরে নিচ্ছি সরকারি সংস্থা তথ্যের হেরফের যা করে তা সরকারের গৌরব প্রচারের জন্যই। তাই তা ব্যবহার করে যদি আমরা সরকারকে সমালোচনা করি তার তথ্য ভিত্তি নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠতে পারে না।

সমস্ত অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে অতিমারি উদ্ভূত অর্থনৈতিক সঙ্কটের মূল কারণ লকডাউন, যাতায়াতের ওপর বিধি-নিষেধ, বেশী মানুষ একত্রিত হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা, ইত্যাদি। এর ফলে অনেক উৎপাদনশীল কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। কর্মহীন মানুষদের স্বাভাবিক ভাবেই বাজারে পণ্য কেনার ক্ষমতা থাকে না। চাহিদা কমেছে। আরও কাজ কমেছে। নিম্নগামী অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার উপায় একটাই। কেইন্সীয় অর্থনৈতিক বিধি অনুসরণ করে সরকারকে মানুষের হাতে কেনার ক্ষমতা পৌঁছে দিতে হবে। তাহলেই শুধু এই ভয়ঙ্কর মন্দা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে। এর ফলে এক দিকে দুস্থ মানুষ ত্রাণ পাবে, অন্য দিকে বাজার চাঙ্গা হবে। ভারত সরকার কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হেঁটেছে।

একই ত্রৈমাসিকে গত বছরের তুলনায় কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ব্যয় বৃদ্ধির হার  একই ত্রৈমাসিকে গত বছরের তুলনায় কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ব্যয় বৃদ্ধির হার

খাত এপ্রিল-জুন ২০১৯ এপ্রিলজুন ২০২০
কোম্পানি কর – 0.9% – 35.7%
ব্যক্তিগত আয় কর 7.0% – 12.3%
আবগারি শুল্ক – 3.8% 47.7%
মোট ব্যয় 12.8% 4.7%
চলতি ব্যয় 13%  3.7%
মূলধন ব্যয় 11.7%  12.8%
ঘাটতি ব্যয় 12.7%  33.1%

সূত্র: Economic Survey 20-21

সারণী থেকে দেখা যায় যে অতিমারির সময় সরকারের ঘাটতি ব্যয় উল্লেখ যোগ্য ভাবে বেড়েছে, যা কেইন্সীয় নীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। কিন্তু একটু খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায় যে এর পেছনে আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কেনার ক্ষমতা বাড়াবার কোন উদ্দেশ্য সরকারের ছিল না। মোট ব্যয় বৃদ্ধির হার গত বছরের অর্ধেকেরও কম। চলতি ব্যয় বৃদ্ধি, যা সরাসরি মানুষের কেনার ক্ষমতা বাড়ায়, গত বছরের বৃদ্ধির এক তৃতীয়াংশও নয়। উল্টো দিকে মূলধন ব্যয়, যার বেশীর ভাগটাই অদূর ভবিষ্যতে মানুষের কেনার ক্ষমতা বাড়াবে না, গত বছরের থেকে বেশী মাত্রায় বেড়েছে। ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়ে যায় যদি আয় খাতের দিকে নজর দি। ঘাটতি ব্যয়ের মূল কারণ কোম্পানি কর হ্রাস। আগের বছরের হ্রাসের তুলনায় ৩৫ গুনের বেশী কোম্পানি কর কমেছিল করোনা কালে। কিছুটা হ্রাস প্রত্যাশিত কারণ ব্যবসার মন্দা চলছিল। কিন্তু এর সিংহ ভাগের কারণ ধনিদের ওপর কর আরোপে সরকারের অনীহা। এরা বেশী কর দিতে অপারগ এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই।

অক্সফ্যাম-এর প্রতিবেদন অনুসারে অতিমারির প্রথম ঢেউ চলাকালীন ভারতীয় বিলিনিয়রদের (অর্থাৎ, যাদের সম্পদ ১০০ কোটি টাকার বেশী) আয় ৩৫% শতাংশ বেড়ে ৩ লক্ষ কোটিতে পৌঁছায়। প্রতিবেদনে আরও প্রকাশ যে একই পর্যায় মুকেশ আম্বানি সমস্ত এশিয়া নিবাসীদের মধ্যে নিজেকে সব চেয়ে ধনি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে।

ব্যক্তিগত আয়করও উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। এই হ্রাসও কিন্তু অতিমারিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের কোনমতেই সাহায্য করে না, কারণ এই করের আওতায় পরে জনসংখ্যার সব চেয়ে বিত্তশালী ১%। কর হ্রাসের ফলে ঘাটতি ব্যয়ের বহর আরও বেশী হত যদি আবগারি শুল্ক গত বছরের ত্রৈমাসিকের প্রায় দের গুণ না হত। সাধারণ ভাবে আবগারি শুল্কের মত পরোক্ষ করের বোঝা কোম্পানি কর অথবা আয়করের মত প্রত্যক্ষ করের তুলনায় বেশী পরে কম অর্থবানদের ওপর। এর কারণ প্রত্যক্ষ কর আরোপ করা হয় নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক শ্রেণী ওপর, যাদের আয় বেশী আর পরোক্ষ করের বোঝা সব ক্রেতাকেই বহন করতে হয়। গরীব মানুষ যেহেতু আয়ের সম্পূর্ণটাই ব্যয় করে বাঁচার তাগিদে আর বিত্তবান আয়ের একটা বড় অংশ সঞ্চয় করে তাই আয়ের অনুপাত হিসাবে প্রত্যক্ষ করের বোঝা বেশী পরে গরীবদের ওপর।

আবগারি শুল্ক বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের দুর্দশা একটা বড় কারণ যা নিয়ে মানুষ প্রতিবাদ মুখর – পেট্রো পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি। লোক সভায় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর স্বীকার করেন যে এই অর্থ বছরে পেট্রো পণ্যের ওপর কর থেকে মোট চলতি খাতের আয়ের ১২.২% উপার্জন  হয়েছে, যা ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে ছিল ৫.৪%। ৭ জুলাইয়ের হিসাব মত কলকাতায় পেট্রলের দামের ৪৮% ছিল উৎপাদকের দাম, ৩৩% কেন্দ্রীয় আবগারি আর ১৯% রাজ্যের কর; ডীসেলের দামের ৫২% ছিল উৎপাদকের দাম, ৩৪% কেন্দ্রীয় আবগারি আর ১৪% রাজ্যের কর।

অর্থনৈতিক যুক্তির বিরুদ্ধে গিয়ে মোদী সরকার যে অতিমারির সময় সাধারণের কেনার ক্ষমতা না বাড়িয়ে দোসর পুঁজির হাত শক্ত করার পথে হাটবার সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে তার কারণ মোদী জানে যে তার জনসমর্থন তার অর্থনৈতিক সাফল্যের ওপর নির্ভর করে না। আসন্ন উত্তর প্রদেশ নির্বাচনের প্রচার থেকে আর একবার স্পষ্ট হয়ে গেছে যে এই স্বৈরাচারী সরকারের ক্ষমতার উৎস ধর্মীয় মেরুকরণ।

Please follow and like us:
error16
fb-share-icon0
Tweet 20
fb-share-icon20
Tagged
No Thoughts on অর্থনীতির অতিমারি

Leave A Comment